ঘূর্ণিঝড় বুলবুল: মোংলা-পায়রায় ১০ নম্বর সঙ্কেত


অনলাইন ডেস্ক :

বঙ্গোপসাগরের ঘূর্ণিঝড় বুলবুল উপকূলের দিকে ধেয়ে আসার আগে বাগেরহাটের মোংলা ও পটুয়াখালীর পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ১০ নম্বর মহাবিপদ সঙ্কেত দেখাতে বলা হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ রুহুল কুদ্দুস শনিবার সকালে সঙ্কেত বাড়ানোর এই তথ্য বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, অতিপ্রবল এই ঘূর্ণিঝড়টি শনিবার সন্ধ্যা নাগাদ উপকূল অতিক্রম করতে পারে।
ঘণ্টায় দেড়শ কিলোমিটার বেগের বাতাসের শক্তি নিয়ে বুলবুল সুন্দরবন দিয়ে উপকূলে আঘাত হানতে পারে।
১০ বছর আগে পশ্চিমবঙ্গের সাগরদ্বীপ ও সুন্দরবন এলাকায় আঘাত হেনেছিল ঘূর্ণিঝড় আইলা। সেই ঝড়ের শক্তি ছিল বুলবুলের মতোই। বুলবুলের তাণ্ডবে সুন্দরবনের ক্ষতির শঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না ভারতীয় আবহাওয়াবিদরা।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ হাফিজুর রহমান সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, বুলবুলের অগ্রবর্তী অংশের প্রভাবে সমুদ্রবন্দরসহ উপকূলীয় এলাকায় শনিবার দুপুর থেকে ঝড়ো হাওয়া অব্যাহত থাকতে পারে।

পটুয়াখালীসহ দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলাগুলোতে সকাল থেকেই বৃষ্টি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে ৯ নম্বর মহাবিপদ সঙ্কেত দেখাতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। কক্সবাজারে আগের মতোই ৪ নম্বর সতর্কতা সঙ্কেত বহাল রাখা হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড়টি শনিবার সকাল ৯টায় মোংলা থেকে ৩৫০ কিলোমিটার দক্ষিণ পশ্চিমে, পায়রা থেকে ৩৮০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান করছিল।
চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে এর দূরত্ব ছিল ৫২৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং কক্সবাজার থেকে ৫১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে।
উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।
উপকূলীয় জেলা ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলোকে ১০ নম্বর মহাবিপদ সঙ্কেতের আওতায় রাখা হয়েছে। চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর থাকবে ৯ নম্বর বিপদ সঙ্কেতের আওতায়।


আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড় অতিক্রমকালে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা জেলাগুলো এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলোতে ভারিবর্ষণসহ ঘণ্টায় ১০০-১২০ কিলোমিটার বেগে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৫-৭ ফুট বেশি উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে।
ঝড় মোকাবেলার প্রস্তুতি
ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার আগে মোংলা, চট্টগ্রামসহ সব সমুদ্রবন্দরে কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। সারা দেশে সব ধরনের নৌযান চলাচল পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখতে বলেছে অভ্যন্তরীণ নৌপ‌রিবহন কর্তৃপ‌ক্ষ।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিপ্তরের মহাপরিচালক শাহাদৎ হোসেন শনিবার সকালে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছেন, ঝুঁকিপূর্ণ সাত জেলাসহ যে সব জেলায় দুর্যোগপূর্ণ বলে চিহ্নিত হয়েছে, সেগুলো থেকে লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে।
খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বরগুনা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর ও ভোলা জেলাকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা বিবেচনা করে প্রস্তুতি সাজানো হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) ৫৬ হাজার স্বেচ্ছাসবীকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে উদ্ধার ও জরুরি ত্রাণ তৎপরতার জন্য। পাশাপাশি উপকূলীয় সেনা ক্যাম্পগুলোকে সতর্ক রাখা হয়েছে। প্রতিটি জেলায় খোলা হয়েছে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ।
আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে ২০০০ প্যাকেট করে শুকনো খাবার পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। সচেতনতা সৃষ্টির জন্য স্বেচ্ছাসেবকরা মাইকে এবং ২২টি কমিউনিটি রেডিওর মাধ্যমে সতর্কবার্তা প্রচার করছে।
ঘূর্ণিঝড় থেকে নিজের ও পরিবারের জান-মাল রক্ষায় উপকূলীয় নিচু এলাকার বাসিন্দাদের শনিবার দুপুর ২টার মধ্যে নিকটবর্তী আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে সব মোবাইলে এসএমএস পাঠাচ্ছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ।
উপকূলীয় ১৩ জেলার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করে তাদের কর্মস্থলে উপস্থিত থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের সব শাখা খোলা রাখা হয়েছে ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য। সেই সঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অফিসে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


ঝড় এগিয়ে আসায় পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে শনিবারের জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষা। জেএসসির স্থগিত পরীক্ষা ১২ নভেম্বর এবং জেডিসির স্থগিত পরীক্ষা ১৪ নভেম্বর হবে। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শনিবারের সব পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়েছে। এ পরীক্ষা কবে নেওয়া হবে তা পরে জানানো হবে।
ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের উদ্ভব
সুদূর প্রশান্ত মহাসাগরে সৃষ্ট উষ্ণমণ্ডলীয় ঝড় মাতমো গত অক্টোবরের শেষে ভিয়েতনাম হয়ে স্থলভাগে উঠে আসে। সেই ঘূর্ণিবায়ুর অবশিষ্টাংশই ইন্দোনেশিয়া পেরিয়ে ভারত মহাসাগরে এসে আবার নিম্নচাপের রূপ নেয়।
বার বার দিক বদলে নিম্নচাপটি আবার শক্তিশালী হয়ে ওঠে। পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগরে এসে বুধবার রাতে তা ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নেয়। তখন এর নাম দেওয়া হয় বুলবুল।
এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সাগর তীরের আট দেশের আবহাওয়া দপ্তরের নির্ধারিত তালিকা থেকে ধারাবাহিকভাবে এই অঞ্চলের ঝড়ের নাম দেওয়া হয়। বুলবুল নামটি নেওয়া হচ্ছে পাকিস্তানের প্রস্তাবিত নামের তালিকা থেকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *