প্রফেসর তায়বুল হক ###

স্বপ্ন দেখতে হয়। স্বপ্ন ব্যক্তিকে তাড়িত করে স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পাতনের। ভারতরে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালামের বিখ্যাত উক্তি ‘ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে যাহা দেখা হয় তাহা স্বপ্ন নয়- স্বপ্ন তাহা যাহা তোমাকে ঘুমুতে দেয় না।’ এমনি ঘুম তাড়ানো এক স্বপ্ন দেখেছিল কয়েকজন তরুণÑ মফস্বল শহর ফেনী থেকে একটি নতুন দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের। এই স্বপ্নবাজদের দলপতি মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন অবশেষে ঘুম তাড়ানিয়া স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করলো আজ থেকে দশ বছর আগে ১৭ই জুন ২০০৯ সালে এক রিমঝিম আষাঢ়ষ্য বাদল দিনে। প্রকাশিত হলো ফেনী থেকে একটি নতুন দৈনিক পত্রিকা- ‘দৈনিক ফেনীর সময়।’
দৈনিক ফেনীর সময় এর সম্পাদক শাহাদাত হোসেন ততদিনে পত্রিকা প্রকাশে মোটামুটি হাত পাকিয়েছে। সাপ্তাহিক ‘ফেনী বার্তায়’ সম্পাদক মীর হোসেন মীরুর সাথে শিক্ষানবিশী করতে করতেই একসময় শাহাদাত নিজেই প্রকাশ করলো সাপ্তাহিক ‘আলোকিত ফেনী’। শাহাদাতের হাত ধরে আলো ছড়াতে থাকলো সাপ্তাহিক আলোকিত ফেনী এবং অবশেষে সেই আলো হাতের যাত্রী হাতে তুলে নিলো দৈনিক ফেনীর সময় নামের নন্দিত পত্রিকাকে।
শুরু হলো পথ চলা। সংশয়, শংকা, ভয়-ভীতি অতিক্রম করে সাফল্যের সাথে চলতে থাকলো সামনে- পাড়ি দিলো দশ বছর। এই অতিক্রান্ত সময়ে ‘ফেনীর সময়’ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হলো ফেনীর একটি অপরিহার্য পাঠ্য দৈনিক পত্রিকায় সর্বমহলে। এ এক ঈর্ষনীয় সাফল্য- ফেনীর মত মফস্বল জেলা শহরের একটি দৈনিক পত্রিকায় জন্য। ফেনী থেকে দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক মিলিয়ে প্রকাশিত হয় কত কত পত্রিকা। কটাই বা মানুষ পড়ে, কটাই বা মানুষের কাছে অপরিহার্য হয়ে উঠতে পেরেছে?
এত এত পত্রিকার ভীড়ে দৈনিক ফেনীর সময় কী যাদুর কাঁঠির ছোঁয়ায় প্রধানতম পত্রিকা হয়ে উঠলো? যাঁদুর কাঁঠি একটাই- পাঠকের আস্থা অর্জন। পাঠকের আস্থাই একটি পত্রিকার টিকে থাকা এবং সাফল্যের জিয়ন কাঁঠি। এই আস্থা অর্জন করতে হলে একটি পত্রিকাকে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়। পেশাগত সততা নিয়ে, দক্ষতা নিয়ে লক্ষ্য অর্জনে পরিশ্রম করে যেতে হয় নিষ্ঠার সাথে- নিরপেক্ষতার সাথে। হৃদয় ছুঁয়ে যেতে হয় পাঠকের, -দোলা দিতে হয় পাঠকের হৃদয়ে, আশা জাগিয়ে তুলে পাঠকের ভরসার স্থলে পরিণত হতে হয় পত্রিকাটিকে। পাঠক যেন নিজের আপন মনের কথাগুলোকে, ভাবনা গুলোকে, দুঃখ কষ্ট আনন্দ বেদনা গুলোকে কাগজের পাতায় ছাপার অক্ষরে দেখতে পায়। তবেইতো পত্রিকাটি হয়ে উঠতে পারে জনগণ নন্দিত-পাঠকপ্রিয়।
দৈনিক ফেনীর সময় শুধু একটি আঞ্চলিক পত্রিকা নয়- ফেনী শহর থেকে প্রকাশিত একটি মফস্বলের দৈনিক পত্রিকাও বটে। টিকে থাকতে গেলে কত কত দিকে সজাগ দৃষ্টি, কত বন্ধুর পথ, কত বাধার বিন্ধ্যাচল অতিক্রম করে তবে না বিজয় কেতন উড়ানো সম্ভব। তা করতে পেরেছে বলেই পত্রিকাটি অগ্রযাত্রার যান্ডা হাতে নিয়ে সাফল্যের যাত্রাকে ক্রমশ আরও উর্দ্ধে তুলে আজ এগারোয়।
আঞ্চলিক পত্রিকা হিসেবে দৈনিক ফেনীর সময় সব সময় বেশী গুরুত্ব দিয়েছে আঞ্চলিক খবরকে- আঞ্চলিক ঘটনাকে। সামনে এনেছে বিভিন্ন আঞ্চলিক সমস্যাকে, বিভিন্ন ক্ষেত্রের সমস্যাকে। এই সমস্যাগুলোকে অনিয়ম অন্যায়গুলোকে লোকচক্ষুর অন্তরাল থেকে বের করে আনার ক্ষেত্রে ভ্রুক্ষেপ করেনি কোন ভয় ভীতিকে কোন রক্তচক্ষুকে। প্রশাসন ফেনীর সময়ে প্রকাশিত বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের ভিত্তিতে তড়িৎ ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং জনগণ অবাক বিষ্ময়ে দেখে বছরের পর বছর দখলকৃত স্কুলের মাঠ মুক্ত হয়, ইট, বালি, রড়ের বাগাড় থেকে তিন দিনের মধ্যে। শুরু হয় গ্যাস এর অবৈধ সংযোগ বিছিন্ন করণ সারা জেলায়। বখাটে মুক্ত হয় স্কুল কলেজের ছাত্রীদের যাতায়াত পথ ও প্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গন, মুক্তি পায় বালিকা চরম নির্যাতনের হাত থেকে, ধরা পড়ে নির্যাতনকারী, ধরা পড়ে খুনী। অবৈধ দখলদার মুক্ত হয় ফুটপাত এবং এইরূপ আরও কত কত প্রতিকার পাওয়া গেছে যা সাধারণ মানুষকে, পাঠককে আড়োলিত করে, আনন্দ দেয় এবং আশা জাগায় ভরসা জাগায়।
আঞ্চলিক পত্রিকা হিসেবে টিকে থাকার শত সমস্যার মধ্যেও দৈনিক ফেনীর সময় সামাজিক দায়িত্ব পালনে অনেক আগেই গঠন করেছে ‘আলোকিত ফেনী ফাউন্ডেশন’ নামের প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সামাজিক দায়িত্ব পালনের জন্য। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে শিক্ষা বিস্তারে উৎসাহ প্রদানের জন্য বিভিন্ন স্তরে বৃত্তি পরীক্ষা যা ফেনী জেলায় অভূতপূর্ব সাড়া ফেলেছে। প্রতিষ্ঠা করছে স্কুল, দাঁড়াচ্ছে বস্তিবাসীদের পাশে, ছিন্নমূল শিশুদের পাশে। শিশু কিশোরদের নিয়ে বিশেষ বিশেষ দিনে প্রতিযোগিতার আয়োজন করছে গানের, চিত্রাংকনের শুধু তাদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের জন্য নয় বরং ঐ বিশেষ বিশেষ দিনের তাৎপর্যকে তাদের কোমল হৃদয়ে গেঁথে দেওয়ার জন্য-দেশপ্রেম সৃষ্ঠির জন্য। এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে ফেনীর কৃতি গুণীজনদের সংবধর্না দেওয়া হয় যা ফেনীতে প্রথম এবং চলমান।
বিভিন্ন জাতীয় দিবস গুলি গুরুত্ব দিয়ে ফেনীর সময় পালন করে, আয়োজন করে আলোচনা অনুষ্ঠান। হৃদয়ে ধারণ করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে- তাই মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আয়োজন করে মুক্তি যুদ্ধের স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠান। প্রকাশ করে বিশেষ রচনা সমৃদ্ধ বিশেষ সংখ্যা। আশ্চর্য হই যখন প্রতি বছর হাতে পাই বিশেষ বিশেষ দিনের বিশেষ সংখ্যাগুলি¬- ঈদ সময়, বাংলা নববর্ষ সংখ্যা, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংখ্যা, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস সংখ্যা এবং এই দিবস গুলি উপলক্ষে বিশেষ আলোচনা সভার আয়োজন দেখে। সত্যিই তখন ভাবিত হই কতবেশী নিবেদিত থাকলে ফেনীর মত শহর থেকে প্রকাশিত চার পৃষ্ঠার একটি দৈনিক পত্রিকার পক্ষে এত এত প্রত্যাশা পুরণ সম্ভব। এই পত্রিকা প্রতি সপ্তাহে সাহিত্য পাতা প্রকাশ করে- গড়ে তুলেছে পাঠক ফোরাম। কত অনুষ্ঠান করছে এই পাঠক ফোরাম, গড়ে উঠছে পত্রিকার নব নব পাঠক। সাহিত্য পাতায় কত তরুণ কত কিশোর হাত মস্কো করে নিচ্ছে ভবিষ্যতের কবি-সাহিত্যক হওয়ার স্বপ্নবুনে। সাহিত্য আড্ডা জমিয়ে তোলে প্রতিষ্ঠিত ও উঠতি কবি সাহিত্যেকদের নিয়ে- অনুষ্ঠিত হয় কবিতা পাঠের আসর।
দৈনিক ফেনীর সময়ের সাথে আমার সম্পর্ক সেই প্রথম থেকেই। পরিবারের অংশীদার না হয়েও সদস্য হয়ে গেছি। ছাড়াতে গেলেও ছাড়ানো যায়না বরং জড়ানোটা আরও ঘনিষ্ঠ হয়। কত কত অনুষ্ঠানে সভাপতি, প্রধান অতিথি, বিশেষ অতিথি, প্রধান আলোচক বা বক্তা হিসেবে উপস্থিত থাকতে হয়েছে তা বেশুমার। জীবনাতেন্তর আগে এই মধুর উৎপাত থেকে ফেনীর সময় আমাকে অব্যাহতি দিবে? মনে হয় না।
মানুষ যাকে ভালোবাসে তার ভাল এবং মন্দ দিকগুলো নিয়েই ভালবাসে। তবুও স্বভাবত মানুষ ভালবাসার ব্যক্তির বা বস্তুর মন্দ দিকগুলো আড়াল করে ভাল দিকগুলো প্রকাশ করতে চায়। ফেনীর সময় আমার ভালোবাসার পত্রিকা। জন্মবার্ষিকীর এই শুভক্ষণে মন্দ দিকগুলো যা আছে, তা আড়ালেই থাক না, ভবিষ্যতে অন্য সময় অন্য কখনো বলার জন্য তোলা রইল। আজ শুধুই ভাললাগা, শুধুই ভালবাসা।
এক দশক পেরিয়ে ফেনীর সময়। প্রার্থনা রইল এই ভাবে দশকের পর দশক এগিয়ে যাক সাফল্যের সাথে গর্বের সাথে, শত বাধা বিপত্তি পদদলিত করে সম্মুখ পানে। কষ্ট হয় যখন দেখি ফেনীবাসীর জন্য অত্যন্ত লজ্জার, ঘৃণার এবং সারাদেশে এবং বর্হিবিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টিকারী নুসরাত হত্যার বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের দায়ে ফেনীর সময় এর সম্পাদক মোহাম্মদ শাহাদাতসহ অন্যান্য সাংবাদিককে প্রতিহিংসার শিকার হয়ে কাঠ গড়ায় দাঁড়াতে হয়। তাই কাজী নজরুলের নিকট ক্ষমাচেয়ে বলতে হয়-
দুর্গম গিরী কান্তার মরু দুস্তর পারাবার
লঙ্গিতে হবে সাহসের সাথে ফেনীর সময় হুশিয়ার।
জয়তু ফেনীর সময়।
লেখক : ট্রেজারার, ফেনী ইউনিভার্সিটি
প্রাক্তন অধ্যক্ষ, ফেনী সরকারি কলেজ, ফেনী।

antalya escort bursa escort adana escort mersin escort mugla escort samsun escort konya escort