মাহবুব আলতমাস ###

বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী ছিলেন আমৃত্যু বাউন্তলে কবি, প্রাবন্ধিক বেলাল চৌধুরী ষাটের দশকের অন্যতম সদা হাস্যেজ্জ্বল এ সজ্জন মানুষটি। জন্ম ১২ নভেম্বর ১৯৩৮ সাল। আর মৃত্যুবরণ করলেন ২৪ এপ্রিল ২০১৮ সাল। প্রচার বিমুখ, সকল বর্ণাঢ্য ঘটনার নেপথ্য নায়ক কারা বেলাল ভাই, কারো মামা, বন্ধু মহলে, আড্ডায় তিনি সদায় ছিলেন অন্যতম এক প্রিয় মানুষ। কবি বেলাল চৌধুরীর বাড়ি ফেনী সদর উপজেলার শর্শদী ইউনিয়নে। সম্ভবত তারা তিন ভাই। তিনি জৈষ্ঠ, সাংবাদিক গিয়াস কামাল চৌধুরী দ্বিতীয় এবং তৃতীয়জন জিয়াউদ্দিন। শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী ও ডা. তবারক উল্লাহ চৌধুরী বায়েজিদ এরা পরস্পর চাচাতো ও জেঠাত ভাই। এরা প্রত্যেকে স্ব স্ব ক্ষেত্রে স্বনামধন্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী। ফেনী জেলার কৃতি সন্তানদের অন্যতম এসব ব্যক্তিত্ব জাতীয় জীবনে দেশের অন্যতম সমুজ্জল দেশপ্রেমিক। সারাজীবন দেশের সেবা করে গেছেন।

গ্রামেই তার শৈশব কেটেছে। দুরন্ত স্বভাবের মানুষটি সে কৈশোর থেকে নানান ঘটনার মধ্যে বড় হয়েছেন। মানুষটি মন মানসিকতায় বাম ঘরানার মানসিকতায় বড় হয়ে ওঠেছেন। কোন সরকারী আনুকুল্যের পিছনে ছুটেন নাই। স্বাধীন বাংলাদেশে দু’হাতে লিখেছেন। দেশপ্রেমিক বেলাল চৌধুরী সাহিত্য সেবার নেপথ্যে দেশের জন্য কাজ করে গেছেন। কৈশোর কালে বাড়ীর পাশে রেল গাড়ী আসা-যাওয়া দেখে দেখে রেলের ড্রাইভার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। একসময় ব্যবসা করার চেষ্টা করেছিলেন চট্টগ্রামে। তারপর ট্রলারে সমুদ্রের মাছ ধরার কাজ করেছিলেন। আমেরিকা যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। অবশেষে কোন স্বপ্নই সফল হলো না। তারপর ট্রলারে মাছ ধরতে ধরতে কলকাতায় চলে গেলেন।

তারপর কলকাতায় থিতু হলেন। দিনে দিনে পরিচিত হয়ে ওঠলেন কলকাতার সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিকবান ব্যক্তিদের সাথে। খ্যাতিমান লেখক সুনীল গঙ্গোপধ্যায়, কবি শক্তি চট্টোপধ্যায়, উৎপল কুমার বসু, নায়ক সৌমিত্র চট্টোপধ্যায়, কথাসাহিত্যিক শ্যামল গঙ্গোপধ্যায় কলাকাতায় সে বিখ্যাত কফি হাউকে নিয়মিত যাওয়া শুরু করলেন। ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে ওঠলেন ইন্দ্রনাথ মজুমদার, কমল কুমার মজুমদার (নজরুল সংগীত শিল্পী ফিরোজা বেগমের স্বামী) সহ অনেকের সাথে।

এপার বাংলা, ওপার বাংলা আজ যতো সহজে হয়েছে সেদিন অতো সহজ ছিল না। পাকিস্তান আমলে মুখ দেখাদেখি ছিল না। পাকিস্তান আমলে জেল খেটেছিলেন সেহেতু কিছুদিন যাওয়ার পর অনেকেই বেলাল চৌধুরীকে পাকিস্তানের গুপ্তচর ভাবতে থাকেন। সদাহাস্য মুখ, সজ্জন এ মানুষটিকে সময়ে ঐ ভাবনা থেকে মুক্ত হলেন। সুন্দর শারিরীক গঠনের মানুষটিকে কলকাতায় দিনে দিনে নারী ও পুরুষ সবাই ভালোবাসতে থাকেন। একসময় তিনি পরিচিতি সংকটে কবিতা লেখা শুরু করলেন। কলকাতার জীবনে যে খুব সুখে ছিলেন এমন কথা বলা যাবে না। তিনি খুব সাধারন ও কষ্টকর জীবন যাপন করবেন। কিন্তু মনে সুখ ছিল। ঐ সুখের লোভে ও অনেক বন্ধুর সান্নিধ্যে বেশ ছিলেন। প্রিয় বন্ধু সুনীল গঙ্গোপধ্যায়ে অতি ভালোবাসায় সিক্ত ছিলেন। এক সাক্ষাতকালে কবি বলেছিলেন আক্ষেপ করে ‘কোনো লেখাই আমি শেষ করতে পারিনি’। তবে আমি মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। সুনীল বাবু বলতেন- ‘বেলাল তুই আমাদের মাঝে এক ছদ্মবেশী রাজপুত্র’।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ব্যবসায়ী মোতাহের হোসেন চৌধুরী পটুর দুর সম্পর্কের মামা ছিলেন বেলাল চৌধুরী। পটু সেনেরখিলের যুবরাজ নাট্যাচার্যের আত্মীয় ছিলেন। আমিও সেলিম আল দীন ও পটু একই গ্রামের অধিবাসী। ঐ সূত্র ধরে স্বাধীনতার পরে পটুর সাথে আমি ও তোতা ভাই ঢাকা গেলে প্রায়শ মামার সাথে অবসরে ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা মারতাম।

মামার আড্ডার সঙ্গী ছিলেন সৈয়দ শামসুল হক, কবি রফিক আজাদ, কবি হাবীবুল্লা সিরাজী, অভিনেতা পিযুশ বন্দোপধ্যায়, কবি ও স্থাপতি রবিউল হক, কবি ত্রিদিব দস্তিদার সহ অনেকেই। মামার সাথে জম্পেশ আড্ডায় অনেক পেশার বিখ্যাত লোকদের আনাগোনা এং অনেকের ডাকে আড্ডায় যেতে আহবান জানাতেন। এ গ্রুপের অনেকেই সময়ে চট্টগ্রাম, ঢাকা ও খুলনা ভ্রমনের অনেক স্মৃতি আমাকে টানে এবং আজ মাঝে মাঝে কষ্টও দেয়।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সম্ভবত ১৯৭২ সালে তিনি কলকাতার মায়া কেটে ঢাকা ফিরলেন। মায়ের অনুরোধে দেশের গ্রামের বাড়ীতে বিয়ে করলেন। উনার দুই ছেলে ও এক মেয়ে ছিলেন।

কথা সাহিত্যিক শ্যামল গঙ্গোপধ্যায়ের একটি বই আছে- ‘স্বর্গে তিন পাগল’। ইন্দ্রনাথ মজুমদার, (লেখক ছিলেন না) বেলাল চৌধুরী ও সুনীল গঙ্গোপধ্যায়। জার্মানী লেখক গুল্টার গ্যাস কলকাতা থেকে ঢাকা এসেছিলেন তৎকালীন ভারতবর্ষের স্বাধীন বাংলাদেশে। একে দেখাশোনার ভার পড়েছিলো ভারতীয় শুভেচ্ছা ও সোহার্দের প্রতিক ভারত বিচিত্রার সম্পাদক বেলাল চৌধুরী ওপর। আমরা অনেকেই সেদিন ঢাকা বিমানবন্দরে তাকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলাম। (সময় তারিখ মনে পড়ছে না)।

“শুরু যেখান থেকেই হোক, আমি তো সেই স্বাধীনতা-পরবর্তীকালের দৃশ্যমান এক পথিক। আবদুল্লাহ ফারুক, মুক্তিযোদ্ধা, রেডিওতে আছেন, এলেন ঢাকা স্টেডিয়ামের প্রভিন্সিয়াল রেস্টুরেন্টে। সঙ্গে অতিশয় সুদর্শন এক পুরুষ। পরিচয় করিয়ে দিলেন বেলাল চৌধুরী। বিরিয়ানির ঘ্রাণ এবং উষ্ণ হাওয়া মিলেমিশে যেন ঢাকা-কলকাতা হয়ে গেল। জলে ও ডাঙায় তখন বেলাল চৌধুরীর হরেক গল্প ছি-পলানটি খেলছে! কুমিরের চাষ করবেন বলে খুলনায় খামার করেছিলেন। তারপর একদিন জাহাজে চেপে উধাও। সে জাহাজ নোঙর করল কলকাতায়। গত শতাব্দীর ষাটের দশকের মধ্যভাগ থেকে সেই যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায় প্রমুখকে ছেঁকে-ছেনে কৃত্তিবাস কী কবিতা পত্রিকার শিকল-কড়া নেড়ে কবরস্থান ও শ্মশানে ঠাঁই করা তারই তো জের ‘ও-বাড়িটায় কেউ থাকে না শুধু হাওয়ার কুহক’।

বেলাল ভাই। কলকাতার মায়া কাটিয়ে ঢাকা ফিরলেন। একদিন যেমন হুট করে চলে গিয়েছিলেন, তেমনি এলেন মায়ের ডাকে। মাটির টানে। জড়িয়ে গেলেন নানান উদ্যোগে। হাত লাগালেন বিবিধ কর্মকান্ডে। এ পাশ-ও পাশ করে থিতু হলেন সচিত্র সন্ধানীতে। নয়াপল্টনের গাজী ভবনের নিচতলায় দপ্তর। সাপ্তাহিক পত্রিকা। মধ্যদুপুর থেকে গাঢ় সন্ধ্যা পর্যস্ত ব্যস্ততা। আড্ডা, লেখালেখি, গল্প, মুখশুদ্ধ করা কেচ্ছা-গিবত সব যেন জড়াজড়ি করে আছে। পত্রিকার মালিক-কর্ণধার গাজী শাহাবুদ্দীন আহমদ থেকে কাইয়ুম চৌধুরী পর্যন্ত ফুরসত পেলেই ঢুঁ মারেন।

এর মধ্যেই একদিন শুরু হয়ে গেল পদাবলীর আয়োজন। দর্শনীর বিনিময়ে কবিতাপাঠ। ১৯৮০ সালের কথা। শামসুর রাহমান, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, সৈয়দ শামসুল হক, সাইয়িদ আতীকুল্লাহকে সামনে রেখে কাঠি নাড়ছেন বেলাল চৌধুরী, রফিক আজাদ। রবিউল হুসাইন, হায়াৎ সাইফ, অরুণাভ সরকার, মুহম্মদ নূরুল হুদাসহ আরও অনেকেই ঢোল হয়ে সে উৎসবে আওয়াজ দিলেন। সন্ধানীর অফিস টগবগ করছে, আর লোল চৌধুরী তপ্ত উনুনে ঘি ঢালছেন। মাহমুদুল হক, রশীদ হায়দার অনুষ্ঠানের আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত। নাসির আলী মামুন ব্রোসিয়রের জন্য কবিদের ছবি তুলছেন। নাম উল্লেখ না করেই বলছি, তরুণদেরও সাড়া ছিল আশাব্যঞ্জক। প্রকাশিত হলো পদাবলী কবিতা সংকলন, সম্পাদনা করলেন বেলাল চৌধুরী। তিনি যেমন প্রিয় ছিলেন তাঁর ‘স্যার’ শামসুর রাহমানের, তেমনি আপনজন ছিলেন আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর। ‘একটি রং তৈরির কারখানা গড়ছি আমি’।

বেলাল চৌধুরীর কবিতা। ১৯৭২ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত।

‘নিবিড় বেদনা কিছু ঝরে গেল নীরবে প্রথম রক্তপাতে।’ প্রথম রক্তপাতের বেদনা কবিতার প্রথম উচ্চারণের মতোই। বেদনার আনন্দময়তা। আনন্দের মধ্যে এই যে নিহিত বেদনা, তাই যেন বেলাল চৌধুরীকে দাবড়ে বেড়ায়। ‘হলদে তামাটে বালির ওপর তাহাদের পায়ের ছাপ।’ তামাটে বালিতে পায়ের ছাপ নিয়েই এগিয়ে চলা। ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত হয় কবিতার বই সেলাই করা ছায়া। স্বপ্নবন্দী ১৯৮৫ সালে, আর ১৯৮৬ সালে প্রতিনায়কের স্বগতোক্তি। পরপর তিন বছর তিনখানা কবিতার বই। কিন্তু মেজাজে ও উচ্চারণে পৃথক। সময় তাঁকে নানান উপলব্ধি দিয়েছে এবং কখনো নিজেকে সমর্পণও করেছেন সময়ের করতলে। তারই একটি প্রতিচিত্র মেলে কবিতাগুলোতে-

১. ‘একটি ডিমের ভেতর কি আছে?

গান, রাসায়নিক স্বরলিপি

অদৃশ্য জঠরে ঠাসা

বিস্তারিত নীড় বাঁধার নির্দেশ

সুষম খাদ্যতালিকা, নক্ষত্রের মানচিত্র’

২. ‘কুমিরের রাত ছিল কাল, অনেক কুমির এসেছিল

রাতভর শুধু, কুমিরেরা আমি জানি নৈশাতাঙ্কের

নিজস্ব বৈধতাতেই এসেছিল তারা, যে বৈধতা আছে

দাসত্বে, যুদ্ধে, বর্ণবৈষম্যবাদে।’

৩. ‘বরফকুচির মতো, চৈত্রের পেঁজা তুলোর মতো

রাশি রাশি ভুল উড়ছে আকাশে অজস্রভুলের

পতাকা উড়িয়ে’

লেখক : ফিচার এডিটর, দৈনিক ফেনীর সময়

কবি ও সাবেক সভাপতি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, ফেনী জেলা শাখা।