কলামিস্ট


একজন গণমাধ্যম কর্মী হিসেবে আমার পথ চলার শুরু থেকে এই জেলায় যে ক’জন রাজনীতিকের সঙ্গেঁ সু-সম্পর্ক গড়ে উঠে তাঁদের মধ্যে সৈয়দ মিজানুর রহমান অন্যতম। পেশার গন্ডি ছাড়িয়ে অনেকটা ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরী হয় তাঁর সাথে। মঙ্গলবার দুপুরে ছোট ভাই আলী হায়দার মানিক যখন ফোনে খবরটা দিল তখন কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিল না। রবিবার হঠাৎ অসুস্থ হওয়ার খবরটি প্রথমে ফেসবুকে দেখি। পরে বকুল ভাই (ফজলুর রহমান বকুল) ফোনে জানান, তারা পাগলা মিয়া জামে মসজিদে মিজান ভাইয়ের সুস্থতা কামনায় দোয়া করিয়েছেন। পরদিন প্রথম পাতায় খবরটা ছাপা হয়। মনে করেছিলাম এরকম অসুস্থতা হয়তো দু’একদিন পর সেরে যাবে। কিন্তু তিনি এত অল্প বয়সে হঠাৎ চলে যাবেন- এটা কার ভাবনায় ছিল ?
তাঁর সাথে আমার পরিচয় সাপ্তাহিক ফেনী বার্তা থেকে। তখন তিনি জেলা ছাত্রদলের সভাপতি। ফেনী বার্তা সম্পাদক শ্রদ্ধেয় মীরু ভাই (মীর হোসেন মীরু) তার ফুফাত ভাই। মাঝে মাঝে ট্রাংক রোডের প্রেস ক্লাব সংলগ্ন অফিসে আসতেন মিজান ভাই। শুধু রাজনৈতিক পরামর্শই নয় ব্যক্তিগত-পারিবারিক বিষয়েও মীরু ভাইয়ের পরামর্শ নিতেন তিনি। তখন আমার সঙ্গে খবরা খবর নিয়ে কথা হত। তাঁর ভদ্রতা, বিনয়, শিষ্টাচার আমাকে আকৃষ্ট করত। বয়সে তিনি বড় হলেও ক্রমেই আমার সাথে গড়ে উঠে এক চমৎকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। বিশেষ করে আমি দৈনিক দিনকালে যোগদানের পর যোগাযোগটা আরও বেড়ে যায়। ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর জাসদ ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেন অধ্যাপক জয়নাল আবদীন ভিপি। এর কিছুদিন পর ফেনী-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেনকে আহবায়ক আর ভিপি জয়নালকে যুগ্ম-আহবায়ক করে এবং পরবর্তীতে যথাক্রমে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক করে জেলা বিএনপির কমিটি হয়। তখন সৈয়দ মিজানকে জেলা যুবদলের সভাপতি, জাসদ থেকে আসা জাহাঙ্গীর চেয়ারম্যান ও হারুন মজুমদারকে যথাক্রমে সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদক করে কমিটি করা হয়। ২০০০ সালে ভিপি জয়নাল গ্রেফতার হলে যুবদল নেতা সৈয়দ মিজানই ছিলেন জেলা বিএনপির অঘোষিত কান্ডারী। রাজনীতিতে নবাগত সংসদ সদস্য মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেনের নির্দেশনায় সৈয়দ মিজান তখন কেবল যুবদল নয়, বিএনপিও চালাতো। তখন সরকার দলীয়দের নিত্য সন্ত্রাস-সহিংসতার ভয়াল সময় অত্যন্ত বিচক্ষনতার সাথে অত্যন্ত দক্ষতা ও বিচক্ষনতার সাথে অতিক্রম করেছেন সৈয়দ মিজান। তাঁর বাড়িতেই (রামপুর সৈয়দ বাড়ী) হত বিএনপির যাবতীয় ঘরোয়া সভা-সমাবেশ। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসলে তিনি কেমন সুবিধা পেয়েছেন, সেটা আমার তেমন জানা নেই। তবে ২০০৯ ও ২০১৪ সালে সদর উপজেলা চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করতে তাকে পৈত্রিক জমি বিক্রি করতে হয়েছে বলে জেনেছি। একজন আইনজীবি হিসেবে বর্তমান সরকার আমলে আদালতে তাঁর ভূমিকা মামলায় জর্জরিত নেতাকর্মীদের মনোবল বাড়িয়েছে বলে অনেকেই বলে থাকেন। আমৃত্যু বিএনপির জন্য নিবেদিত সৈয়দ মিজান কেবল দলের নয় তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ভিন্ন দলেও ছিল। স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে যে কাউকে আকৃষ্ট করার অসম্ভব শক্তি ছিল তার। ফেনী সরকারি পাইলট হাই স্কুলের ১২৫ বছর পূর্তি উৎসবে প্রয়াত আওয়ামীলীগ নেতা একরাম ভাই সহ সবার সঙ্গে তাকে দেখেছি আন্তরিকভাবে স্বীয় দায়িত্ব পালন করতে। ওই মহোৎসবে তিনি সম্ভবত খাদ্য বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন।
মিডিয়া কর্মীদের কারো সঙ্গে তাঁর বৈরী সম্পর্ক ছিল কিনা জানা নেই। মাঝে মাঝে দৈনিক ফেনীর সময় এ প্রকাশিত কোন সংবাদে খুশি হয়ে যেমন ফোন করে স্বভাবসুলভ হাসিতে ধন্যবাদ জানাতেন। তেমনি নাখোশ হলেও ক্ষোভ দেখাতেন না। বরং ভুলত্রুটি হলে এর ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করতেন। এটা বর্তমান সময়ের রাজনীতিকদের মাঝে খুব একটা দেখা যায় না। কোন কারনে ফেনীর সময় না পেলে ফোন দিতেন, সংগ্রহ করতেন। সার্কুলেশনের দায়িত্বে থাকা আবদুর রহিমের সাথে প্রায়ই যোগাযোগ রাখতেন। তার মাধ্যমে আমারও খোঁজখবর নিতেন। ফেনীর সময় এর প্রতিটি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানেই তাঁর সরব উপস্থিতি আমার আজীবন মনে থাকবে। ২০১৩সালে জেলা শিল্পকলা একাডেমী মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে তিনি সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন খাগড়াছড়ির সাবেক এমপি ওয়াদুদ ভূঁইয়াকে। আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, ওয়াদুদ ভাই একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে এসেছেন। বললাম আপনিতো ফেনীরই মানুষ। উনিও পত্রিকার কথা শুনে শুভেচ্ছা জানাতে চলে এলেন। ওয়াদুদ ভাইয়ের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানে বাড়তি মাত্রা যোগ হল। তৎকালীন মেয়র নিজাম উদ্দিন হাজারী, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার সহ সর্বদলীয় নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন শ্রেনী-পেশার প্রতিনিধিগণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। সর্বশেষ ২০১৭ সালের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানেও দলীয় নেতৃবৃন্দকে সঙ্গে নিয়ে শুভেচ্ছা জানাতে আসেন সৈয়দ মিজান। আদালত শেষে দুপুরে আসেন ফেনীর সময় কার্যালয়ে। দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ করায় আমাকে বিবাদী করে এক প্রধান শিক্ষক আদালতে পরপর দুটি মামলা দায়ের করেন। মিজান ভাই বিষয়টি জানামাত্রই স্বপ্রণোদিত হয়ে আরো কয়েকজন সহকর্মীকে নিয়ে আদালতে মামলার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে যান। অথচ আমি তখন জানিও না, ওই মামলায় আমাকে একদিনের জন্যও আদালতে যেতে হয়নি। তিনি সহ কয়েকজন আইনজীবির প্রচেষ্টায় এটি দ্রুত নিষ্পত্তি হয়। একজন সম্পাদকের প্রতি আইনজীবির এমন ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ আমাকে সত্যিই অনুপ্রানীত করে। ২০১৩ সালে আমার বাবার মৃত্যু সংবাদেও তিনি ছুটে যান দাগনভূঞার মমারিজপুরে আমাদের গ্রামের বাড়িতে। ২০১৬ সালে পবিত্র হজ্বব্রত পালনে সৌদি আরবে অবস্থানরত সময়ে মিজান ভাই প্রায়ই আমার অফিসে এসে খোঁজখবর নিতেন বলে শুনেছি। সুখে-দু:খে এ মানুষটির নানা খন্ড স্মৃতি কেবলই মনে পড়ছে। সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও জেলা সহ-সভাপতি হলেও তার স্বপ্ন ছিল জেলা সাধারণ সম্পাদক হওয়া। আসলে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হওয়ার মত যোগ্যতাও তার ছিল। এ স্বপ্ন পূরণে সহকর্মী ও শুভাকাঙ্খিরা ছিলেন দৃঢ় আশাবাদী। কিন্তু তিনি সেই সময় পেলেন কই। ফেনী সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি থেকে শুরু করে দীর্ঘ পথ মাড়িয়ে এলেও কাঙ্খিত স্বপ্ন পূরণের আগেই চলে গেলেন আপাদমস্তক এ রাজনীতিক। এ কথা নির্ধিদ্বায় বলা যায়, ফেনীতে পরিচ্ছন্ন রাজনীতিকদের একজন ছিলেন সৈয়দ মিজান। সন্ত্রাস নির্ভর কিংবা কোন নোংরা পথে তার বিচরন দেখা যায়নি। বরং আমার জানামতে ফেনী জেলার সর্বত্রই তার হাত ধরে অনেক নেতা তৈরি হয়েছেন। যারা বিএনপি ও সহযোগি সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
প্রিয় মিজান ভাই চলে গেছেন না ফেরার দেশে। সত্যিই মেনে নেয়া কষ্টকর, কিন্তু এতো সৃষ্টির অমোঘ নিয়ম। এ নিয়ম ভাঙার সাধ্য কারোই নেই। আমি প্রায়ই বলি, যে মানুষ তাঁর স্রষ্টাকে স্বীকার করে না, সেও মৃত্যুকে স্বীকার করে।
সব মৃত্যু মানুষের হৃদয়ে নাড়া দেয় না। কিছু কিছু মৃত্যু অন্যদের ব্যথিত করে। তাঁরাই স্বার্থক। মিজান ভাইও এমন একজনই ছিলেন। যাঁর মৃত্যু সংবাদ দলমত নির্বিশেষে যারাই শুনেছেন অন্তরে লেগেছে। আমি কোন রাজনৈতিক দলের কর্মী না হলেও একথা বলতে পারি সৈয়দ মিজানের মৃত্যু কেবল বিএনপির জন্যই নয় বরং ফেনীবাসীও একজন সম্ভাবনাময় রাজনীতিককে হারিয়েছে। যে ক্ষতি সহজেই পূরন হবার নয়। পরম করুনাময় তার ভুলভ্রান্তি ক্ষমা করে ওপারে ভাল রাখুন। তার স্বজনদের এই শোক সহিবার শক্তি দিন।