অনলাইন ডেস্ক নিউজ

ভারতের আকাশ বাণীর ‘এ’ গ্রেডের প্রথিতযশা সঙ্গীত শিল্পী অনসূয়া মুখোপাধ্যায়। মাত্র ৭ বছরে সঙ্গীত চর্চার শুরু করেন ওস্তাদ চন্ডীচরন সরখেলের কাছে। দীর্ঘদিন ধরেই সারা ভারতবর্ষে সুনামের সহিত সঙ্গীতের সাথে জীবন অতিবাহিত করেন। ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত, রাগপ্রধান, ভজন, গীত, নজরুল সঙ্গীত ও ভক্তিগীতিতে তার দীর্ঘ পদচারনা। দীর্ঘ ছয় বছর তিনি রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা গানের অধ্যাপকের দায়িত্বে ছিলেন। গত ২ ও ৩ ফেব্রুয়ারি ফেনীতে ২ দিনব্যাপি নজরুল সম্মেলন ফেনী জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে ভারতের শিল্পীদের দল নিয়ে গান গাইতে যোগ দেন এ শিল্পী। ‘ফেনীর সময়’ এর জন্য সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন হাসান শাহাদাত।

ফেনীর সময় : আপনার সঙ্গীতের শুরুটা কিভাবে?
অনসূয়া : আমি ভারতের বিহার প্রদেশের জামশেদপুরের মেয়ে। তো ওখানেই মাত্র ৬ বছর বয়সে পিত্রালয়ে সঙ্গীত বিষয়ে দীক্ষা গ্রহণ করি ওস্তাদ শ্রী চন্ডীচরন সরখেল’র কাছে। তারপরই ১৯৬৭ থেকে কলকাতায় বিয়ে পরবর্তীতে যথাক্রমে শ্রীমতি মীরা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুকুমার মিত্র, অমিয় রঞ্জণ বন্দ্যোপাধ্যায়, নীহারঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়, দীননাথ মিশ্র, আশ্চার্য জয়ন্ত ও বিমান মুখোপাধ্যায়’র কাছে। মোট ৩৪ বছর আমি সঙ্গীত শিখেছি।
ফেনীর সময় : সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে শিল্পীরা মূলত কী বলতে চান; সমাজকে কী বার্তা দিতে চান?
অনসূয়া : মূলত সঙ্গীত একটি সাধনা। স্বর সাধনা, শব্দ সাধনা। নৃত্য বলি কী গান সবকিছুই আসলে সাধনা। আনন্দ-শান্তি এগুলো সঙ্গীতের আরেক নাম। সঙ্গীত তো শান্তির বার্তা নিয়ে আসে। সঙ্গীতের যে শাখাগুলো রয়েছে তার মধ্য দিয়েই মানুষকে শান্তির বার্তা দিতে চায় শিল্প এবং শিল্পীরা।
ফেনীর সময় : ভৌগোলিকভাবে ভারত-বাংলাদেশের বাঙালিরা আলাদা কিন্তু শিল্প-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে কী আমাদের কোনো ফারাক রয়েছে?
অনসূয়া : শিল্প এমন একটি জিনি যাতে কোনো বেধাবেধ বা ফারাক করা যায় না। ফলে আমি মনে করি না যে আমাদের শিল্পের দিক থেকে কোন প্রার্থক্য আছে। রাজনৈতিকভাবেই হয়ত আমরা পৃথক। আসলে আমরা ফিলিসোফিকেললি একই সুতোয় গাঁথা। এবং এটাই চিরন্তন মনে হয়। অন্তত আমি প্রার্থক্য আছে বলে মনে করি না।
ফেনীর সময় : তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন আমরা এক?
অনসূয়া : হ্যাঁ, নিশ্চয়ই এক। আমরা আসলে রাজনীতির পাল্লায় পড়ে আলাদা আছি। শুধুমাত্র কাঁটাতার দিয়েই কী আলাদা করা যায় একটা জাতিকে। আর শিল্প কিংবা শিল্পীর কেন, কোনে দেশেরই আসলে কোনে সীমানা নাই। রাজনীতির পাল্লায় পড়ে আমাদের এমন হয়েছে। সর্বশেষ আমরা আসলে এক। কাঁটাতার দিয়ে বললো যে তুমি ওপারে যেতে পার বে না। এটা তো আসলে হয়না। আমার যারা ভারতেই আমাদের পিতৃ পুরুষরাই এখানকারই। এগুলো আমাকে ভীষণ ভাবায়।
ফেনীর সময় : প্রকাশিত অ্যালবাম?
অনসূয়া : পলিউর, মিউজিক ইন্ডিয়া, এইচ এম ভি প্রভূতি ভারতের বিখ্যাত কোম্পানীর দ্বারা রেকডকৃত কিছু গানের অ্যালবাম রয়েছে। এ ছাড়া নজরুল গীতি, ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে রয়েছে কিছু অ্যালবাম। তা ছাড়া রাগপ্রধান, ভজন, গীত, নজরুল সঙ্গীত ও ভক্তিগীতিতে আমার দীর্ঘ সময়ের পদচারনা রয়েছে। চলচ্চিত্রে কিছু গান গেয়েছি। তবে সেগুলো কোনে নাম করে নাই।
ফেনীর সময় : প্রযুক্তির কালে গান হারিয়ে যাবে মনে হয়েছে কখনো?
অনসূয়া : না, কখনোই না। সঙ্গীত হারিয়ে গেলে মানুষের প্রাণই হারিয়ে গেলো। প্রাণ হারিয়ে গেলে মানুষ কী করে বাঁচবে বলো। সঙ্গীতের সাধনা আজীবন মানুষের মধ্যে থাকবেই; ধরনটা হয়ত ভিন্ন হবে। সুর-সঙ্গীত-কবিতা-গল্প এগুলো কখনোই হারাবে না। এগুলো সভ্যতার বিরাট একটি অংশ। তবে প্রযুক্তির কারণে একটু হয়ত বিপথে যাচ্ছে আমাদের শিল্প। ঠিক পথে চলছে না। যে পথে থাকার কথা ছিলে সে পথে নাই সঙ্গীত। কেউ শিখছে না ভালো করে, ইউটিউব থেকে সংগ্রহ করে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে। এখন মানুষ প্রযুক্তিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এই জিনিসগুলো সঙ্গীতকে বিপথে নিয়ে যাচ্ছে। এর জন্য যদিও প্রযুক্তি দায়ী নয় আমরাই দায়ী। একটা শব্দ কিভাবে থ্রো করতে হবে, কিভাবে কথা বলতে হবে সেটার চর্চাটা হচ্ছে না ঠিকমতো। সঙ্গীত হচ্ছে গুরুমূখী বিদ্যা। অনেক সুক্ষ্ম্যভাবে এটা নিতে হয় যা আমরা এখন নিচ্ছি না।
ফেনীর সময় : আপনি ভারতের রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীতে অধ্যাপনা করেছেন দীর্ঘ ৬ বছর, শিক্ষকতা করতে গিয়ে সঙ্গীতে প্রতি কী ধরনের উপলব্ধি হয়েছিলো?
অনসূয়া : আমি যেটা উপলদ্ধি করেছি যে আমি ক্লাসে ছাত্রদের বিমোহিত করে রাখতে পারতাম। আমি ফুল ক্লাস নিতে পারতাম। আমার প্রিন্সিপাল আমাকে প্রায়ই বলতেন তুমি কী ছেলেদের জাদু করেছে যে সবাই ক্লাসের সময়ের বাইরেও তোমার ক্লাসে বসে আছে। দেখা যেত অন্য ক্লাসের ছেলে-মেয়েরা আমার ক্লাসে এসে বসে থাকত সঙ্গীতের কথা শোনার জন্য। অনেকে বলতো ম্যাডাম আমাকে একটু শেখাবে? আমি বলতাম সবাই আমার ক্লাসে এসো। ৬ বছরই আমার এই অন্যরকম উপলদ্ধি। সবাই তখন বলতে লাগলো কী ভালো ভালো গান শেখাচ্ছে অনসূয়া ম্যাডাম। কী ভালো মানুষ। তাদের শেখার আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে সেভাবে শেখানে হচ্ছে না। আমি ১৯৩০ সালের প্রাচীণ ভারতের অনেক সুরকার কুলদাশ গুপ্ত, শুভদাশ গুপ্ত বিখ্যাতদের গান করে শুনিয়েছে। আমার ছাত্ররা তো সহজেই নিয়েছে। তার মানে সত্যি সত্যি কোনো জিনিস আসলে শেখানে হয় তাহলে এখনো ছাত্ররা তা গ্রহণ করবে। এতে কোনে সন্দেহ নেই। তবে সে ধরনের সঙ্গীতজ্ঞ’র অভাব রয়েছে আমাদের মাঝে। সেভাবে শেখানো হচ্ছে না।
ফেনীর সময় : বাংলাদেশে আপনার প্রিয় সঙ্গীত শিল্পী কারা?
অনসূয়া : লালনের গান আমার প্রিয়। শিল্পীদের মধ্যে নজরুল শিল্পী ফিরোজা বেগম, রুনা লায়লা, আব্বাস উদ্দিন এদের গান আমি প্রায়ই শুনি। তা ছাড়া বাংলাদেশ অনেক প্রথিতযশা শিল্পী-জ্ঞানী-গ্রণীর দেশ। এখানকার শিল্পীদের গানের সাথে আমার বহুদিনের পরিচয়।
ফেনীর সময় : বাংলাদেশের মানুষ (বিশেষ করে ফেনীর) মানুষের কাছে এসে কেমন লাগলো?
অনসূয়া : অসম্ভব ভালো। ভীষণ সঙ্গীতপ্রেমী। তারা সঙ্গীদের মর্যাদা দেয়। রাস্তাঘাটে সবাই সঙ্গীত বিষয়ে ওয়াকিবহাল। এখানে না আসলে আমি সত্যিই অসর্ম্পূন্ন থেকে যেতাম। এখানকার মানুষরা অনেক আবেগের-অনেক ভালোবাসার। এই প্রথম আমি ফেনীতে এলাম। এখানকার মানুষর সাথে কথা বলাটা আসলে অনেক আনন্দের বিষয়। যা ভাষায় প্রকাশ করার নয়। পূর্বে আমি বাংলাদেশে সম্পর্কে যা শুনেছি মনে হয় আরে অনেক বেশি পেয়েছি।
ফেনীর সময় : সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে দীর্ঘ একটি জীবন অতিবাহিত করলেন, কী উপলদ্ধি হলো?
অনসূয়া : একটাই উপলদ্ধি হলো যে, সঙ্গীতই আমার প্রাণ। আমার জান। সঙ্গীত নাই আমিও নাই। ঈশ্বরের কাছে আমার প্রার্থ্যনা যে আমৃত্যু যেন সঙ্গীতের সাথে থাকতে পারি। সঙ্গীতবিহিন জীবন আসলে বৃথা।
ফেনীর সময় : শুনেছি যশোরে আপনার পিতৃভূমি? ভূমির কোন বেদনা আপনাকে ?
অনসূয়া : আমার বাবার যে মা অর্থ্যাৎ আমার দাদু তিনি যশোরের। ফলে এ দেশের প্রতি বেদনাতো রয়েছে। আমি কী করবো আমি যেতে হলে তো পার্সপোর্ট করতে হতো। কিছুই করার নাই চিরকালে এ বেদনা নিয়েই থাকতে হবে। বাংলা বিহার উড়িষ্যারর জামশেপুরের মেয়ে হলেও আমি বাঙালি। এটাই অনেক বড় বিষয়।
ফেনীর সময় : ফেনীর সময় পত্রিকাটি আপনাদের নজরুল সঙ্গীতের প্রতিবেদন ছাপা হলো, অনুভূতি শুনতে চাই?
অনসূয়া : অনেক অভিভূত আমি। তোমাদের পত্রিকায় না দিলে আমরা কী করছি কেমন জানতো এখানকার মানুষ? সে ক্ষেত্রেই পত্রিকা অনেক বড় একটি যোগাযোগ মাধ্যম। আমার অনেক ভালো লাগছে তোমাদের আতিথেয়তায়।
ফেনীর সময় : ধন্যবাদ আপনাকে।
অনসূয়া : ফেনীর সময়কেও ধন্যবাদ।