মার্চ ৬, ২০২৬ ০৫:৪৮

যুলহিজ্জাহ মাসের প্রথম দশ দিন গুরুত্ব, মাহাত্ম্য ও আমলসমূহ

মাওলানা রশিদ আহমদ শাহীন

মাওলানা রশিদ আহমদ শাহীন :

আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন: “আপনার পালনকর্তা যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং পছন্দ করেন। তাদের কোন ক্ষমতা নেই” (সূরা আল-কসাস, আয়াত: ৬৮)।
আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার অফুরন্ত অনুগ্রহ ও নিয়ামতের একটি অনুপম দিক হলো, তিনি বান্দাদের জন্য ইবাদাতের কিছু বিশেষ বিশেষ সময়/স্থানকে অধিক বরকতময় বলে ষোঘণা দিয়েছেন। যার উদ্দেশ্য হলো:

ক. নতুন নতুন প্রেরণায় বান্দাদেরকে ইবাদাতে উজ্জ্বীবিত করা;
খ. তাদের গুনাহগুলো মাফ করে দেওয়া;
গ. তাদের মর্যাদা/দারাজাত বুলন্দ করা;
ঘ. রবের সাথে তাদের অটুট সম্পর্ক বিনির্মাণ করা;
ঙ. পরস্পরকে আল্লাহর সান্নিধ্যদায়ক আমলে প্রতিযোগী করে গড়ে তোলা;
চ. বেশি বেশি করে নেক আমল সম্পাদনে উৎসাহিত করা;
ছ. নাফ্স ও দুনিয়ার মোহাচ্ছন্নতা থেকে মুক্ত করে অলসতার ভাব দূরিভূত করা;
জ. ঈমানকে নবায়ন করে কলুষমুক্ত কলব পরিচর্চা করার সুবর্ণ সুযোগ প্রদান করা।
ঝ. তাওবাহ-ইস্তেগফারের মাধ্যমে গুনাহমুক্ত হওয়ার সুযোগ দেয়া।

প্রকৃত বুদ্ধিমান ও সৌভাগ্যবানতো তারাই যারা এই মৌসুমগুলোকে সুবর্ণসুযোগ মনে করে লুফে নেয়। নবীজি (স.) ইরশাদ করেছেন: “নিশ্চয়ই বছরের বিভিন্ন দিনে আল্লাহ তোমাদের জন্য বিশেষ বিশেষ অনুদানের ব্যবস্থা রেখেছেন। অতএব, তোমরা তা পাওয়ার জন্য সচেষ্ট হও। তোমাদের কেউ যদি তা পেয়ে যায়, এরপর আর কোন দিন সে হতভাগা হবে না” (তাবারানী: আল-মুজামুল কাবীর)।

এই পর্যায়েরই একটি বরকতময় মৌসুম হলো, যিলহিজ্জাহ মাসের প্রথম দশ দিন। তাই হেলায় হেলায় না কাটিয়ে আসুন জেনে নেয়া যাক এই দশদিনের ব্যাপারে গুরুত্বর্র্পণ কথাগুলো।

যুলহিজ্জাহ মাসের দশ দিনের ফাজিলাত : ক. দশ রাতের নামে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলার কসম করেছেন: আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই দশকের কসম করেছেন পবিত্র কুরআনে। আর আল্লাহ যখন কোন বস্তুর কসম করেন, তখন বুঝতে হবে, ঐ জিনিসটি অত্যন্ত মূল্যবান, মহান ও অতিসম্মানিত। কারণ, আযীম/মহান সত্তা আযীম/মহান বস্তুরই কসম করেন। ইরশাদ হয়েছে:“শপথ ফজরের। শপথ দশ রাত্রির। কসম জোড় ও বিজোরের” । (সূরা আল-ফাজর, আয়াত: (১-৩)।

খ. এই দশককে সর্বোত্তম সময়ের সাথে একত্রিত করা হয়েছে: এই দশকের শ্রেষ্ঠত্বতার আরো একটি দিক হলো, এই দশককে আল্লাহ সর্বোত্তম চারটি সময়ের সাথে একত্রিত করেছেন। আর আমরা জানি যে যার সঙ্গে থাকে, সে তারই অনুবর্তী হয়। সেগুলো হলো: এক. ফজর:

ফজরের আগমনে মৃত্যু (নিদ্রা) থেকে নতুন জীবন ফিরে আসে। অন্ধকার শেষে আলো এবং নীরবতা-নিস্তব্ধতা ভেদ করে জীবনের কোলাহল ফিরে আসে। আসে দুর্বলতার পরে শক্তি। এ সময় ফেরেশতাগণ একত্রিত হন। এটি ঐ সময়ের অতি নিকটবর্তী যখন রাত্রের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহ প্রথমাকাশে অবতরণ করেন। এর মাধ্যমেই মুনাফিক ও মুমিনদেরকে চেনা যায়।

দুই. রাত্রি: কুরআনে দিবসের উপর রাতকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। দিবসের কথা উল্লেখ করা হয়েছে ৫৭ বার। আর রাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে ৭২ বার। রাত নফল নামাযের জন্য শ্রেষ্ঠ সময়। ইখলাস ও আল্লাহ তাআলার সাথে ঐকান্তিকভাবে মিলিত হওয়ার সর্বোত্তম সময়। যেখানে রিয়ার কোন সম্ভাবনা তেমন থাকে না। দু‘আ কবুলের মোক্ষম সময়।

রাতের শেষাংশেই আল্লাহ তা‘আলা ডাকতে থাকেন। হযরত আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত। রসূল (স.) বলেন: “আল্লাহ তা’আলা রাতের শেষ তৃতীয়াংশে দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন। এবং বলতে থাকেন: “ “কেউ কি আছো আমাকে ডাকার। আমি তার ডাকে সাড়া দিবো। কেউ কি আছো কিছু চাইবে? আমি তাকে তা দিয়ে দিবো। কেউকি আছো ক্ষমা প্রার্থনা করবে? আমি তাকে মাফ করে দিবো”।[বুখারী,কিতাবুত তাহাজ্জুদ- ১১০৬]।

এই রাত দিয়েই আল্লাহ জান্নাতবাসীদেরকে আলাদা করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন:“রাতের সামান্য অংশই এরা ঘুমিয়ে কাটাতো” (সূরা আল-যারিয়াত, আয়াত: ১৭)। “তাদের পার্শ্বদেশ শয্যা থেকে আলাদা থাকে। তারা তাদের পালনকর্তাকে ডাকে ভয় ও আশায় এবং আমি তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি,তা থেকে ব্যয় করে”[সূরা আল-সিজদাহ, আয়াত: ১৬]।

এই রাত দিয়েই আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের পরিচয় দিয়েছেন: “আর রহমানের বান্দা তারাই, যারা যমীনে অত্যন্ত বিনম্রভাবে চলাফেরা করে এবং যখন জাহেল ব্যক্তিরা তাদেরকে (অশালীন ভাষায়) সম্বোধন করে, তখন তারা বলে, সালাম। আর যারা তাদের রবের জন্য সিজদারত ও দন্ডায়মান হয়ে রাত্রি যাপন করে” [সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৬৩,৬৪]।

তিন. জোড়: চার. বিজোড়: জোড়-বিজোড় দিয়েই সৃষ্টিজগত গঠিত। পৃথিবীতে যত সৃষ্টি আছে, তা হয়ত জোড় কিংবা বিজোড়। এমনকি এই দশকের মধ্যেও রয়েছে জোড়। অর্থাৎ দশম জিলহিজ্জাহ, কুরবানীর দিন। এবং বিজোড়। অর্থাৎ নবম জিলহিজ্জাহ, আরাফাহ দিবস।

গ. এই দশকের মধ্যেই আল্লাহ দ্বীন ও তাঁর নিয়ামতকে পরিপূর্ণ করার ঘোষণা দিয়েছেন।

হযরত ‘উমার থেকে বর্ণিত। একজন ইয়াহুদী ব্যক্তি তাকে বললো, হে আমীরুল মুমিনীনি! আপনাদের কিতাবের মধ্যে একটি আয়াত রয়েছে, যা আপনারা তিলাওয়াত করেন, যদি তা আমাদের ইয়াহুদী সম্প্রদায়ের উপর নাযিল হতো তাহলে আমরা সেই দিনটিকে ঈদের দিনে রূপান্তর করতাম। ‘উমার বললেন, কোন আয়াতটি? সে বললো: সেই আয়াতটি হলো “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম” (সূরা আল-মাইদাহ, আয়াত: ৩)। তখন ‘উমার বললেন: আমি জানি এই আয়াতটি কোন দিন কোন স্থানে নবীজির উপর নাযিল হয়েছে। রাসূল (স.) আরাফাতে দাাঁড়িয়ে ছিলেন। দিনটি ছিলো জুমাবার”। [বুখারী, কিতাবুল ঈমান হাদীস-৪৫]।

ঘ. আল্লাহর যিকিরের জন্য বিশেষভাবে বরাদ্দ সুনির্দিষ্ট দিনসমূহ: আল্লাহ তা’আলার যিকরতো মুমিনের সার্বক্ষণিক প্রাণসম্পদন। তবুও আল্লাহ সুনির্দিষ্ট কিছু দিনে তার যিকরের বিশেষ ব্যবস্থা করেছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন: “যাতে তারা নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহর নাম স্মরণ করে তার দেয়া চতুষ্পদ জন্তু যবেহ করার সময়” [সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ২৮]। সংখ্যাগরিষ্ঠ আলিম, যাদের মধ্যে ইবনু ‘উমার ও ইবনু ‘আব্বাস (রা.)ও রয়েছেন, বলছেন: নির্দিষ্ট দিনগুলো দ্বারা যিলহিজ্জাহ মাসের প্রথম দশককে বোঝানো হয়েছে।

ঙ. এই দশ দিনকে বিশ্বনবী (স.) কর্তৃক পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ দিবস হিসেবে ঘোষণা: হযরত যাবির (রা.) নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন: “পৃথিবীর দিনগুলোর মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দিনগুলো হলো, দশকের দিনসমূহ। অর্থাৎ জিলহিজ্জার প্রথম দশদিন। জিজ্ঞাসা করা হলো, আল্লাহর পথে জিহাদেও কি এর চেয়ে উত্তম দিন নেই? তিনি বললেন, আল্লাহর পথে জিহাদেও এর চেয়ে উত্তম দিন নেই। তবে সেই ব্যক্তির কথা ভিন্ন, জিহাদে যার চেহারাকে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে” (অর্থাৎ শাহাদাত বরণ করেছে)।[মুসনাদ বাযযার: ১১২৮; মুসনাদ আবী ‘ইআলা: ২০৯০; ইবনু হিব্বান]।

চ. এই দশকেই রয়েছে নবম জিলহিজ্জাহ আরাফা দিবস: ১. এটি ক্ষমা ও মাগফিরাতের দিন। জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও নাজাতের দিন। একটি মহান দিন। হযরত ‘আইশা (রা.) রাসূল (স.) থেকে বর্ণনা করেন : “আরাফাহ দিবসের চেয়ে আল্লাহ অন্য কোন দিন এত লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন না। আল্লাহ তা‘আলা বান্দাদের নিকটবর্তী হন। এবং ফেরেশতাদের সাথে তাদের নিয়ে গর্ব করে বলেন,(আরাফাতে অবস্থানকারী) ওরা কি চায়? তোমরা সাক্ষী থেকো, আমি ওদেরকে মাফ করে দিলাম”। (মুসলিম-১৩৪৮)।

এই ক্ষমা ও মুক্তির মধ্যে আরাফাতে অবস্থানকারী ও অন্যান্যরাও শামিল হতে পারে। আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাতের দুয়ার সবার জন্যই উম্মুক্ত। এ জন্যই এর পরবর্তী দিন সমগ্র বিশ্বের মুসলিম উম্মাহর জন্য আনন্দ ও ঈদের দিন বানানো হয়েছে। আল্লাহর মাগফিরাতের চেয়ে অধিক আনন্দের বিষয় মুমিন জীবনে কী হতে পারে?

২. এই আরাফাহতে অবস্থানই হলো হাজ্জ। রাসূল (স.) বলেন: “আরাফাহ (অবস্থান) ই হচ্ছে হাজ্জ”(তরিমযি) ৩. এটি শ্রেষ্ঠ দু’আ দিবস। হাদীসে বলা হয়েছে: “সর্বশ্রেষ্ঠ দু’আ হলো আরাফাহ দিনের দু’আ। আমি ও আমার পূর্ববর্তী নবীগণ যা কিছু বলেছেন, তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ কথা হলো এটি : [তিরমিযী-৩৫৮৫]।

৪. আরাফাহর দিন: শয়তানের লাঞ্জিত হওয়ার দিন। ইমাম মালিক হযরত তলহা বিন ‘উবাইদুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন: রসুলুল্লাহ (স.) বলেন: “আরাফাহ দিবসের চেয়ে শয়তান কে অন্য কোন দিন এতটা লাঞ্জিত, পর্যুদস্ত, অপমানিত ও ক্রোধান্বিত অবস্থায় দেখা যায় না। কারণ, সে দেখতে পায় সেদিন আল্লাহর রহমাত নাযিল হয়, আল্লাহ মানুষের বড় বড় গুনাহ মাফ করে দেন। তবে বদর দিবসে যা সে দেখেছে, সেটি আলাদা। বলা হলো: ইয়া রাসূলাল্লাহ! বদর দিবসে সে কি দেখেছে? রাসূল (স.) বললেন: সে দিন কি সে দেখে নি যে, জিব্রাইল (আ.) ফেরেশতাদের সারি বিন্যাস করছেন?!”

৫. আরাফাহ দিবসই সেই ইয়াওমুল মাশহুদ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “কক্ষপথ বিশিষ্ট আসমানের শপথ। আর ওয়াদাকৃত দিনের কসম। আর কসম সাক্ষ্যদাতার ও যার ব্যাপারে সাক্ষ্য দেয়া হয়েছে” [সূরা আল-বুরূজ:১-৩] ।

রাসূল (স.) বলেন, প্রতিশ্রুত দিনের অর্থ হলো, কিয়ামতের দিন। আর এর অর্থ হলো, আরাফাহর দিন। এবং এর অর্থ হলো, জুমাবার। জুম‘আর দিনের চেয়ে উত্তম কোন দিনে কোন সূর্য উদয় হয়নি এবং ডুবেও নি। সে দিন এমন একটি সময় আছে, কোন মুমিন বান্দা যখনই কোন কল্যাণের দু‘আ করবে, তখনই তার দু‘আ কবুল করা হয়। অথবা যদি কোন অকল্যাণ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা হয়, তখনই তাকে আল্লাহ তা থেকে আশ্রয় দেন”। (তিরমিযী-৩৩৩৯)।

ছ. এই দশকেই রয়েছে ইয়াওমুন নাহার বা কুরবানীর দিন: কুরবানী দিবসের অনন্য বৈশিষ্ট্য ও শ্রেষ্ঠত্বতার সংক্ষিপ্ত কথা হলো: ১. এটি আল্লাহর কাছে সর্বশ্রেষ্ঠ দিন

রাসূল (স.) বলেন:“আল্লাহর নিকট সর্বাধিক মহিমান্বিত দিন হলো নহরের দিন। অতঃপর ইয়াওমুল কির (স্থিতির দিন)। অর্থাৎ কুরবানীর পরের দিন। যিলহিজ্জাহ মাসের এগারতম দিন, যে দিন হাজীগণ কুরবানী করার পর মিনায় অবস্থান করেন)। [আবু দাউদ-১৭৬৫]।

ইবনুল কায়্যীম (র.) বলেন: “আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম দিন হলো কুরবানীর দিন। এটিই হলো, আল-হাজ্জুল আকবার বা বড় হাজ্জের দিন” (যাদুল মা‘আদ ১/৫৪)।

কোন কোন গবেষকের মতে: নহরের দিনের চেয়ে আরাফাহর দিন উত্তম। কারণ, সে দিনের সিয়াম দুই বছরের কাফফারাহ। তাছাড়া, আল্লাহ তা‘আলা সেদিন সর্বাধিক পরিমাণ লোক জাহান্নাম থেকে মুক্ত করেন। যা অন্য কোন দিনে করেন না। আল্লাহ সে দিন বান্দাদের নিকটবর্তী হন এবং আরাফাতে অবস্থানকারীদের নিয়ে ফেরেশতাদের সাথে গর্ব করেন।

২. কুরবানীর দিন হলো ইয়াওমুল হাজ্জিল আকবার/ বড় হাজ্জের দিন: হযরত ইবনু ‘উমার (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসূল (স.) সে হজ্জটি করেছিলেন, সেই হজ্জের মধ্যে নহরের দিন জামারাতসমূহের মধ্যে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন: এটিই হলো বড় হজ্জের দিন”। [বুখারী-১৭৪২)।

এটি বড় হজ্জের দিন বলার কারণ, এই দিনেই হজ্জের অধিকাংশ আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়ে থাকে। যেমন: # জামারাতুল আকাবাতে পাথর নিক্ষেপ, কুরবানী; হাদই জবাই, মাথা মুন্ডন বা চুল খাটো করা, তাওয়াফুয যিয়ারাহ; সাঈ; ঈদের নামায, এটি মুসলমানদের ঈদের দিন।

এর আগে রয়েছে আরাফাহ দিবস, যা অনেক বরকতময়। আবার পরে রয়েছে তাশরীকের দিনগুলো। যেগুলোর ব্যাপারে রাসূল (স.) বলেছেন: “তাশরীকের দিনগুলো হচ্ছে, পানাহার ও আল্লাহর যিকিরের দিবস” [মুসলিম}।

এই সবগুলো দিবস মিলেই মূলত মুসলমানদের ঈদ। আরফাহ ও তাশরীক দিবসগুলোর মধ্যে অবস্থিত নহর দিবসকে এ অর্থে এই দিবসগুলোর রাজমুকূট বলা যায়।

রাসূল (স.) বলেন:“আরাফাহ দিবস, নহর দিবস এবং আইয়্যামুত তাশরীক এই দিনগুলো হলো আমাদের মুসলিমদের ঈদ। এ গুলো পানাহারের দিন। [তিরমিযি-৭৭৩]।

জ. এই দিবসগুলোর আমলসমূহ আল্লাহর কাছে সব চেয়ে প্রিয়: এই মর্মে নিচের হাদীসগুলো উল্লেখযোগ্য: ১. হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন: “যিল হিজ্জার প্রথম দশকের চেয়ে উত্তম এমন কোন দিন নেই, যে দিনগুলোর নেক আমল আল্লাহর নিকট সর্বাধিক পছন্দনীয়। সাহাবায়ে কেরাম বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর পথে জিহাদও কি নয়? রাসূল (স.) বললেন: আল্লাহর পথে জিহাদও নয়। তবে সেই মুজাহিদের কথা ভিন্ন, যে জান-মাল নিয়ে জিহাদে বেরিয়ে পড়ে, কিন্তু কোন কিছু নিয়েই আর ফিরে আসে না। (অর্থাৎ শাহাদাত বরণ করে)। [বুখারী]।

২. ইবনু ‘উমার (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: আমি রসূলুল্লাহর কাছে ছিলাম। সেথায় কিছু আমলের কথা উল্লেখ করা হয়। তখন রসূল (স.) বলেন: “অন্য যে কোন দিনের চেয়ে এই দশদিনের আমল সর্বোত্তম। সাহাবাগণ জিজ্ঞাসা করলেন: আল্লাহর পথে জিহাদ? ইয়া রাসূলাল্লাহ! রসূল (স.) বললেন: জিহাদও নয়। তবে কোন ব্যক্তি যদি জান-মাল নিয়ে আল্লাহর পথে বের হয়ে যায় অতঃপর তাতে জীবনটি বিলিয়ে দেয়,তার কথা অবশ্য আলাদা”। [আহমাদ]।

৩. ইমাম তাবারানী ছহীহ সনদে ইবনু মাসঊদ (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূল (স.) বলেছেন: এই দশদিনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ আমল অন্য কোন দিনে নেই। বলা হলো: আল্লাহর পথে জিহাদও নয়? তিনি বললেন: না, আল্লাহর পথে জিহাদও নয়। না, আল্লাহর পথে জিহাদও নয়”।

৪. হযরত আনাস বিন মালিক (রা.) বলেন: বলা হতো: (জিলহিজ্জার প্রথম দশকের) এক দিন অন্যান্য সময়ের এক হাজার দিনের সমান। আর আরাফাহর দিন অন্যান্য সময়ের দশ হাজার দিনের সমান। অর্থাৎ মর্যাদার ক্ষেত্রে। [বায়াহাকী. ইসবাহানী.]

৫. হযরত সাঈদ বিন জুবাইর (যিনি পূর্বোক্ত ইবনু আব্বাসের হাদীসের বর্ণনাকারী) তার ব্যাপারে এসেছে: “জিলহিজ্জাহ মাসের দশ দিন শুরু হলে তিনি ইবাদাত-বন্দেগীতে এত বেশি অধ্যবসয়ী হতেন যে যেন তা তার জন্য অসম্ভব হয়ে যেত”। অর্থাৎ অনেকটা অসাধ্য সাধনের মত করে ইবাদাত করতেন। (কিংবা অন্য কারো জন্য এত ইবাদাত প্রায় অসম্ভবের মত ছিলো)। [বায়হাকী]।

৬. ইমাম আওযায়ী বলেন: আমার কাছে এই কথাগুলো পৌঁছেছে: এই দশ দিনের আমল আল্লাহর পথে যুদ্ধ করার মত। যাতে দিনে রোযা রাখা হয়, রাতে পাহাড়া দেয়া হয়। তবে কেউ যদি শাহাদাত বরণ করে তার কথা ভিন্ন”। আওযায়ী বলেন, বনী মাখযুমের এক ব্যক্তি নবীজি (স.) থেকে আমাকে এই হাদীসটি বলেছেন। [বায়হাকী]। এত বিশাল মর্যাদাবান দিনগুলোকে আমরা কতটা অবহেলায় কাটিয়ে দিচ্ছি! আফসোস আমাদের জন্য।

ঝ. জিলহিজ্জার প্রথম দশকের মর্যাদার রহস্য: ১. এই দিনগুলোর মধ্যে ইসলামের মৌলিক ইবাদাতগুলোর সমাবেশ ঘটে: এ প্রসঙ্গে প্রসিদ্ধ হাদীস ব্যাখ্যাকারক আল্লামা ইবনু হাজার তার ফাতহুল বারীর মধ্যে বলেন:“যিলহিজ্জার প্রথম দশ দিনের বিশেষভাবে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত হওয়ার কারণ হিসেবে আমার কাছে যা প্রতীয়মান হচ্ছে, তা হলো: এ দিনগুলোতে নামায, সিয়াম, সাদাকাহ ও হজ্জের মত এমন কিছু মৌলিক ইবাদাতের যুগপৎ সমাবেশ ঘটেছে, যা অন্য কোন সময়ে এভাবে একসাথে পাওয়া যায় না”। অর্থাৎ এর মধ্যে আছে:

  • নামায। অন্যান্য সময়ের মত;
  • যাকাত। ঐ সময়ের মধ্যে যার নিসাব এক বছর পূর্ণ করেছে;
  • সিয়াম। যে নফল রোযা রাখতে চায়। কিংবা হাদই দিতে অক্ষম;
  • আল্লাহর ঘরের হজ্জ;
  • তালবীয়াহ, দু‘আ ইত্যাদি।

এ সব ইবাদাতের সমন্বিত অবস্থা বিচেনায় অন্য কোন সময় এর সমকক্ষ হতে পারে না।

২. হাজীদের সাথে আমলের অংশীদারিত্ব:

মনীষিদের কেউ কেউ বলছেন: আল্লাহর তা‘আলা অসীম রহমতের একটি দিক হলো, যেহেতু, সবার পক্ষে আল্লাহর ঘরের হাজ্জ করা সম্ভব হয় না, তাই আল্লাহ তা‘আলা তাদের জন্য এমন কিছু আমলের ব্যবস্থা করেছেন, যার মাধ্যমে তারা হাজীদের সাথে অংশীদার হতে পারবে এবং তাদের মত সাওয়াব লাভ করতে পারবে”। সুতরাং আমাদের উচিত যিলহিজ্জাহ মাসের প্রথম দশককে যথাসাধ্য ইবাদাতের মাধ্যমে অতিবাহিত করা। আল্লাহ আমাদেরকে তাওফীক দান করুন।

এ দিনগুলোতে যেসব আমল করা মোস্তাহাব: ১. তাওবা: তাওবা অর্থ ফিরে আসা বা প্রত্যাবর্তন করা। আল্লাহ তা‘আলার নাফরমানি থেকে ফিরে আসা, আল্লাহর হুকুমের পাবন্দি করার ওপর দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা এবং অতীতের কৃত কর্মের ওপর অনুতপ্ত ও লজ্জিত হয়ে তা ছেড়ে দেওয়া এবং ভবিষ্যতে আর কখনো আল্লাহর নাফরমানি না করা ও তার হুকুমের অবাধ্য না হওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্প করা। এ দিন গুলোতে তাওবা করে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করার একটি সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “হে মোমিনগণ! তোমরা আল্লাহর নিকট তওবা কর-বিশুদ্ধ তাওবা; সম্ভবত তোমাদের রব তোমাদের মন্দ কাজগুলো মোচন করে দিবেন এবং তোমাদের জান্নাতে প্রবেশ করাবেন যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। সে দিন আল্লাহ লজ্জা দিবেন না নবীকে এবং তার মুমিন সঙ্গীদেরকে, তাদের জ্যোতি তাদের সম্মুখে ও দক্ষিণ পার্শ্বে ধাবিত হবে। তারা বলবে, হে আমাদের রব! আমাদের জ্যোতিকে পূর্ণতা দান কর এবং আমাদেরকে ক্ষমা কর, নিশ্চয় তুমি সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান”। [সূরা আত-তাহরীম, আয়াত: ৮]

২. ফরয ও নফল সালাতগুলো গুরুত্বের সাথে আদায় করা: অর্থাৎ ফরয ও ওয়াজিবসমূহ সময়-মত সুন্দর ও পরিপূর্ণভাবে আদায় করা, যেভাবে আদায় করেছেন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। সকল ইবাদতসমূহ তার সুন্নাত, মোস্তাহাব ও আদব সহকারে আদায় করা। ফরয সালাতগুলো সময় মত সম্পাদন করা, বেশি বেশি করে নফল সালাত আদায় করা। যেহেতু এগুলোই আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করার সর্বোত্তম মাধ্যম। সাওবান রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি:

“তুমি বেশি বেশি সাজদা কর, কারণ তুমি এমন যে কোনো সাজদাই কর না কেন তার কারণে আল্লাহ তোমার মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন এবং তোমার গুনাহ ক্ষমা করবেন”। এটা সব সময়রে জন্য প্রযোজ্য। নিয়মিত ফরয ও ওয়াজিবসমূহ আদায়ে যত্নবান হওয়া- অর্থাৎ ফরয ও ওয়াজিবসমূহ সময়-মত সুন্দর ও পরিপূর্ণভাবে আদায় করা। যেভাবে আদায় করেছেন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। সকল ইবাদতসমূহ তাঁর সুন্নাত, মোস্তাহাব ও আদব সহকারে আদায় করা। হাদীসে এসেছে: আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “যে ব্যক্তি আমার কোনো ওয়ালীর সঙ্গে শত্রুতা রাখে, আমি তার সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করি। আমার বান্দা ফরয ইবাদতের চেয়ে আমার কাছে অধিক প্রিয় কোনো ইবাদত দ্বারা আমার নৈকট্য লাভ করতে পারে না। আমার বান্দা নফল ইবাদত দ্বারাই সর্বদা আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে। এমনকি অবশেষে আমি তাকে আমার এমন প্রিয়পাত্র বানিয়ে নেই, আমি তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শুনে। আমি তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে। আর আমিই তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে। আমি তার পা হয়ে যাই, যা দিয়ে সে চলে। সে আমার কাছে কোনো কিছু চাইলে আমি অবশ্যই তাকে তা দান করি। আর যদি সে আমার কাছে আশ্রয় চায় আমি তাকে অবশ্যই আশ্রয় দিই। আমি যে কোনো কাজ করতে চাইলে তাতে কোনো রকম দ্বিধা করি না, যতটা দ্বিধা করি মুমিন বান্দার প্রাণ হরণে। সে মৃত্যুকে অপছন্দ করে থাকে অথচ আমি তার প্রতি কষ্টদায়ক বস্তু দিতে অপছন্দ করি”।

৩. সিয়াম পালন করা: যিলহজ মাসরে প্রথম দশ দিনের সিয়াম পালন করা একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। যেহেতু অন্যান্য নেক আমলরে মধ্যে সিয়ামও অন্যতম, তাই এ দিনগুলোতে খুব যত্নসহকারে সিয়াম পালন করা।

হাফসা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো চারটি আমল পরিত্যাগ করেন নি। সেগুলো হলো: আশুরার সাওম, যিলহজের দশ দিনের সাওম, প্রত্যেক মাসে তিন দিনের সাওম, ও জোহরের পূর্বের দুই রাকাত সালাত”। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় একদিন সাওম পালন করবে, একদিনের সাওমের বিনিময় তার চেহারাকে জাহান্নামের আগুন থেকে সত্তর খারিফ দূরে রাখবে” ।

৪. হজ ও উমরা করা: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দুটি মর্যাদাপূর্ণ ইবাদতের জন্য উম্মতকে উৎসাহিত করেছেন। এ দু’টি ইবাদতে রয়েছে পাপের কুফল থেকে আত্মার পবিত্রতা, যার মাধ্যমে মানুষ আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে প্রিয় ও সম্মানিত হতে পারে। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

“যে ব্যক্তি হজ করেছে, তাতে কোনো অশ্লীল আচরণ করে নি ও কোনো পাপে লিপ্ত হয় নি সে সে দিনের মতো নিষ্পাপ হয়ে গেল, যে দিন তার মাতা তাকে প্রসব করেছে”।

হাদীসে আরও এসেছে: আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

“এক উমরা থেকে অন্য উমরাকে তার মধ্যবর্তী পাপসমূহের কাফ্‌ফারা হিসেবে গ্রহণ করা হয়। আর কলুষযুক্ত হজের পুরস্কার হলো জান্নাত”।

৫. আল্লাহর যিকির করা: এ দিনসমূহে অন্যান্য আমলের মাঝে যিকিরের এক বিশেষ মর্যাদা রয়েছে, যেমন হাদীসে এসেছে: আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

“এ দশ দিনে (নেক) আমল করার চেয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে অধিক প্রিয় ও মহান আর কোনো আমল নেই। তোমরা এ সময়ে তাহলীল (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ) তাকবীর (আল্লাহু আকবার) তাহমীদ (আল-হামদুলিল্লাহ) বেশি করে আদায় কর”। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, “যাতে তারা তাদের কল্যাণময় স্থানগুলোতে উপস্থিত হতে পারে এবং তিনি তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তু থেকে যা রিযিক হিসেবে দান করেছেন তার ওপর নির্দিষ্ট দিনসমূহে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে”। [সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ২৮]

অধিকাংশ আলেম বলেছেন: এ আয়াতে নির্দিষ্ট দিন বলতে যিলহজের প্রথম দশ দিনকে নির্দেশ করা হয়েছে। এ সময়ে আল্লাহর বান্দাগণ বেশি বেশি করে আল্লাহর প্রশংসা করেন, তার পবিত্রতা বর্ণনা করেন, তার নি‘আমতের শুকরিয়া আদায় করেন, কুরবানির পশু যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম ও তাকবীর উচ্চারণ করে থাকেন।

হাদীসে আছে চারটি বাক্য আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়। ১- সুবহানাল্লাহ, ২- আলহামদুলিল্লাহ, ৩- লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ৪- আল্লাহু আকবর। এ দিনগুলোতে এ যিকিরগুলো করা যেতে পারে।

৬. তাকবীর, তাহলীল ও তাহমীদ: এ দিনগুলোতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের মহত্ত্ব ঘোষণার উদ্দেশ্যে তাকবীর পাঠ করা সুন্নাত। এ তাকবীর প্রকাশ্যে ও উচ্চস্বরে মসজিদ, বাড়ি-ঘর, রাস্তা-ঘাট, বাজারসহ সর্বত্র উচ্চ আওয়াজে পাঠ করা হবে। তবে মেয়েরা নিম্নস্বরে তাকবীর পাঠ করবে। তাকবীর হলো:

আব্দুল্লাহ ইবন উমার ও আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা যিলহজ মাসের প্রথম দশকে বাজারে যেতেন ও তাকবীর পাঠ করতেন, লোকজনও তাদের অনুসরণ করে তাকবীর পাঠ করতেন। অর্থাৎ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই দুই প্রিয় সাহাবী লোকজনকে তাকবীর পাঠের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন।

ইমাম বুখারী রহ. বলেছেন: ইবন উমার ও আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুমা এ দশদিন তাকবীর বলতে বলতে বাজারের জন্য বের হতেন, মানুষেরাও তাদের দেখে দেখে তাকবীর বলত। তিনি আরও বলেছেন, ইবন উমার মিনায় তার তাবুতে তাকবীর বলতেন, মসজিদের লোকেরা শুনত, অতঃপর তারা তাকবীর বলত এবং বাজারের লোকেরাও তাদের সাথে তাকবীর বলত। এক পর্যায়ে পুরো মিনা তাকবীর ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠত। ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা এ দিনগুলোতে মিনায় তাকবীর বলতেন, প্রত্যেক সালাতের পর, বিছানায়, তাঁবুতে মজলিসে ও চলার পথে সশব্দে তাকবীর বলা মোস্তাহাব। যেহেতু উমার, ইবন উমার ও আবূ হুরায়রা সশব্দে তাকবীর বলেছেন।

৭. ‘আরাফার দিন সাওম পালন করা: হজ পালনকারী ছাড়া অন্যদের জন্য ‘আরাফার দিন সাওম পালন করা। আবূ কাতাদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ‘আরাফার দিনের রোজা রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, “আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী, এটি পূর্ববর্তী এক বছর ও পরবর্তী এক বছররে গুনাহর কাফ্‌ফারা হবে”।

৮. কুরবানির দিন তথা দশ তারিখের আমল:

কুরবানির দিনের ফযীলত

[১] এ দিনের একটি নাম হলো ইয়াওমুল হাজ্জিল আকবর বা শ্রেষ্ঠ হজের দিন। যে দিনে হাজীগণ তাদের পশু যবেহ করে হজকে পূর্ণ করেন। হাদীসে এসেছে: ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত,

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানির দিন জিজ্ঞেস করলেন, এটা কোন দিন? সাহাবীগণ উত্তর দিলেন এটা ইয়াওমুন্নাহার বা কুরবানির দিন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: এটা হলো ইয়াওমুল হাজ্জিল আকবর বা শ্রেষ্ঠ হজের দিন”।

[২] কুরবানির দিনটি হলো বছরের শ্রেষ্ঠ দিন। হাদীসে এসেছে: আব্দুল্লাহ ইবন কুরত রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

“আল্লাহর নিকট দিবসসমূহের মাঝে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ দিন হলো কুরবানির দিন, তারপর পরবর্তী তিনদিন” এ দিনগুলোর ব্যাপারে অনেক মুসলিমই গাফেল, অথচ অনেক আলেমের মতে নিঃর্শতভাবে এ দিনগুলো উত্তম, এমনকি ‘আরাফার দিন থেকেও। ইবনুল কাইয়্যেম রহ. বলেছেন: আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম দিন, নহরের দিন। আর তাই হলো হাজ্জে আকবারের দিন। যেমন, সুনানে আবূ দাঊদে রয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বড় দিন হলো নহরের দিন, অতঃপর মিনায় অবস্থানের দিন। অর্থাৎ এগারতম দিন। কেউ কেউ বলেছেন: ‘আরাফার দিন তার থেকে উত্তম। কারণ, সে দিনের সিয়াম দুই বছরের গুনাহের কাফ্‌ফারা। আল্লাহ ‘আরাফার দিন যে পরিমাণ লোক জাহান্নাম থেকে মুক্ত করেন, তা অন্য কোনো দিন করেন না। আরও এ জন্যও যে, আল্লাহ তা‘আলা সে দিন বান্দার নিকটবর্তী হন এবং ‘আরাফায় অবস্থানকারীদের নিয়ে ফিরিশতাদের সাথে গর্ব করেন। তবে প্রথম বক্তব্যই সঠিক, কারণ হাদীস তারই প্রমাণ বহন করে, এর বিরোধী কিছু নেই। যাই হোক, উত্তম হয় ‘আরাফার দিন নতুবা মিনার দিন, হাজী বা বাড়িতে অবস্থানকারী সবার উচিৎ সে দিনের ফযীলত অর্জন করা এবং তার মুহুর্তগুলো থেকে উপকৃত হওয়া।

৯. কুরবানি করা:

কুরবানি বলা হয় ঈদুল আজহার দিনগুলোতে নির্দিষ্ট প্রকারের গৃহপালিত পশু আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের লক্ষে যবেহ করা।

ইসলামি শরী‘আতে এটি ইবাদত হিসেবে সিদ্ধ, যা কুরআন, হাদীস ও মুসলিম উম্মাহ’র ঐক্যমত্য দ্বারা প্রমাণিত। যেমন কুরআন মজীদে এসেছে:

“তোমার রবের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় কর ও (পশু) নাহর (কুরবানি) কর।” [সূরা আল-কাউসার, আয়াত: ২]

“বলুন, আমার সালাত, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ জগৎসমূহের রব আল্লাহরই উদ্দেশ্যে। তার কোনো শরীক নেই এবং আমি এর জন্য আদিষ্ট হয়েছি এবং আমিই প্রথম মুসলিম।” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১৬২, ১৬৩]

হাদীসে এসেছে: বারা ইবন আযিব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

“যে ব্যক্তি ঈদের সালাতের পর কুরবানির পশু যবেহ করল তার কুরবানি পরিপূর্ণ হলো ও সে মুসলিমদের আদর্শ সঠিকভাবে পালন করল”।

“আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে দু’টি সাদা কালো বর্ণের দুম্বা কুরবানি করেছেন। তিনি বিসমিল্লাহ ও আল্লাহু আকবর বলেছেন। তিনি পা দিয়ে দুটো কাঁধের পাশ চেপে রাখেন। তবে বুখারীতে ‘সাদা-কালো’ শব্দের পূর্বে ‘শিং ওয়ালা’ কথাটি উল্লেখ আছে।

লেখক : অধ্যক্ষ: তাযকিয়াতুল উম্মাহ মডেল মাদ্রাসা, ফেনী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিজ্ঞাপন