জাহিদুল আলম রাজন :
বাংলাদেশের গণমাধ্যমে যখন চাপ, আপোষ ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক সুবিধা অর্জন অনেকের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, তখন কিছু কণ্ঠ নির্ভয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছে সত্য আর ন্যায়ের পক্ষে। এমনই এক সাহসী কণ্ঠ ফেনী থেকে প্রকাশিত স্থানীয় দৈনিক ‘ফেনীর সময়’, যার পথচলার বয়স আজ ১৭ বছর।
এই পত্রিকাটি কেবল সংবাদ পরিবেশনের একটি মাধ্যম নয়—এটি ভাটির জনপদের এক প্রতীক, প্রতিবাদ আর জনতার ভাষা হয়ে উঠেছে। ক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সত্য বলা, প্রশাসনিক চাপের ভেতর থেকেও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা, কিংবা মিথ্যার বিরুদ্ধে কলম চালানো—এই কঠিন কাজগুলো ধারাবাহিকভাবে করে চলেছে ‘ফেনীর সময়’।
এই দীর্ঘ পথচলার প্রেরণা এবং নেতৃত্বে ছিলেন সম্পাদক শাহাদাত হোসেন। তার হাত ধরেই শুরু হয়েছিল এই সাহসী যাত্রা, আর তার দৃঢ় মনোবল, মূল্যবোধ ও সাংবাদিকতা-ভিত্তিক আদর্শিক অবস্থানের ফলেই আজও টিকে আছে পত্রিকাটি।
বাংলাদেশের মতো দেশে, বিশেষ করে জেলা শহরে, একটি আপোষহীন দৈনিক পত্রিকা টিকিয়ে রাখা শুধু কঠিন নয়—অনেক সময় জীবন-ঝুঁকিপূর্ণও। ‘ফেনীর সময়’ সেই লড়াই করছে প্রতিদিন। শাহাদাত হোসেন তার নিজের জীবনকে বাজি রেখে কখনো মিথ্যা মামলা, কখনো মানসিক নির্যাতন, আবার কখনো আর্থিক সংকট পেরিয়ে চালিয়ে গেছেন এই সংবাদপত্রের প্রকাশনা। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছে দুই ডজনেরও বেশি হয়রানিমূলক মামলা—শুধুমাত্র সাহস করে সত্য বলার অপরাধে।
তিনি চাইলে থেমে যেতে পারতেন, নীরব থাকতে পারতেন, কিংবা সুবিধার আশায় পথ পরিবর্তন করতে পারতেন। কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছেন কঠিনতম পথ—জনগণের পক্ষে দাঁড়ানো, সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কলম চালানো এবং সাংবাদিকতাকে কেবল একটি পেশা নয়, বরং সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করা।
‘ফেনীর সময়’-এর সবচেয়ে বড় শক্তি তার আপোষহীনতা। এই পত্রিকাটি কখনো সংবাদকে পণ্য বানায়নি, বরং সেটিকে মানুষের মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। যেখানে অনেকে সংবাদপত্রকে ব্যবসা বা ক্ষমতা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখেন, সেখানে ‘ফেনীর সময়’ সংবাদকে দেখেছে দায়িত্বের জায়গা থেকে।
১৭ বছরের এই পথচলা সময়ের হিসাব নয়, এটি এক আদর্শিক যাত্রা। এই সময়ে অনেক বড় বড় জাতীয় দৈনিকও যেটা পারেনি, ‘ফেনীর সময়’ পেরেছে—একটি জনপদের স্বপ্ন, যন্ত্রণা, প্রতিবাদ আর প্রত্যাশাকে শব্দে রূপ দিয়ে মানুষের সামনে তুলে ধরতে। তারা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে কোন অন্যায় কোথায় ঘটছে, কে করছে, আর কে দায়ী।
হ্যাঁ, ভুল হয়েছে, সমালোচনাও এসেছে। কিন্তু এই পত্রিকাটি তার মূল জায়গা থেকে কখনো সরেনি। শাহাদাত হোসেন জানতেন—এই লড়াই সম্মানের, এই সংগ্রাম আদর্শের। তাই বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছেন তিনি, বারবার প্রমাণ করেছেন, নৈতিক শক্তিই সবচেয়ে বড় শক্তি।
আজ ‘ফেনীর সময়’-এর ১৭ বছর পূর্তির দিনটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের জন্মদিন নয়—এটি সততা, সাহস, ন্যায়ের প্রতি অবিচলতার এক অনন্য উদযাপন। যদি দেশের প্রতিটি জেলা শহরে এমন একটি পত্রিকা থাকতো, যা সত্য বলার দায়ে নির্ভীক হতো, তাহলে গণমাধ্যম হতো আরও শক্তিশালী, নিরপেক্ষ এবং সমাজমুখী।
এই সাহসী যাত্রার জন্য সম্পাদক শাহাদাত হোসেন-কে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও অভিনন্দন। তাঁর নেতৃত্বেই এই আলো জ্বলে থাকুক আরও অনেক বছর—সত্যের পক্ষে, জনগণের পাশে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে।