আলী হায়দার মানিক :
ফেনীতে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য নারীদের নিপুন হাতে তৈরি শীতল পাটির কাঁচামাল পাটিপাতা বাগান অনেকটা বিলুপ্তির পথে। একসময় গ্রামের নারীরা অবসর সময়ে নয় শুধু পেশা হিসেবেও পাটিপাতা দিয়ে শীতল পাটি তৈরির কাজে ব্যস্ত ছিলেন। হাজার বছরের এ শিল্প হারিয়ে যেতে বসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গ্রাম বাংলার শিল্প ও ঐতিহ্যের অন্যতম নিদর্শন শীতল পাটি। আধুনিক সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে। তেমনই একটি শিল্প শীতল পাটি, সময়ের ব্যবধানে এ শিল্পটি এখন হারানোর পথে। ফেনীর সোনাগাজী উপজেলা উপকূলীয় অঞ্চল হওয়ায় এখানে পাটিপাতা বাগান ছিল বেশি। রাস্তার পাশে সারি সারি পাটিপাতা বাগান দেখা ছিল। এখন অনেকটা বিলুপ্তির পথে। এছাড়াও ছাগলনাইয়া, দাগনভূঞা, ফুলগাজী ও পরশুরামেও পাটিপাতা বাগান ছিল। বিশেষ করে জলাশয় জমিতে পাটিপাতা বাগান করা হতো। নিচু জমিতে ধান ও সবজি হতো না বলে ওইসব জমিতে পাটিপাতা বাগান করা হতো। রাস্তার পাশে নিচু জায়গায় এ পাটিপাতার বাগান ছিল চোখে পড়ার মতো। বিগত ১৫-২০ বছরের মধ্যে ফেনীর বিভিন্ন উপজেলায় পাটিপাতা বাগান বিলুপ্তির পথে। পাটিপাতা দিয়ে তৈরি শীতল পাটি বিক্রির জন্য সোনাগাজী উপজেলার বখতারমুন্সি বাজার ছিল বিখ্যাত। নারী-পুরুষ একসঙ্গে রাতদিন পাটিপাতা দিয়ে হাতে তৈরি করতেন শীতল পাটি। শীতল পাটি বিক্রির কেন্দ্রবিন্দু ছিল বখতারমুন্সি বাজার। একসময় খুচরা বিক্রেতাদের থেকে শীতল পাটি কিনার জন্য বখতারমুন্সি বাজারে ফেনী ও নোয়াখালীর পাইকাররা ছুটে যেতেন। সেখানে অন্যান্য বাজারের তুলনায় শীতল পাটির ছিল বেশি।
ফেনী সদর উপজেলার বাসিন্দা আমির হোসেন জানান, এখন থেকে ১৫-২০ বছর আগেও পাটিপাতা বাগার তাদের বাড়ির চারিদিকে ছিল। এখন বাগান তো দূরের কথা পাইত্রা গাছ একদম দেখা যায় না। নতুন প্রজন্ম এখন আর পাটিপাতা বাগান কাকে বলে সেটা জানবে না। নিচু জায়গাগুলো অলস পড়ে না থেকে পাটিপাতা বাগান করা হলে অনাবাদি জায়গাগুলো আবাদ করা হবে বলেও তিনি জানান। এসব জায়গা থেকে বছরে ভালো আয় আসতে পারে। এতে আত্মকর্মসংস্থানেরও সৃষ্টি হবে।
সোনাগাজী উপজেলার বগাদানা ইউনিয়নের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম পাটোয়ারী বলেন, তাদের ওই অঞ্চলের মানুষের একসময়ে পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎসহ ছিল পাটিপাতা দিয়ে তৈরি শীতল পাটি। শীতল পাটি বিক্রি করে চলতো পরিবারের যাবতীয় ভরন পোষণ।
ছাগলনাইয়া উপজেলার কুহুমা গ্রামের কাজী বাড়ির বাসিন্দা মেজবাহ উদ্দিন জানান, ‘আমাদের গ্রামে নিচু জমিতে পাটিপাতা বাগান ছিল চোখে পড়ার মতো। এখন আর সেই আগের মতো বাগান চোখে পড়ে না। গ্রামের মানুষের যেসব জমিতে ধান হতো না সেইসব জমিতে পাটিপাতা বাগান করতেন। কিন্তু এখন সেই আগ্রাহ আর কারো মাঝে দেখা যায় না।
পরশুরাম উপজেলার নুরুল আফসার জানান, তাদের বাড়িরে আশপাশে প্রচুর পাটিপাতা বাগান ছিল। এখন সেইগুলো মানুষ ধ্বংস করে বাড়ি-ঘর নির্মান করেছেন। পাটিপাতা বাগান অনেক নতুন প্রজন্মের কাছে অপরিচিত হয়ে গেছে। শীতল পাটি ছিল এলাকার মানুষের কাছে পরিবারের ব্যবহারের জন্য একটি অন্যতম পণ্য। মেয়ের বিয়ের সময় শ্বশুর বাড়িতে শীতল পাটি উপহার হিসেবে দেয়া হতো। এখন সেই ঐতিহ্য বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।
ফুলগাজী উপজেলার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম সোহাগ জানান, পাটিপাতা বাগান তাদেরও ছিল। সেটা বিক্রি করে বছরে অনেক টাকা আয় হতো। এখন আর পাটিপাতা বাগান নেই। নিচু জায়গায় এই পাটিপাতা বাগান ছিল। পরিচর্চা না করার কারনে ও মানুষের মাঝে আগ্রহ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এই শিল্প অনেকটা হারিয়ে যেতে বসেছে। পাটিপাতা বাগান তৈরির জন্য উদ্যোগ গ্রহন করা প্রয়োজন বলেও তিনি জানান।
দাগনভূঞা উপজেলার বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন লিটন জানান, পাটিপাতা বাগান তাদের গ্রামে অনেক ছিল। তবে এখন আর চোখে পড়ার মতো নেই। দুই একটা থাকলেও তা নাগালে বাহিরে। তবে এ শিল্প ধ্বংসের পথে। এটিকে বাঁচাতে হলে আবারও পরিকল্পিতভাবে নিচু জায়গায় বাগান তৈরি করতে হবে। তাহলে পাটিপাতা বাগান আবারও ফিরে পারে ঐতিহ্য। নারীরা এ পাটিপাতা দিয়ে নানা রকম শীতল পাটি তৈরি করার দৃশ্য এখন অনেকটা স্বপ্নের মতো।