মার্চ ৬, ২০২৬ ০৮:২৮

যে কারণে জলাবদ্ধতা ফেনী পৌর এলাকায়, কী করছে পৌরসরভা?

যে কারণে জলাবদ্ধতা ফেনী পৌর এলাকায়, কী করছে পৌরসরভা?
  • অপরিকল্পিত ড্রেনেজ
  • খালগুলো বেদখল ও ভরাট হয়ে যাওয়া
  • ড্রেনের আউট ফলগুলো নিয়মিত সংস্কার না করা
  • সব ধরণের অবর্জনা ড্রেনে ফেলা

আলী হায়দার মানিক :
ফেনী পৌরসভায় পর্যাপ্ত আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় এবং অবৈধ দখলের কারণে বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে ওঠেছে। এতে বছরের পর বছর ধরে পৌরবাসী পানিবন্দী হয়ে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ফেনী পৌরসভার পাগলি ছড়া খাল, দাউদপুর খাল, কুবর ছড়া খাল ও ধমধমা খাল দীর্ঘদিন যাবত পরিস্কার ও সংস্কার না করার কারণে বৃষ্টি হলেই শহরজুলে জলাবদ্ধতার কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে ওঠে। এছাড়াও ফেনী শহরজুড়ে অবৈধ দখলও জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অপরদিকে, পৌরসভার ড্রেনগুলো পরিস্কার করা হলেও আউট ফলগুলো নিয়মিত পরিস্কার না করার কারণে পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ড ও পাড়া-মহল্লায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এছাড়াও পৌরসভার ৪, ৫, ৬, ১০, ১১ ও ১২নং ওয়ার্ডের মধ্যে নিচু জায়গা বেশি হওয়ায় বৃষ্টি হলেই পানি জমে যায়। বিভিন্ন জটিলতার কারণে ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে দীর্ঘদিন ড্রেন না হওয়ার কারণে বিশেষ করে ১০ ও ১২নং ওয়ার্ডে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। পৌরসভার ড্রেনসমূহের বিপুল পরিমাণ অপছন যোগ্য (প্লাস্টিক সহ নানা সামগ্রী) জিনিসপত্র ফেলার কারণে ড্রেনসমূহে পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হয়। বিশেষ করে তাকিয়া রোড থেকে রামপুর সৈয়দ বাড়ি ও ফয়েজ পাটোয়ারী বাড়ির পিছনের ড্রেন দীর্ঘ সময় ধরে পরিস্কার না করায় ১৭নং ও ১৮নং ওয়ার্ডে আংশিক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।

পৌরসভার ১৭নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা বেলায়েত হোসেন জানান, বিগত ১৫-১৬ বছর ধরে পৌর এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। এটির অন্যতম কারণ হলো পৌর নাগরিকদেরকে ক্ষমতাশীনরা নাগরিক সুবিধা থেকে দারুণভাবে বঞ্চিত করেছেন। উন্নয়নের নামে তারা ভাগ-ভাটোয়ারায় ব্যস্ত ছিল। যেখানে ভোটের কোন মূল্য ছিল না সেখানে নাগরিকরা কিভাবে সুবিধা ভোগ করবে। আগামী জনগণের ভোটে নির্বাচিত মেয়র হলে আশা করা যায় পরিকল্পিত কাজের মাধ্যমে জলাবদ্ধতা সহ যাবতীয় সমস্যা সমাধান হবে।

পৌরসভার ১১নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা হাসান মাহমুদ সবুজ জানান, বৃষ্টি হলেই ওয়ার্ডের চৌধুরী বাড়ির উত্তর দিকে সিরাজুল ইসলাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সড়ক থেকে পাগলা মিয়া সড়ক পর্যন্ত রাস্তা পানির নিচে তলিয়ে যায়। মাস্টার আবদুল হাই সাহেবের বাড়ির সড়কও একই অবস্থা হয়। অতীতের বিনা ভোটের জনপ্রতিনিধিরা মানুষের আশা আকাঙ্খা অনুযায়ী কোন কাজই করেনি। যেখানে তাদের পকেটে ভারী হয়েছে সেখানেই তারা কাজ করেছে। তাই সামান্য বৃৃষ্টি হলেই পৌর নাগরিকরা পানিতে ভাসতে হচ্ছে। সবার আগে পানি নিস্কাষণ জরুরী বলেও তিনি জানান।

পৌরসভার ৯নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা ব্যবসায়ী নেতা মতিউর রহমান সোহেল জানান, বর্ষা মৌসুম আসলেই মনের মাঝে অজানা আতংক কাজ করে। কারণ একটু বৃষ্টি হলেই পাড়া-মহল্লার রাস্তাগুলোতে পানি জমাট হয়ে যায়। ড্রেনগুলো যে পরিমাণ গভীর করা দরকার ছিল সেই পরিমান গভীর হয়নি বলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।
পৌরসভার ১৬নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা আইয়ুব আলী মামুন জানান, পুরো ওয়ার্ডটি অনেকটা বসবাস অনুপযোগী হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে পুরাতন পুলিশ কোয়ার্টার ও শাহীন একাডেমী রোডে বৃষ্টি হলেই ড্রেনের পানি রাস্তায় ওঠে যায়। স্কুলগামী শিক্ষার্থীরা চলাচল করতে পারে না। এছাড়াও পুরাতন পুলিশ কোয়ার্টারের রাস্তাগুলো সংকুচিত করে ফেলায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা একেবারেই বেহাল দশা।

পৌরসভার ১০নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা আরাফাত খান জানান, অল্প বৃষ্টিতেই পাঠান বাড়ি এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। প্রতি বছর এই সমস্যায় পড়তে হচ্ছে পৌর নাগরিকদের। জলাবদ্ধতা থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজে বের করে দ্রুত নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা সময়ের দাবী হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর জলাবদ্ধতার কারণে মানুষের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে।

শুধুমাত্র পৌরসভার অবহেলা নয়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদাসীনতাকেও দায়ী করেন সচেতন নাগরিকরা। তারা বলেন, পৌরসভার বাহিরে যে সংযোগ খালগুলো রয়েছে সেগুলো সংস্কার না করার কারণেও পৌর এলাকায় জলাবদ্ধতা হচ্ছে। আউটফলগুলো ৩-৪ কিলোমিটার সংস্কার করা হলে পৌরসভার পানির সমস্যা দূর হবে বলেও তারা জানান।

কী করছে পৌরসভা?

নিজস্ব প্রতিনিধি :
ফেনী পৌরসভা সূত্র জানিয়েছে, শহরের শহীদ শহীদুল্লা কায়সার সড়ক, ট্রাংক রোড থেকে শুরু করে মহিপাল পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থার কাজ শুরু হচ্ছে। এ কাজ শেষ হলে আশা করা যায় অতি বৃষ্টি না হলে পৌরবাসী জলাবদ্ধতা থেকে রেহাই পাবেন। এছাড়াও জলাবদ্ধতা নিরসনে আরো ব্যাপক কাজ ইতিমধ্যে হাতে নেয়া হয়েছে। আশা করা যায় আগামী ১ বছরের মধ্যে জলাবদ্ধতা থেকে ফেনী পৌরবাসী মুক্তি পাবেন। তবে নাগরিকরা পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতায় সহযোগী হিসেবে কাজ করতে হবে বলে মনে করেন পৌরসভার দায়িত্বশীল সূত্র।

জানতে চাইলে ফেনী পৌরসভার প্রশাসক গোলাম মো: বাতেন ফেনীর সময় কে জানান, যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণেও ড্রেনগুলোতে স্বাভাবিক পানি চলাচলে বাধাগ্রস্ত হয়। দেশের গুরুত্বপূর্ণ পৌরসভাগুলোর মধ্যে ফেনী পৌরসভা উল্লেখযোগ্য। এখানে মানুষের বসবাসও অন্যান্য জেলা শহরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সংলগ্ম জেলা হওয়ায় জেলা শহরের বাহিরেও এখানে ভিন্ন জেলার ভাসমান মানুষের বসবাস বেশি। কিন্তু এখানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অপরিকল্পিত নগরায়ন গড়ে ওঠেছে। তাই ছোট্ট শহরে যে পরিমান বসবাস সেই পরিমান ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ছোট ড্রেন না করে প্রয়োজন ছিল বড় ড্রেনেজ ব্যবস্থা নির্মাণ করার।
তিনি আরো জানান, সাম্প্রতিক সময়ে পৌরসভার গুরুত্বপূর্ণ ড্রেনগুলো ড্রেজার মেশিন দিয়ে ময়লা আবর্জনা অপসারণ করা হয়েছে। এতে প্রায় ৩০ হাজার মেট্টিক টন ময়লা-আবর্জনা অপসারণ করা হয়। তার মধ্যে অপছন যোগ্য (অর্থাৎ প্লাস্টিক) অপসারণ করা হয়েছে প্রায় ৩ হাজার মেট্টিক টন। এছাড়াও লেপ-তোষক-বালিশ পৌর নাগরিকদের নিত্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন রকম জিনিসপত্র পাওয়া গেছে। এসব আবর্জনার কারণে ড্রেন যতই পরিস্কার করা হোক না কেন পানি নিষ্কাশন সংকূচিত হয়ে যায়।

শহরতলীর দোস্ত মোহাম্মদ টেক্সটাইল মিল সংলগ্ন খাল, ডাকাতিয়া খাল, দেওয়ানগঞ্জ খাল, বালিগাঁও সংযোগ খাল, কাজিরবাগ সংযোগ খাল, দাউদপুর খাল খনন করে কালিদাস পাহালিয়া নদী পর্যন্ত পরিস্কার করতে হবে। পৌরসভার চারিদিকে যত খাল-বিল রয়েছে সেগুলো নিয়মিত পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। খাজা আহমদ লেক বড় করতে হবে। বড় ড্রেন থেকে ছোট ড্রেনের সমতায় নিয়ে আসতে হবে। তাহলে জলাবদ্ধতা বলতে কোন শব্দ আশা করা যায় ফেনী পৌর এলাকায় থাকবে না। জলাবদ্ধতা নিরসনে পৌরসভার প্রধান ডেনগুলোর আউট ফল থেকে ৪ কিলোমিটার পর্যন্ত খালগুলো নিয়মিত পরিস্কার রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। না হয় পৌরসভার মধ্যে যত বড় ড্রেনেজ ব্যবস্থা করা হোক না কেন বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হবে। কোভিট-১৯ এর আওতায় শহরের সিভিল সার্জনের বাস ভবনের সামনে থেকে কুমিল্লা বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত ১ কোটি ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ড্রেন প্রশস্ত করণের কাজ শুরু হচ্ছে। তবে পৌরসভার বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ড্রেন নির্মাণ হলেও অদৃশ্য হস্তক্ষেপের করণে ওই এলাকা ড্রেন নির্মাণ করা হয়নি বলেও জানান পৌরসভার দায়িত্বশীল সূত্র।

ফেনী পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো: জাকির উদ্দিন জানান, পৌরসভার প্রত্যেকটা ওয়ার্ড ঘুরে অনেক প্রতিবন্ধকতা ছিল সবই উন্মুক্ত করে পানি অপসারণের যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। দাউদপুর ব্রীজ সংলগ্ন স্থানে খাল দখল করে সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণ করাতে একফোঁটা পানিও উক্ত খাল দিয়ে নেমে লেমুয়া নদীতে যাওয়ার কোন রকম রাস্তা না থাকায় এমন জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। যদি ওই স্থান উন্মুক্ত করা না হয় হাতলে ফেনীর অবস্থা আরো কঠিন থেকে কঠিন ভয়াবহ রূপ নিবে বলেও তিনি জানান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিজ্ঞাপন