- জোড়াতালি দিয়ে চলছে স্বাস্থ্যসেবা
- চিকিৎসা সংকটে রোগি মৃত্যুর অভিযোগ
- কর্মকর্তা-কর্মচারী ৩২৬ জনের ১২৮ পদ শূন্য
- রোগীদের প্রাইভেট হাসপাতালের পাঠানোর অভিযোগ
আলী হায়দার মানিক :
ফেনী জেনারেল হাসপাতালে কাঙ্খিত চিকিৎসা সেবা মিলছে না। চিকিৎসক, নার্স ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। অভিযোগ রয়েছে, চিকিৎসা নিতে এসে মরণ যন্ত্রণায় ধুঁকে ধুঁকে মরছে রোগীরা। হাসপাতালটি জেলার প্রধান চিকিৎসা সেবার কেন্দ্র বিন্দু হলেও চিকিৎসার কোন পরিবেশ নেই বলে অভিযোগ করেছেন হাসপাতালে ভর্তি রোগীর স্বজনরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২৫০ শয্যা জেলা সদরের হাসপাতালটিতে ৫৬জন চিকিৎসকের মধ্যে ১৩জন রযেছে। ৪৩টি পদই শূন্য। একইভাবে নার্স ১৫৩ জনের মধ্যে ১১৩জন থাকলেও ৪০ পদ শূন্য রয়েছে। এছাড়াও তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী ৪১ জনের মধ্যে ২৬ জন রয়েছে। শূন্য পদ রয়েছে ১৫টি। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ৭৩ জনের মাঝে ১৬জন রয়েছে। এ পদেও ৫৭টি শূন্য রয়েছে।
এ হাসপাতালে জেলার বাহির থেকেও প্রচুর রোগী প্রতিদিন ভর্তি হচ্ছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো থাকায় রামগড়, খাগড়াছড়ি, বারইয়ারহাট, চৌদ্দগ্রাম, সেনবাগ থেকেও রোগী ভর্তি হচ্ছে। চিকিৎসার কোন পরিবেশ নেই অভিযোগ করেন রোগীর স্বজনরা। প্রজেক্টের অধীনে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের যারা পরিচালনা করত তারা ৫ আগস্টের পর পালিয়ে যাওয়ায় ১১ মাস কর্মচারীরা বেতন-ভাতা পাচ্ছে না। এ কারণে পরিস্কার-পরিচ্ছনতা কাজে ব্যাঘাত ঘটছে। চিকিৎসার করুণ দশার কারণে রোগীরা সঠিক স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন না। শিশুদের ওয়ার্ডে নেই কোন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নিতে এসে বিগত ৬ মাসে ২৬৭জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে বেশিরভাগ শিশু ও বয়স্ক রোগী। রোগীর স্বজনদের অভিযোগ যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়ার কারণেই রোগীরা মুত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। এছাড়াও নতুন ভবনে একটি লিফট থাকলেও সেটাও অনেকটা বিকল হয়ে আছে। মুমূর্ষু রোগীরা উপরে ওঠা নামা করতে ভীষণ যন্ত্রণা পোহাতে হচ্ছে।
৮০ বছর বয়সী মায়ের চিকিৎসা নিতে আসা শহীদুল ইসলাম নামের এক রোগীর স্বজন জানান, মাকে মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে এসে পদে পদে ধোঁকা খেতে হচ্ছে। স্ট্রেচার খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কর্মচারী ও নার্স নেই। পরে একটি স্ট্রেচার খোঁজ করে নিয়ে নিজেরা টেনে টেনে হাসপাতালের জরুরী বিভাগে নিয়ে যায়। সেখানে গিয়েও দেখা যায় রোগীদের লম্বা লাইন। কাজের ধীর গতি দেখে জিজ্ঞেস করা হলে তারা জানায় জনবল সংকট।
হাসপাতালের আশপাশের দোকানীরা জানায়, সদর হাসপাতালে ডাক্তার নেই বলে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তির জন্য একটি চক্র সেখানে কাজ করে থাকে। তারা যে কোন রোগী আসলে তাদেরকে বিভিন্ন প্রাইভেট হাসপাতালে গিয়ে ভর্তির পরামর্শ দেয়। এ ধরণের সিন্ডিকেট ভেঙ্গে দেয়ার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রোগীর স্বজনরা জানায়, এমনিতে নেই ডাক্তার। আবার যে কয়জন রয়েছে তাদের কাছে বিভিন্ন ওষধ কোম্পানীর রিপ্রেজেন্টেটিভ এসে ভিড় জমায়। এতে রোগী দেখা ও চিকিৎসায় ব্যাঘাত ঘটছে। যেন দেখার কেউ নেই।
এছাড়াও সকালে টোকেন কেটে লম্বা লাইন ধরে রোগীরা ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। চিকিৎসকরা অনেকটা প্রাইভেট চেম্বার নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. শোয়েব ইমতিয়াজ নিলয় জানান, কর্মকর্তা-কর্মচারী সংকট থাকায় চিকিৎসা সেবায় বিঘ্ন ঘটছে। সার্জারী ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞও সংকট রয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হওয়ায় জেলার বাহির থেকেও বিভিন্ন জেলা থেকে এখানে রোগীরা চিকিৎসা নেয়ার ভিড় জমান। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সুদৃষ্টি দিলে চিকিৎসা সেবার মান উন্নত হবে বলেও তিনি জানান।
জানতে চাইলে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মো: কামরুজ্জামান ফেনীর সময় কে বলেন, জোড়াতালি দিয়ে চলছে চিকিৎসা সেবা। আসলে আমাদের পক্ষ থেকে কিছুই করার নেই। ২৫০ শয্যা হলেও গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৫ থেকে সাড়ে ৫শ রোগী চিকিৎসা সেবা নিচ্ছেন। শূন্যপদ নিয়ে চিকিৎসা সেবা দিতে ভীষণ হিমশিম খাচ্ছেন বলেও তার অভিযোগ। এছাড়া এক বিভাগ থেকে আরেক বিভাগে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। রোগীরা যথাযথ চিকিৎসা পাওয়াতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। এতেও শতভাগ চিকিৎসা সেবা নয় ৫০% থেকে ৩৫% স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া যাচ্ছে না।
তিনি আরো জানান, চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল দায়িত্বে আসার পর থেকে চাহিদা অনুযায়ী চিকিৎসা সেবা দেওয়া যাচ্ছে না মর্মে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বারবার লিখিতভাবে জানিয়েও কোন লাভ হয়নি। জোড়াতালি দিয়েও চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। জনবল সংকট নিরসন হলে আশা করছি চিকিৎসা সেবার মান চাহিদা অনুযায়ী সম্ভব হবে।
জানতে চাইলে ফেনীর সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ রুবাইয়াত বিন করিম ফেনীর সময় কে জানান, আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। একজন মানুষ যখন জীবনের ঝুঁকিতে পড়ে যায় তখন হাসপাতালে যায়। তখন চাহিদা অনুযায়ী চিকিৎসা সেবা না পাওয়া সত্যি দু:খজনক। এখানে দীর্ঘদিন যাবত চাহিদা অনুযায়ী জনবল না থাকার কারণে এ সমস্যাগুলো হচ্ছে। আমাদের চেষ্টার কোন ত্রুটি নেই। জনবলের জন্য জুন মাসের শেষ পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ে চেষ্টা করেছি। সিভিল সার্জন সম্মেলনেও এ বিষয়ে কথা বলেছি। ১০০ শয্যার স্ট্যান্ডার্ড মানের জনবলের জন্য পদ সৃজনের প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। আগে ১০০ শয্যার জনবল স্ট্যান্ডার্ড মানে পৌঁছলে এরপর ২৫০ শয্যার জন্য যে পরিমান জনবল প্রয়োজন সেটা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বরাবর লিখিতভাবে জানানো হবে।