মার্চ ৬, ২০২৬ ০৪:৩০

ফেনীতে যেভাবে সংগঠিত হয় আন্দোলন

নিজস্ব প্রতিনিধি :
চব্বিশের জুলাইয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনের শুরু থেকে ফেনীতে কয়েকজন শিক্ষার্থী অগ্রনী ভূমিকা পালন করলেও ক্রমেই সেটি গণআন্দোলনে রুপ নেয়। স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার হাজারো শিক্ষার্থীর সাথে অভিভাবক সহ সাধারণ মানুষ এক দফার ফ্যাসিবাদ বিরোধি আন্দোলনে যুক্ত হয়।

মাসব্যাপি বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে হামলা-সংঘর্ষ হয়। শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগের আগেরদিন ৩৫ জুলাই (৪ আগষ্ট) শহরের মহিপালে আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীদের নির্বিচার গুলিতে ১১জন ছাত্র জনতা প্রাণ হারান। তৎকালীন সরকার দলীয়দের অব্যাহত হুমকি-ধামকি ও গ্রেফতারের আতংক মাথায় থাকলেও তবুও অদম্য সাহসী এসব ছাত্র-ছাত্রীরা পিছপা হয়নি। আন্দোলন বেগবান করতে অগ্রভাগে থাকা ১৮ জনকে দিয়ে সমন্বয়ক কমিটি করা হয়।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক মুহাইমিন তাজিম বলেন, “ফ্যাসিবাদের দিনগুলো ছিল দু:সহ। তখন ফ্যাসিবাদ উৎখাত করতে ছাত্ররা মূল্যবোধের জায়গা থেকে কোটা সংস্কারের দাবীতে রাজপথে নামি। ফেনীর ছোট্ট একটি শহরে আন্দোলন করা ছিল কঠিন। সেইসময়ে গণইফতার আয়োজনে ছাত্রলীগ হামলা চালালে আমি সহ বেশ কয়েকজন আক্রমনের শিকার হয়। সেদিন থেকে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে মানুষ ক্ষোভে ফুঁসে উঠে।”

ফেনী সরকারি কলেজের গণিতের এ শিক্ষার্থী আরো বলেন, “৬ জুলাই থেকে আমরা অল্প কয়েকজন নিয়ে আন্দোলনে নামি। ওইদিন পুলিশ বাধা দিলে মাইক নিয়ে আসা রিক্সাওয়ালা পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে বিকাল বেলা তাকে খুঁজে বের করে মাইক পুনরুদ্ধার করি। সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, গণঅধিকার সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থন নিয়ে ১৪ জুলাই জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি দিই। মূল আন্দোলন শুরু হয় ১৬ জুলাই। পলিটেকনিকের শিক্ষার্থীরা রেললাইন অবরোধ করলে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ১৭ তারিখ পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচী বানচাল করতে মহিপালে জেলা ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক নুর করিম জাবেদের নেতৃত্বে একটি গ্রুপ আরেকটি গ্রুপ ট্রাংক রোডে আসা ছাত্র-ছাত্রীদের হানাদার বাহিনীর মত তল্লাশী চালায়। শহীদ মিনারে মেয়েদের উপর নির্যাতন করা হয়। অনেককে ধরপাকড় করে পিটিআইতে নিয়ে মারধর করা হয়। সেদিন শহীদ মিনারের সামনে ট্রাংক রোডে জড়ো হলে ছাত্রলীগ-যুবলীগ সন্ত্রাসীরা অতর্কিত হামলা চালায়। ১৮ জুলাই ফেনী সেন্ট্রাল হাইস্কুলের সামনে থেকে মিছিল নিয়ে বের হয়ে বড় মসজিদের সামনে এলে ছত্রভঙ্গ করা হয়। ওইদিনই প্রথম ফেনীতে গোলাগুলি হলে অনেকে আহত হয়। নারীদের উপরও পুলিশ সরাসরি আক্রমণ করে। ১৯ জুলাই ১৪৪ ধারা কারফিউর মধ্যে জহিরিয়া মসজিদের সামনে থেকে মিছিল বের হলে পুলিশ গুলি করলে। অনেকে চোখে-মুখে গুলিবিদ্ধ হয়। ২৬ জুলাই শিবিরের দায়িত্বশীল মুহাইমিন সাইমুনের পরিচালনায় গায়েবানা জানাযা হয়। ওই কর্মসূচীতে শিবির-ছাত্রদলের অনেকের উপস্থিতি দেখতে পাই। ফেনী ইউনিভার্সিটি সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীরা বিভিন্ন এলাকায় গ্রাফিতি কর্মসূচী পালন করি।”

তাজিম আরো বলেন, “১ আগস্ট মোমবাতি প্রজ্জ্বলন কর্মসূচীর মাধ্যমে সবাইকে আবার সংগঠিত করা হয়। বড় বাজার থেকে বের হলে প্রেসক্লাবের সামনে এলে পুলিশ বাধা দিয়ে কর্মসূচী পন্ড করে দেয়। ২ তারিখ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে জহিরিয়া মসজিদের সামনে থেকে মিছিল বের হলে পুলিশ-ছাত্রলীগ যৌথভাবে বাধা দেয়। ৩ তারিখ ট্রাংক রোডে অবস্থান গড়ে তুলতে তুমুল আন্দোলন হয়। এক দফা ঘোষনার পর আন্দোলন আরো তীব্র হয়। শেখ হাসিনার কঠোর ঘোষনার পর ছাত্রলীগের অনেক বন্ধু-বান্ধবের মাধ্যমে আমাদের উপর আক্রমনের খবর পাই। অস্ত্র ব্যাবহারের আশংকায় ট্রাংক রোড থেকে কর্মসূূচীর স্থান সরিয়ে মহিপালে নেয়া হয়। সেদিনের বর্বরোচিত হামলার ঘটনায় প্রাণহানীর খবর সবার জানা রয়েছে।”

আরেক সমন্বয়ক আবদুল কাইয়ুম সোহাগ বলেন, “৬ জুলাই আন্দোলন সংগঠিত করতে ৫ তারিখ রাতে আবদুল আজিজ ও তাজিমদের মাধ্যমে হার্ট ফাউন্ডেশনের সামনে বৈঠক হয়। ৬ তারিখ থেকে কোটা সংস্কার দাবীতে মাঠে সক্রিয় হয়। ছোট খাট প্রোগ্রাম, ব্লকেড হতে থাকে। কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের আলোকে আবদুল্লাহ আল জোবায়ের, মোতাহের হোসেন তুহিন, আবদুল আজিজ সহ কয়েকজন জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি বরাবর স্মারকলিপি দিই। স্মারকলিপি প্রদানের পর থেকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধামকি বাড়তে থাকে। পরবর্তীতে তাহমিদের মাধ্যমে পলিটেকনিকের শিক্ষার্থীরা রেললাইনে ১৬ জুলাই আন্দোলন করে। ১৭ জুলাই শহীদ মিনারে আন্দোলন করতে গেলে আগে থেকে অবস্থান নেয়া ছাত্রলীগ কর্মসূচীতে আসা পিটিআই মাঠে নিয়ে মারধর ও শ্লীলতাহানী করে। বড় মসজিদের পেছন থেকে মিছিল বের করলে হামলা চালানো হয়। অনেকে বিভিন্ন ধরনের ছদ্মবেশে আমাদের সাথে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করতো।”

সোনাগাজী সরকারী কলেজের শিক্ষার্থী সোহাগ আরো বলেন, “কর্মসূচীর প্রচার করতে অনেকে কয়েকটি গ্রুপ ও ফ্যাক আইডি খোলা হয়। প্রতিটি গ্রুপে আড়াইশ করে মেম্বার ছিল। কর্মসূচী জোরালো শুরু হয় নেট শার্টডাউন, ৬ জন ডিবি হেফাজতে নেয়া। তখন খুবই ভয়ংকার পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আমাদের মধ্যে কয়েকজনকে বাসা থেকে তুলে নেয়া হয়। কয়েকজনকে টাকা নিয়ে ছেড়ে দেয় এবং কয়েকজনকে কারাগারে পাঠায়। চোখে-মুখে লাল কাপড় বাঁধা সহ প্রতীকি প্রতিবাদও করা হয়। ২ আগস্ট জহিরিয়া মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচীর অংশ হিসেবে বৃষ্টির মধ্যে ট্রাংক রোডে অবস্থান নিই। ৩ আগস্ট ট্রাংক রোডে কর্মসূচী করেছিলাম। ৪ আগস্ট ছাত্রদল, ছাত্রশিবিরের সাথে সমন্বয় করে মহিপালে অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নিই। সেদিন সকাল ১১টায় কর্মসূচী শুরু হয়। পূর্ব থেকে ইসলামপুর রোডে ছাত্রদল নোতকর্মীদের উপর হামলা করে ছাত্রলীগ। মহিপালে পুরোপুরিভাবে ছাত্রশিবির যোগ দিয়েছিল। নেতৃত্ব ও শৃঙ্খলার দায়িত্বে ছিলো ছাত্রশিবির। দীর্ঘক্ষন কর্মসূচী চলার একপর্যায়ে যোহরের নামাজের পর ছাত্রলীগ-যুবলীগের সন্ত্রাসীরা বিদেশী অস্ত্র দিয়ে নিরস্ত্র ভাইদের উপর হামলা করে। ঘটনাস্থলে ৭ জন ভাই নিহত হয়।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিজ্ঞাপন