মার্চ ৬, ২০২৬ ০৪:২৯

ভরা মৌসুমেও সাগরে মিলছেনা ইলিশ পেশা বদলাচ্ছে জেলেরা

এম মাঈন উদ্দিন :
প্রতি বছর ভরা মৌসুমে সাগরে ইলিশ না পেয়ে পেশা বদলে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন মিরসরাই উপজেলার জেলেরা। দেশের ৫টি প্রজনন ক্ষেত্র’র একটি মিরসরাইয়ের সাহেরখালী পয়েন্ট। কিন্তু এই পয়েন্ট ঘিরে জাতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে উঠায় মাছ বিচরণক্ষেত্র পরিবর্তন করেছে। মূলত এই কারণে আগের মত ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উজান থেকে নেমে আসা মিঠাপানির প্রবাহ ও গতিপ্রকৃতির পরিবর্তন, পরিবেশদূষণ ও জলবায়ুর প্রভাবে এই অঞ্চলে ইলিশ কমে যাচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ৫ বছরেই বদলে গেছে ইলিশ আহরণের চিত্র। ইলিশের মৌসুম চললেও সাগর থেকে যেন মাছ উধাও। ৫ বছরে মিরসরাইয়ে ইলিশ আহরণ কমেছে ২২৭ মেট্রিক টন। ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে সরকার বছরে একাধিকবার সাগর ও নদীতে মাছ আহরণ বন্ধ রেখেও কেন বাড়ছে না তাই এখানকার জেলেদের বোধ্যগম্য নয়। তবে জেলেদের ধারণা মিরসরাইয়ের চরে প্রতিষ্ঠিত অর্থনৈতিক অঞ্চলের কারণে ইলিশ আহরণ কমতে পারে।

মিরসরাই উপজেলা মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, মিরসরাইয়ে ২৯টি জেলে পাড়ায় নিবন্ধিত জেলে রয়েছে ২ হাজার ৫শত ৫৭ জন। পরিবার রয়েছে প্রায় ৫ হাজার।
সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা কার্যালয়ের দেয়া তথ্যমতে, মিরসরাইয়ে ২০২০ সালে ইলিশ আহরণ হয় ৩২৭.৪ মেট্রিক টন। ২০২১ সালে এসে ইলিশ আহরণে ধাক্কা খায় এখানকার জেলেরা। ওই বছর ইলিশ আহরণ হয় ২৫২.৩ মেট্রিক টন। এভাবে প্রতি বছর কমতে থাকে ইলিশ আহরণ। ২০২২ সালে আহরণ হয় ১৪৭.৪ মেট্রিক টন ইলিশ। সেই ধাক্কা আর সামাল দিতে পারেনি মিরসরাইয়ের ২৯টি জেলে পাড়ার কয়েক হাজার জেলে। ২০২৩ সালে আহরণ হয় ১১৬ মেট্রিক টন ইলিশ। ২০২৪ সালে ইলিশ আহরণ নেমে যায় তলানিতে। ওই বছর আহরণ হয় মাত্র ৩৬ দশমিক ৪৯ টন।

ধারণা করা হচ্ছে চলতি বছর হয়তো আরো ৪৪ মেট্রিক টন ইলিশ আহরণ হলে মোট আহরিত ইলিশের পরিমাণ হবে ১০০ টন। ফলে বিগত ৫ বছরে ইলিশ আহরণের পরিমাণ কমেছে ২২৭ মেট্রিক টন।

এবিষয়ে ডোমখালী জলদাশ পাড়ার জেলে রতন জলদাশ জানান, তার ৬ সদস্যের সংসার। প্রত্যেক বছর ইলিশ মৌসুম এলে দাদনে জাল ক্রয় করেন। পরে ইলিশ মাছ আহরণ করে সেই দাদনের টাকা পরিশোধ করতে হয়। বিগত কয়েক বছর ইলিশ মাছ আহরণ কমে যাওয়ায় দাদনের টাকা পরিশোধ করতে স্থানীয় এনজিও থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। এছাড়া বছরে দুই বার মাছ আহরণ বন্ধ থাকায় তারা পরিবার পরিজন নিয়ে কষ্টে দিন কাটান।

উপজেলার সাহেরখালী ইউনিয়নের আনন্দবাজার এলাকার জেলে জদু জলদাশ বলেন, ইলিশ এখন সোনার হরিণ। সাগর ও নদী দূষণ বেড়ে গেছে। তাই ইলিশ মাছ দিন দিন কমে যাচেছ। এছাড়া মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে জমি ভরাট কাজে বড় বড় ড্রেজার ব্যবহৃত হওয়ায় কারণেও ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না।

একই এলাকার অজয় জলদাশ বলেন, সাগরে আগের মত মাছ না পাওয়ায় এখন আর সাগরে মাছ ধরতে যাই না। এখন কৃষি কাজের সাথে জড়িত রয়েছি। অনেকটা বাধ্য হয়ে বাপ-দাদার পেশা ছাড়তে হয়েছে।

জানা গেছে, চারটি কারণে ইলিশ কম পাওয়া যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞেরা। এর মধ্যে উজান থেকে নেমে আসা মিঠাপানির প্রবাহ ও গতিপ্রকৃতির পরিবর্তন, পরিবেশদূষণ ও জলবায়ুর প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধি, সাগরে ইলিশের প্রাকৃতিক আবাসস্থলে ব্যাঘাত এবং পূর্ববর্তী বছরের অতিরিক্ত আহরণকে ইলিশ কম পাওয়ার কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। এছাড়া মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের বর্জ্যসহ নানা কারণে ইলিশের পরিমাণ কমছে।

জানতে চাইলে সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম বলেন, এ বছর জেলেদের জালে আশানুরূপ ইলিশ ধরা পড়েনি। ইলিশের আহরণ কমে যাওয়ার বিষয়ে মৎস্য বিভাগ চিন্তিত। তিনি আরো বলেন, আগে যেভাবে উপকূলে ইলিশ পাওয়া যেত এখন সেভাবে পাওয়া যায় না। এটার প্রধান কারণ হচ্ছে ইলিশ উৎপাদন ও প্রজনন ক্ষেত্রগুলো বিঘ্নিত হচ্ছে। এছাড়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের কারণে ঘাটগুলো বদলে ফেলায় ইলিশ আহরণ কমেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিজ্ঞাপন