আরিফ আজম : অতিবৃষ্টি ও ভারতীয় পাহাড়ী ঢলের পানির চাপে মুহুরী-কহুয়া-সিলোনীয়া নদীর ভাঙা গড়ার খেলায় ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন ফেনীর পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়া উপজেলার বাসিন্দারা। দেড় যুগের বেশি সময় ধরে পতিত সরকারের মন্ত্রী-এমপিরা সীমান্তবর্তী এলাকার ১২২ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের আশ্বাস দেয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে বারবার ভাঙা-গড়ার খেলায় ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৪ সালে ভয়াবহ বন্যার পর মুহুরী-কহুয়া-সিলোনীয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ নির্মাণের আলোচনা জোরালো হয়। স্মরণকালের ওই বন্যায় ক্ষতির পরিমাণ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে ‘মুহরী-কহয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিষ্কাশন এবং সেচ ব্যবস্থা প্রকল্পের পুনর্বাসনের নিমিত্তে সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়। এর রেশ কাটতে না কাটতেই চলতি বছর বাঁধের ৪১ স্থানে পুনরায় ভেঙে যাওয়ায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন সংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে ঢাকা-ফেনী, ফুলগাজী ও পরশুরামে মানববন্ধন, পানি উন্নয়ন বোর্ড কার্যালয় ঘেরাও, জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি সহ নানা প্রতিবাদি কর্মসূচীতে সরব হয় ভুক্তভোগী সহ জেলার সচেতন মহল।
পরশুরামের স্থানীয় সংবাদিক ও সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক সাধারণ সম্পাদক এম এ হাসানের মতে, মূহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বেড়িবাঁধ ভাঙ্গনের কারণগুলোর মধ্যে- প্রথমত, যুগ যুগ ধরে বাঁধ ভাঙ্গার পর বালু ও মাটি দিয়ে বেড়িবাঁধ মেরামত হয়। বালু ও মাটির বাঁধ বন্যার প্রতিরোধক হিসেবে টিকে থাকে না। ফলে প্রতিবছর বাঁধ ভাঙ্গে। পানিউন্নয়ন বোর্ড ও ঠিকাদার লাভবান হয়।
তিনি আরে বলেন, নদীর দুই পাশ দখল করে ঘরবাড়ি স্থাপনা নির্মাণ করায় নদীর প্রশস্ততা কমে গেছে। ফলে বন্যার সময় স্বাভাবিক পানি নদী দিয়ে চলাচল করতে পারে না। ফলে বেড়িবাঁধ উপচে পানি পানি প্রবাহিত হলে বাঁধ দুর্বল হয়ে ভেঙে যায়। অবৈধভাবে যত্রতত্র বালু উত্তোলনের কারণে কোথাও নদীর গভীরতা কোথাও নাব্যতা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে নদীর স্বাভাবিক স্রোত বাধাগ্রস্ত হয়ে বন্যা বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়। মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বেড়িবাঁধ স্থায়ীভাবে নির্মাণের জন্য আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে আরসিসি ঢালাই দিয়ে গাইডওয়াল ও সিসি ব্লক বসানো হলে বেড়িবাঁধ টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ছাগলনাইয়ার সিনিয়র সাংবাদিক মোহাম্মদ শেখ কামাল বলেন, ঠিকাদার, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও এক শ্রেনীর প্রভাবশালী চক্র এই বাঁধকে টাকা কামাইয়ের উৎস হিসেবে জিইয়ে রেখেছে। ফলে স্থায়ী সমাধান না করে এই বাঁধের ভাঙা-গড়ার খেলায় নিজেদের ভাগ্য গড়েছে। এর বলি হয়েছে সীমান্তবর্তী এ তিন উপজেলার বাসিন্দারা।
তথ্যমতে, ২০১৮ সালের বাঁধের ৭ স্থানে ভাঙন দেখা দেয়। ওই বছর বাঁধ সংস্কারে প্রায় ২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছিল। পরের বছর ২০১৯ সালের বন্যায় ২২ জায়গায় বাঁধ ভেঙে যায়। সেই সময় বাঁধ সংস্কারে প্রায় ১ কোটি ৭৯ কোটি টাকা ব্যয় হয়। ২০২০ সালের জুলাই মাসে বাঁধের ১৫টি স্থানে ভেঙে যায়। এতে দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে বাঁধের ৭শ মিটার মেরামত করা হয়। ২০২১ সালের বাঁধের ৯টি স্থানে ভাঙন মেরামতের জন্য ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়। ২০২২ সালের ছয় স্থানে ভাঙা বাঁধ মেরামতের জন্য ১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়। ২০২৩ সালে ভাঙন রোধে ১০ কোটি ২৭ লাখ টাকা খরচ করা হয়। ২০২৪ সালে বাঁধে মেরামতে প্রায় ২১ কোটি টাকা খরচ করা হয়। চলতি বছর ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ঘরবাড়ি, প্রানি সম্পদ, কৃষি, মৎস, সড়ক ও সেতু, জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য, বাঁধ, বনবিভাগ, বিদুৎ বিভাগের মোট ২৩৮ কোটি ৪০ লাখ ৪৬ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জেলা প্রশাসন জানিয়েছেন।
পাউবোর পক্ষ থেকে জানানো হয়, সমীক্ষা অঞ্চলের সমস্যা লাঘবে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রস্তাবনা করা হয়েছে। উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রস্তাবনায় বিভিন্ন অবকাঠামো বাস্তবায়নে নদী তীর প্রতিরক্ষার কাজ, নদী পুন:খনন, বিদ্যমান বাঁধ পূন:নির্মাণ, নতুন বাঁধ নির্মাণ, বাঁধের ঢাল ও পাদদেশে প্রতিরক্ষা কাজ, বন্যা বাইপাস ও ফিউজ, রেগুলেটর ও ড্যাম নির্মাণ, জলাধার পূন:খনন, বিদ্যমান অবকাঠামো পূনর্বাসন, বিদ্যুৎ খুঁটি অপসারন, ব্রিজ অপসারন ও নতুন নির্মাণ সহ নানা বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ৫ বছরের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন ও ৪ হাজার ৬৩৫ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল। মেগাপ্রকল্পটির ব্যায় ইতিমধ্যে ৭ হাজার ৪শত কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এটি বাস্তবায়ন হলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভাঙ্গার কারণে সৃষ্ট বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি (সম্পদ হানি, কৃষি জমিতে বালি ভরাট, ফসলের ক্ষতি) দূর হবে।
এছাড়া প্রায় ৪ হাজার হেক্টর অতিরিক্ত জমি বন্যা মুক্ত হবে। অতিরিক্ত ৬৬ লাখ ঘন মিটার পানি সংরক্ষণ হবে। যার ফলে ৮শ হেক্টর অধিক জমি সেচ সুবিধার আওতায় আসবে। ২০২৪ সালের মত অতিবন্যার বছর বন্যার গভীরতা ২ ফুট হ্রাস পাবে এবং বন্যার সময়কাল দুইদিন কমে আসবে। মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। অতি বন্যায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার ঝুঁকি হ্রাস পাবে। নদী ভাঙ্গনের কবল থেকে ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনাসমূহ জমি রক্ষা পাবে। জনমানুষের জীবনযাত্রার মান ও আর্থ সামাজিক অবস্থার উন্নতিও হবে বলে পাউবো কর্তৃপক্ষের আশাবাদ।
এ ব্যাপারে জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলাল ফেনীর সময় কে বলেন, ‘চব্বিশের বন্যায় ১০২ স্থানে বাঁধ ভেঙেছে। বাঁধের ১৫ ফুট উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়েছে। চব্বিশের বন্যার শিক্ষা অনুযায়ী মহাপরিকল্পনার দিকে এগুতে হবে। দ্রুতসময়ের মধ্যে এই কাজ শুরু করতে বাঁধের পাড়ের বাসিন্দা সহ ফেনীবাসীকে দূর্ভোগ থেকে মুক্তি দেয়ার দাবী জানান তিনি।
|
জামায়াতের জেলা আমির মুফতি আবদুল হান্নান ফেনীর সময় কে বলেন, ‘প্রতিবছর বাঁধ ভাঙা পরশুরাম, ফুলগাজী ও ছাগলনাইয়ার মানুষের জন্য অভিশাপ হয়ে উঠেছে। এটি থেকে মুক্তি দিতে বাঁধের উপর অবৈধ দখলদারিত্ব উচ্ছেদ, গাছপালা কেটে ও নদী শাসন করে পানি প্রবাহ নির্বিঘ্ন করতে হবে। এছাড়া ভারতীয় পাহাড়ী ঢলের পানি ঠেকাতে টেকসই বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ কাজ দ্রুতসময়ে শুরু করতে হবে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কুমিল্লা পূর্বাঞ্চল জোনের তত্ত্ববধায়ক আবদুল লতিফ ফেনীর সময় কে বলেন, “স্বাধীণতার ৫৩ বছরে বাঁধে তেমন কোন কাজ হয়নি। কোন প্রজেক্ট না নেয়ায় কাবিখা থেকে মেরামত করা হতো। ২০১০ সালের দিকে প্রজেক্টের মাধ্যমে বাঁধের কিছু কাজ করা হয়। চব্বিশের ভয়াবহ বন্যার মতো চলতিবছরও বন্যার ব্যাপকতার ফলে জনগনের চাহিদা অনুযায়ী টেকসই বাঁধ নির্মাণে কনসালটেন্ট নিয়োগ করা হয়। ফিজিবিলিটি স্ট্যাডির রিপোর্ট পেলে ডিপিপি প্রণয়ন করেছি। ইতিমধ্যে এটি খসড়া করা হয়েছে। পুরো জেলা বন্যামুক্ত করতে সাড়ে ৭ হাজার ৩শ ৪৫ কোটি টাকার প্রাথমিক ব্যয় নির্ধারণ করা হয়। অংশীজনদের মতামত নিয়ে টেকসই বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হবে।”
বাঁধের স্থায়ী সমাধানে অংশীজনদের
সাথে মতবিনিময় আজ
শহর প্রতিনিধি :
ফেনী জেলায় বন্যার স্থায়ী সমাধানে টেকসই বাঁধ নির্মাণে অংশীজনদের সাথে মতবিনিময় সভা আজ অনুষ্ঠিত হবে। শহরের গ্র্যান্ড সুলতান কনভেনশন হলে অনুষ্ঠিত এ সভায় জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম সভাপতিত্ব করবেন।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, সভায় পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড সহ প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বক্তব্য রাখবেন। উম্মুক্ত আলোচনায় প্রশাসনের কর্মকর্তা ছাড়াও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন শ্রেনি-পেশার প্রতিনিধি, বাঁধ এলাকার ভুক্তভোগী বাসিন্দাগণ অংশ নেবেন। প্রস্তাবিত এ প্রকল্পের সফলতা স্থানীয় অংশীজনের মূল্যবান মতামতের উপর বহুলাংশে নির্ভর করবে।
জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম ফেনীর সময় কে বলেন, প্রস্তাবিত মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পূনর্বাসন (১ম পর্যায়) প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ফেনী জেলায় দীর্ঘমেয়াদী বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও জলাবদ্ধতা নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ লক্ষ্যে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে প্রকল্পের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, পানি উন্নয়ন বোর্ড এর পরিকল্পনা দপ্তর ও মাঠ দপ্তরের কর্মকর্তা এবং ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং এর প্রতিনিধিগণের সাথে স্থানীয় অংশীজনদের মতবিনিময় সভা হবে।