মাদক সেবনে রয়েছে আত্মিক, দৈহিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, জাতীয় ইত্যাদি ক্ষতি। * আত্মিক ক্ষতি: মাদকের আত্মিক ক্ষতি অসংখ্য। যেমন- ১. উত্তাপ সৃষ্টি: মাদক সেবন করার ফলে মানবাত্মায় উত্তাপের সৃষ্টি হয়। এর ফলে বিবেকবুদ্ধি হারিয়ে যায়, ভাল-মন্দ পার্থক্য করতে পারে না। মাদক সেবনের মাধ্যমে মাদকসেবী স্বীয় আত্মার ধ্বংস সাধন করে। মাদক সেবন ব্যক্তির আত্মায় গভীর ভাবে প্রভাব বিস্তার করে এবং এর বিষক্রিয়া ও অনিষ্টতা সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে।
২. বিবেক শূন্য: মাদক সেবন ব্যক্তিকে বিবেকশূন্য ও মাতালে পরিণত করে। ফলে সে এমন কাজ করে যা একজন সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পন্ন লোক করতে পারে না। মাদক সেবনের ফলে সে অশ্লীল বাক্য ব্যবহার করে এবং গর্হিত কাজ করে। ব্যভিচার, ধর্ষণ, নিষিদ্ধ আত্মীয়ের সাথে জোরপূর্বক যৌনতা এই সবকিছু মদ্যপায়ীদের মধ্যে অধিক পাওয়া যায়। আমেরিকার ন্যাশনাল ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস এর ন্যাশনাল ভিকটিমাইযেশান সার্ভে ব্যুরো অব জাষ্টিস-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৯৯৬ সালে প্রতিদিন গড়ে ২৭১৩ ধর্ষণের ঘটনা সংগঠিত হয়েছিল, রিপোর্টে আরো বলা হয়েছে ধর্ষকদের অধিকাংশই ঘটনার সময় মাতাল ছিল। একই পরিসংখ্যানে দেখা যায় ৮% আমেরিকান মা-বোন, অথবা কন্যার সাথে যৌন কর্মে লিপ্ত। প্রতি বারো বা তেরে জনের একজন আমেরিকান এই কর্মে অভ্যস্ত এবং দু’জনের একজন অথবা উভয়ে এসময় মাতাল থাকে। এইড্স বিস্তারের ক্ষেত্রে মাদকের ভুমিকা অন্যতম।
৩. দুর্বল হয়ে পড়ে : মদখোর মাদকের প্রভাবে নিজেকে বড় শক্তিশালী মনে করে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সে দুর্বল, অক্ষম ও নিস্তেজ হয়ে পড়ে।
৪. আভ্যন্তরীণ বিষয় প্রকাশ: মাদকসেবী বিবেক-বুদ্ধি হারিয়ে অনেক সময় আভ্যন্তরীণ বিষয় প্রকাশ করে ফেলে। যা তার নিজের ও পরিবারের ক্ষতি কারণ হয়।
- দৈহিক ক্ষতি: মাদক দৈহিকভাবে অনেক ক্ষতি সাধন করে। তন্মধ্যে প্রসিদ্ধ ক্ষতি সমূহ হলো- (১) অসুস্থ করা: মাদক সেবন সুস্থ ব্যক্তিকে চরমভাবে অসুস্থ করে ফেলে, যুবককে বৃদ্ধ করে দেয়। ফলে অল্প বয়সে মৃত্যু মুখে পতিত হয়। মস্তিষ্কের লাখ লাখ সেল ধ্বংস করে ফেলে এবং লিভার, সিরোসিস রোগের সৃষ্টি হয়। (২) জটিল রোগের সৃষ্টি: মাদক সেবন মানব দেহে নানা জটিল রোগের সৃষ্টি করে। যেমন- (ক) কলিজা শুকিয়ে শক্ত হয়ে যাওয়া। (খ) অম্লনালীর ক্যান্সার এবং মাথা, গলা, কলিজা ও মল নালীর ক্যান্সার। (গ) অগ্ন্যাশয় ও যকৃতের প্রদাহ। (ঘ) হৃদয় স্পন্দন সংক্রান্ত সকল রোগ, হাইপার- টেনশান। (ঙ) হৃৎপিন্ডে রক্ত সঞ্চালেন নালী সমূহের যাবতীয় রোগ, গলনালী প্রদাহ এবং হৃদযন্ত্র ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া। (চ) পক্ষাঘাত, সন্যাস রোগ এরূপ অন্যান্য প্যারালাইসিস। (ছ) স্নায়ু ও মস্তিষ্কের যাবতীয় রোগ। (জ) কিডনি বিকল করা। (৩) হজম শক্তি হ্রাস: মাদক সেবনের কারণে হজম শক্তি হ্রাস পায়। আর এর ফলে আমাশয়, কোষ্ঠ কাঠিন্য, পেটের পীড়া ইত্যাদি রোগের উৎপত্তি হয়। (৪) খাদ্য স্বাদ হ্রাস: মাদক সেবন খাদ্যের স্বাদকে বিনষ্ট করে দেয়। ফলে খাদ্যের কোন স্বাদই সে পায় না। সর্ব প্রকার খাদ্য মাদকসেবীর কাছে সমান মনে হয়। (৫) চেহারা পরিবর্তন: মাদকসেবীর চেহারার লাবণ্যতা ম্লান হয়ে যায়। উজ্জল চেহারা কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে।
- অর্থনৈতিক ক্ষতি: মাদক অর্থনৈতিক ভাবে বিরাট ক্ষতি সাধন করে। যেমন: (১) সম্পদহীন করে: মাদক সেবনে ব্যক্তি অর্থ ব্যয় করতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়। এক সময় সব কিছু বিক্রয় করে দিয়ে পথে বসতে বাধ্য হয়। (২) পরিবারকে নিঃস্ব করে: যে পরিবারে মদখোর থাকে সে পরিবার ধীরে ধীরে দারিদ্রতার দিকে ধাবিত হয। এক সময় পরিবারটি নিঃস্ব হয়ে যায়। (৩) ঋণগ্রস্থ করে: মাদকসেবী মাদক মাদকদ্রব্য ক্রয়ের অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়ে ঋণ করতে বাধ্য হয়। ঋণের বোঝা এক সময় তাকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে তুলে। (৪) অবৈধ পন্থায় অর্থ উপার্জনে বাধ্য করে: মদ ও নেশা দ্রব্য সেবন করতে গিয়ে মাদকসেবী চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ইত্যাদি অবৈধ কাজ করতে বাধ্য হয়। ফলে পরিবেশকে সম্পূর্নরূপে বিনষ্ট করে।
- ধর্মীয় ক্ষতি: মাদক সেবন ধর্মীয় ক্ষেত্রে বর্ণনাতীত ক্ষতি সাধন করে। যেমন- (১) যিকির থেকে গাফেল করে: মাদকসেবী যখন মাদকসেবনে ব্যস্ত থাকে। তখন সে আল্লাহর যিকির থেকে গাফেল থাকে এবং তার হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। (২) ইবাদত থেকে গাফেল করে: যখন কেউ মাদক সেবনে অভ্যস্থ হয়ে পড়ে তখন সে সর্ব প্রকার ইবাদত থেকে গাফেল হয়ে যায়। এমনকি ইবাদতের ধারে কাছেও যেতে চায় না। মাদক সেবনের ফলে তার হৃদয় কঠিন হয়ে য়ায়। ৩. ঈমানহারা করে: মাদক একসময় মাদকসেবীকে ঈমান হারা করে দেয়। মহানবী (স) বলেছেন- যিনাকারী যখন যিনা করে তখন সে মু’মিন থাকে না এবং মদখোর যখন মদ পান করে তখন সে মু’মিন থাকে না (বুখারী- ২৪৭৫, মুসলিম-৫৭, তিরমিযী-২৬২৫, নাসায়ী-৪৮৭০, তাফসীরে কুরতুবী, ৫ম খন্ড, পৃ: ২২৮৫)। মহানবী (স) বলেছেন- মাদক সকল অনিষ্টতার প্রসূতি (তিবরানী)। রাসূল (স) আরো বলেছেন- মদ্যপানকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না (ইবন মাযাহ- ৩৩৭৬)।
- জাতীয় ক্ষতি: মাদকসেবন জাতীয় নানাবিধ ক্ষতি সাদন করে। (১) শান্তি শৃঙ্খলা বিনষ্ট করে: মাদক সেবন যে জাতির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে সে জাতির চরমক্ষতি সাধন করে। শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্ট করে। মাদক সেবন পারস্পরিক শত্রুতা ও ক্রোধের জন্ম দেয়। ফলে সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্ট হয় এবং পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ লেগে থাকে। (২) উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথে অন্তরায়: মদ ইত্যাদি নেশাদ্রব্য সেবন জাতীয় উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে। সাইয়িদ সাবিক বলেন, মাদকাশক্তি সুঠামদেহী, স্বাস্থ্যবান, শক্তিশালী ও জ্ঞানী হতে বাধা সৃষ্টি করে। (৩) দায়িত্ব পালনে ব্যাঘাত: মাদকসেবী কোন দায়িত্বশীল ব্যক্তি হলে মাদক সেবন তাকে দায়িত্ব পালনে বাধা গ্রস্থ করে। কারণ দেহের উপর তার নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তার কর্মক্ষমতা দূর্বল হয়ে পড়ে। (৪) শত্রুকে সুযোগ করে দেয়: মাদক সেবন করার দ্বারা রাষ্ট্রের শত্রুদের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ করে দেয়। মাদকসেবী মাদকসেবনের ফলে ভাল-মন্দ, পবিত্র-অপবিত্র, লাভ-ক্ষতি ইত্যাদির মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
লেখক : প্রধান ফকীহ, আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদ্রাসা।