দু’আ শব্দের অর্থ চাওয়া, প্রার্থনা করা, মহান আল্লাহ তায়ালাকে একান্তে ডাকা, তাঁর সামনে নিজেকে পেশ করা, দুআ বলতে প্রচলিত অর্থে আমরা মুনাজাত কে বুঝি। প্রভুর সঙ্গে বান্দার একান্ত আলাপ হল মুনাজাত। সেই চায় যে অভাব বোধ করে এবং তার কাছেই চায় যে তার এ অভাবটুকু পূরন করতে পারে। মহান আল্লাহ তায়ালা অভাবমুক্ত আর আমরা অভাবী তাই আমরা কাতর ভাবে তাঁরই কাছে দুআ করবো। সূরা মুমিন ৬০নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন তোমার রব বলেছেন, তোমরা আমাকে ডাকো আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। হাদীস শরীফে নবীজি (সা.) বলেছেন দুআই ইবাদত।
মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে তাঁর কাছে দুআ করার হুকুম দিয়েছেন। যেহেতু আল্লাহর হুকুম পালন করার নাম ইবাদত। সেহেতু দুআ ও ইবাদত। দোয়াকে রাসুল (সা.) ইবাদাতের মগজ বলেছেন। সালমান ফারসী (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, আল্লাহ তা’আলা লজ্জাশীল ও দানশীল। যখন কোন বান্দাহ তাঁর সামনে দুই হাত পাতে, তখন তাকে ব্যর্থ করে খালি হাতে ফিরিয়ে দিতে তিনি লজ্জা অনুভব করেন। (আবূ দাউদ, তিরমিযী)
আবু সায়ীদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (স) বলেছেন, যখন কোন মুসলমান দু’আ করে এবং তাতে গুনাহর কথা না থাকে এবং আত্মীয়-স্বজনের অধিকার হরণের কোন কথা না থাকে, তখন আল্লাহ এ রকম দু’আ অবশ্যই কবুল করেন। হয় এই দুনিয়াতে তার দু’আ কবুল করে নেন এবং তার উদ্দেশ্য পূরণ করে দেন; অথবা আখেরাতে তার জন্যে জমা করে রাখেন, অথবা তার উপর আসন্ন কোন বিপদ ঐ দু’আর বদৌলতে সরিয়ে দেন। সাহাবীগণ বললেন, তাহলে তো আমরা খুব বেশি দু’আ করব। তিনি (স) বলেন, আল্লাহও খুব বেশি দানকারী। (মুসনাদে আহমদ) আল্লাহ তায়ালা হচ্ছেন মহান আমরা সকলেই তাঁর দয়ার ভিখারী কিন্তু তাঁর কাছে আমরা কিভাবে চাইবো, কোন বাক্য দিয়ে দুআ করলে আল্লাহ তায়ালা বেশি খুশি হবেন। কিভাবে দুআ করলে দুআ কবুল হবে এ প্রশ্ন গুলো আমাদের মাথায় গুরপাক খায়। আসুন সংক্ষিপ্ত আলোচনার মাধ্যমে তা জেনে নিব ইনশাল্লাহ।
দুআ কেন করব : আল্লাহ তাআলা অসীম ক্ষমতার অধিকারী। আমরা সবাই তাঁর অনুগত গোলাম। আমাদের শক্তি, বুদ্ধি, ক্ষমতা, চিন্তার দক্ষতা খুবই সীমিত। তাই পদে পদে আমরা অসীম শক্তির অধিকারী আল্লাহ তাআলার কুদরতের মুখাপেক্ষী। তাঁর সাহায্য ও দয়া ছাড়া ইহকাল ও পরকালে সফল হওয়া সম্ভব না। আল্লাহ তাআলা বলেন, আর আমার বান্দারা যখন আমার সম্পর্কে আপনাকে জিজ্ঞেস করে তখন (আপনি বলে দিন) আমি তো নিকটেই। দুআকারীর দুআ আমি কবুল করি, যখন আমার কাছে দুআ করে। অতএব তারাও যেন আমার হুকুম মানে এবং আমার প্রতি ঈমান রাখে, যাতে তারা সৎপথে আসতে পারে। [৪] আমরা ডাকলেই তিনি সাড়া দেবেন। আমরা চাইলেই তিনি দিয়ে দেবেন। তাই বান্দা হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো তাঁর কাছে কাকুতি-মিনতি করা। তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করা। সর্বাবস্থায় তাঁর দিকে ফিরে যাওয়া।
দুআর গুরুত্ব ও ফজিলত : দুআর গুরুত্ব ও ফজিলত সম্পর্কে অসংখ্য হাদিস বর্ণিত হয়েছে। আমরা এখন কয়েকটি হাদীস দেখার চেষ্টা করব। আয়িশা বলেন, নবি বলেছেন, ‘তাকদিরে যা লেখা আছে তা থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। এসে গেছে এবং আসেনি, এমন বিপদের ক্ষেত্রে দুআ কাজে আসে। আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, নবি বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে যে চায় না তার প্রতি যে অসন্তÍুষ্ট হন।
দুআ করার আদব : ইখলাস তথা একনিষ্ঠতার সাথে দুআ করা মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, কাজেই, আল্লাহকে ডাকো তাঁর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে, যদিও কাফিররা এটা অপছন্দ করে।
আল্লাহ তায়ালার ওপর পরিপূর্ণ আস্থা রেখে দোআ করা : আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, নবি বলেছেন, ‘কবুল হওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে আল্লাহর কাছে তোমরা দুআ করো। জেনে রাখো, আল্লাহ তাআলা অমনোযোগী ও অসাড় মনের দুআ কবুল করেন না।’[২৮]
ইসমে আজম দিয়ে দুআ করা : আনাস ইবনু মালিক বলেন, রাসূলুল্লাহ-এর সাথে আমি বসা ছিলাম। তখন এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ছিল। রুকু-সিজদা এবং তাশাহহুদের পর সে দুআ করে। যাতে সে বলছিল, হে আল্লাহ! আপনার কাছে আমি চাইছি। সমস্ত প্রশংসা আপনারই, আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আপনি মহান দাতা, আসমান এবং জমিনের অস্তিত্ব দানকারী। হে গৌরব ও মহত্ত্বের অধিকারী! হে চিরঞ্জীব! হে চিরস্থায়ী! আপনার কাছে আমার প্রার্থনা।
নবি তখন সাহাবিদের বললেন, ‘বলতে পারো সে কীসের মাধ্যমে দুআ করল?’ সাহাবিরা বললেন, ‘আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভালো জানেন।’ নবি বললেন, ‘যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ! সে তো আল্লাহর ইসমে আজম (মহান নাম) দিয়ে দুআ করেছে-যার মাধ্যমে দুআ করা হলে তিনি কবুল করেন। আর যার ওসিলা দিয়ে কোনো কিছু চাওয়া হলে সেটা তিনি প্রদান করেন।’
নিজের গুনাহের স্বীকারোক্তি : সাইয়িদুল ইস্তিগফার তথা শ্রেষ্ঠ ক্ষমা প্রার্থনার মাঝে এই স্বীকারোক্তি পাওয়া যায়। শাদ্দাদ ইবনু আউস থেকে বর্ণিত আছে, নবি বলেছেন, সাইয়িদুল ইস্তিগফার হচ্ছে এই দুআ, হে আল্লাহ! আপনি আমার প্রতিপালক। আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন। আমি আপনার দাস। আমি যথাসাধ্য আপনার সঙ্গে কৃত প্রতিজ্ঞা আর অঙ্গীকারের ওপর আছি। আমার কৃতকর্মের কুফল থেকে আপনার কাছে আমি পানাহ চাচ্ছি। আমাকে আপনি যে নিয়ামত দিয়েছেন, আমি তা স্বীকার করছি। আর আমার কৃত গুনাহের কথাও আমি স্বীকার করছি। আমাকে আপনি মাফ করে দিন। কারণ, আপনি ছাড়া কেউ গুনাহ ক্ষমা করতে পারে না।
যে ব্যক্তি দিনের বেলায় দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে এ ইস্তিগফার পড়বে, সন্ধ্যা হওয়ার আগেই মারা গেলে সে জান্নাতি হবে। আর যে ব্যক্তি রাতের বেলায় দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে এ দুআ পড়বে, ভোর হওয়ার আগেই মারা গেলে সে জান্নাতি হবে
তথ্যসূত্র: দুআ বিশ্বকোষ, মানবজীবনে কুরআন হাদীস