মার্চ ৬, ২০২৬ ০৮:২৮

মফস্বল শহরে আমার সাংবাদিকতা

আমার গণমাধ্যমে আসার মূল কারিগর আমার বন্ধু সালেহ উদ্দিন সিফাত। গণমাধ্যম নিয়ে আগ্রহ জন্মায় কোন এক সময়ের সচিত্র নোয়াখালীর ফেনী প্রতিনিধি ও আমার ফালাহিয়া ক্যাম্পাসের সিনিয়র বড় ভাই আতাউর রহমান থেকে। ২০২৩ সালের অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে সিফাত হঠাৎ বলে, তোরে লেখালেখি করতে বললাম, ভালোই করতেছিলি। এখন আবার নিস্ক্রিয় হয়ে গেছস। আমাদের সার্কেলের সবাই কমবেশি ভালো কিছু করার ট্রাই করতেছে। এরমধ্যে যদি তুই পিছিয়ে পড়ছ! আমার মনে হয় তুই সাংবাদিকতায় প্রবেশ কর। এখানে তুই ভালো করতে পারবি। সম্ভবত এর একদিন বা দুইদিন পর আমার শ্রদ্ধেয় সম্পাদক শাহাদাত হোসেন মহোদয়ের সাথে যোগাযোগ করি। শহরে গিয়ে দেখা করতে বলে। দেখা করতে গেলাম। দিনটি ছিল শুক্রবার। সন্ধ্যার পর ট্রাংক রোডের বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে স্টার লাইন সুইটসে নিয়ে গেলো। একটা কপি খাওয়ালো। এরপর আগ্রহের কথা বললাম। নিউজ ও মাল্টিমিডিয়া দুইটাই পারবো বলায় সম্পাদক মহোদয় অনেকটা আগ্রহ দেখালো। সে থেকে শুরু হয়ে আজ প্রায় এক বছর দশ মাস। এসময়ে দুইজন ব্যক্তি থেকে আমি নিয়মিত শিখেছি। শুধু শিখেছি বললে ভুল হবে হয়তো। সবচেয়ে বেশি শিখেছি। যারা আমাকে নিয়মিত শিখিয়েছেন এবং এখনো শিখাচ্ছেন। এরমধ্যে একজন হলেন আমার সাংবাদিকতা শিখার মূল কারিগর, যাকে আমি আমার সাংবাদিকতার গুরু বা শিক্ষক হিসেবে মানি, যিনি আমাকে সবসময় সাহস যোগাতেন আমার শ্রদ্ধেয় সম্পাদক মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন। আরেকজন ফেনীর সময়ের চীফ রিপোর্টার আরিফ আজম ভাই। এছাড়া সবসময় সহযোগিতা করতেন ফেনীর সময়ের কো-অর্ডিনেটর হোসাইন সুজন ভাই। বিশেষ কৃতজ্ঞতা নির্বাহী সম্পাদক আলি হায়দার মানিক ভাইয়া।

মফস্বলে একজন গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে কাজ করাটা খুবই কঠিন। বিশেষ করে ফেনীর মত এই জনপদে। এই জনপদ ১৫ বছর কেমন ছিল তার একটি নমুনা আমরা ৪ আগস্ট দেখতে পেয়েছি। ১৫ বছরে সঠিক তথ্য প্রকাশ করতে গিয়ে কত সাংবাদিক হামলা শিকার ও মামলার আসামি হয়েছে তা বলে হয়তো শেষ করা যাবে না। স্ময়ং ফেনীর সময় সম্পাদক মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন নিজেই ২৪টি মামলার আসামি হয়েছিল। সেই জনপদ ফেনীতে গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে কাজ করা কত কঠিন তা সহজেই অনুমেয়।

এক বছর দশ মাসের এ সময়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মত একটি অভ্যুথান পেয়েছি। যা আমার জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এছাড়া ২৪ এর ডামি নির্বাচন ও উপজেলা নির্বাচনের মত নির্বাচনও পেয়েছিলাম। আমি ফেনীর সময়ে যুক্ত হওয়ার এক মাসের মাথায় সম্পাদক মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন ও প্রধান প্রতিবেদক আরিফ আজমের বিরুদ্ধে আওয়ামীলীগের ডামি প্রার্থীকে ডামি প্রার্থী বলায় মানহানির মামলা দায়ের করে। এবং পত্রিকার নিবন্ধন বাতিলের দাবীতে আওয়ামী পন্থী আইনজীবীরা কোর্ট প্রঙ্গনে মানববন্ধনও করে। পরে নিজাম হাজারী সমঝোতায় আসতে বাধ্য হয় এবং ওই প্রার্থী মামলা তুলে নেয়। সেখান থেকে মূলত অনিয়ম নিয়ে নিউজ করার অনেকটা সাহস পাই।
নির্বাচনের সময় নতুন হওয়ায় নিউজের ধরন তেমন একটা বুঝতে পারতাম না বলে অনিয়ম নিয়ে নিউজ তেমন একটা করার সুযোগ হয়নি। নির্বাচনের দিন কিছু যায়গায় চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু যেহেতু ডামি নির্বাচন, তাই এত আগ্রহও ছিল না। এরপরও মাঠ খালি,জনশূন্য ভোটকেন্দ্রে দুই-তিনটায় লাইভ দিয়েছিলাম। বেশিরভাগ কেন্দ্রের দৃশ্য ছিল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ইচ্ছেমত অনবরত সিল মেরে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে এমন ছিল, মাঠ ফাঁকা। আশপাশে মহিলাদের জমায়েত করে রাখা হতো, যাতে মিডিয়াকে দেখানো যায়।

উপজেলা নির্বাচনে গিয়ে ঝামেলায় পড়তে লাগছিলাম। বাঁলিগাও এর দুইটা ভোট কেন্দ্র পর্যবেক্ষণে গিয়ে কেন্দ্র মানুষ শূন্য পাই। আমি গাড়ি থেকে নামার সাথে সাথে ভিডিও ও ছবি নিচ্ছিলাম। এরমধ্যে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনন উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মানিক ভিডিও করতে ও ছবি তুলতে বাঁধা দেয়। বাঁধা পেরিয়ে ভিডিও নিয়ে কোনভাবে ওখান থেকে চলি আসি পাশের আরেক কেন্দ্রে। ঝামেলা বাঁধে ওখানে। ১৮ বছরের নিচে থাকা ৬-৭ জন কিশোর ভোট দিতে প্রবেশ করছিল। এরমধ্যে আমি প্রবেশ করে ভিডিও শুরু করি। মুহূর্তেই আশপাশ থেকে নেতাকর্মীরা চলে আসে। দ্রুত আমার নির্বাহী সম্পাদক আলি হায়দার মানিক ভাইয়া এসে বাঁচিয়ে দেয়। এরপরও তোলা ভিডিওগুলো ডিলিট করতে অনেক অনুরোধ করে। মানিক ভাইয়া থাকায় অনেকটা সাহস পেয়েছিলাম। ফলে নিজের যায়গায় স্থির ছিলাম। নির্বাচনগুলাতে কেন্দ্রের প্রকৃত পরিস্থিতি পরেরদিন পত্রিকায় তুলে ধরার চেষ্টা করতাম।

গণমাধ্যমে আমার মূল টার্নিং পয়েন্ট ছিল জুলাই আন্দোলন। জুলাই আন্দোলনের শুরু ৬ জুলাই থেকে শেষ ৫ আগস্ট পর্যন্ত মাঠে থাকার সুযোগ হয়েছিল। ৬, ১৪ ও ১৭ জুলাই এর কর্মসূচি আপডেট শুরু থেকে জানতাম। কখন কি সিদ্ধান্ত হচ্ছে, কোথায় হবে ইত্যাদি সব আপডেট রাখতাম। বিশেষ করে আন্দোলনের প্রতিটা গ্রুপে এড থাকায় কি সিদ্ধান্ত হচ্ছে তা দেখতাম। ফলে আগ থেকে জানতাম। কর্মসূচি শুরু হওয়ার আগে আরিফ আজম ভাইকে বলে রাখতাম। শুরুর আধাঘন্টা পূর্বে, পরে ৪-৫ ঘন্টা পূর্বে তখনকার স্টার লাইনের ফয়সাল ভাই ও ফেনীর তালাশের আকাশ ভাইকে জানায়ে রাখতাম। জুলাই আন্দোলনে আমরা তিনজন কোন না কোনভাবে সবসময় যোগাযোগ রাখতাম। ফলে প্রতিটা কর্মসূচি শুরু হওয়ার পূর্বে আমরা তিনজন সবসময় উপস্থিত থাকতাম।

আন্দোলনের নিউজের ধরন অনেক সময় পরিবর্তন হয়েছে। আমার এখনো মনে আছে, ২৬ জুলাইয়ের গায়েবানা জানাজা আদায় হওয়ার পর সম্পাদক মহোদয়কে জানালাম পরিস্থিতি, নিউজ কিভাবে করা যায় জানতে চাইলাম। জানাজার ইমাম সাইমুনের রাজনৈতিক পরিচয় বলার পর সম্পাদক মহোদয় পরিচয় এড়িয়ে শিক্ষার্থীর পাশাপাশি তার নামের সাথে হাফেজ অথবা মাওলানা যেন লাগানো হয়। এটা ছিল কৌশলগত। এবং কি জানাজায় উপস্থিত শ’খানেক হলেও নয়া দিগন্তে হাজারো দেখানো হয়। এমন অনেক কৌশল সম্পাদক মহোদয় থেকে শিখেছি,এখনো শিখছি।

৫ আগস্ট পরবর্তী সময় চলছে আরেকরকম। অনেকটা স্বাধীন হওয়ায় অনেক আড়ালের তথ্যও সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছি। এমন অনেক নিউজ এসেছে, যা জাতীয় আইটেমে রুপ নিয়েছে। আরিপ আজম ভাই ও আমার এক যৌথ নিউজ জাতীয় আইটেমে রুপ নিয়েছিল। এসব আসলে সম্ভব ফেনীর সময়ের পলিসিগত কারণে। এমন অনেক হাউজ আছে,ইচ্ছে করলেই সব নিউজ দেওয়া যায় না। কিন্তু আমার সম্পাদক মহোদয়ের একটাই কথা,যা পাও নিয়ে আসো। আমরা কোন না কোনভাবে চেষ্টা করবো এটা দিতে। আমি অনিয়ম নিয়ে যত নিউজ নিয়ে আসছি এখন পর্যন্ত একটাও বাদ যায়নি। প্রমাণ ছিল, নিউজ দিয়েছি,পরদিন পত্রিকায় আসছে। মূলত ফেনীর সময়ের পলিসিগত কারণেই আমরা সব তথ্য সামনে নিয়ে আসতে পারি। আর এ জন্যই ফেনীর জনপদে ফেনীর সময় এখনো সেরা। আমি এমনো জানি, যে ফেনীর সময়কে গালি দেয়, সেও প্রথম প্রহরে ফেনীর সময় পড়ে।

এই মফস্বল শহরে গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে কাজ করাটা যেমন কঠিন, তেমনি সহজও। পেশাকে উপভোগ করলে ভালো করার সম্ভাবনা থাকে। অনেকে অনেক উদ্দেশ্য নিয়ে এ পেশায় আসে। কিন্তু একজন পেশাদার গণমাধ্যমকর্মীকে জনগণ তখনে গ্রহণ করবে যখন আপনি তাদের আস্থার যায়গা হয়ে উঠবেন। ফেনী শহরে পেশাদার চেয়ে অপেশাদার গণমাধ্যমকর্মী বেশি। ফলে মানুষ বিভ্রান্ত হয় বেশি। আমরা বিভিন্ন সময় দেখতে পাই। বিশেষ করে অনলাইন ফেসবুক পেজগুলোতে।
আমার সম্পাদক মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন একটি কথা সবসময় বলেন, তুমি আজকে যার মিত্র, কাল তুমি তার শত্রু। এ কথাটা একজন গণমাধ্যমকর্মীর ক্ষেত্রে আসলে প্রযোজ্য। এমন অনেকের কাছের লোক ছিলাম,কিন্তু সত্য প্রকাশের কারণে এখন তাদের শত্রু। এভাবে চলছে আসলে। আমি নিজেকে সংবাদকর্মী পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দবোধ করি। অনেকে সাংবাদিক বলে থাকে। যা আমি সংকোচবোধ করি। কারণ, সাংবাদিক হওয়ার জন্য যে পড়াশোনা প্রয়োজন তা আমার নেই। সাংবাদিক পরিচয়ে নয়, সংবাদকর্মী পরিচয়ে চলতে চাই এ জনপদে। আমৃত্যু যেন সঠিক ও সৎ পথে থাকতে পারি সেটাই রবের কাছে চাওয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিজ্ঞাপন