মার্চ ৬, ২০২৬ ০৮:২৮

হোসনে আরা : প্রথম মুসলিম নারী রাজবন্দী

[এক] বাংলাদেশের সাহিত্য ও রাজনীতিতে উজ্জ্বল নাম হোসনে আরা। আজকের দিনে আমরা অনেকেই তাঁর নামও জানি না, কৃতিত্ব তো দূরের কথা। যে সময়ে তিনি সাহিত্য ও রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ করেন সে সময়ে বাংলাদেশের নারীরা, মুসলমান নারীরা ছিল শিক্ষায় পশ্চাৎপদ। হোসনে আরাও স্বাভাবিক বাস্তব কারণে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ তেমন না পেলেও স্বশিক্ষায় সুশিক্ষিতরূপে নিজেকে গৌরবজনক অব¯’ানে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
বেগম রোকেয়ার শিক্ষা ও জীবনাদর্শনে অনুপ্রাণিত, এমনকি রাজনীতিতে তিনি রোকেয়াকেও ছাড়িয়ে গেছেন। একটি রুচিশীল ও শিক্ষিত পারিবারিক পরিমণ্ডলে তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠার কারণেই হয়তো এটি সম্ভব হয়েছে। হোসনে আরার জন্ম পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগণা জেলার পেয়ারা গ্রামে, ১৯১৬ সালে। বাবা মোহাম্মদ এবায়দুল্লাহ; তিনি পুথিলেখক ও পাঠক হিসেবে নাম করেছিলেন। অন্যদিকে চাচা ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ নামকরা পণ্ডিত, সাহিত্য ব্যক্তিত্ব। সুতরাং পারিবারিকভাবে সাহিত্যের পরিবেশে তিনি বেড়ে উঠতে থাকেন।

[দুই] প্রথমে স্থানীয় মক্তবে তাঁকে ভর্তি করে দেয়া হয়। বাল্য শিক্ষা শেষ করার পর লেখাপড়া অব্যাহত রাখার জন্য সাত/আট বছর বয়সে তাঁকে পুরান ঢাকায় বসবাসরত চাচা ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর বাসায় পাঠানো হয়। এখানে স্কুলে ভর্তি হয়ে চাচার তত্ত্বাবধানে পড়তে থাকেন। কিন্ত দুর্ভাগ্য যে, বাড়ীতে পিতার অসুস্থতার খবর শুনে তিনি বছর খানেকের মধ্যে বা একটু পরে তিনি গ্রামের বাড়ীতে চলে যান। এতে তাঁর লেখাপড়া বিঘ্নিত হয়। কিন্তু তাঁর লেখাপড়ার আগ্রহ থাকায় নিজ চেষ্টায় তিনি লেখাপড়া করতে থাকেন, যা পরবর্তী জীবন সংগ্রামে ও জীবন সাফল্যে তাঁর কাজে লাগে।

[তিন] ১৯৩০ সালের শীতকালে সাহিত্যিক সাংবাদিক মোহাম্মদ মোদাব্বের তাঁর এক চাচাতো বোনের আক্দ উপলক্ষে কলকাতা থেকে ঢাকায় আসেন। সেখানে আরেক চাচাতো বোন হোসেন আরাকে দেখে মনে ধরে। তাঁর ভাষ্য, ‘সেখানে আরেক চাচাতো বোনকে দেখলাম। সে কৃষ্ণকায়া এবং অবিবাহিতা। তবে তার চোখে-মুখে কিছুটা বৈচিত্র্য লক্ষ্য করি। মনে হল, এই মেয়েটা হলে মন্দ হয় না। আত্মীয়-স্বজনরাও বলাবলি করেন এই একই কথা।’ তাঁর চাচা মুজিবুর রহমান এতে রাজী জেনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন এবং তাঁকে বিবাহিত জীবনের দায়-দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্বন্ধে উপদেশ দেন। এরই ফাঁকে হোসনে আরার পিতা মৃত্যুবরণ করলে বিয়ের তোড়জোড় কিছুদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যায়।

পরে সেই বছরই, ১৯৩০ সালের ২৫শে মে তিনি ১৪ বছর বয়সী হোসনে আরাকে বিয়ে করেন। বড় বোনের দু’খানা সোনার গহনা ধার নিয়ে নতুন বউকে পরানো হলো। বিয়ের পর বউয়ের বয়স ও দেহরং নিয়ে পাড়া- প্রতিবেশী নানা নেতিবাচক কথা বলতে থাকলেও তিনি তা পাত্তা দেননি, বাচ্চা গৃহিণী ঘরে এল। পাড়া-পড়শীরা বউ দেখে নাক সিটকায়। ঘর আলো করা বউ না এনে আনলো কিনা ঘর আঁধার করা কালো বউ। আমি অনেককে ঝাঁকালো কণ্ঠে বলি : ‘রাতে ঘুমাবার সময় ত ঘর আঁধার করেই শুতে হয়। পড়শীরা চটে না, হাসতে হাসতে চলে যায়।’

[চার] ১৯৩২ সালে আবার অহিংস-অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে দলে দলে গান্ধী কর্মীরা আইন অমান্য করে জেলে যায়। ২৬শে জানুয়ারী ভারতের স্বাধীনতা দিবস পালন উপলক্ষে গড়ের মাঠে বিশাল জনসমাবেশ। তাতে যোগ দিতে হোসনে আরা গ্রাম থেকে কলকাতায় চলে আসে। মোহাম্মদ মোদাব্বেরের ভাষ্য, ‘এই সময় আমার স্ত্রী হঠাৎ গ্রাম থেকে কলকাতায় এলো। ২৫শে জানুয়ারী সে আমাকে বলল যে ২৬শে জানুয়ারী মনুমেন্টে তলায় বিরাট সভা হবে। অধ্যাপিকা [অধ্যাপক] জ্যোতির্ময় গাঙ্গুলী এই সভায় সভানেত্রীত্ব করবেন কথা ছিল, কিন্তু তিনি গ্রেফতার হয়েছেন। আমি এই সভায় জাতীয় পাতকা তুলবো ও সভানেত্রীত্ব করবো। তুমি বাধা দিতে পারবে না।’

গৃহিণীর কথা শুনে হতভম্ব হয়ে গেলেও তিনি বারণ করেননি। একদল মেয়ে নিয়ে হোসনে আরা আর কয়েকটি মটর বাস নিয়ে ময়দানে চলে যান। সঙ্গে ছিলেন জননেতা সৈয়দ জালালুদ্দীন হাশেমী। সেদিন অপরাহ্ণ তিনটার দিকে তিনি কংগ্রেসের পতাকা উড়িয়ে যখন হাজার হাজার জনতার সামনে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করছিলেন তখন কয়েক শত পুলিশ সভা¯’ল ঘেরাও করে হোসনে আরাসহ অনেককে ধরে ভ্যানে তুলে লাল বাজার পুলিশ সদর দফতরে নিয়ে যায়। সন্ধ্যা ছয়টার দিকে মোদাব্বের এ খবর শুনে মুছড়ে পড়লেও চাচা মুজিবুর রহমান বুঝাতে সক্ষম হন যে, অতটুকু মেয়ে যে বীরত্বের পরিচয় দিয়েছে তাতে মুসলমানদের মাথা উঁচু হয়েছে। ফলে তার সম্বিত ফিরে আসে।

[পাঁচ] পরদিন লর্ড সিংহের আদালতে হোসনে আরাসহ সত্তরজন মেয়ের ছয় মাসের কারাদণ্ডাদেশ হয়। গলার হার ও কানের দুল স্বামীর হাতে তুলে দিয়ে তিনি সসাহসে চললেন কারাগারে। স্বামীকে জেলে দেখা করতে বললেন। ২৭ ও ২৮শে জানুয়ারীর সকল কাগজে ড. শহীদুল্লাহর ভ্রাতুষ্পুত্রী পরিচয়ে হোসনে আরার কারাদণ্ডের খবর ফলাও করে প্রকাশিত হলো।

কলকাতার প্রেসিডেন্সী জেলে সত্তর জন রাজবন্দিনীকে এক বিরাট ওয়ার্ডে রাখা হয়। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েক জন হলেন, অধ্যাপিকা জ্যোতিময় গাঙ্গুলী, দেশবন্ধুর বোন ঊর্মিলা দেবী, কল্যাণী দাস (বিপ্লবী) বীণা দাসের বড় বোন শান্তি ঘোষ ও সুমীতি চৌধুরী (কুমিল্লায় স্টীভেন্স হত্যা মামলার আসামী), নলিনী মৈত্র (কথা সাহিত্যিক প্রবোধ কুমার সার্ন্যালের ভাগ্নী), আরতী মুখোপাধ্যায় (বিদ্যাসাগর পরিবারের মেয়ে) প্রমুখ।

এই প্রেসিডেন্সী জেল-জীবনে হোসনে আরার কাব্যপ্রতিভা স্ফুরণ ঘটে। এখানে শিক্ষিত সহবন্দিনীরা তাঁকে লেখাপড়া ও লেখালেখিতে উৎসাহ দেন। তাঁর অনুরোধে স্বামী মোদাব্বেরও তাঁকে কারাগারে নানা বই-পুস্তক, কাগজ-কলম দিয়ে সহযোগিতা করেন। প্রেসিডেন্সী কারাগারে হোসনে আরার জীবন যাপন, লেখাপড়া ও লেখালেখির একটি সুন্দর চিত্র ফুটে ওঠে মোহাম্মদ মোদাব্বেরের ভাষ্যে, ‘প্রতি পনের দিন অন্তর আমি জেলে দেখা করতে যাই। প্রতিবারই কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করি হোসনে আরার মধ্যে। জেল-জীবনের দুঃখ-বেদনার ছাপ তার চোখে-মুখে নেই, তার জায়গায় দেখতাম একটা শান্ত, সমাহিত ও আনন্দোজ্জ্বল চেহারা। পরে জেনেছিলাম যে, রাজবন্দিনীদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠা মেয়ে বলে সে আর সব মেয়ের আদরের পাত্রী হয়ে পড়ে। তার কল্যাণী দিদি তাকে সঙ্গে নিয়ে ঘুমায় আর লেখাপড়া শেখায়। শান্তি ও সুনীতি তাকে হাতে করে ভাত খাওয়ায়। যেন ও -সবার আদরের দুলালী। কোনোদিন জেলে দেখা করতে গিয়ে দেখি ফুলের মালা পরে, হাতে ফুলের কাঁকন, মাথায় টোপর পরে সে আমার সামনে হাজির। দেখে হাসবো কি কাঁদবো তার দিশা পাই না। জেল অফিসে বসে আলাপের মধ্যে হোসনে আরা বলল, ‘জানো, আমার দিদিরা আমাকে এত হাসি-খুশীর মধ্যে রাখে যে, আমি বাড়ীর কথা ভাবনারও সময় পাইনে! তাছাড়া পড়াশোনার মধ্যে আমি কিছু কবিতা লিখছি। দিদিরা বলেছে, ভালো হচ্ছে। তুমি একটা ফাউন্টেন পেন, খাতা ও রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের কিছু বই আমাকে দিয়ে যেয়ো। অবশ্য পরের বার সাক্ষাতের সময় সবই দিয়ে এসেছিলাম।’

এরপর প্রেসিডেন্সী জেল থেকে হোসনে আরাকে দলবলসহ মেদিনীপুরের হিজলী মহিলা স্পেশাল জেলে বদলী করা হয়। এখানে তাঁর খালু ও খালাতো ভাই বিশেষ অনুমতি নিয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁকে মুছলেকা দিয়ে বের করার চেষ্টা করে, কিন্তু তাতে তিনি রাজি হননি, বরং দৃঢ়ভাবে তা প্রত্যাখ্যান করেন। এ প্রসঙ্গে মোদাব্বের লেখেন, ‘পরের তারিখে জেলে গেলাম দেখা করতে। হোসনে আরা হাসতে হাসতে বলল : জান, খালু এসেছিলেন দেখা করতে। আমি হুকুম দেইনি, তবুও তিনি দেখা করেছেন এবং আমার হাতে একখানা কাগজ দিয়ে বলেছিলেন, এটায় সই করে দাও, তোমাকে জেল থেকে বের করে নিয়ে যাই। আমি খালুকে ইংরেজের দালাল দেশদ্রোহী আরও কত কি বলেছি। তিনি শেষ পর্যন্ত পালিয়ে বাঁচলেন। বলেই তার সে কি হাসি!’

এরপরে হোসনে আরাদেরকে বহরমপুর জেলে বন্দী করা হয়। এখানে তিনি কাঁঠাল গাছে উঠে কাঁঠাল পাড়তে গেলে ওয়ার্ডবয় বাধা দেয়, কিন্তু বাধা উপেক্ষা করে কাঁঠাল পেড়ে তা দিয়ে তাকে আঘাত করার অপরাধে তাঁর আরও এক মাস জেল হয়।

সাজা শেষে ২৭শে আগস্ট হোসনে আরা বহরমপুর জেল থেকে মুক্তি পান। সংগ্রামী মেয়েরা তাঁকে ফুলের মালা, ফুলের চুড়ি, মাথায় টোপর দিয়ে জেলগেট পর্যন্ত এসে বিদায় জানায়। মোদাব্বের তাকে ট্রেনে করে বাড়ীর দিকে নিয়ে আসার সময় ট্রেনে ও শিয়ালদহ স্টেশন তাকে শত শত লোক সংবর্ধনা জানায়। ‘শিয়ালদহ স্টেশনে হৈ হৈ ব্যাপার। হোসনে আরাকে নেবার জন্য কয়েকশত লোকের সমাবেশ হয়েছে, সবাই হিন্দু এবং কংগ্রেস নেতা ও কর্মী। তারা ফুলের মালা ও তোড়া দিয়ে সংবর্ধনা জানালো।’
[ছয়] মোদাব্বের তাঁকে গ্রামের বাড়ীতে নিয়ে গেলেন, কিন্তু তৎকালীন কুসংস্কারাচ্ছন্ন নিকটজন, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী প্রায় সবাই জেলখাটা এ বিপ্লবী মেয়েকে নানা গঞ্জনা দিতে থাকে। মোদাব্বের জানান, ‘গ্রামে আমাদের উপর শুরু হলো কুসংস্কারে অন্ধ লোকদের অত্যাচার। পড়শীরা সকলেই প্রায় আমাদের বয়কট করে বসলো, আমার এক দূর সম্পর্কের বড় ভাই প্রকাশ্যে বলে বেড়াতে লাগলো যে, এই বউকে বাড়ীতে থাকতে দেব না। মুসলমানদের মেয়ে বেপর্দা হয়ে মিটিং করবে, জেল খাটবে, এ অনাচার আমরা সইব না। মা ত মাথায় করাঘাত করে চীৎকার করে কাঁদেন, ছেলেকে ঘরমুখো করব বলে বিয়ে দেওয়ালাম, আর সেই বউ ছেলেকে ঘর থেকে টেনে বের করলো। আরো কত রকমের অত্যাচার সে আমাদের উপর দিয়ে চললো […]’

কিছুদিন পর মোদাব্বের কলকাতায় ফিরে গিয়ে হোসনে আরার অনুরোধ মতো কিছু হোমিওপ্যাথিক ঔষধ, একটা হোমিও মেটেরিয়া মেডিকো ও একটা ঔষধের বক্স পরের সপ্তাহেই পাঠিয়ে দেন। হোসনে আরা জানালেন বাড়ীতে একা একা থাকতে হবে, কাজেই তাঁর হোমিওপ্যাথিকে চিকিৎসাশাস্ত্র কিছু জানা আছে, তাই গ্রামের মানুষের অসুখে-বিসুখে কাজ দেবে।

পরে কোনো এক সময়ে হোসনে আরা কলকাতায় স্বামী মোদাব্বেরের সঙ্গে থাকতে শুরু করেন। এ কলকাতা-জীবনে তাঁর সাহিত্যপ্রতিভা বিকশিত হবার পথ খুঁজে পায়। একদিকে নিজের স্বঅর্জিত জ্ঞান ও অন্যদিকে সাংবাদিক স্বামীর অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতায় তিনি লেখালেখিতে পূর্ণরূপে আত্মনিয়োগ করেন। ইতোপূর্বেই আমরা দেখেছি কারাগারে তাঁর লেখাপড়ার ও কবিতা লেখার আগ্রহ। তাঁর প্রথম প্রকাশিত লেখা ‘মক্তব’ নামক শিশুসাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এ সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, হাজরার মা নামে তাদের একজন কাজের মহিলা ছিল। মধ্যদুপুরে ও সন্ধ্যায় কাজের শেষে অবসরে বাসায় সে ভাই-বোনদের নিয়ে মজলিস করতো। সেখানে হাজরার মা নানা রূপকথার গল্প, নানা ছড়া, ব্যঙ্গমা-ব্যঙ্গমীর গল্প, রাজপুত্র ও রাজকন্যার নানা কাহিনী শোনাতো। তার মুখে শোনা ‘সোনার কাঠি ও রাজপুত্তর’ গল্পটি হোসনে আরা নিজের ভাষায় লিখে ‘মক্তব’ পত্রিকায় প্রেরণ করেন। কিছুদিন পর তাঁর প্রেরিত গল্পটি অবিশ্বাস্যভাবে ছাপা হয়ে পত্রিকাটি তাঁর ঠিকানায় চলে আসে। এরপর এর উল্লেখ ও ছাপার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে তিনি লিখেছেন, গল্পটির নাম ছিল ‘সোনার কাঠি ও রাজপুত্তর’। আর সে পত্রিকায় গল্পটি ছাপা হয়েছিল, তাকে সাহিত্য পত্রিকা বলে হয়ত তোমাদের মনেই হবে না, ‘মক্তব’ কি কখনো এ যুগে কোনো সাহিত্য পত্রিকার নাম হতে পারে? আমার হাতে যখন পত্রিকাটি এল, আমি আনন্দে আটখানা হয়ে হাজরার মাকে দেখালাম : দেখ দেখ হাজরার মা, তোর বলা গল্প কেমন ছাপা হয়ে বেরিয়েছে। আর তার সঙ্গে আমার নামও চাপার অক্ষরে বেরিয়েছে।

শুনে হাজরার মা কোথায় খুশী হবে তা নয়, সে গালে হাত দিয়ে ও-মা! কি ঘেন্নার কতা গো, মেয়ে লোকের নাম আবার ছাপা করে দেছে, আর তাই দুনিয়ার লোক দ্যাখ পে! হাজরার মা-র রক্ষণশীলতা যত বেশী হোক না কেন, তাতে আমার আনন্দ এতটুকুও কমল না। মনে হল যেন আমি একটা রাজ্য জয় করে ফেলেছি। তবে একথা স্বীকার করতেই হবে যে, হাজরার মাকে না পেলে আমার লেখার দিকে হয়তো ঝোঁক যেত না। এই রূপকথাটাই আমার শিশুদের জন্য প্রথম লেখা, তবে মৌলিক লেখা নয় বলে এটাকে আমি লেখা হিসেবে ধরিনে।’

তিনি জানিয়েছেন,‘ছোটদের জন্য আমার প্রথম কবিতা আজাদের মুকুলের মাহফিলের ঈদ সংখ্যায় বের হয়।’ কবিতাটির খানিক অংশ এ রকম,
আয় ভায়েরা আয় বোনেরা
মুকলেরা সব আয়,
তোদের তরে সওয়দা এলো
ভরে খুশীর নায়।

           মুকুলেরা সব আয় ॥
           তোদের তরে খাঞ্জা ভরে
           বেহেশ্তি আন্জাম
           আনলো কে আজ? চিনিস তারে? 

           কি-বা তাহার নাম?
           আনলো বয়ে সওদা নতুন
           ভাঙলো খুনীর বাঁধ, 

           সেই তো ঈদের চাঁদ। 
           মেঘের ফাঁকে লুকিয়ে থাকে 

            ডাক দিল যে ওই, 
            আমার সাধের সোনা মানিক
            মুকুলেরা সব কই?
            আয়রে ছুটে সকল পেলে
            সময় বয়ে যায়Ñ
            ভাই-বোনেরা আয়। 

এরপর তাঁর লেখার প্রেরণা সৃষ্টি হয়। তিনি লিখেছেন, ‘সত্যি বলতে কি, ছোট বেলায় লেখা পড়া না করলেও ছন্দের দিকে বিশেষ আকর্ষণ আমার ছিল। ইংরেজের কারাগারে রাজবন্দিনীর সনদ নিয়ে যখন ঢুকলাম, হাতে তখন অফুরন্ত সময়। কাজেই লেখাপড়া না করে উপায় ছিল না। সাহিত্য, কাব্যপাঠ ও আলোচনায় বেশী সময় আমাদের কাটত। আবার একা একা নিভৃতে কবিতা লেখার ঝোঁকও বেড়ে গেল। জেলে থাকতে বা রাজনৈতিক জীবনে কাজের ফাঁকে ফাঁকে অজস্র কবিতা লিখেছি এবং তার প্রায় সবই হিন্দু ও মুসলমান পরিচালিত সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু তার কোনোটাই ছোটদের জন্য নয়। প্রকৃতপক্ষে ১৯৪৯ সাল থেকে আমি ছোট্টদের জন্য লিখতে শুরু করি। আমার অধিকাংশ লেখাই ‘হাসি’ ছদ্ম নামে বেরিয়েছিল। ছোটদের জন্য পদ্য লিখতে পারব এমন ভরসা আমার ছিল না, কিন্তু ভরসা হয়ে দাঁড়াল আমার বাচাল মেয়েরা। তাদের শৈশবের চটুলতা, আদর, হাসি-কান্না অহরহ আমার মনে এক অপূর্ব ছন্দরাজ্যের সৃষ্টি করেছিল।’

১৯৪৯ সালে স্বামীর সহযোগিতায় তাঁর প্রথম ছড়ার বই ‘ফুলঝুরি’ কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়। প্রকাশ করে ব্যানসন কোম্পানী প্রকাশনা সং¯’া। বইটি শিশু-কিশোরদের কাছে বেশ প্রিয়তা লাভ করে। তাঁর নামটিও ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। ফলে তাঁর উৎসাহ আরও বেড়ে যায়। এরপরে ঐ সালের অগাস্ট মাসে স্বামীর সঙ্গে পূর্ববঙ্গে চলে আসেন। নতুন পাকিস্তান রাষ্ট্রে নতুন উদ্যামে লিখতে থাকেন। ছড়া-কবিতা একে একে বের হয় ঢাকা থেকে। ‘খেয়াল খুশী’, ‘হল্লা’, ‘টুংটাং’, ‘হট্টগোল’ ছড়াগ্রন্থ’। এছাড়া ‘মিছিল’ নামে একটি কবিতার বই বের হয় তাঁর। তবে সেটি গুরুত্ব পায়নি, যেমন গুরু“ত্ব পেয়েছে তাঁর ছড়াগ্রন্থগুলো। ছড়ায় প্রভাব ছিল রবীন্দ্র-নজর“ল-সুকুমার রায়ের। ্যঙ্গাত্মক দৃষ্টিতে সমাজের অসঙ্গতি তুলে ধরতে চেষ্টা করার পাশাপাশি শিশু মনস্তত্ত্বের উপযোগী চিন্তা ও শব্দ ব্যবহারে তাঁর মনোযোগ ছিল। সৃষ্টিশৈলী ও ছড়ার ছন্দের নিপুণ প্রয়োগে তিনি প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। এতদ্ব্যতীত তিনি গদ্যও লিখতে পারতেন ভালো, যার প্রমাণ তাঁর গদ্যগ্রš’ ‘আমার কারাবরণ’ নামে স্মৃতিকথা। বইটিতে সে সময়ের রাজনীতি ও রাজনৈতিক আন্দোলনে মেয়েদের অব¯’ান, কারাগার জীবনের বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে।

হোসনে আরা বাংলা সাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত ছড়াকারদের অন্যতম। শিশুসাহিত্যে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি ১৯৬১ সালে বাংলা একাডেমী সাহিত্যে পুরস্কার ও অনেক পরে ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ শিশু একাডেমী পুরস্কার লাভ করেন। প্রাইমারী স্কুলের বাংলা পাঠ্য বইয়ে বিভিন্ন সময়ে তাঁর বিভিন্ন ছড়া সংকলিত হয়। তন্মধ্যে ‘সফদার ডাক্তার’ শীর্ষক ছড়াটি উল্লেখযোগ্য। ছড়াটি শুরু হয়েছে এভাবে,

         সফদার ডাক্তার
মাথা ভরা টাক তার
         ক্ষিদে ফেলে পানি খায় চিবিয়ে।

        চেয়ারেতে রাত দিন

বসে গনে দুই তিন
পড়ে বই আলোটারে নিবিয়ে!

এছড়া আরো দু’চারটি ছড়া পাঠ্য বইয়ের কল্যাণে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের প্রতিটি শিক্ষিত লোকের মুখে মুখে। সম্ভবতঃ পাকিস্তান আমলেও তাঁর ছড়া প্রাইমারী স্কুলে পাঠ্য ছিল।

[আট] হোসনে আরা ব্যক্তিত্বসম্পন্ন সাহিত্যিক, একই সঙ্গে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, পাকিস্তান আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনে নারীদের মধ্যে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেছেন। আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি স্বামী মোহাম্মদ মোদাব্বের ছায়াসঙ্গীই ছিলেন না, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার চেয়েও অগ্রসর ছিলেন। তাঁর জীবনাচারে ও সাহিত্যেও তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ও রাজনীতিসচেতন সমাজচিন্তার প্রতিফলন ঘটেছে।
[নয়] পাকিস্তান সৃষ্টির অল্প পরেই ঢাকায় এসে হোসনে আরা দম্পতি পুরান ঢাকায় মোগলটুলীর বাসায় থাকতেন। বাসার ওপরে বাস করার পাশাপাশি সেখানে অর্ধ সাপ্তাহিক ‘পাকিস্তান’ পত্রিকার অফিসে বসে সাংবাদিকতা করতেন স্বামী মোদাব্বেরের সঙ্গে। নীচতলায় ছিল ছাপাখানা। পরে তারা মোহাম্মদপুরে চলে আসেন। স্বামী ছেলে-মেয়ে নিয়ে সুখের সংসার ছিল তাঁর। চার ছেলে লাকী, হ্যাপী, সানী, মন্টি ও এক মেয়ে শীলা ও অন্যান্য আত্মীয় গুণগ্রাহী রেখে তিনি ১৯৯৯ সালের ৩০শে মার্চ ৮২ বছর বয়সে পরলোক গমন করেন।
তথ্যসূত্র : গ্রন্ত: মোহাম্মদ মোদাব্বের : ইতিহাস কথা কয়, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাটদেশ, ঢাকা, ১৯৮১
প্রবন্ধ : গোলাম সরওয়ার : শিশু সাহিত্যিক হোসনে আরা, দৈনিক ইনকিলাব, ঢাকা-৭/৫/২০০১
হোসনে আরা : আমার প্রথম লেখা, দৈনিক ইত্তেফাক, ৭/৪/২০০১
সেলিনা বাহার জামান, তোমাদের কবি হোসনে আরা, ঐ
স্মরণ, দৈনিক ইত্তেফাক, ৩০/০৫/২০০৩

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিজ্ঞাপন