বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় জেলা ফেনী একসময় নদী ও কৃষিনির্ভর সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু গত দুই দশকে প্রতি বর্ষা মৌসুমেই এখানকার মানুষকে মুখোমুখি হতে হচ্ছে এক ভয়াবহ দুর্যোগের—বন্যা। ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় সরকারি হিসাবে প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ৪০ জন, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ১০ লক্ষাধিক মানুষ এবং ক্ষতির পরিমাণ ছাড়িয়ে গেছে আড়াই হাজার কোটি টাকা। পরের বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালেও একই দুর্যোগ পুনরাবৃত্ত হয়েছে; ক্ষতির মুখে পড়েছে শতাধিক গ্রাম, প্রায় দেড় লক্ষাধিক মানুষ এবং ১৪০ কোটিরও বেশি টাকার সম্পদ। এই অব্যাহত বন্যা কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা, দুর্নীতি ও সীমান্তজলনীতি সংকটের প্রতিফলন।
বন্যার মূল কারণ : ১. ভারতের উজান থেকে আকস্মিক পানি ছেড়ে দেওয়া : প্রতিবছর বর্ষার শুরুতেই ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর মাধ্যমে প্রচুর পানি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। অনেক সময় দেখা যায়—তেমন বৃষ্টিপাত ছাড়াও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নদীর পানি তিন মিটার পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারত পরিকল্পিতভাবে পানি ছেড়ে দেওয়ায় এই আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা চুক্তির লঙ্ঘন।
২. দুর্বল তীররক্ষা বাঁধ : ফেনীতে তিনটি প্রধান নদীর তীরঘেঁষে প্রায় ১২২ কিলোমিটার এলাকায় তীররক্ষা বাঁধ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই বাঁধের মান খুবই দুর্বল। প্রতিবছরই বারবার বাঁধ ভাঙে। পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রতিবছরই মেরামতের নামে কোটি কোটি টাকা খরচ করলেও কাজের কাজ কিছুই হয় না। বরং দুর্নীতির কারণে টেকসই কোনো সংস্কার সম্ভব হয় না।
৩. নদী দখল ও পলি জমে সরু হয়ে যাওয়া : বিভিন্ন এলাকায় মুহুরী ও কহুয়া নদীর অংশবিশেষ দখল হয়ে গেছে। নদীর গভীরতা কমে গেছে পলি জমে। এতে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে ভারী বৃষ্টিপাত বা উজানের পানি এলেই দ্রুত নদীর পানি উপচে লোকালয় প্লাবিত হয়।
ক্ষয়ক্ষতি ও মানবিক বিপর্যয় : ২০২৪ সালের বন্যায় ফেনীতে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৪০ জনের, পানিবন্দি হয়েছে লক্ষাধিক মানুষ। গবাদি পশু, ফসল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বসতঘর সব কিছু মিলে ক্ষতির পরিমাণ ছাড়িয়েছে আড়াই হাজার কোটি টাকা। হাজারো পরিবার আশ্রয় নিয়েছে স্কুল, কলেজ ও বাঁধের ওপর।
২০২৫ সালেও প্রায় একই রকম পরিস্থিতি দেখা গেছে। তিন দফা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শতাধিক গ্রাম, ক্ষতির পরিমাণ ১৪০ কোটি টাকার বেশি। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থাও ভেঙে পড়ে। স্কুল-কলেজ বন্ধ, বিশুদ্ধ পানির সংকট, এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি ছিল চরম পর্যায়ে।
জনমত ও অভিযোগ : স্থানীয় জনগণ এবং তরুণ প্রজন্ম একযোগে বলছে, এই দুর্যোগ কোনো স্বাভাবিক বিষয় নয়, এটি পরিকল্পনার অভাব এবং দুর্নীতির পরিণতি।
তাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে : ১. টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি বেড়িবাঁধ নির্মাণ, ২. পানি উন্নয়ন বোর্ডের দুর্নীতি তদন্ত ও জবাবদিহিতা, ৩. নদী পুনরুদ্ধার ও প্রশস্তকরণ, ৪. ভারত-বাংলাদেশ যৌথ পানি ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা, ৫. স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে পরিকল্পনা গ্রহণ।
তরুণ প্রজন্ম ‘বন্যা থেকে মুক্তি চাই’ সেøাগানে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করছে। তারা প্রজন্মভিত্তিক সমাধানের দাবি জানিয়ে বলছে, এভাবে আর চলতে দেওয়া যায় না।
করণীয় ও সুপারিশ : ১. টেকসই বাঁধ নির্মাণ : সাধারণ মাটি বা বালির বাঁধের পরিবর্তে কংক্রিট ও ইঞ্জিনিয়ারিং ভিত্তিক বেড়িবাঁধ নির্মাণ করতে হবে, যা অন্তত ৩০–৫০ বছরের জন্য কার্যকর থাকবে।
২. নদী খনন ও প্রশস্তকরণ : সংশ্লিষ্ট নদীগুলোতে নিয়মিত খনন ও চ্যানেল প্রশস্ত করতে হবে। নদী দখলমুক্ত করতে হবে প্রশাসনিক উদ্যোগে।
৩. পানি উন্নয়ন বোর্ড সংস্কার : প্রতিটি প্রকল্পে স্বচ্ছতা আনতে হবে। স্থানীয়দের অংশগ্রহণ, পর্যবেক্ষক কমিটি এবং সিভিল সোসাইটির সম্পৃক্ততা জরুরি।
৪. আন্তঃদেশীয় পানি ব্যবস্থাপনা সমন্বয় : ভারতের সঙ্গে যৌথ পানি ব্যবস্থাপনার নির্ভরযোগ্য ও বাস্তবমুখী চুক্তি প্রয়োজন। হঠাৎ পানি ছেড়ে দিয়ে বাংলাদেশে বন্যা তৈরি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
৫. বিপর্যয় মোকাবেলায় প্রস্তুতি : প্রতিটি ইউনিয়নে দুর্যোগ প্রস্তুতি কমিটি, আশ্রয়কেন্দ্র এবং দুর্যোগ–পরবর্তী পুনর্বাসন তহবিল থাকা আবশ্যক।
ফেনীর বন্যা এখন আর শুধুমাত্র প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং এটি দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক অব্যবস্থাপনার প্রতিচ্ছবি। প্রতিবছরই একই দুর্যোগে হাজার হাজার পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। শুধু মেরামতের নাম করে কোটি কোটি টাকা খরচ করে এই সমস্যা থেকে মুক্তি সম্ভব নয়।
প্রয়োজন একটি টেকসই, স্বচ্ছ ও মানুষের অংশগ্রহণভিত্তিক সমাধান। ফেনীর নদী, বাঁধ ও জনপদ রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামীতে ক্ষতির মাত্রা হবে আরও ভয়াবহ। সরকারের সদিচ্ছা, আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও জনসম্পৃক্ততায়ই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান নিহিত।