নিজস্ব প্রতিনিধি :
ফেনী সরকারী কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবী জোরালো হয়ে উঠছে। গত ক’দিন ধরে সাধারণ শিক্ষার্থীদের দফায় দফায় বৈঠক আর অধ্যক্ষের সাথে ছাত্রদল নেতাদের সৌজন্য সাক্ষাতের পর এ দাবী আরো প্রবল হয়। ২০১৯ সালে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এক বছর মেয়াদের নির্বাচন হলেও কলেজ প্রশাসনের পক্ষ থেকে ওই কমিটি ভেঙ্গে না দেয়ায় এখনো বহাল তৎসময়ে বিনাভোটে নির্বাচিতরা। চব্বিশের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে পটপরিবর্তনে আওয়ামীলীগের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি মহিপাল গণহত্যা মামলার আসামী হয়ে পালিয়ে যায় ছাত্র সংসদের নেতারাও। অভ্যুত্থানের পর সব ছাত্র সংগঠন জেলার শতবর্ষী এই বিদ্যাপিঠে ছাত্র সংসদ কার্যকরে নির্বাচনের দাবীতে সরব হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দীর্ঘ ২৭ বছর পর ২০১৯ সালের ৯ এপ্রিলে ফেনী সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদ (ফেকসু) নির্বাচন হয়। ওই বছরের ৩০ মার্চ এককভাবে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে তোফায়েল আহমেদ তপু ভিপি ও জিএস রবিউল হক ভূঞা রবিন নেতৃত্বাধীন প্যানেল বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। প্যানেলে আশিক হায়দার রাজন হাজারী এজিএস, নুর করিম জাবেদ স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পাদক এবং নোমান হাবিব তথ্য ও প্রযুক্তি সম্পাদক হয়। তারা সবাই মহিপালে ৪ আগস্টে হত্যা ও আহতের মামলার মামলার আসামী। এছাড়া ১৮ সদস্যের সবাই ভারত, দুবাই সহ বিভিন্ন দেশে আত্মগোপনে রয়েছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী সায়েম মাহমুদ বলেন, “শতবর্ষী ফেনী সরকারি কলেজ অত্র অঞ্চলের উচ্চশিক্ষার জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। ১৯২২ সালে কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর প্রথমবার ১৯৫৬ সালে, এরপর দ্বিতীয়বার ১৯৯২ সালে এবং সর্বশেষ ২০১৯ সালে কলেজটিতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত হওয়া ছাত্র সংসদ নির্বাচনে একতরফা ভোট হয়েছিল। তখনকার ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগ প্রভাব খাটিয়ে এককভাবে বিজয়ী হয়েছে। প্রতিপক্ষ ছাত্র সংগঠনকে মনোনয়ন ফরমও সংগ্রহ করতে দেয়নি তারা। নিয়ম অনুযায়ী একবছর পর আগের কমিটির গঠনতন্ত্রকে বাতিল করে দেয়া হয়। কিন্তু সর্বশেষ ছাত্র সংসদ নির্বাচনের প্রায় ৬ বছর পার হয়ে গেলেও কলেজ প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ কমিটি বাতিল করার কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। জুলাই বিপ্লবের পর বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থীরা এ ব্যাপারে দাবি জানিয়ে আসলেও কলেজ প্রশাসন নির্বিকার।”
সায়েম মাহমুদ আরো বলেন, “ফেনী সরকারি কলেজের আপামর সাধারণ শিক্ষার্থীরা ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে আছে। ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে কলেজে সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক চর্চায় গুনগত পরিবর্তন আসবে বলে আমি মনে করি। ছাত্র সংসদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের দাবি ও অধিকারের কথা স্বতস্ফূর্তভাবে প্রশাসনের নিকট পেশ করতে পারবে। এছাড়াও নির্দিষ্ট ছাত্র সংগঠনের দৌরাত্ম্যে লাগাম টানা সহ শিক্ষার্থী বান্ধব পরিচ্ছন্ন ও গতিশীল ক্যাম্পাস গড়ে তুলতে হলে ফেনী সরকারি কলেজে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। জুলাই বিপ্লবে ফেনী কলেজের ২ জন শহীদের রক্তকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে আমরা শীঘ্রই ছাত্র সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করার জোর দাবি জানাচ্ছি।”
কলেজ ছাত্রদলের আহবায়ক আব্দুল হালিম মানিক ফেনীর সময় কে বলেন, “শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের সর্বোচ্চ মাধ্যম ছাত্র সংসদ, আমরা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল চাই ২০১৯ সালে খুনি নিজাম হাজারীর নির্বাচন ফেনী স্টাইলে গঠিত অবৈধ ফেকসু কমিটি বাতিল করে কলেজ প্রশাসনের মাধ্যমে ফেকসু গঠনতন্ত্র সংস্কার করে প্রকাশ্যে ও গুপ্তভাবে ছাত্রীলীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা সহ লীগের সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত কেউ ফেকসু নির্বাচনে ভোটার হতে পারবেনা এমন নীতিমালার সুস্পষ্ট ঘোষণা করতে হবে এবং লীগের কোন দোসর ফেকসু নির্বাচন আয়োজনে সম্পৃক্ত থাকতে পারবেনা। এ জাতীয় আরো কিছু সংস্কার রয়েছে সেগুলো প্রস্তাবনা আমরা যথাসময়ে দিবো, আর এসবের যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করার পর আমরা ফেকসু নির্বাচন চাই।”
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক ও গণিতের ছাত্র মুহাইমিন তাজিম বলেন, “ফেকসু অকার্যকর হওয়া মানে শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে বাধাগ্রস্ত হওয়া। ক্যাম্পাসে শিক্ষক সংকট,ক্লাসরুম সংকট,কলেজ প্রশাসনের সচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে ফেকসু দ্রুত কার্যকর করা উচিৎ। গতবারের ফেকসু ছিলো স্বৈরাচারি এবং অকার্যকর সংসদ। সে সংসদ অবৈধ ও বাতিল করে নতুন করে রোডম্যাপ ঘোষনা করতে হবে।”
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আরেক সাবেক সমন্বয়ক ও কলেজের গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুল আজিজ ফেনীর সময় কে বলেন, “জুলাই অভ্যুত্থান এর অন্যতম একটা লক্ষ্য ছিল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে বিভিন্ন দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত করে ছাত্র সংসদ কেন্দ্রীক নেতৃত্ব তৈরী করা। সেই লক্ষ্যে ডাকসু, জাকসু সহ বেশ কিছু ছাত্র সংসদ নির্বাচনের কর্মযজ্ঞ চলছে। ছাত্র সংসদ কেন্দ্রীক নেতৃত্ব গড়ে তোলা এবং ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে সরব জন্য ফেকসু নির্বাচনও খুব গুরুত্বপূর্ণ।”
আজিজের মতে, কলেজের আবাসন নিয়ে তীব্র অসুবিধা, শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধার অভাব, অডিটোরিয়ামের দুরাবস্থা, খেলার মাঠের করুন পরিস্থিতি এবং ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়েও অনেক শঙ্কা দেখেছি। কিন্তু সব মিলিয়ে শিক্ষার্থী বান্ধব দাবি দাওয়া বাস্তবায়নের জন্য কাজ করার মত সার্বজনীন কোন নেতৃত্ব নেই। তাই সকল দিক বিবেচনায় কলেজ প্রশাসনকে পাতানো ফেকসু নির্বাচনের পরিবেশ থেকে বের হয়ে নতুন নির্বাচন করা জরুরী।”
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট ফেনী সরকারি কলেজের আহবায়ক নাজনীন সুলতানা বলেন, “শত বছরের পুরোনো ফেনী সরকারি কলেজ ক্যাম্পাস নানান সংকটে জর্জরিত। এখানে আবাসন সংকট তীব্র, নিজস্ব গণপরিবহনের ব্যবস্থা নেই, স্বল্পমূল্যে খাবারের কোনো ক্যান্টিন নেই, নেই বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধা। দীর্ঘ সময় ধরে এখানে কোনো ছাত্র সংসদ নির্বাচনও হয়নি। তাই এসব সমস্যা নিয়ে শিক্ষার্থীদের হয়ে কথা বলার মতো কেউ নেই। ২০১৯ সালে ছাত্রলীগের সাজানো নির্বাচন হয়। যে দলই ক্ষমতায় এসেছে তাদের ছাত্র সংগঠন ক্যাম্পাসে দখলদারিত্ব ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম করেছে। কেউই ছাত্র সংসদ নির্বাচন দেয়নি। অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে আকাঙ্খা সামনে এসেছে তাকে ধারণ করে ২০১৯ এর ছাত্র সংসদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বাতিল ঘোষণা করে পুনরায় ফেনী সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রশাসনের কাছে দাবি জানাই।”
জানতে চাইলে ফেনী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মোহাম্মদ এনামুল হক খন্দকার ফেনীর সময় কে বলেন, “ছাত্র সংসদ এটা বাতিল, বিজ্ঞপ্তি দেয়া লাগে না। এটা তো এক বছরের জন্য। এক বছরে এটার মেয়াদ শেষ। মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এটার কার্যকারিতা শেষ। নতুন নির্বাচন আয়োজনে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত পেলে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।”