মার্চ ৬, ২০২৬ ০৫:৪৬

মাহমুদুল হাসানের অনিয়ম-দূর্নীতির প্রমাণ মিলেছে

ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি :
ফেনী আলিয়া কামিল মাদরাসা থেকে বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দূর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি। ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গঠিত কমিটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। দীর্ঘসময় ধরে হওয়া তদন্তে মাহমুদুল হাসানের স্বেচ্ছাচারিতা, বিধি বহির্ভূত কর্মকান্ড, অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া যায়। তার এই কর্মকান্ডে ঐতিহ্যবাহী স্বনামধন্য এই দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বিঘ্ন ঘটবে মর্মে তদন্তকারী কমিটির প্রতিয়মান হয়। যা ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত বেসরকারি মাদ্রাসা সমূহের শিক্ষক কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণের চাকরির শর্তাবলী সংক্রান্ত প্রবিধান ২০২৩ সংশোধিত এর ১৩ (খ), (ছ), (জ) এর আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। একই প্রবিধানের বিধি ১৫ এর আওতায় অধিকতর তদন্ত সাপেক্ষে অভিযুক্ত মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর প্রেরণের সুপারিশ করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তদন্ত কমিটির আহবায়ক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) ফাতিমা সুলতানা, সদস্য সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতানা নাসরীন কান্তা ও জেলা প্রশাসনের সহকারি কমিশনার ফাহমিদা সুলতানা সাক্ষরিত প্রতিবেদন জেলা প্রশাসকের কাছে জমা দেয়া হয়।

নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্যমতে, তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ফেনী আলিয়া কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত দুর্নীতি, অনিয়ম ও নারী শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের উত্ত্যক্ত করা ইত্যাদি অভিযোগ, গভর্নিং বডি নির্বাচন ২০২৫ এর অভিভাবক প্রতিনিধি নির্বাচনের সদস্য পদপ্রার্থীদের নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয়ে অভিযোগ এবং চারটি বিষয়ে তার কারণ দর্শানোর জবাব পর্যালোচনার নিমিত্ত গঠিত ৩ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি নিম্ন স্বাক্ষরকারীগণ কর্তৃক বিগত ১৫ জুলাই সকাল সাড়ে ১১টায় শুনানি করা হয়। শুনানিতে ৯ জন অভিযোগকারী শিক্ষার্থী, নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয় অভিযোগকারী ৬ জন সদস্য পদপ্রার্থী ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কমিটির সদস্যবৃন্দ উপস্থিত থাকলেও অভিযুক্ত অধ্যক্ষ মাহমুদুল হাসানকে পরপর দুইবার ১ জুলাই ও ১৫ জুলাই নোটিশের মাধ্যমে ডাকা হলেও তিনি শুনানিতে হননি। ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত বেসরকারি মাদ্রাসা সমূহের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের চাকরির শর্তাবলী সংক্রান্ত প্রবিধান ২০২৩ (সংশোধিত) এর ১৫ অনুযায়ী তদন্ত কমিটির সামনে উপস্থিত না হলে অভিযুক্তের অনুপস্থিতিতে শুনানি কার্যক্রম পরিচালিত হবে মর্মে উল্লেখ থাকায় অধ্যক্ষ মাহমুদুল হাসানের অনুপস্থিতিতে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালিত হয়। শুনানিতে উপস্থিত অভিযোগকারী শিক্ষার্থীগণ, নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয়ে অভিযোগকারী অভিভাবক প্রতিনিধি প্রার্থীদের লিখিত বক্তব্য নেয়া হয় এবং মাহমুদুল হাসানের কারণ দর্শানোর জবাবেরও পর্যালোচনা করা হয়।

অভিযোগকারী ৯ জন শিক্ষার্থীর লিখিত বক্তব্য পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, মাহমুদুল হাসান ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বড় অংকের টাকা আত্মসাৎ করেছেন যা অডিট দ্বারা প্রমাণিত। ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি বিধি অনুযায়ী জ্যোষ্ঠতা লংঘন করে ভারপ্রাপ্ত উপাধ্যক্ষ পদে সহকারী অধ্যাপক জনাব গাজী মীর মোঃ ইকবাল এর পরিবর্তে সহকারি অধ্যাপক আনোয়ার হোসেনকে দায়িত্ব দেয়া। এছাড়াও শিক্ষার্থী কর্তৃক প্রদত্ত বক্তব্য ও মামলার নাম্বার অনুযায়ী মাহমুদুল হাসান ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট এ দুটি পৃথক রাজনৈতিক ফৌজদারি মামলার আসামি বলে দাবি করেন। মামলার নাম্বার যথাক্রমে ক) জিআর ৪৯৯/২৪ ও খ) জিআর ২৭৪/২৫। শিক্ষার্থীদের বক্তব্য এবং অফিস কর্তৃক প্রদত্ত নথিপত্র বিশ্লেষণ পূর্বক প্রমাণিত হয় যে শরিফুল ইসলাম (সহকারী শিক্ষক), মো: মনির সহকারি মৌলভী), সাইফুল ইসলাম সজীব (হিসাব সহকারী), আব্দুল্লাহ আল মমিন (অফিস সহকারি-কাম-কম্পিউটার অপারেটর) সকলে অধ্যক্ষের নিকটাত্মীয় এবং জুনায়েদ আল মাহমুদ (সহকারী শিক্ষক) অধ্যক্ষের ছেলে। মহিলা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানি ও লাঞ্ছনার বিষয়ে গত বছরের ৩ অক্টোবর জেলা প্রশাসন কর্তৃক প্রদত্ত তদন্ত রিপোর্টে উল্লেখিত। ইসলামি আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ব্যবহারিক ও মৌখিক পরীক্ষা রশিদ বিহীন টাকা গ্রহণ, মাদ্রাসা মার্কেটের বরাদ্দের অনিয়ম, অধ্যক্ষের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও দুর্নীতি, মাদ্রাসা হোস্টেলের অনিয়ম ও মসজিদ মার্কেটের ভাড়ার টাকা আত্মসাৎ করেছেন মর্মে তাদের লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করেন।

প্রতিবেদনে অভিভাবকদের উদ্বৃতি দিয়ে আরো উল্লেখ করা হয়, তদন্তকালে মাদ্রাসার গভর্নিং বডি নির্বাচন ২০২৫ এ অভিভাবক সদস্য পদপ্রার্থী ৬ জনের লিখিত বক্তব্য গ্রহণ করা হয়। বক্তব্যের মর্ম অনুযায়ী অধ্যক্ষ মাহমুদুল হাসান নিজেই নিজেকে ভূয়া ব্যবসায়ী পরিচয়ে এফিডেভিট দিয়ে একজন অভিভাবকের মাধ্যমে মহামান্য হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন এবং উক্ত রিটের প্রেক্ষিতে অভিভাবক প্রতিনিধি নির্বাচন স্থগিত হয়। প্রার্থীদের লিখিত বক্তব্য এবং সংযুক্ত মামলার রায়ের কপি থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত যে, রিট আবেদনে দাখিলকৃত এফিডেভিটে প্রদত্ত জাতীয় পরিচয় পত্রের তথ্য এবং মাহমুদুল হাসানের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য তথা এফিডেভিটে ব্যবহৃত নাম্বারটি একই ব্যক্তির। অর্থাৎ প্রার্থীদের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।

অধ্যক্ষ মাহমুদুল হাসান অনুমোদিত ছুটি বিহীন মাদ্রাসায় দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকার কারণে তাকে চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলে তার জবাবে তিনি উল্লেখ করেন যে একদিকে তার বিরুদ্ধে করা মামলায় গ্রেফতার এড়াতে এবং অন্যদিকে হাইকোর্ট কর্তৃক তার সাময়িক বহিষ্কারাদেশ হওয়ার পর জেলা প্রশাসক ও মাদ্রাসা সভাপতি কর্তৃক যোগদানের অনুমতি না পেয়ে তিনি মাদ্রাসায় যোগদান করতে পারেননি। বস্তুত মহামান্য হাইকোর্ট কর্তৃক বহিষ্কারাদেশ স্থগিত হওয়ার পরও অধ্যক্ষ নিয়মিত যোগদান করার ক্ষেত্রে কোন আইনগত বাধা ছিল না। সভাপতির অনুমতি না পাওয়ার যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। তাই ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত বেসরকারি মাদ্রাসা সমূহের শিক্ষক কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণের চাকরি শর্তাবলী সংক্রান্ত প্রবিধান ২০২৩ (সংশোধিত) এর ১৩ (খ) অনুযায়ী বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা পেশাগত অসদাচরন এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

অধ্যক্ষ একক সিদ্ধান্তে ৫৫ জন শিক্ষক কর্মচারী নিয়োগ দেন মর্মে তাকে ৫ জানুয়ারি কারণ দর্শানোর নোটিশ করা হলে তার জবাবে তিনি উল্লেখ করেন যে, শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত রেজুলেশন বইটি পাওয়া যায়নি এবং তিনি আরো দাবী করেন যে নিয়ম মাফিক ও বিধি মোতাবেক শিক্ষক নিয়োগ দেন যার স্বপক্ষে তিনি কোন প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি। তিনি যে রেজুলেশন সংযুক্তি আকারে দিয়েছেন সেখানে এই ৫৫ জন শিক্ষক কর্মচারীর নাম উল্লেখ নেই। খন্ডকালীন শিক্ষকের ভাউচারে বেতন দেয়ার রেজুলেশনের সত্যতা পাওয়া গেছে। এছাড়া ছাত্র-ছাত্রীদের থেকে রশিদ মূলে আদায়কৃত অর্থ সংশ্লিষ্ট অর্থ বছরের ক্যাশ বইতে লিপিবদ্ধ না করা, শিক্ষার্থী হতে রশিদ বিহীন অর্থ সংগ্রহ, অনুমোদনহীন নির্মাণ খরচ, অর্থ ও ক্রয় কমিটি এবং প্রজেক্ট কমিটির স্বাক্ষরবিহীন ভাউচার, প্রতিটি অর্থবছরে বাজেট প্রণয়ন না করা, বিধি বহির্ভূত অতিরিক্ত খরচ দেখানো সহ বিভিন্ন অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাৎ এর মতো শাস্তিযোগ্য অপরাধ সংগঠিত হযেছে।

প্রসঙ্গত; ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-রেজিষ্ট্রার ড. মো: আবু হানিফা স্বাক্ষরিত চিঠিতে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসককে নির্শে দেয়া হয়। ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, “ফেনী আলিয়া কামিল মাদরাসা, ফেনী- এর অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকবৃন্দের অভিযোগের বিষয়ে ইসলামি আরিবি বিশ্বব্যিালয় অধিভুক্ত বেসরকারি মাদরাসাসমূহের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীগণের চাকুরির শর্তাবলী সংক্রান্ত প্রবিধান-২০২৩ অনুযায়ী ১৪, ১৫ এবং ১৬ ধারা অনুযায়ী বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সভাপতিকে নির্শেক্রমে অনুরোধ করা হলো।” ওইদিন রাতে মাদরাসার অধ্যক্ষ পদ থেকে মাওলানা মাহমুদুল হাসানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম ফেনীর সময় কে বলেন, পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিজ্ঞাপন