মার্চ ৬, ২০২৬ ০৭:০৪

ফেনী সরকারি কলেজে ফ্যাসিবাদি আমলের ১৫ বছর নজিরবিহীন লুটপাট

সময় রিপোর্ট :
ফেনী সরকারি কলেজে পতিত আওয়ামীলীগ সরকারের ১৫ বছরে লুটপাটের মহোৎসব চলেছে। সরকারি দলের নেতাদের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে নজিরবিহীন এ লুটপাটে সহযোগী তৎসময়ের অধ্যক্ষগণ সহ শিক্ষক-কর্মচারীদের একটি সিন্ডিকেট। নামে-বেনামে বিল-ভাউচার করে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে কোটি কোটি টাকা। ইতিমধ্যে অডিট আপত্তির মুখে কয়েকজন প্রাক্তণ অধ্যক্ষ টাকা ফেরত দিতেও বাধ্য হয়েছেন। দৈনিক ফেনীর সময় টীম এর অনুসন্ধানে এমন বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য-প্রমাণ হাতে এসেছে।

প্রশাসনিক ভবনে এক বছরে
২৯ লাখ টাকার টোনার

প্রশাসনিক ভবনের জন্য টোনার কিনতেই খালি করা হয় ফান্ড। প্রতি অর্থবছরে প্রতিযোগিতামূলকভাবে টাকা খরচ দেখানো হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রিন্টারের টোনার, মনিহারির ব্যয় দেখানো হয়েছে ২৮ লাখ ৮৮ হাজার ৩৭৪ টাকা। ২০২২-২৩ সরকারি বরাদ্দ ১০ লাখ টাকা সহ ২১ লাখ ২৭ হাজার ২৮৮ টাকা খরচ আর ২০২৩-২৪ সালে ১৮ লাখ ৯৯ হাজার ৭৭৩ টাকা খরচ দেখানো হয়। ২০২৪-২৫ এখন অব্দি এ খাতে খরচ হয় ৬ লাখ টাকা। কলেজের স্ব স্ব বিভাগে দাপ্তরিক কাজ, প্রশ্ন প্রণয়ন, প্রিন্টিং এর কাজ করা হলেও এসব টাকা লোপাটে ভাগ পায় অধ্যক্ষ সহ সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেট।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কলেজের মাষ্টার রোলের কর্মচারী কম্পিউটার অপারেটর মনতোষ চন্দ্র দাস টোনার-কাগজ কেনার দায়িত্ব পালন করেন। সাবেক হিসাব কর্মকর্তা প্রাণহরি দেবনাথকে দিয়ে এসব বিল-ভাউচার পাশ করানো হতো। অবসরের পরও তাকে মাষ্টাররোলে স্বপদে বহাল রাখা হয়। বর্তমান অধ্যক্ষ প্রফেসর মোহাম্মদ এনামুল হক খোন্দকার যোগদানের পর অনিয়ম চোখে পড়ায় চাকরী হারান প্রাণহরি।

ড্রেনের অস্তিত্বও নেই, নির্মাণ ও
সংস্কারে ব্যয় ১২ লাখ টাকা

কলেজের একাডেমিক ভবনের পেছনে (সাবেক কমিশনার জয়নাল আবেদিন ভবন) ড্রেন নির্মাণ ও মেরামতের কোন অস্তিত্ব নেই। কাগজে-কলমে খাত দেখিয়ে হাতিয়ে নেয়া হয় ১২ লাখ টাকা। ফেনীর সময় টীম ভবনের পিছনে পরিদর্শন করে ড্রেনের কোন অস্তিত্ব পায়নি।
জানা যায়, ২০২৩ সালে কমিশনার জয়নাল আবেদিন ভবনের পিছনে ড্রেন নির্মাণের নামে প্রথম দফায় ৫ লাখ ৮৬ হাজার ২শ ৬২ টাকা এবং একই বছরের দ্বিতীয় দফায় ওই প্রকল্প দেখিয়ে ৫ লাখ ৯৭ হাজার ১শ ৭১ টাকা সহ মোট ১১ লাখ ৮৩ হাজার ৪শ ৩৩ টাকা লোপাট করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারী বলেন, “কলেজে কখনো কোন ড্রেন হয়নি। একটা হয়েছে ওইটা বধ্যভূমির পেছনে। ওখানে পানি যাওয়ার জন্য ওইটা করা হয়েছে। কলেজের অর্থ থেকে কোন ড্রেন হয়নি।”

মেয়াদ শেষেও ফেকসুর
নামে টাকা উত্তোলন

দীর্ঘ ২৭ বছর পর ২০১৯ সালের ৯ এপ্রিলে ফেনী সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদ (ফেকসু) নির্বাচন করা হয়। সেইসময়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় ওই বছরের ৩০ মার্চ ভিপি তোফায়েল আহমেদ তপু ও জিএস রবিউল হক ভূঞা রবিন নেতৃত্বাধীন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের একক প্যানেল একতরফা নির্বাচিত হয়। একবছরের মেয়াদ শেষ হলেও ফেকসুর নামে টাকা উত্তোলন করা হয়। এনিয়ে অডিটে আপত্তি তোলা হয়েছে।
কলেজ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২০ সালে ফেকসুর মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। ফেনীর সময় অনুসন্ধান টীমের হাতে ২০২২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ৭৩ হাজার ৮শ টাকা এবং একইবছরের ১০ নভেম্বর দ্বিতীয় ধাপে ৯৭ হাজার টাকা খরচ দেখিয়ে উত্তোলনের তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়।

২শ ফুটের তারকাঁটা বেষ্টনীর
খরচ সাড়ে ৫ লাখ

ফেনী রেলওয়ে স্টেশনের পুকুর ও কলেজ বধ্যভূমির মাঝখানে সড়ক নির্মাণের পর কলেজের সীমানাপ্রান্তে নিরাপত্তা বেষ্টনীর জন্য দেয়া হয় তারকাঁটা। ২শ ফুটের তারকাঁটা কিনতে খরচ দেখানো হয় প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টাকা।
সূত্র জানায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ফেনী কলেজের অডিটোরিয়াম সংলগ্ন সড়কের পাশে নিরাপত্তার জন্য দেয়া হয় তারকাঁটা। সেখানে ২শ ফুট তারকাঁটার ব্যয় দেখানো হয়েছে ৫ লাখ ৪২ হাজার ২৬৩ টাকা। চলতিবছর সদর হাসপাতাল মোড় সংলগ্ন কলেজের ছাত্র হোস্টেলের নিরাপত্তায় ২শ ফুটের সমপরিমাণ তারকাঁটা দিতে ব্যয় হয় ১ লাখ ২৮ হাজার টাকা।

কেবল নামফলকেই বিপন্ন
উদ্ভিদ কর্ণার ও চাইল্ড কেয়ার
দুই প্রকল্পে খরচ ১০ লক্ষাধিক

২০১৭ সালে কলেজের কলা ভবনের সামনে বিপন্ন উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্ণার নামে একটি বাগান তৈরি করেন তৎকালীন অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ। সেখানে ব্যয় দেখানো হয়েছে সাড়ে ৭ লাখ টাকা। অনুসন্ধানে জানা যায়, কেবল নামফলক লাগিয়েই জনাব আজাদ ওই টাকা পকেটস্ত করেন। যা পরবর্তীতে তদন্তেও প্রমাণ মিলে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মহানিম, পুত্রঞ্জীব, দেশী গাব, বাসক, হাতিফল নরফোক পাইন, উদাল সহ ১০-১২টা বিরল গাছ রোপন করা হয়। তবে ওই বিভাগের সংশ্লিষ্ট একাধিক শিক্ষক জানান, উল্লেখিত গাছগুলো এর অনেক পরে লাগানো হয়। দুই শতাংশ জায়গায় কলা ভবনের সামনে তৈরি করা বাগানটি থেকে ঠিক কত টাকা লোপাট করা হয়েছে তার দৃশ্য বলে দেয়।
অপরদিকে কলেজের অনার্স ভবনের নিচতলায় বিশেষায়িত চাইল্ড কেয়ার সেন্টার করা হলেও কখনো খোলা হয়না। ২০২২ সালে মে মাসে তৎকালীন অধ্যক্ষ প্রফেসর বিমল কান্তি পাল নামফলক লাগিয়ে এটির উদ্বোধন করেন। এই নামফলক লাগিয়েই প্রকল্পে খরচ দেখানো হয় প্রায় ৩ লাখ টাকা।

অনুষ্ঠান মানেই টাকা
কামাইয়ের উৎস

২০২২-২৩ অর্থবছরে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে ব্যয় করা হয় এক লাখ ৩৮ হাজার ৪শ ২৮ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২ লাখ ২০ হাজার ৩০৪ অথচ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সেইখাতে ব্যয় হয় ৪৮ হাজার ১৫৪ টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিজয় দিবস উদযাপনে ব্যয় হয় ১ লাখ ৪০ হাজার ৭৬০ টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯১ টাকা, সেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে একইখাতে ব্যয় হয়েছে ৯৭ হাজার ৪৯১ টাকা।
২০২৪ সালে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে ব্যয় হয় ৪৮ হাজার ১৫৪ টাকা। তার আগের দুই বছর ২০২৩ সালে হয় ১ লাখ ২৯ হাজার ৯০৬ টাকা। ২০২২ সালে হয় ১ লাখ ১৪ হাজার ৮১১ টাকা। এছাড়া বিজয় দিবস, শহীদ দিবস আর বুদ্ধিজীবী দিবসগুলো সরকারি ছুটি হওয়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপস্থিত থাকে হাতেগোনা। সবমিলিয়ে সেচ্ছাসেবী সংগঠন, অনুষ্ঠানের বিভিন্ন ইভেন্টে অংশগ্রহণকারী, শিক্ষক-কর্মচারী সহ উপস্থিতি সংখ্যা হয় দুই শতাধিক।
নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, ৩শ উপস্থিতি ধরে আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা হয়। জনপ্রতি ৬০ টাকা হারে আপ্যায়ন বাবদ ব্যয় হতে পারে ১৮ হাজার টাকা। তাছাড়া ব্যানার, সাউন্ড সিস্টেম, ডেকোরেশন সহ অন্যান্য খরচ মিলে ৪০-৫০ হাজার টাকা হতে পারে। এত টাকা কোথায় বা কোন খাতে ব্যয় হয় এ প্রশ্ন সচেতন শিক্ষার্থীদের।

বার্ষিক মিলাদেও হাতিয়ে
নেয়া হতো লাখ লাখ টাকা

প্রতিবছর বার্ষিক মিলাদ ও দোয়া মাহফিল আয়োজনেও লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়া হতো। বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেয়া টাকার তহবিল থেকে খরচ দেখিয়ে এ টাকা উত্তোলন করা হয়েছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বার্ষিক মিলাদে ব্যয় দেখানো হয়েছে তা চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তিন গুণ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বার্ষিক মিলাদ খাতে ব্যয় দেখানো হয় ৪ লাখ ৭০ হাজার ৪শ টাকা। ঠিক একই ধরনের ব্যয় দেখানো হয়েছে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে। সেবছর ব্যয় দেখানো হয়েছে ৪ লাখ ৭৩ হাজার ২২২ টাকা। অথচ এই খাতে ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে ব্যয় দেখানো হয় ১ লাখ ৬৭ হাজার ৩শ টাকা।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের অনেকে জানিয়েছেন, বার্ষিক মিলাদ ও দোয়া মাহফিলে অংশ নেয় ৬শ থেকে ৭শ শিক্ষার্থী। শিক্ষক ও অন্যান্য মিলে ৮শ জনের আপ্যায়নের আয়োজন হয়। জনপ্রতি ৬০ টাকা ধরলে নাস্তার বিল হতে পারে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। সাউন্ড সিস্টেম, ব্যানার ও অন্যান্য খরচ মিলে বড় জোর হতে পারে ৮০ হাজার টাকা। সেখানে প্রায় ৫ লাখ টাকা করে পরপর দুইবার দেখানো হয়েছে।

মাওয়ায় পদ্মাসেতু উদ্বোধন
কলেজের খরচ ৩ লাখ

২০২১-২২ অর্থবছরে পদ্মাসেতু উদ্বোধন উপলক্ষে অনুষ্ঠান বাবদ ব্যয় দেখানো হয়েছে ৩ লাখ ২৩ হাজার ৪৪০ টাকা। অথচ ফেনী সরকারি কলেজে পদ্মা সেতু উদ্বোধন উপলক্ষে ঠিক কোন কোন খাতে এতো টাকা ব্যয় হয়েছে তার কোন সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। একাধিক শিক্ষার্থীর সাথে কথা বললে ফেনী কলেজে এমন অনুষ্ঠান হয়েছে কিনা তারা জানেন না। তবে ফেনী পৌরসভার অনুষ্ঠানে গুটি কয়েক শিক্ষক সহ বেশ কিছু শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে বলে জানা গেছে।

উন্নয়ন তহবিলে ভাগ্য খুলে
শিক্ষক-কর্মচারীদের

২০২২ সাল থেকে ২০২৫ পর্যন্ত ফেনী সরকারি কলেজের দায়িত্ব পালন করেছেন ৪ জন অধ্যক্ষ। ২০২২-২৩ অর্থ বছরে উন্নয়ন তহবিলের নামে ব্যয় হয়েছে ৫৩ লাখ ৭৬ হাজার ৫৭২ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে সেটি দেখানো হয় ৪৪ লাখ ৩৯ হাজার ২১৩ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে ২ মাসে ব্যয় হয় ৩ লাখ ২১ হাজার ১১১ টাকা। বর্তমান অর্থ বছর ২০২৪-২৫ এ ব্যয় দাঁড়ায় ১৫ লাখ ৭৯ হাজার ২৮১ টাকায়। উন্নয়ন খাতে যে ব্যয় দেখানো হয়েছে তার প্রামাণ্য নথি নিয়ে থেকে যায় প্রশ্ন। যেখানে ২০২২-২৩ অর্থ বছর ও ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের মধ্যে এই খাতের ব্যয়ের পার্থক্য ৩৭ লাখ ৯৭ হাজার ২৯১ টাকা। অডিট রিপোর্ট আপত্তির মুখে তিনজন অধ্যক্ষ প্রায় ৩০ লাখ টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হন। একজন অধ্যক্ষ এখনো দুদকের জালে রয়েছেন।

নিরাপত্তা তহবিল ও পুরস্কার
কেনার নামে নয়ছয়

নিরাপত্তা তহবিল থেকে ২০২২-২০২৩ অর্থবছরের ১০ মাসে মোট ব্যয় হয়েছে ৫৭ লাখ ৫৫ হাজার ৩শ ৪৫ টাকা। আরেক অধ্যক্ষের সময় ২০২৩ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারী থেকে ২০২৪ সালের ২ মে পর্যন্ত এ তহবিলে মোট ব্যয় হয়েছে ৫৬ লাখ ৫৭ হাজার ৬ শত ৪৫ টাকা। এছাড়া ২০২৪ সালে আরেক আধ্যক্ষের সময় তিন মাসে মোট ব্যয় হয় ৮০ হাজার ৮শ ৫৪ টাকা। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের জুলাই এর মাঝামাঝি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে আরেক অধ্যক্ষের সময়ে মোট ব্যয় হয়েছে ২ লাখ ২২ হাজার টাকা এবং একই অর্থবছরে বর্তমান অধ্যক্ষের সময়ে ৯ মাসে মোট ব্যয় হয়েছে ৯ লাখ ৩২ হাজার ১শ ১৩ টাকা। অর্থাৎ ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে ১০ মাসের চেয়ে ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের মোট ব্যয়ের পার্থক্য ৪৮ লাখ ২৩ হাজার ২শ ৩২ টাকা।

শুধু নিরাপত্তা তহবিল থেকে নয়, এভাবে অন্যান্য তহবিলের (বিবিধ তহবিল) নামেও লাখ লাখ টাকা লোপাট হয়।

কলেজ সূত্রে জানা যায়, এক অধ্যক্ষের সময় ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় ২৬ লাখ ২০ হাজার ১শ ২৫ টাকা। ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে আরেক অধ্যক্ষের সময় মোট ব্যয় ৩০ লাখ ৯৮ হাজার ২শ ৬৪ টাকা। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে জুলাই মাসে ব্যয় করেন ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৬ টাকা। একই অর্থবছরে আরেক অধ্যক্ষের সময় আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বরে মোট ব্যয় হয় ২ লাখ তিন হাজার ৬শ ৯৮ টাকা। একই অর্থবছরের বর্তমান অধ্যক্ষের সময়ে মোট ব্যয় ৮ লাখ ২ হাজার ৪শ ৪৭ টাকা।
অপর একটি সূত্র জানায়, বার্ষিক সাহিত্য ও সংস্কৃতি প্রতিযোগিতায় শুধু ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৮ লাখ ৮৪ হাজার ২০ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে একই খাতে ব্যয় হয়েছে আগের বছরের অর্ধেক অর্থাৎ ৪ লাখ ৩৯ হাজার টাকা। এর আগে ২০২২-২৩ অর্থ বছরে বার্ষিক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় ব্যয় দেখানো হয়েছে ৬ লাখ ৯০ হাজার ৯৮০ টাকা।

সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী একাধিক শিক্ষার্থীর সাথে যোগাযোগ করলে তারা বলে পুরষ্কারে বেশিরভাগ সময় বই ও সার্টিফিকেট দেয়া হয়। সেই অনুযায়ী বিভিন্ন ইভেন্টে প্রতিবছর ১২০-১৩০ জনকে পুরষ্কৃত করলে জনপ্রতি ৪০০ টাকা করে ধরলেও পুরষ্কার আসার কথা ৫২০০০ টাকা এবং সাউন্ড সিস্টেম, অনুষ্ঠান আয়োজনসহ অর্থ ব্যয় হওয়ার কথা ১-১.৫ লক্ষের মতো সেখানে ব্যয় করা হয়েছে ৪-৫ গুণ বেশি।

ছাত্র-ছাত্রীদের সেশন
ফি বাড়লো ১শ টাকা

ফেনী সরকারি কলেজে ২২ হাজারের অধিক ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তাদের কাছ থেকে প্রতিবছর নিরাপত্তা খাতে ৬৫০ টাকা করে আদায় হলেও সেশন ফি’র সাথে নতুন করে ১শ টাকা বাড়িয়েছে কলেজ প্রশাসন।
সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসের একাডেমিক কাউন্সিলে ৬৫০ টাকা থেকে ৭৫০ টাকা করে গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়। সরকারি ৬ জন ও বেসরকারি কর্মচারী ৪০ জন মিলে নিরাপত্তা, নৈশপ্রহরী ও মাষ্টার রোল কর্মচারী বাবদ প্রতিবছর খরচ হয় ৫০ লাখ টাকার মতো। এর মধ্যে বিভিন্ন বিভাগের সেমিনার থেকে ১৫ জনের বেতন দেয়া হয়। বিভিন্ন উৎসবের নামে বাকি টাকা ব্যয় করা হতো।

‘এরা শিক্ষক সমাজের কলংক,
দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত’

বরেণ্য শিক্ষাবিদ প্রফেসর তায়বুল হক বলেছেন, “এসব বিষয়ে কিছু বলতে লজ্জা হয়। যাদের সম্পর্কে অভিযোগ আসতেছে আমিও একদিন এই কলেজের অধ্যক্ষ ছিলাম। এই কথা শুনলে মনে হয়, অধ্যক্ষরা বুঝি এইরকম করে। মাঝে মাঝে খুব ঘৃণা হয়। পৃথিবীর সর্বত্র কিছু পেশা রয়েছে অর্থ উপার্জনের জন্য নয়। শিক্ষকতা, ডাক্তার, উকিল আদর্শ স্থানীয় লোক। সেবামুলক ক্ষেত্রে মানুষ তাদের অনুসরণ করে। শিক্ষকের কাছে ছাত্র যায় জীবন গড়ার জন্য। শিক্ষককে অনুসরণ করে আদর্শবান হওয়ার জন্য। শিক্ষক যখন আদর্শ চোর হয় তখন ছাত্রের ধারণা কেমন হয়। এই সমস্ত লোক এসব পেশায় আসা উচিত না। আমি যখন শিক্ষক ছিলাম, তখন যারা অধ্যক্ষ ছিলেন তারাও কিছু কিছু করতেন। চোখে পড়লে সেসব কর্মকান্ডের প্রতিবাদ করতাম। এখনকার সময়ের তুলনায় তাদের কর্মকান্ড খুবই ক্ষুদ্র। নিজেও এই কলেজে আজীবন চাকরী করেছি। আমার পরবর্তী সময়ে যেসব শুনেছি, অধ্যক্ষকে ওএসডি, বস্তায় বস্তায় কাগজ নিয়ে গেছে অডিট করার জন্য”।
ফেনী সরকারি কলেজের সাবেক এ অধ্যক্ষ আরো বলেন, “শিক্ষক সমাজের জন্য এরা কলংক। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত। সমাজ কলংকমুক্ত করার জন্য অন্য কেউ অপরাধে জড়িত হওয়ার আগে দুইবার চিন্তা করে। এরা কিছু চর্তুপাশে তাবক সৃষ্টিৃ হয়। অফিসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহায়তা ছাড়া শিক্ষক অপকর্ম করতে পারেনা। সমাজ-রাষ্ট্র সামগ্রীকভাবে যেভাবে পরিচালিত হয় রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বত্র কমবেশি প্রভাব পড়ে। গত ১৫ বছরে উন্নয়নের নামে লুটপাট, ফ্যাসিজম রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্তর থেকে সর্বনিম্ন পর্যন্ত স্তরে স্তরে ফ্যাসিজমের সৃষ্টি হয়েছিল। যারা যেখানে ছিল তাবকতা করতে হতো। সমাজের অবক্ষয় কোথাও বেশি কোথাও কম, সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। যারা নিয়ন্ত্রন করবে তারাই উৎসাহিত করেছে। পচনের ভিতরেও কিছু কিছু ভালো লোক থাকে। অভিযোগগুলো সঠিক তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্ত প্রমাণিত হলে সঠিকভাবে বিচারের মুখোমুখি করে শাস্তি প্রয়োগ করতে হবে।”

অভিযোগ অস্বীকার করলেন
বিমল, ফোন ধরেননি মোক্তার

ফেনী সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর বিমল কান্তি পাল তার দায়িত্বকালীন সময়ে আর্থিক অনিয়ম-লুটপাটের অভিযোগ প্রত্যাখান করে বলেন, “জাতীয় দিবস উদযাপন সহ দৈনন্দিক কার্যক্রম শিক্ষকদের দিয়ে কমিটির মাধ্যমে পরিচালনা করা হয়। ব্যক্তিগতভাবে কেউ কলেজ ফান্ড থেকে টাকা নেয়ার সুযোগ নেই। অডিটেও কোনরকম আপত্তি না হওয়ায় অবসরোত্তর পেনশন সুবিধা পেয়েছি।” টাকা ফেরত দেয়ার বিষয়টি সঠিক নয় বলে তার দাবী।
অভিযোগ সম্পর্কে জানতে অপর সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর মোহাম্মদ মোক্তার হোসেইনকে একাধিকবার ফোন দেয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিজ্ঞাপন