ড. খন্দকার নাজমুল হক
গবেষক ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ।
আজ ভোর ৬.০০টায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না-লিল্লাহ ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন। ১৯৮১ সালের ৩০শে মে স্বামী প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান শাহাদাত বরণ করলে দুই শিশু সন্তান তারেক জিয়া এবং আরাফাত জিয়াকে বুকে ধারণ করে গৃহবধু থেকে বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রীর আসন দখল করেন। ১৯৮২ সালে স্বৈরশাসন জেনারেল এরশাদ প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করলে গৃহবধু বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপার্সন এর দ্বায়িত্ব গ্রহণ করেন। জেনারেল এরশাদ বিরোধী নয় বছরের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনে ভুমিকার কারণে তাঁকে আপোষহীন নেত্রীর খেতাব দেওয়া হয়। ফ্যাসিবাদের রোশানলে পড়ে মিথ্যা মামলায় বৃদ্ধ বয়সে দীর্ঘদিন কারাগারে থাকতে হয়েছে। তিনি ১/১১ সরকারের সাথে আপোষ করেন নাই, বেগম খালেদা জিয়া ভারতের তাবেদারী করেন নাই। তিনি একজন মেধাবী ও দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী নেতা ছিলেন। যার শূন্যতা কখনো পূরণ হবে না। তাঁর মৃত্যুতে একজন মেধাবী আন্তর্জাতিক আধিপত্যবাদ বিরোধী ও দেশপ্রেমিক নেতার প্রস্থান ঘটলো।
বেগম খালেদা জিয়ার বিদায় বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, আপোষহীন নেতৃত্ব, ভারতীয় আধিপত্যবাদ বিরোধী দেশপ্রেমিক নেতা হিসেবে এক অনন্য অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছে। তাঁর দীর্ঘ জীবন ছিল গণতন্ত্রের সংগ্রাম, সামনে থেকে নেতৃত্বদান, রাষ্ট্র পরিচালনা এবং সংসদীয় গণতান্ত্র চর্চার এক রোল মডেল। তিনি কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নেতা ছিলেন না; এরশাদের ৯ বছরের স্বৈরাচারী শাসনকালে তিনি ছিলেন ১৫ দলের নেত্রী হিসেবে ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রীর দ্বায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি প্রেসিডেন্ট পদ্ধতি বাতিল করে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার পদ্ধতি চালু করেন। ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসনকালে ৪ দলের নেত্রী হিসেবে ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রীর দ্বায়িত্ব গ্রহণ করেন। খালেদা জিয়া একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি, একটি জাতীয়তাবাদী ধারার নাম এবং কোটি কোটি মানুষের আস্থার প্রতীক।
তিনি ১৯৮৪ সালে তিনি বিএনপির চেয়ারপারসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং জেনারেল এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন।
১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই নির্বাচন ছিল সামরিক শাসন-পরবর্তী প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচন এবং তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ পুনরায় সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন করে। রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থা থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় রূপান্তর এই ঐতিহাসিক পরিবর্তন তাঁর শাসনামলের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে মাইলষ্টোন হিসেবে লিখা থাকবে। এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দীর্ঘমেয়াদে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেয়।
তিনি মোট তিনবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮২ সালের সামরিক শাসন, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রেক্ষাপটে তিনি সামনে আসেন এক অনিবার্য নেতৃত্ব হিসেবে। তাঁর সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬০% নারী শিক্ষক নিয়োগ, বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ, মেয়েদের বিনাবেতন লেখাপড়ার সুযোগ, চাকুরীতে নারীদের নিয়োগ, নারীর সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, অবকাঠামো উন্নয়ন, গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ উৎপাদন, টেলিযোগাযোগ বিস্তার এবং খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারের দিকে গুরুত্ব দেন। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে মোবাইল ফোন খাতের যাত্রা, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের বিকাশে তাঁর সরকারের নীতিগত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নারী নেতৃত্ব ও নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে খালেদা জিয়ার অবস্থান ছিল বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি দেশে তিনি একাধিকবার সরকার প্রধানের দায়িত্ব পালন করে আন্তর্জাতিক পরিসরে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের এক শক্তিশালী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তাঁর সময়কালে মেয়েদের শিক্ষায় উপবৃত্তি কর্মসূচি সম্প্রসারণ, নারী শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ নারীদের সামাজিক দৃশ্যমানতা বাড়াতে বিভিন্ন নীতি বাস্তবায়িত হয়। এসব উদ্যোগ বাংলাদেশে নারী শিক্ষার হার বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
তিনি বিএনপিকে একটি গণভিত্তি দলে রূপ দেন, যার সাংগঠনিক কাঠামো দেশব্যাপী বিস্তৃত হয়। দীর্ঘ সময় বিরোধী দলে থেকেও তিনি সংসদীয় রাজনীতি, নির্বাচন এবং জনগণের অধিকার আদায়ের প্রশ্নে দলের অবস্থান দৃঢ় রাখেন। গণতান্ত্রিক আন্দোলন, ভোটাধিকার প্রশ্নে তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি ও ২০ দল রাজপথে সক্রিয় ছিল বহু বছর।
খালেদা জিয়ার জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় ছিল তাঁর কারাবাস ও অসুস্থতার সময়কাল। ফ্যাসিবাদী শাসনকালে দীর্ঘ বন্দিজীবন এবং চিকিৎসা সেবাবিহীন গুরুতর অসুস্থতা সত্ত্বেও তিনি রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক থেকে গেছেন। তাঁর এই সময়টি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সহনশীলতা, ধৈর্য ও ব্যক্তিগত দৃঢ়তার উদাহরণ হিসেবে লিপিবদ্ধ থাকবে। শারীরিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তিনি দলীয় নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে সক্রিয় ছিলেন, যা তাঁকে অনুসারীদের কাছে আরও দৃঢ় ও অনমনীয় নেতৃত্বের প্রতীক করে তোলে।
আন্তর্জাতিক পরিসরে খালেদা জিয়া দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী নারী নেত্রী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কমনওয়েলথ, ওআইসি এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বিশ্লেষকরা তাঁকে দক্ষিণ এশিয়ার “টু বেগম” রাজনীতির এক কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন যেখানে নারী নেতৃত্ব দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান করেছে। মুসলিম বিশ্বের রাজনীতিতে নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর অবস্থান বহু গবেষণা ও আলোচনার বিষয় হয়েছে।
১৯৯১ সালের ৩০শে এপ্রিল চট্রগ্রামের ঘুনিঝড়ে বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং মানবিক মূল্যবোধের কথা দেশ ও জাতি স্মরণ করবে। দলীয় সংকীর্ণতার পরিবর্তে তিনি উদার ও মানবিক নেতা হিসেবে বাঘা বাঘা রাজনীতিবিদদের নিকট প্রশংসনীয় ও আস্তার প্রতিক ছিলেন। শেখ হাসিনা ভারতের তাবেদার ও লেন্দুপ দর্জির ভুমিকা তিনি বিরোধিতা করেছেন। ভারতের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তিনি আন্তর্জাতিক বিশ্বে মাথা উচু করে জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রনব মুখার্জিকে স্বাক্ষাতকার দেন নাই। ফারাক্ষা ইস্যুতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে অভিযোগ তুলেছেন। রাজনৈতিক দলের লিডারদের সাথে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সংকটে সহমর্মিতা প্রকাশ এবং সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টে সংবেদনশীলতা তাঁকে একজন মানবিক রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত করেছে। যুদ্ধাপরাধী মামলায় জামায়াত নেতাদের অন্যায়ভাবে ফাসীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। ফেলানী হত্যাকাণ্ড, ৫৭জন সেনাবাহিনীর অফিসার হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। ফ্যাসিস্ট সরকারের অগণতান্ত্রিক সংসদ নির্বাচনের অংশগ্রহণ করেন নাই। এরশাদের শাসনকালে কোন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন নাই। তাই তাকে আপোষহীন নেত্রী বলা হয়ে থাকে।
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম আপোষহীন ও দেশপ্রেমিক একটি অধ্যায়ের ইতি টানল। তাঁর জীবন ছিল গৃহবধু, রাজনীতিবিদ, প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেতা, রাজনৈতিক উত্থান-পতন, ক্ষমতা, আন্দোলন ও সংগ্রাম, আপোষহীন ধৈর্যের সমন্বয়। তিনি ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে, সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাকারী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশপ্রেমিক নারী নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে। সময়ের সঙ্গে তাঁর শাসনকালের অর্জনগুলো ইতিহাসের পাতায় গভীরভাবে মূল্যায়িত হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া দেশ প্রেমিক ও ফ্যাসিস্ট বিরোধী গণতন্ত্রের আপোষহীন নেত্রী হিসেবে ইতিহাস হয়ে থাকবেন।