কিশান মোশারফ:
বাংলা নাট্যজগতে সেলিম আল দীনকে প্রাচ্য ও প্রাচীন জীবনবোধ আহরিত পরিচিত শিল্পরূপের নান্দনিক শিল্প দ্রষ্টা বলাচলে। তিনি কেবল একজন সফল নাট্যকার নন, বরং একজন নাট্যাচার্য যিনি বাঙালির হাজার বছরের নাট্যশিল্প-নন্দনতত্ত্বকে আধুনিক শিল্পচিন্তার কেন্দ্রে পুন:প্রতিষ্ঠা করেছেন। পাশ্চাত্য নাট্যতত্ত্বের অনুকরণ ও বিভাজনমূলক শিল্পদর্শনের বিপরীতে দাঁড়িয়ে তিনি প্রবর্তন করেন এক স্বতন্ত্র শিল্পভাবনা, যার নাম দেন ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্ব’। এই তত্ত্বের মধ্য দিয়ে বাস্তব ও পরাবাস্তব, ইতিহাস ও মিথ, ব্যক্তি ও সমষ্টি সবকিছু মিলিত হয়ে এক বহুমাত্রিক নাট্যভাষা নির্মাণ করেছে, যা মূলত বাঙালির জীবন ও সংস্কৃতির গভীর শিকড়ে প্রোথিত।
সেলিম আল দীনের নাট্যজীবনের শুরুতে পাশ্চাত্য নাট্যরীতির প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ব্রেশট, স্ট্যানিস্লাভস্কি কিংবা অ্যাবসার্ড থিয়েটারের নানা অনুষঙ্গ তাঁর প্রাথমিক রচনায় উপস্থিত ছিল। তবে খুব দ্রুতই তিনি উপলব্ধি করেন—পাশ্চাত্যের শিল্পবিভাজন, যেমন বাস্তব বনাম কল্পনা, ট্র্যাজেডি বনাম কমেডি, উচ্চশ্রেণি বনাম নিম্ন শ্রেণি বাঙালির সামগ্রিক জীবনবোধকে ধারণ করতে অপারগ। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি ফিরে তাকান বাংলার মধ্যযুগীয় নাট্যরীতি, মঙ্গলকাব্য, পাঁচালি, পালাগান, যাত্রা ও লোকবিশ্বাসের ভাণ্ডারের দিকে।
এই প্রত্যাবর্তন কোনো নস্টালজিক আবেগ নয়; বরং তা ছিল এক গভীর সাংস্কৃতিক অনুসন্ধান। সেলিম আল দীন দেখান, বাঙালির শিল্পচেতনায় বাস্তব ও অতিপ্রাকৃত কখনো আলাদা নয় দুটো পরস্পরের সঙ্গে জড়িত। এই উপলব্ধিই তাঁর দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্বের ভিত্তি।
‘দ্বৈতাদ্বৈত’ শব্দটি ভারতীয় দর্শন থেকে যুক্ত হয়বস্তু একই সঙ্গে পৃথকও, আবার অভিন্নও। সেলিম আল দীন এই দর্শনকে শিল্পক্ষেত্রে প্রয়োগ করেন। তাঁর মতে, নাটকে বাস্তব ও পরাবাস্তব, ইতিহাস ও মিথ, ব্যক্তি ও সমাজ সবকিছু আলাদা আলাদা সত্তা নয়, বরং একে অপরের ভেতরেই অবস্থান করে।
এই শিল্পতত্ত্বে কোনো সরল দ্বন্দ্ব নেই, নেই চূড়ান্ত সমাধান। বরং এখানে রয়েছে স্তরায়িত বাস্তবতা। একজন দরিদ্র মানুষ যেমন বাস্তব সামাজিক শোষণের শিকার, তেমনি তার বিশ্বাস, লোককথা, স্বপ্ন এবং ভয়ও তার বাস্তবতার অংশ। সেলিম আল দীনের নাটকে তাই ভূত, দেবতা, কিংবদন্তি বা অলৌকিক ঘটনা কেবল কল্পনা নয় সেগুলো মানুষের জীবনযাপনের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ।
সেলিম আল দীনের নাটকের প্রধান চরিত্ররা তথাকথিত ‘নায়ক’ নয়। তারা কৃষক, জেলে, মাঝি, নারী, ভবঘুরে, নিপীড়িত ও প্রান্তিক মানুষ। তাঁর নাটকে ইতিহাস লেখা হয় রাজাদের মাধ্যমে নয়, লেখা হয় সাধারণ মানুষের যন্ত্রণা ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। এই দৃষ্টিভঙ্গি দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
নাটকগুলোতে সামাজিক নৃতাত্ত্বিক পটভূমি অত্যন্ত শক্তিশালী। ভাষা, আচার, খাদ্যাভ্যাস, লোকবিশ্বাস সবকিছু মিলিয়ে তিনি নির্মাণ করেন এক জীবন্ত সাংস্কৃতিক জগৎ। এই জগতে ব্যক্তি ও সমাজ আলাদা নয়; ব্যক্তির সংকটই সমাজের সংকট।
বাস্তব ও পরাবাস্তবের সহাবস্থান : সেলিম আল দীনের নাটকে বাস্তবতার সঙ্গে পরাবাস্তবের মেলবন্ধন খুব স্বাভাবিক। কিত্তনখোলা কিংবা চাকা নাটকে নদী, চাকা বা যাত্রাপথ কেবল বস্তু নয় সেগুলো প্রতীক, স্মৃতি ও ইতিহাসের ধারক। এই প্রতীকগুলো নাটককে একদিকে বাস্তব করে তোলে, অন্যদিকে তাকে নিয়ে যায় সময় ও স্থানের সীমানার বাইরে। এখানে পাশ্চাত্য ‘সুররিয়ালিজম’-এর মতো বিচ্ছিন্ন কল্পনার বিস্ফোরণ নেই। বরং পরাবাস্তব আসে লোকজ বিশ্বাস ও সামষ্টিক চেতনা থেকে। ফলে দর্শক বা পাঠক এটিকে নিজের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন মনে করে না।
নাট্যরীতির নবতর নির্মাণ : দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্বের প্রয়োগে সেলিম আল দীন নাট্যরীতিতেও নতুনত্ব আনেন। তাঁর নাটকে গীত, কোরাস, বর্ণনা ও অভিনয় একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়। নাট্যসংলাপ কখনো কবিতার মতো, কখনো আবার কথ্য ভাষার কাছাকাছি। এই মিশ্রণই তাঁর নাটককে আলাদা মাত্রা দেয়।
জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন, মুনতাসির ফ্যান্টাসী, শকুন্তলা, কেরামত মঙ্গল, হাতহদাই, যৈবতী কন্যার মন, নিমজ্জন, ধাবমান, স্বর্ণবোয়াল প্রতিটি নাটকেই দেখা যায় তিনি নিজেকে বারবার অতিক্রম করেছেন। বিষয়, ভাষা ও কাঠামোয় ক্রমাগত নতুন পরীক্ষা চালিয়েছেন, কিন্তু মূল দর্শন থেকে সরে যাননি।
সেলিম আল দীন শুধু নাটক লেখেননি, নাট্যচর্চার কাঠামোও নির্মাণ করেছেন। নাসির উদ্দিন ইউসুফের সঙ্গে তিনি গড়ে তোলেন গ্রাম থিয়েটার আন্দোলন (১৯৮১–৮২)। এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল শহরকেন্দ্রিক নাট্যচর্চার বাইরে গিয়ে গ্রামবাংলার মানুষের নিজস্ব নাট্যরীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা। গ্রাম এবং শহরের নাটক, নাট্যচর্চা ও শিল্প ভাবনার মেল বন্ধন তৈরি করা।
গ্রাম থিয়েটার দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্বের বাস্তব প্রয়োগ। এখানে নাটক ছিল না কেবল মঞ্চনির্ভর শিল্প; বরং তা ছিল একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুশীলন। এই আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালির লোকনাট্য বিশ্বসংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে।
সেলিম আল দীনের দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্ব বাংলা নাটকে এক মৌলিক দার্শনিক ও নান্দনিক সংযোজন। তিনি প্রমাণ করেছেন, আধুনিক হওয়া মানেই পাশ্চাত্য অনুকরণ নয়; বরং নিজের সংস্কৃতিকে গভীরভাবে জানাই আধুনিকতার প্রকৃত শর্ত। বাস্তব ও পরাবাস্তবের সহাবস্থান, প্রান্তিক মানুষের কেন্দ্রীয়তা এবং লোকজ নন্দনতত্ত্বের সৃজনশীল পুনর্গঠন সব মিলিয়ে তাঁর নাট্যদর্শন বাংলা সাহিত্যকে দিয়েছে এক স্বতন্ত্র পরিচয়।
বাংলা নাটক আজ বিশ্ব সংস্কৃতির যে পরিসরে জায়গা করে নিয়েছে, তার পেছনে সেলিম আল দীনের অবদান অনস্বীকার্য। দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্ব কেবল একটি নাট্যতত্ত্ব নয়; এটি বাঙালির জীবনবোধের শিল্পরূপ যেখানে বিভাজন নয়, সহাবস্থানই সত্য।
লেখক : নাট্যকার, লেখক ও সাংবাদিক।