মার্চ ৬, ২০২৬ ০৪:২৯

জোটের নির্বাচন দেশপ্রেম না ক্ষমতার কাড়াকাড়ি

ড. খন্দকার নাজমুল হক

জোট মহাজোট রাজনৈতিক দলের খেলা খেলতে খেলতে জেনারেল এরশাদ নয় বছর ক্ষমতায় ছিলো। এরশাদকে তাড়ানোর ৭ দলীয় জোট, ৮ দলীয় জোট, ৫ দলের বামদলীয় জোট এবং জামায়াতে ইসলামী আন্দোলন গড়ে তুলেছিল বিধায় ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ সালে দেশপ্রেমিক নাগরিকরা বিজয় অর্জন করে। ১৯৯১ সালে বিএনপি, আওয়ালীগ, বামদল ও জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিক দলের জোট ছাড়াই নির্বাচন করে। ইসলামী দলগুলোর মধ্যে একমাত্র জামায়াতে ইসলামী ১৯৯১ সালে ১৮টি আসন লাভ করে। তখন ভোটের দিক দিয়ে জামায়াত ৫০টি আসনে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ স্থান অর্জন করে। ১৯৯১ সালে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে। জামায়াতে ইসলামী একটি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে পরিচিত লাভ করেছিল।


স্বাধীন বাংলাদেশে ক্ষমতায় থেকে যে সকল জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিলো সেখানে ক্ষমতাসীনরা নিরস্কুশ সংখ্যা গরিষ্টতা অর্জন করে ক্ষমতা দখল করেছিল। ভোট চুরি, ব্যালট বাক্স চিনতাই নিত্যকার ঘটনা ছিল। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, ১৯৭৯ সালে বিএনপি, ১৯৮৬ সালে জেনারেল এরশাদের জাপা এবং ১৯৮৮ সালের জাপা। ১৯৯১ সাল থেকে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ধারা অব্যাহত থাকে। ভোট চুরি, কেন্দ্র দখল, হোন্ডা গুন্ডার রাজনীতি বিলুপ্ত হয়ে যায়। ২০০১ সাল থেকে জোট মহাজোট খেলা শুরু হয়ে যায়। ৪ দলীয় জোটের অংশীদার হিসেবে বিএনপির সাথে জামায়াত ৩৯টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ১৭টি আসন পেয়েছিল। জামায়াতের রাজনৈতিক ত্যাগের বিনিময়ে ৪ দলীয় জোট ভূমিধস বিজয় অর্জন করে। জামায়াতে ইসলামী বিনিময়ে দুটো মন্ত্রী পেয়েছিল। বিএনপির বিরুদ্ধে হাওয়া ভবন দুনীতির তুলেছিল প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার। বিএনপির আমলেই বাংলাদেশ ৪ বার দুনীতিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। তখন জামায়াতে ইসলামীর দুটো মন্ত্রণালয়ে কোন দুনীতির কলংক ছিল না।


২০০৮ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনা ও এরশাদের মহাজোট প্রশাসনের মাধ্যমে ভুমিধস বিজয় অর্জন করে এবং ভারতের তাবেদার লেন্দুপ দর্জির ভুমিকা পালন করে। হাসিনা কেয়ারটেকার সরকার পদ্ধতি বাতিল করে ফ্যাসিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠা করে। আওয়ামী লীগ ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচন সংবিধানের দোয়াই দিয়ে গণতন্ত্র, ভোটের অধিকার হরণ করে, দিনের ভোট রাতে, আমি ডামির  নির্বাচন করে। ভারতের তাবেদার রাস্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। ৩৬ জুলাই বিপ্লবে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ায় রাজনৈতিক দল গুলো সংস্কার, বিচার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হবে। আবারও জুলাই বিপ্লবের চেতনা লালনকারী রাজনৈতিক দলের মধ্যে জোট জোট রাজনৈতিক খেলা শুরু হয়েছে। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জোট জামায়াতকে মাত্র ৩৭টি আসনে নির্বাচন করার সুযোগ দিয়েছিল। ১৯৯১ সালে যেসব আসনে জামায়াত ১০/১৫ হাজার ভোটে পরাজিত হয়েছিল, সেসব আসনে জোটের রাজনীতির কারণে নির্বাচন করার সুযোগ পায়নি। দীর্ঘ ২৫ বছর জোটের কারণে জামায়াতে ইসলামীর  প্রার্থীদের নির্বাচন থেকে দূরে থাকতে হয়েছিল। এসবের প্রভাব জামায়াতের অভ্যন্তরেও ছিল।


ইসলামী আন্দোলন  সংসদ সদস্য প্রার্থীদের ডেকে মতামত নিয়েছে। অধিকাংশের মত হলো একক নির্বাচন করার। ১১ দলের পক্ষ থেকে প্রেস কনফারেন্স করে জোটের ভূমিধস বিজয় অর্জন করতে কি কি করা হবে জাতীকে জানানো হবে। যদি ইসলামী আন্দোলন জোটে না আসে, তাদের জন্য বরাদ্দকৃত আসন বাকি রেখেই হয়তো আজকের প্রেস কনফারেন্স হয়ে যাবে। ইসলামী আন্দোলনকে সমঝোতায় ৪৫টি আসন ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ইসলামী আন্দোলনের দাবি এখন ৬৫-৭০ আসনের মতো। নির্বাচন পরবর্তী সরকার কাঠামো নিয়েও স্পষ্ট ঘোষণা চায়। সরকার গঠিত হলে কে কোথায় থাকবে, এগুলো স্পষ্ট চায়। ইতোমধ্যে অনেক কিছু স্পষ্ট করা হয়েছে, যেগুলো আরও স্পষ্ট করা দরকার, সেগুলো নিয়ে আলাপ হতে পারে। ইসলামী আন্দোলন একটি সুবিধাবাদী রাজনৈতিক দল,  ত্যাগের বিনিময়ে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে চায়না। জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ জোট রাজনৈতিক খেলায় ও সমঝোতায় নিজদের প্রভাবিত আসন ছেড়ে দিতেছে । সেই আসনের প্রার্থী এবং নেতাকর্মীরা স্বাভাবিকভাবেই নাখোশ।


ইসলামী আন্দোলনকে বিচক্ষণতার সাথে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা এবং  জামায়াতকে শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত জোট টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। ইসলামী আন্দোলনের সংসদীয় রাজনীতিতে ১১ দলের জোটে  থাকা দেশের জন্যই জরুরি। জামায়াতকে যেভাবে অবিশ্বস্ত সঙ্গী বিবেচনা করছেন, মোটেও এমনটা নয়। জামায়াত বিশ্বস্ততার সাথে সমঝোতার সঙ্গীদের সাথে সর্বোচ্চ ডেডিকেশন দিয়ে আচরণ করে আসছে। ইসলামী রাজনৈতিক দলের লিডারদের  দেশপ্রেমের পরিচয় দিতে না পারলে জুলাই বিপ্লব শেষ হয়ে যাবে।


প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান এবং ডেইলি স্টার মাহফুজ আনাম তারেক জিয়ার গাঁড়ে উঠে বসেছেন। তারেক জিয়াকে কুপোকাত করতে বামদল ও ভারতের তাবেদার লেন্দুপ দর্জিরা বিএনপির সাথে জোটবদ্ধ করেছে। তারেক জিয়ার জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ দলের ভিতরে ভারতের তাবেদারদের নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশ্বে রাজনীতি করা। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়া ভারতের তাবেদার কে বিএনপিতে আশ্রয় দেন নাই, ভারতের তাবেদার সাজেন নাই। তারেক জিয়াকে ভারতের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী চেতনার পরিচয় দিতে না পারলে ১৭৫৭ সালে  নবাব সিরাজুদ্দৌলার যে পরিনতি হয়েছিলো তাকেও সেই পরিনতি ভোগ করতে হবে।

ভারতের তাবেদারী করে পাতানো সংসদ নির্বাচন করা হলে, সেই রাজনৈতিক ধারার বিরুদ্ধে আরেকটি জুলাই বিপ্লব সংঘটিত  হবে। ওসমান হাদী জীবন দিয়েছে ভারতের তাবেদারীর বিরুদ্ধে। এ দেশের ১৮ কোটি মানুষকে ভারতের বিরুদ্ধে লড়াই করে টিকে থাকতে হবে। ড. ইউনুস জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়ে ইতিহাস তৈরি করে গেছেন। বিএনপি জামায়াতকে ভারতের তাবেদারী থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করতে হবে। প্রথম আলো, ডেইলি স্টার থেকে নিরাপদ থাকতে হবে।
লেখক : গবেষক ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিজ্ঞাপন