মার্চ ৬, ২০২৬ ০৪:২৯

জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমান 

ন্যায্যতার ভিত্তিতে ফেনীর সব সমস্যার সমাধান করা হবে

নিজস্ব প্রতিনিধি :

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও ১১ দলীয় জোটের প্রধান ডা.শফিকুর রহমান বলেছেন, ৩৬ জুলাই এর আগে গোটা দেশ ছোপ ছোপ রক্তে ভরে গিয়েছিল। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছি। সেই পিলখানা, আলেম-ওলামা, ছাত্র-জনতা খুন-গুমের শিকার হয়েছেন। ফেনীবাসী ছিলেন আরো সন্ত্রাসের রাজ্যে। বংশানুক্রমে সন্ত্রাস। ফেনী জেলার বাসিন্দারা জুলাইজুড়ে আন্দোলন করেছেন। ফেনীর মেয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আধিপত্যবাদকে প্রশ্রয় দেননি। ফেনী জেলার মানুষ মকবুল আহমাদ দূর্দীনে জামায়াতের নেতৃত্ব দিয়েছেন।

তিনি আরো বলেন, বিপ্লবের পরপরই সীমান্তের ওপার থেকে তেড়ে আসা পানিতে বাঁধ ভেঙ্গে ফেনী জেলা সমুদ্রে পরিনত হয়েছিল। কুমিল্লা, নোয়াখালী, লক্ষীপুর জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দু:খের সঙ্গী-সাথী হতে তখন এসেছিলাম। ফেনী নদী নিয়ে কথা বলায় আবরার ফাহাদকে জীবন দিতে হয়েছে। দেশের ন্যায্য প্রাপ্যের কথা বলেছিল। আধিপত্যবাদের দোসররা তাকে সহ্য করতে পারেনি। মহিপালে ১২ জনকে শহীদ করা হয়েছে। তাদের শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করতে হবে।

গতকাল শুক্রবার সকালে ফেনী সরকারি পাইলট হাই স্কুল মাঠের নির্বাচনি জনসভায় তিনি প্রধান অতিথির ভাষন দেন। ১১টার দিকে মঞ্চে উঠলে উপস্থিত নেতাকর্মী ও সমর্থক শ্লোগানের মাধ্যমে তাকে স্বাগত জানান। তিনি হাত নেড়ে নেতা-কর্মীদের শুভেচ্ছার জবাব দেন। জনসভাকে ঘিরে নেতাকর্মীদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করে।

পৌনে ১১টার দিকে আকাশপথে হেলিকপ্টার যোগে ভাষা শহীদ সালাম স্টেডিয়ামে অবতরণ করেন। জনসভায় জেলার প্রত্যন্ত এলাকা থেকে আসা জনসমাগম সামাল দিতে এবং সবাইকে মঞ্চের দৃশ্য দেখানোর জন্য ৫টি বিশাল পর্দায় (এলইডি স্ক্রিন) সভা সমপ্রচার করা হয়।

অর্থনীতিতে ফেনীর বিশেষ অবদান রয়েছে উল্লেখ করে জামায়াত আমীর ডা.শফিকুর রহমান বলেন, ১৮ কোটি মানুষের দেশে কোন জেলা মেডিকেল কলেজ বাদ থাকবেনা। দেশবাসী সুযোগ দিলে সরকারী মেডিকেল কলেজ হবে। বিশেষায়িত হাসপাতাল হবে। বাঁধের শান্তিপুর্ণ সমাধান করা হবে। মানসম্মত স্টেডিয়াম নাই। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন স্টেডিয়াম হবে। ন্যায্যতার ভিত্তিতে সব সমস্যার সমাধান করা হবে।

দাঁড়িপাল্লা-ঈগল প্রতীকে ভোট চেয়ে জামায়াত আমীর বলেন, ১১টি দল একাকার। ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ এর প্রার্থী। আর কোন মান-অভিমান চলবেনা। আধিপত্যবাদ, মামলা বানিজ্য, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ভোট তুলে আনতে হবে। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ১১ দলকে বিজয়ী করতে হবে। ১২ তারিখ প্রথম ভোট হবে হ্যাঁ। হ্যাঁ মানে আজাদী। রাজার ঘরে জন্ম হলে রাজা হবে, মন্ত্রীর ঘরে জন্ম হলে মন্ত্রী হবে। এই সংস্কৃতিকে পাল্টে দিতে হবে। দূর্নীতিকে লাল কার্ড দেখাতে চাই। সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করতে চাই। জুলাই যোদ্ধাদের সম্মান করুন। সেই সম্মান করলে মাথা গরমের সুযোগ নেই। খবরদার মা’দের সম্মান নিয়ে টান দেবেননা, আল্লাহর আরশ কেঁপে উঠবে। মা’য়ের বেইজ্জতি সহ্য করতে পারবোনা। হাদী, রেজাউল করিম, আবু সাঈদের কী দোষ ছিল? ‘বুকের ভিতর তুমুল ঝড়, বুক পেতোছি গুলি কর’ শ্লোগান দিয়ে তারা প্রাণ দিয়েছেন। বীরেরা পালায়না, প্রত্যেকটি মায়ের ঘরে বীরের জন্ম হোক। 

তিনি আরও বলেন, যুবকদের বেকার ভাতা দিতে চাইনা, তাদের কাজ দিয়ে মর্যাদা তুলে দিতে চাই। যুবক-তরুণরা বুকের দিকে আঙ্গুল তুলে বলতে হবে ‘আমিই বাংলাদেশ’। মায়েদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। মায়েদের দৃষ্টি পরিবর্তনের বাংলাদেশের দিকে। মায়েদের দোয়া আমাদের শক্তি। তাদের আস্থার প্রতিদান দিতে লড়ে যাবো। 

জেলা আমির মুফতি আবদুল হান্নানের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারী আবু তাহের মোহাম্মদ মাছুম, জাগপা সভাপতি রাশেদ প্রধান, শ্রমিক কল্যান ফেডারেশনের সহ-সভাপতি কবির আহমদ, ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম, শ্রমিক কল্যাণের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি আতিকুর রহমান।

জেলা সেক্রেটারী মুহাম্মদ আবদুর রহীমের পরিচালনায় ফেনী-১ আসনের প্রার্থী এসএম কামাল উদ্দিন, ফেনী-২ আসনের প্রার্থী মজিবুর রহমান মঞ্জু, ফেনী-৩ আসনের প্রার্থী ডা. মোহাম্মদ ফখরুদ্দীন মানিক ছাড়াও বক্তব্য রাখেন সাবেক জেলা আমীর অধ্যাপক লিয়াকত আলী ভূঞা ও একেএম শামসুদ্দিন, নায়েবে আমীর অধ্যাপক আবু উউসুফ ও মাওলানা মাহমুদুল হক, খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য মোহাম্মদ আলী মিল্লাত, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কার্যকরি পরিষদ সদস্য মাজহারুল ইসলাম, শহর সভাপতি ওমর ফারুক ও জেলা সভাপতি আবু হানিফ হেলাল, এনসিপির সংগঠক আজিজুর রহমান রিজভী প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

মুফতি আবদুল হান্নান জানান, এই জনসভা থেকে ডা. শফিকুর রহমান গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দেন। এই নির্দেশনার ওপর ভিত্তি করেই তৃণমূলের নেতাকর্মী সহ সর্বস্তরের জনগন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের কার্যক্রম পরিচালনা হবে।

আলেমদের নিয়ে ষড়যন্ত্র ও মিথ্যাচার বন্ধের আহ্বান জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে কওমি মাদ্রাসা বন্ধ করে দেয়া হবে এমন প্রচারণা জঘন্য মিথ্যাচার। কওমি মাদ্রাসা আমাদের কলিজা। আলেম ওলামার ব্যাপারে একটা কথা ছড়ানো হচ্ছে, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে কওমি মাদ্রাসা থেকে যারা ফারিগ হয়েছেন, শিক্ষা নিয়েছেন সেই মাদ্রাসাগুলো বন্ধ করে দেয়া হবে আর মসজিদ থেকে তাদেরকে বিদায় করে দেয়া হবে। এটা জগতের একটা জঘন্য মিথ্যাচার।’

তিনি জোর দিয়ে বলেন, কওমি মাদ্রাসা আমাদের হৃদয়, আমাদের কলিজা। ইসলামী শিক্ষা মূলত তারাই এখন ধরে রেখেছেন। আমরা কথায় নয়, কাজে প্রমাণ করব কওমি মাদ্রাসা মানেই আমাদের কলিজা। ইনশাআল্লাহ। যারা ভয় দেখায় তারা মতলববাজ। আমরা আশা করি তাদের এই মতলব সবাই বোঝে।

নারীদের অধিকার ও অপপ্রচার প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘বলা হয় জামায়াতে ইসলামী বা তার সঙ্গীরা ক্ষমতায় গেলে মা-বোনদের ঘরের বাইরে বের হতে দেবে না। আমাদের মা-বোন, স্ত্রী-কন্যা আছে। তারা যদি ঘরের বাইরে গিয়ে অবদান রাখতে পারে, উচ্চশিক্ষা নিতে পারে, তবে বাংলাদেশের প্রত্যেকটি মাকে আমরা সেভাবেই গড়ে তুলব। আমরা মায়েদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর।’

নির্বাচনী সহিংসতা বা উত্তেজনার বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় আমরা মাথা গরম হালত দেখতে পাচ্ছি। শীতের দিনে মাথা গরম করলে চৈত্র মাসে কী করবেন আপনারা? একটু মাথাটা ঠান্ডা রাখেন। জুলাই যোদ্ধাদের সম্মান করুন। মা-বোনদের গায়ে হাত তুলবেন না। মায়েদের একটা দীর্ঘশ্বাস আপনাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দেবে।’

বক্তব্যে বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘ফেনী নদী নিয়ে দুটি কথা বলেছিল আবরার, এজন্য তাকে জীবন দিতে হয়েছে। ফেনীবাসী আবরার ফাহাদের রুহকে আপনাদের কাছে রেখে গেলাম। যতদিন ফেনী দুনিয়ায় বেঁচে থাকবে, আবরার ফাহাদকে আপনাদের কলিজায় একটু জায়গা দিয়ে রাখবেন।’

সমাবেশে ডা. শফিকুর রহমান ফেনী-১ আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী অ্যাডভোকেট কামাল উদ্দিনের হাতে দাঁড়িপাল্লা এবং ফেনী-২ আসনে জোট প্রার্থী জহিরুল ইসলামের হাতে ঈগল প্রতীক তুলে দিয়ে তাদেরকে বিজয়ী করার আহ্বান জানান। তিনি নেতাকর্মীদের ভোটকেন্দ্র পাহারা দিয়ে ফলাফল নিশ্চিত করে ঘরে ফেরার নির্দেশ দেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিজ্ঞাপন