মার্চ ৬, ২০২৬ ০৪:৩০

খেলাপিদেরকে ‘না’ বলুন

মোহাম্মদ ইউনুছ

ঋণখেলাপিরা দেশ ও জাতির শত্রু। তারা দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের অন্যতম মূল কারিগর। ঋণখেলাপিকে মূলত দুই শ্রেণিতে বিন্যাস করা যায় প্রথমত ইচ্ছাকৃত এবং দ্বিতীয়ত অনিচ্ছাকৃত বা প্রাকৃতিক কারণে সৃষ্ট। বড় বড় ঋণখেলাপিরা সাধারণত প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা ইচ্ছাকৃতভাবেই ঋণ পরিশোধ করে না। দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে ছোট ছোট ঋণগ্রহীতারা, যারা একবার লোকসানের মুখে পড়লে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারে না।


বাংলাদেশ ব্যাংকের লোন ক্লাসিফিকেশন এন্ড প্রোভিশনিং পলিসি অনুযায়ী যে ঋণ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিশোধ না হওয়ায় সাব স্টান্ডার্ড, ডাউব্টফুল অথবা ব্যাড এন্ড লস হিসেবে শ্রেণিকৃত হয়, সেই ঋণের গ্রাহকই ঋণখেলাপি হিসেবে বিবেচিত হয় ।


ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) আইন, ২০২৩-এর ধারা ৩ অনুযায়ী, “ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতা” অর্থ এইরূপ কোনো খেলাপি ঋণগ্রহীতা ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি, যিনি বা যাহা— (১) নিজের, তাঁর পরিবারের সদস্যের, স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির অনুকূলে কোনো ব্যাংক-কোম্পানি বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে গৃহীত ঋণ, অগ্রিম, বিনিয়োগ বা অন্য কোনো আর্থিক সুবিধা কিংবা তার অংশ বা তার ওপর আরোপিত সুদ বা মুনাফা পরিশোধে সক্ষম থাকা সত্ত্বেও পরিশোধ করেন না।


বর্তমানে দেশে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৬ লক্ষ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি গুরুতর সতর্কবার্তা। ঋণ গ্রহণ করে তা পরিশোধ না করার প্রবণতা আজ একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। পরিতাপের বিষয় হলো, যাদের হাতে অর্থের প্রাচুর্য, সেই ধনী শ্রেণির একটি বড় অংশ দেশীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আস্থা না রেখে দেশে সঞ্চয় না করে বিদেশে অর্থ পাচারে উৎসাহী। অথচ স্বল্প ও মধ্য আয়ের মানুষই সঞ্চয়ের প্রকৃত ভিত্তি। তারাই কষ্টার্জিত অর্থ ব্যাংকে জমা রাখেন, এবং সেই অর্থের ওপর ভর করেই ব্যাংক গুলো ঋণ বিতরণ করে। অর্থাৎ, স্বল্প ও মধ্য আয়ের মানুষের সঞ্চয়ই শেষ পর্যন্ত খেলাপি ঋণের ঝুঁকি বহন করছে।


টিআইবির রিপোর্ট অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট প্রার্থীর প্রায় ২৫ শতাংশেরই কোনো না কোনো ঋণ বা দায় রয়েছে। এসব প্রার্থীর সর্বমোট ঋণের পরিমাণ ১৮ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকারও বেশি। একজন ঋণখেলাপি প্রার্থীর আপিল শুনানিতে এক নির্বাচন কমিশনার বলেন, “মনোনয়নপত্র বৈধ করলাম, ব্যাংকের টাকাটা দিয়ে দিয়েন। টাকাটা না দিলে জনরোষ তৈরি হবে।”


এমন কমিশনার দিয়ে নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হতে পারে, তা নিয়ে মানুষের আশঙ্কা থেকেই যায়। তাছাড়া নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের হলফনামায় প্রদত্ত আয়, সম্পদ ও ঋণদায় সংক্রান্ত তথ্য কতটা সঠিক এবং সেই আয়-সম্পদ কতটা বৈধভাবে অর্জিত—তা যাচাই করা উচিত ছিল; কিন্তু তা করা হয়নি।


নির্বাচনে অন্তত ৪৫ জন ঋণখেলাপি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যাদের বেশিরভাগই বিএনপির মনোনীত প্রার্থী। যেমন— চট্টগ্রাম-৪: আসলাম চৌধুরী- ১৭০০ কোটি টাকা। সিলেট-১: খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির- ৮৪০ কোটি টাকা। বগুড়া-১: কাজী রফিকুল ইসলাম- ৭৬৫ কোটি টাকা। যশোর-৪: টি এস আইয়ুব- ১৩৮ কোটি টাকা। ভোলা-২: হাফিজ ইব্রাহিম- ১০৯ কোটি টাকা। কুমিল্লা-৪: মনজুরুল আহসান মুর্শী- ৩৮ কোটি টাকা। কুমিল্লা-৩: শাহ মোফাজ্জল কারেকবাদ- ৩০ কোটি টাকা।


দেশের অর্থনীতি যখন নাজুক অবস্থায়, তখন সরকারের উচিত ছিল ঋণ আদায়ে আরও কঠোর হওয়া। কিন্তু তা না করে সরকার ঋণখেলাপিদের জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ করে দিয়েছে। এখন সমস্যাটা হলো—একজন ঋণখেলাপি যখন নির্বাচিত হবেন, তখন তিনি আর ঋণের টাকা পরিশোধ করবেন না; বরং কীভাবে আরও ব্যাংক থেকে টাকা বের করা যায়, সে পথ খোঁজার চেষ্টাই করবেন। এতে অন্য ঋণগ্রহীতারাও ঋণ পরিশোধ না করতে উৎসাহিত হবেন। ফলে নতুন নতুন ঋণখেলাপির সৃষ্টি হবে। এর ফলশ্রুতিতে ব্যাংক ব্যবস্থা তথা দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড আরও ভেঙে পড়বে, যা কারো জন্যই সুখকর নয়।


রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপের ফলে অনেক ক্ষেত্রেই ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা নষ্ট হয়েছে, যা খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং ঋণ পুনঃতফসিল ও মওকুফের অপসংস্কৃতি বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি।


আমাদের সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলার সৎ সাহস থাকতে হবে। দেশের অর্থনীতিকে বাঁচাতে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়াতে হবে। সব ক্ষেত্রেই ঋণখেলাপিদের ‘না’ বলতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিজ্ঞাপন