মার্চ ৬, ২০২৬ ০৮:২৮

আশ্রয় কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফিরছে ফেনীর বন্যার্তরা

নিজস্ব প্রতিনিধি :
ফেনীর ফুলগাজী-পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া উপজেলার বন্যাদুর্গত হাজারো মানুষ আশ্রয়ন থেকে বাড়ি ফিরছেন বন্যার্ত মানুষরা। বাড়ি ফিরে তারা নতুন করে নেমেছেন বেঁচে থাকার লডাইয়ে। বন্যার পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করলেও ঘরে ফিরে নতুন সংকটে পড়েছেন ফেনীর বন্যাদুর্গত তিন উপজেলার মানুষ। কর্দমাক্ত ঘরবাড়ি, ভাঙাচোরা আসবাবপত্র আর পঁচে যাওয়া খাদ্যসামগ্রী নিয়ে শুরু হয়েছে বেঁচে থাকার নতুন স্বপ্ন।

পানি নামলেও অনেক এলাকায় এখনও বিদ্যুৎ নেই, অনেকেই এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে মানবেতর দিন পার করছেন। এখনও ৯টি আশ্রয় কেন্দ্রে ১৩০টি পরিবারের ৪৮৪ জন রয়েছে। ইতিমধ্যে ৯ হাজার ৭৬ জন আশ্রয় কেন্দ্র ত্যাগ করে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে নতুন করে বেঁচে থাকার যুদ্ধ শুরু করেছেন।

ফুলগাজীর আশ্রয়কেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারিয়া ইসলাম বলেন, এখনও অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরায় চালু হয়নি। পানি নামলেও অনেক ঘর বসবাসযোগ্য নয়। আমরা বিদ্যুৎ বিভাগ ও স্বাস্থ্য বিভাগসহ সমন্বিতভাবে কাজ করছি।

সোমবার থেকে টানা বৃষ্টি এবং ভারতের ত্রিপুরা সীমান্ত হয়ে আসা পাহাড়ি ঢলে মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে। এতে ফুলগাজী, পরশুরাম, ছাগলনাইয়া ও ফেনী সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। এতে ১৩৭টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে, এর মধ্যে ১২১ টি গ্রাম থেকে পানি নেমে গেছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় ফেনী জেলায় কমপক্ষে দেড় লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন এবং এক হাজারের বেশি ঘরবাড়ি আংশিক বা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতি হয়েছে ফসল, সড়ক, সেতু ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের।

ফুলগাজী বাজারের শ্রীপুর সড়কে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে অন্তত ১৫টি দোকান। দোকান হারানো ব্যবসায়ীরা এখনও নদীপাড়ে দাঁড়িয়ে খুঁজে ফিরছেন তাদের জীবিকার স্থান। স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. আবদুল আলিম বলেন, একদিনে দোকান গেলো নদীতে। এত বছর দোকানের আয় দিয়ে সংসার চালাতাম। এখন হাওয়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি। সংসারে একমাত্র আয় ছিল দোকান টি, এখন পুরো পরিবার নিয়ে চিন্তায় আছি।

ফুলগাজী উপজেলার গজারিয়া গ্রামের গৃহবধূ রোজিনা আক্তার জানান, পানি নেমে গেছে, কিন্তু ঘরে ঢোকা যাচ্ছে না। মাটি, কাদা, পঁচা খাবারের গন্ধে শিশুরাও অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। আশ্রয়কেন্দ্রেও এখন তেমন কিছু নেই।’

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, এবার মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের পরশুরামে ১৯টি ও ফুলগাজীতে ১৭টিসহ মোট ৩৬টি স্থানে ভেঙেছে। এর আগে চারদিন ধরে ২০টি ভাঙনের তথ্য জানান পাউবো।

ফেনী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আক্তার হোসেন মজুমদার জানান, ‘মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বাঁধে আমরা জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা করেছি। তবে টেকসই বাঁধ ও নদী খননের কাজ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হতে হবে।

জেলা কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের দেওয়া তথ্য মতে, এবারের বন্যায় মৎস্য খাতে ৮ কোটি ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকা, কৃষিতে ৫ হাজার ৫৬৪ দশমিক ৬১ হেক্টর ফসলি জমি দুর্যোগে আক্রান্ত ও প্রাণিসম্পদে ৬৪ লাখ ৮৮ হাজার ৭৫০ টাকা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। পুরোপুরি পানি নেমে যাওয়ার পরই ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত পরিমাণ তুলে ধরা হবে বলে জানান সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা।

ফুলগাজী উপজেলার কমুয়া এলাকার খামারি মো: হারুন বলেন, গতবছরের বন্যায় অন্তত ২০ লাখ টাকার বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। এবারও পানিতে ডুবে মুরগি মারা গেছে। মাছের ঘের পানিতে ভেসে গেছে।প্রতিবারই বাঁধ ভাঙে, পানি আসে, তারপর সকলে আশ্বাস দেয়। এসব এ জনপদে নিয়মে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, বারবার এমন দুর্যোগের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে চাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর তদারকি।

ফুলগাজীর সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রসুল গোলাপ জানান, ‘ফুলগাজীর মানুষ এখন ত্রাণ চায় না, তারা চায় টেকসই বেড়িবাঁধ। নদী খনন, বাঁধের মেরামত আর সঠিক তদারকি না থাকলে আমরা প্রতি বছর ডুববো এই বাস্তবতা এখন মানতেই হবে।’

শনিবার ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়ার দুর্গত এলাকা ঘুরে দেখেন প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা ফারুক ই আজম। স্থানীয় জনগণ তাকে বলছেন, ত্রাণ লাগবে না, শুধু বাঁধ দিন। তিনি বলেন, দুটোরই দরকার। এখন মানুষকে বাঁচাতে হবে ত্রাণ দিয়ে, পরে জীবন ও জীবিকার জন্য লাগবে টেকসই বেড়িবাঁধ।’

পরশুরাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম জানান, ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। তবে চাহিদার তুলনায় অনেক কিছুই কম পড়ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করে পর্যায়ক্রমে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

ফেনী জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম জানান, জেলায় ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সাড়ে ২৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কাছে শুকনো খাবার, গো-খাদ্য ও শিশু খাদ্যের আরও ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। সেনাবাহিনী ত্রাণ কার্যক্রমে প্রশাসনকে সহযোগিতা করছেন। পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিজ্ঞাপন