মার্চ ৬, ২০২৬ ০৫:৪৬

অপসাংবাদিকতার শেকড় বাকড়

বলা হয়ে থাকে সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা। রাস্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবেও এটি আন্তর্জাতিক বিশ্বে স্বীকৃত। একসময় খবরের কাগজই ছিলো সংবাদ ভিত্তিক গণমাধ্যমের একমাত্র পরিচয়। যারা পত্রিকায় লেখালেখি করতো সাধারণ মানুষ তাদের সাংবাদিক হিসেবে চিনতো, সম্মান এবং সমীহ করতো। কিন্তু সময়ের ধারাবাহিকতায় তথ্য প্রযুক্তির ব্যাপকতা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উৎকর্ষতায় প্রায় তিনদশক সময়ে সমগ্র বিশ্বে প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ায় বহুমাত্রিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। এর ফলে বেড়েছে সংবাদকর্মী ও এর কলাকৌশলীর সংখ্যা, তৈরি হয়েছে ব্যাপক ভিত্তিক কর্মসংস্থান। একসময় যেখানে শুধুমাত্র খবরের কাগজই ছিলো সাংবাদ মাধ্যমের অন্যতম পরিচয়, সেখানে এখন ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ার অগ্রবর্তী চাপে খোদ সংবাদপত্রকেই করতে হচ্ছে নিরন্তর টিকে থাকার লড়াই। খবরের কাগজের জনপ্রিয়তা এবং প্রচার সংখ্যা বর্তমান সময়ে ক্রমশ নিম্নমুখী। আবার টিকে থাকার লড়াইয়ে প্রচলিত ধারার প্রায় সব গুলো সংবাদপত্র কৌশল বদলের চেষ্টায় চালু করেছে অনলাইন সংস্করণ। অনেকে চালু করেছে ভিজ্যুয়াল ভিডিও সংবাদ, ফিচার, লাইভ সম্প্রচার, ইন্সট্রাগ্রাম, ইউটিউব চ্যানেল ইত্যাদি। চিন্তা করা যায় সামান্য একটা মুঠোফোন ডিভাইস কিভাবে প্রযুক্তি দুনিয়াকে অবিশ্বস্য রকম বদলে দিয়েছে।

বর্তমান সময়ে টার্চ মোবাইল ফোন হয়ে উঠেছে জার্নালিজমের অন্যতম একটি অনুষঙ্গ। মুঠোফোনের কাঁদে ভর করে জন্ম নিচ্ছে নিত্য নতুন সাংবাদকর্মী। রাজনৈতিক পেশীশক্তির উত্থানের মত সাইনবোর্ড ও স্টিকার সর্বস্ব সাংবাদিক পরিচয়ের দৌরাত্ব্যে মূলধারার সাংবাদিক ও গণমাধ্যম অনিয়ন্ত্রিত অস্থির সময় পার করছে। রাজনৈতিক, পারিবারিক, সামাজিক বিরোধকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতেও অনেকে রাতারাতি বনে যাচ্ছেন সাংবাদিক।

বাংলাদেশ এখন ফেইচবুক সাংবাদিকতা নামক ভয়াল কালো জ্বরে আক্রান্ত। গত কয়েকদিন আগে সিএনজি অটোরিকশায় করে এক যায়গায় যাচ্ছিলাম। অটো চালক এক ঘটনার বর্ণনা দিতে দিতে বললেন, এখন সবাই সাম্বাদিক (সাংবাদিক)। মোবাইল আছে, মোবাইলে ছবি তোলা যায়, ভিডিও করা যায়। ছবি তুইল্যা চাইরা দিলাম। লাইকও পরে, কমেনও (কমেন্টস) করে। এভাবেই নিয়ন্ত্রণহীন গতিতে তৈরি হচ্ছে সাংবাদিকতার পরিচয়। যারা একটু বেশি চালাক তারা ডেঁস ডেঁস ডট কম নাম দিয়ে নিজেই সাংবাদিকতার একটা কোম্পানি খুলে বসছে। এক সময় সাংবাদিকরা গোয়েন্দাদের মত নিজের নাম পরিচয় আড়ালে রেখে নিরবে নিভৃতে কাজ করতেন। কিন্তু এখনকার চিত্র ভিন্ন। ফেইচবুক, ইউটিউব ডেঁস ডেঁস ডট কম একটা আইডি খুলেই রাজ্যের পদ পদবী দিয়ে কেজিচিকা বড়ির মত ভিজিটিং কার্ড ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিতে থাকে যত্রতত্র। সাইকেল, রিকশা, হোন্ডা, অটোরিকশা, টেম্পু এসব লোহালক্কড়ের শরীরে এঁটে থাকতে দেখাযায় সাংবাদিকের জীবন কুন্ডলী এবং প্রেস লেখা প্লেকার্ড। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা উপজেলায়, ইউনিয়ন এমনকি ওয়ার্ডে এমন চক্রবুহ্য সাংবাদিকদের দেখা মিলবে। এরা সংবাদ তৈরি করার চাইতে অন্যের প্রকাশিত সংবাদের সূত্রধরে আরো গভীর থেকে সংবাদ প্রাকাশের বান করে চাপ প্রয়োগ, হুমকিধামকি, ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের খেলায় মত্ত হয়ে থাকে। কৌশলের নূন্যতম নগদ আদায় পর্যন্ত এরা হাল ছাড়েনা। এমনই একটি চক্রের সদস্য দীর্ঘদিন থেকে আমাকে তাদের বিভিন্ন খ্যাপে যুক্ত করার অপপ্রয়াশ চালিয়ে আসছিলো। আমিও এসবের কর্মকৌশল জানতে এবং বুঝতে কিছু চা-নাস্তা আদর আপ্যায়নসহ কথায় সঙ্গ দিতে থাকি। ঐ পরিচয়ধারী সাংবাদিকের এমন কয়েকটি খ্যাপ প্রক্রিয়া তুলে ধরছি।

পঞ্চাশোর্ধ সুঠাম দেহের অধিকারী পূর্ব পরিচিত ঐ ব্যক্তির সাথে প্রায়ই আমার সাথে তার সাক্ষাৎ হয়ে থাকে। ভদ্রলোক এসেই দেশের চলমান সামাজিক, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার অনিয়ম, অসন্তোষ ইত্যাদি নিয়ে এটা ওটা সরস গল্পের আসর খুলে বসেন। রাশভারি গল্পের শেষ অংশে থাকে ব্যক্তিগত অভাব অভিযোগ। এক সময় সরকারি চাকরি ছিলো, ব্যক্তিগত ব্যবসা ছিলো। চাকরী যায়, ব্যবসা যায়, পারিবারিক কলহ বিবাদে বউও চলে যায়। দীর্ঘদিন হাজত খাটেন। এভাবে সবকিছু খেয়েদেয়ে একদিন পরিচয় দিয়ে বসলেন, তিনি এখন সাংবাদিকতা করছেন। বর্তমানে সাংবাদিক পরিচয়ের বাইরে মানবাধিকার সংবাদকর্মী, সংগঠক, অনলাইন নিউজপোর্টালের সম্পাদক ইত্যাদি পরিচয়ে ঠাঁসা তার ভিজিটিং কার্ড। আমি আগ্রহ না দেখালেও বেশ কায়দা করে তার একখানা ভিজিটিং কার্ড আমার টেবিলের গ্লাসের তলায় চেপেচুপে ডুকিয়ে দিয়ে বললেন- গরিব অসহায়, নির্যাতিতদের আমরা আইনি সহায়তা দিয়ে থাকি। আমি বললাম
-কি রকম আইনি সহায়তা?
-এই ধরেন ধর্ষণ, যৌতুক নির্যাতনের অভিযোগ, জায়গা জমির বিরোধ, এইসব আরকি।
-মামলা টামলা পাইছেন?
-পাইছি মানে, অনেক। দুই চারটা কাজ করার পর, লোকজন এখন খোঁজ খবর করে। একপর্যায়ে তিনি বেশ আশান্বিত ও গৌরব চিত্তে গলা হাঁকিয়ে বললেন, মানবাধিকার সাংবাদিকতা দেশের যে কোন প্রান্তে করা যায়। কথায় কথায় বললেন, আমি মাইজদী জর্জ কোর্টের প্রভাবশালী এক উকিলের বীরুদ্ধে খেলেছি। এ নিয়ে লম্বা এক পিরিস্তি তিনি হাজির করেন এবং বক্তব্যের ধরণ থেকে পরিস্কার হওয়া গেছে যে, একাজে তিনি ভিকটিম এবং উকিল উভয় যায়গা থেকে উপরি প্রাপ্ত হয়েছেন। অর্থাৎ বাদী বিবাদী উভয় মাদ্যম থেকে পকেট ভারীর জোড় থাকে।

অন্য আরেকদিনের কথোপকথন,
-ভাই আমাদেরতো কোন ক্ষেপ নাই।
-ক্ষেপ নাই মানে?
-আহা, বুঝলেননা, ক্ষেপ নাই মানে কাজ কর্ম নাই।
-কাজ কর্ম তৈরি করেন। লেখালেখি করার বিষয়বস্তুর অভাব আছে নাকি। আশেপাশে কত ধরনের সমস্যা, যে কোন সমস্যা নিয়ে লিখেন।
-ঐ সব লিখেটিখে পেট ভরেনা। পেট ভরার জন্য ক্ষেপ ধরতে হইবো। কিছু ক্ষেপের প্লান করছি। এইযে তাবিজ-কবজ, জ্বিন চালা, ফকিরি ব্যবসা, কবিরাজির নামে যৌন ঔষধের রমরমা কারবার। এদের কয়েকজনের তালিকা করছি। এগুলোতে কায়দা করে ক্ষেপ লাগাইলে, ভয়ভীতি দেখাইয়া, ছবিটবি তুইল্যা, কিছু কামাই রোজগার করন যাইবো। আবার হিসাব মতো বোঝাপড়া হলে মাসিক চুক্তিও হতে পারে।
-এদের অপকর্ম তুলে ধরে নিউজ করবেননা?
-নিউজ করবো করবো কইরা ভয়ের মধ্যে রাখতে হইবো।
-আর কোন কাজ?
-আরেকটা চিন্তা করছি। আমাদের এখান থেকে প্রকাশিত এক সপ্তার স্থানীয় পত্রিকাগুলো সংগ্রহ করবো। ঐ গুলার থেইকা কারো বীরুদ্ধে কোন নিউজটিউজ থাকলে আমরা ঐটার গভীর অনুসন্ধানে নামবো।

-অনুসন্ধানে নেমে কি করবেন?
-আরে ভাই ঐখানেইতো ধান্দা। আমরা চিহ্নিত ব্যক্তির মুখোমুখি হয়ে তিন চারজন নানান দিক থেকে কথা বলতে থাকবো। কেউ উত্তেজিত হবো, কেউ ভয়ভীতি দেখাবো, কেউ আবার উত্তেজিত আমাদের লোককে থামাবো, কেউ আবার ঐ লোকের পক্ষে ঠান্ডা হাত বুলাবো। এসব করতে করতে একটা নগদ ধান্দা হয়েই যাবে। আরে ভাই বুদ্ধি খাটায়া কাম করলে রোজগার হয়। ওরা দুই নম্বরী কইরা কামাইতেছে। সেখান থেকে আমাদেরকে কিছু দিবে। আমরাতো জুলুম করতেছিনা। কিছু টোকাই-পোকাই সাংবাদিক হইয়া (ভাব খানা এমন তিনি একজন সৎ, শিক্ষিত, উপকারী সাংবাদিক) লাইনটারে ডুবাইছে।
-কি রকম?

-সবকটা শালারপুত ব-অ কলম, মুরুক্ষ। আজগুবি পত্রিকার সাংবাদিক। এক লাইন লিখবার মুরোদ নাই, খালি ধান্দাবাজি।
দীর্ঘ আলাপচারিতায় বুঝলাম এইসব পরিচয়ধারী মতলববাজ সাংবাদিকেরা দলেবলে জোটে থাকলেও কেউ কাউকে বিশ্বস করেনা বলেই প্রতীয়মান হয়।
অন্য একটি ঘটনার বর্ণনা উপস্থাপন করছি।
ফসলি জমির মাটি কাটা সরকার নিষিদ্ধ করেছে। সরকারী আইন প্রয়োগের সহযোগী শক্তি হয়ে মাঝরাতে মাইক্রোগাড়ী ভাড়া করে সাংবাদিক পরিচয়ধারীদের পরিচালিত খ্যাপ বর্ণনা।

-জানেনতো ফসলি জমির মাটিকাটা নিষেধ। রাত একটু গভীর হলেই ফসলি জমির মাটি কাটার উৎসব শুরু হয়। মাটি যায় ইট ভাটায়। মাইক্রো ভাড়া কইরা বের হইছি (গলার স্বর একটু নীচু করে বললেন, মাঝেসাঝে বড় ক্ষেপে কিছু পুঁজি দিতে হয়)। ইটভাটায় গেছি, জমিনে গেছি। ম্যালা ধকল গ্যাছে। মাগার কাজ হয় নাই। (চোখেমুখে গভীর হতাশার ছাপ)
-কেন?
-আমগো গাড়ীর আলো দেইখা ওরা ধরে নিয়েছে হয় প্রশাসনের লোক, নয়তো সাংবাদিক। মাটিকাটা, গাড়িটানা বন্ধ কইরা একদম চুপচাপ। চর্তুরদিকে শুনশান নিরবতা। আমরাও গাড়ী ঘুরাইয়া ফিরে আসার ভান করে কিছুদুর আইসা অপলাইনে যাইয়্যা চুপটি করে বসে থাকি। মাটি খোরের দল ভাবছে আমরা চলেগেছি। শুরু হয় মাটিকাটা। মাটি ভর্তি একটা গাড়ী আসছে। ঐ গাড়ী থামালাম। ড্রইভার হালারপুত একজনেরে ফোন দিয়া আমারে ধরাইয়া দিলো। এলাকার মেম্বার। মাইর গরম। পোলাপাইনের ভয় দেখাইলো। আমরাও ইউএনও, থানা পুলিশের ভয় দেখাইলাম। কিন্তু কাজ হয়না। হালারপুত খুব গাউরা মাল। হে কয়, সবকিছু ম্যানেজ কইরা মাটি কাটি। বললাম সবকিছু ম্যানেজ করলে দিনে কাটেননা কেন? হে কয়, আমিতো এলাকার মেম্বার, মানুষের ভালোমন্দ দেখতে হয়। দিনে মানুষের চলাচলে অসুবিধা হবে তাই রাতে মাটিকাটি। দীর্ঘক্ষণ বছরা ভছরি কইরা কুল পাইলামনা। মেম্বার শালার বেটা সামনাসামনি হইলে কিছু একটা ব্যবস্থা হইতো। অন্তত হাজার পাঁচেক হইলে গাড়ীর খরছ দিয়া কিছু হাত খরচা পাইতাম। কিন্তু না, পুরাটাই লচ। তিন-চারদিন পর জানতে পারলাম, পরের দিন হাসাইন্যা (ছদ্মনাম, দলের একজন) মেম্বারের কাছ থেইকা সবাইরে বেইচ্ছা ধান্দা কইরালাইছে। কতবড় নিমক হারাম। মাদার চু- (কটু বাক্য) একটা ফোনও দেয় নাই। ঐ রাতে সব সালারে নাস্তাপানি করাইলাম, গাড়ী ভাড়াটাও আমার কান্দে। আর মাঝখান থেইকা-

অপর একজন খ্যাপবাজের পরিচয় তুলে ধরছি- যে নিজেকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রোগ্রাম প্রোডিউসরের একান্ত সহকারীসহ তালিকাভূক্ত সংগীত শিল্পী হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকেন। গলায় প্রেস লেখা রঙ্গীন ফিতার সাথে প্লাস্টিকের কার্ড ঝুলিয়ে রাখেন সব সময়। তার কর্মকৌশলে আছে জৌলুসের ভান। অঞ্চল ভিত্তিক বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামে প্রামাণ্য অনুষ্ঠান করার কথা বলে প্রতিষ্ঠান প্রধানের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয় অতি সহজে। অনেক প্রশাসনিক কর্মকর্তার স্ত্র, সন্তানকে টিভিতে, স্টেজে পারফর্ম করার সুযোগ করে দেবে, মিডিয়াতে ফলাও করে প্রচার করে দেবে, রাতারাতি সুনাম সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়বে ইত্যাদির মোহময় ফাঁদ পেতে হাতিয়ে নেয় মোটা অংকের টাকা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব লোকেরা লজ্জা শরমের কথা চিন্তা করে প্রতারিত হবার ঘটনা কাউকে জানায়না। অর্থাৎ চোরের কিল নিরবে হজম করার মত।
প্রশাসনের দুর্ণীতিবাজ কর্মকর্তা, মাদক, চোরাকারবারি, চাঁদাবাজ এধরনের নানান সিন্ডিকেটের সাথে এই সকল অপ-সাংবাদিকদের থাকে গভীর সখ্যতা। ট্রাফিক পুলিশের হয়ে কাজ করা, থানা পুলিশের দালালি, পার্সপোট অফিস, ভূমি অফিসে খবরদারি, বাসস্ট্যান্ড, সিএনজি, অটোরিকশা, ফুটপাত এসব থেকে মাসোয়ারা কামাই এদের পকেটবাজীর উৎস। রাজনৈতিক নেতা, চেয়ারম্যান, মেম্বার এদের সাথেও থাকে মতলববাজ সাংবাদিকনামধারী এইসব দস্যূদের চিকন সখ্যতা। আবার উপরোক্ত কারবারীদের ইনফরমার হয়েও এরা কাজ করে থাকে।

এই জাতীয় অপ-সাংবাদিকেরা অনেক সময় মামলা মোকদ্দমাসহ শারীরিক হেনস্তার স্বীকার হলেও কিছুদিন ঘাপটি মেরে থেকে আবার পাদপ্রদীপের আলোয় মেলে ধরে ফন্দিফিকিরের জাল।

এই ধরনের মতলববাজ সংবাদিক চক্র বিভিন্ন অফিস-আদালত, সভা-সমাবেশে মূল ধারার সাংবাদিকদের ন্যায় অবলিলায় যাতায়াত করলেও মূল ধারার সাংবাদিকদের সাথে সখ্যতার একটা দূরত্ব থেকেই যায়। এই ধরনের দুরত্ব তাদের জোটবদ্ধ হতে উৎসাহিত করে। দলভারী করার খেলায় তান্ত্রিক কবিরাজ, হোটেলের কর্মচারীকেও কায়দা করে বানানো হয়ে থাকে সাংবাদিক। এই ধরনের অপচর্চার খেলা কোথায় গিয়ে থামবে বলা মুশকিল। গ্রুপিং সাংবাদিকতার কুটচালে কিছু স্বার্থান্ধ ফ্রন্ট লাইন সাংবাদিকও জড়িয়ে পড়েন। এরা সাধারণত ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গুঁটি চালেন। এমন বাস্তবতাও কম নয়। সাংবাদিক শাহনাজ মুন্নি এক নিবন্ধে লিখেছেন- সাংবাদিকদের আন্তঃবিরোধের সুযোগ নিয়ে থাকে নামসর্বস্ব সংবাদ মাধ্যমের এইসব অপ-সাংবাদিক।

অপ-সাংবাদিক চক্র নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে, শক্তি বাড়াতে, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও শক্তিশালী সামাজিক নেতৃত্বের যেমন দারস্থ হয়, অপর পক্ষে নিজেরাই বিভিন্ন বর্ণচোরা সাংবাদিক সংগঠনের ব্যাণারে আত্মপ্রকাশের সুযোগ নিয়ে থাকে বা সুযোগ তৈরি করে থাকে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিভিন্ন বৈচিত্রপূর্ণ নামে কোন ভবনের ছাদে, দেয়ালে, টিনের চালায় সাংবাদিক সংগঠনের নামসর্বস্ব সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখা যায়। আবার একই সংগঠনে গ্রুপিংয়ের কারণে তৈরি হয় একাধিক কমিটি, একই নামে দৃশ্যমান হয় একাধিক সাইনবোর্ড। নিজেদের মাঝে আস্থা এবং অবিশ্বাসের কারণে অনেক ক্ষেত্রে একাধিক পক্ষকে শান্ত রাখার জন্য স্বল্প মেয়াদী (৪-৬ মাস এমন) তিন বা ততোধিক কমিটি একযোগে গঠন করার নজিরও আছে।

আলোর মাঝে কালো যেমন লেপ্টে আছে, ঠিক তেমনি ভাবে সাংবাদিকতায়ও অপ-সাংবাদিকতা বা হলুদ সাংবাদিকতা যুগের পর যুগ ধরে কালিমার কালো তিলক হয়ে লেপ্টে আছে। প্রযুক্তির ফাঁকফোকর এবং সাংবাদিকদের নানাবিধ আন্তঃবিরোধের ফাঁক গলে এই অপদ্বৌরাত্য ব্যাপকতর ভাবে বেড়ে গিয়েছে। এই অপ-সাংবাদিকতা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সমাজ এবং রাষ্ট্রের সুস্থ কাঠামো ব্যাহত হবে। এটি নিয়ন্ত্রণের জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, সুস্থ ও জ্ঞানবিকাশী গণমাধ্যমের ঐক্য একান্ত জরুরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিজ্ঞাপন