রাত ৮টা। এক বিষন্ন রাত। বিকাল থেকে ফেনীর এস.এস.কে রোডে অবস্থিত আল কেমি হাসপাতালে রয়েছি। একেরপর এক আহতের চিকিৎসার খোঁজখবর নেওয়ার পর এখন বের হওয়ার সময়, সাথে রয়েছে ফেনী আল জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদ্রাসা তৎকালীন সভাপতি নাজমুল হক। বাহির হওয়ার চিন্তা করার সাথে সাথেই মনে হচ্ছে, কি না কি ঘটে! আল্লাহর ভরসা করে বের হলাম, মোটরবাইক নিয়ে একটু পথ আসার পর দেখলাম এই এক অপরিচিত রাত, নিস্তব্ধ শহর, মনে হচ্ছে এই শহরে আজ প্রথম এলাম। সবকিছুই অপরিচিত, বারবারই মনে হচ্ছে কখন জানি পিছন থেকে মানুষরূপী দানবরা একে৪৭ সহ সর্বাধিক আধুনিক অস্ত্র নিয়ে মাথায় খুলি ওড়ে নে, কখন জানি এই দেহটি নিস্তব্ধ হয়ে মাটিতে লুটে পড়ি। এমন মনে হওয়ার পিছনে কারণ,মহিপালে আজ দুপুর ২টায় ১১টা লাশের ঘটনা। ওই দানবরা শুধু ফেনীতেই সেদিন ১১টা লাশ পালাইনি, এর পাশাপাশি পুরো বাংলাদেশে অসংখ্য বীর বাঙ্গালির রক্ত আজকেই কেড়ে নিয়েছে। আপনারা নিশ্চয়ই প্রতিমধ্যেই বুঝে গেছেন আমি এক শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মানুষদের স্মরণ করতে যাচ্ছি, আমি স্মরণ করাতে যাচ্ছি আমাদের জাতি সত্তার উপর বসে থাকা সবচেয়ে নিচু ফ্যাসিস্ট খুনীদের গুলিতে ফেনীতে এগারোজন ভাইয়ের জীবন কেড়ে নিয়েছে। অসংখ্য ভাই-বোনের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হারানোর স্মৃতিচারন করতে যাচ্ছি।
ফেনী বৈষম্য বিরোধী ছাত্রআন্দোলন প্রথম শুরু হয়েছিলো পলিটেকনিকের ছাত্রদের রেললাইন অবরোধের মাধ্যমে। সেখানে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জুলাই আন্দোলনের অন্যতম স্লোগান মাষ্টার তাহমিদ ইসলামের নেতৃত্বে। তাহমিদ ইসলাম সেখানে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের সহযোগিতা কর্মসূচির নেতৃত্ব দেয়। এর পূর্বে ১৪ জুলাই ফেনী সরকারি কলেজের আব্দুল আজীজ,তাজিম, সোহাগ ও আশিক ভাইয়ের নেতৃত্বে ডিসি অফিসে স্মারকলিপি দেওয়া হয়।
১৭ই জুলাই আগেরদিনের শিক্ষার্থীদের ঘোষণার আলোকে ট্রাংক রোডে বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দেয়। সকাল থেকেই শহরের শহীদ মিনারের সামনে ছাত্রলীগের কঠিন অবস্থান, যাকেই সন্দেহ হচ্ছে তাকেই চার্জ করতেছে এবং আন্দোলনের কোন গ্রুপে বা ডকুমেন্ট পেলেই লাঠি দিয়ে মারধর এবং শহীদ মিনারের মধ্যে আটকাচ্ছে। সকাল ১১ কেন্দ্রীক আমাদের জনশক্তিদের কয়েকজনের নাম্বার থেকে কল আসে যে, তাদেরকে চেক করে মারধর করে আটকিয়ে রাখছে। তখনও মিছিল শুরু হয়নি। এরমধ্যে আমাকে প্রথম কল করলো মহিপাল কলেজের শিক্ষার্থী, ছাত্রশিবিরের সাথী আব্দুল আহাদ। সে বলল, “আমাদের ৩০ জন থেকে বেশি শিক্ষার্থীকে মারধর করছে এবং শহীদ মিনার থেকে পিটিআই স্কুল মাঠে আটকিয়ে রাখছে। সবার মোবাইল বারবার চেক করছে এবং তৎকালীন ছাত্রশিবিরের প্রাইভেট ইনিস্টিউট শাখার সভাপতি হাসান ভাইয়ের মোবাইল চেক করে শিবিরের ডকুমেন্ট পেয়েছিলো এবং ডকুমেন্ট পেয়ে সবাইকে শিবির বলে সন্দেহ করে মারধর করছে”।
আমি সাথে সাথে বিভিন্ন মাধ্যমে কে কে আটকে পড়ছে বের করার চেষ্টা করছি এবং এদের মধ্যে যাদের বিষয়ে নিশ্চি হচ্ছি তাদেরকে তৎকালীন শহর ছাত্রশিবিরের সভাপতি শরীফুল ইসলাম ভাইকে জানিয়ে আমাদের অভ্যন্তরীন সাংগঠনিক গ্রুপে থেকে রিমুভ দিচ্ছি। খুব বেশি চিন্তিত হচ্ছি, কি করা যায়? কি করা যায়? কিছুক্ষণ পর জুলাই আন্দোলনে ফেনী সরকারি কলেজে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব দানকারী আবু সুফিয়ান নোমান ভাইয়ের মাধ্যমে যমুনা টিভির সাংবাদিক আরিফুর রহমান ভাইকে এবং ফেনীর জুলাই আন্দোলনের অন্যতম দুঃসাহসী সাংবাদিক ফেনীর সময়ের শহীদ ভাইকে সহ তাদেরকে উদ্ধার করানোর জন্য পাঠানোর বিষয়ে কথা বলি।
এরমধ্যে দুপুর ১২টা নাগাদ ফেনী কোটা আন্দোলনের অন্যতম নেতৃত্বদানকারী আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ ও ওমর ফারুক শুভ’র নেতৃত্বে ভিতরের বাজার থেকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি মিছিল বের হয়। মিছিলের এক পর্যায়ে দোয়েল চত্ত্বর পের হতে না হতেই ছাত্রলীগের নরপিশাচরা হকিস্টিক, স্ট্যাম, লাটি ও বাঁশ দিয়ে শিক্ষার্থীদেরকে পুলিশের সামনেই হামলা করে। এই আঘাতে সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ তাদের নির্লজ্জটা প্রমান দেয় নারীদের উপর হামলার করার মাধ্যমে।পুলিশ ছিল নিরব দর্শক। হামলার এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়,অধিকাংশ ইসলামপুর রোড়ে আশ্রয় নেয়। প্রতিমধ্যে আন্দোলনকারী জানতে পারে তাদের সহযোগিদের একাংশকে পিটিআই স্কুল মাঠে আটকে রেখেছে।
আমি বারবার ফেনী সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী আশিকুর রহমান ভাই, (যিনি আমাকে আগের দিন আন্দোলনের বিষয়ে অবগত করে ও সহযোগিতা চাই) উনাকে কল দিয়ে জানাই, যেভাবেই হোক পিটিআই স্কুল থেকে আটকে পড়াদেরকে ছাড়িয়ে আনতে হবে। কিছুক্ষণ পর আন্দোলনকারী শুভ, তাজীম, জাফর ও আশিক ভাইসহ দুঃসাহসের পরিচয় দিয়ে পুলিশের ও সাংবাদিকদের সহায়তায় পিটিআই স্কুল থেকে আটজে পড়া শিক্ষার্থীদের ছাড়িয়ে আনে। সেদিন নারী শিক্ষার্থীদের উপর হামলায় ফেনীর প্রতিটি মানুষ ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের প্রতি তীব্র ঘৃণা ছড়ায়। আছরের পর ফালাহিয়া মাদ্রাসার আমার জুনিয়র সফি উল্লাহকে কল দিয়ে হামলাকারী পরিচয় পাঠিয়ে কিছু স্টিকার তৈরি করতে বলি। সফির বানানো স্টিকারের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে স্টিকার বানানো হয় এবং রাতের মধ্যে সেগুলো ব্যাপক প্রচার হয়। সেদিনের হামলার পরবর্তীতে আন্দোলনে নেতৃত্ব দানকারীদেরকে নিরাপদে নিজ বাস্থস্থানে থাকতে দেয়নি।
১৮ জুলাই বাদ আছর আন্দোলনকারী আবু জাফর ও শুভ’র নেতৃত্বে দাউদপুল থেকে বড় মসজিদে পর্যন্ত মিছিল হয়। সেদিন শুভ ফালাহিয়া ছাত্রশিবিরের সাথে পূর্বে পরিচয়ের সুবিধার্ত্তে তৎকালীন ফালাহিয়া মাদ্রাসা সভাপতি নাজমুল হক থেকে কিছু শিক্ষার্থী চাই।নাজমুল ভাই নির্দিষ্ট কয়েকজনকে পাঠাই। মিছিলটি বড় মসজিদের সামনে পৌঁছালে সেখানে তারা অবস্থান কর্মসূচি পালন করার জন্য রাস্তায় বসে পড়ে।অবস্থান কর্মসূচি মাঝপথে হঠাৎ পুলিশ শিক্ষার্থীদের উপর লাঠিচার্জ এবং টিয়ারস্যাল নিক্ষেপ করে। মূহুর্তের মধ্যে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ভঙ্গ হয়ে যায় এবং ৪ জনের মত শিক্ষার্থী আহত হয়ে,সন্ত্রাসী পুলিশ সদস্যরা ছাত্রী শিক্ষার্থীদের উপরও নির্লজ্জের মতো লাঠিচার্জ করে। বাদ মাগরিব,তৎকালীন শহর সভাপতি শরীফ ভাই, জেলা সভাপতি ইমাম ভাই, শহর সেক্রেটারী ফারুক ভাই ও জেলা সভাপতি হেলাল ভাই সহ আন্দোলন নিয়ে বসে কি করা যায় সে বিষয়ে। আমি আছর থেকে শহর সভাপতির সাথে থাকায় তাই আমাকেও ভাই নিয়ে গেল। সার্বিক আলোচনার মধ্যে মাগরিব নামাজ বিরতি এবং নামাজের পর আবার সবাই বসলো। মাগরিব একটু পরই জেলা ছাত্রদল সভাপতি মামুন ভাই অন্য একটি নাম্বার থেকে সরাসরি আমার নাম্বারে কল দিলো। মামুন ভাই কল দিয়ে বললো, “আপনারা আসেন আজকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর হামলা করেছে পুলিশ,এভাবে তো আর বসে থাকা যায় না”,শহর সভাপতি পরামর্শ ক্রমে উত্তর দিলাম, ভাই কেন্দ্রের সাথে আমরা কথা বলার চেষ্টা করতেছি, কিন্তু নেট বন্ধ হওয়াতে পারতেছিনা, তাও দ্রুত কথা বলে ইনশাআল্লাহ আপনাকে আপডেট জানাবো। মামুন ভাই ঠিক আছে বলে কেটে দিলো। এরপর ভাইয়েরা আরো কিছুক্ষণ বসলো, আমি শহর শাখার সদস্য নুর হোসেন ভাইসহ (উনি আবার আমার একই ডিপার্টমেন্টের জুনিয়র এবং বন্ধু) আমরা আমাদের ফেনী বিশ্ববিদ্যালয়ের মোমবাতি প্রজ্জলনে অংশগ্রহণ করলাম।সেখানে মোমবাতি প্রজ্জলনে ল” ডিপার্টমেন্টের সজীব ভাই সবার সাথে সমন্বয় করে। সে কর্মসূচি পালনের পর যে যার মত বাসায় ফিরে আসলাম।
১৯ই জুলাই সকাল বেলা থেকে শুনা যাচ্ছে আজকে জুমার পর আন্দোলনকারীরা মিছিল করতে পারে। প্রতি মধ্যে তৎকালীন কোচিং পরিচালক জামাল ভাই এবং শহর সেক্রেটারী ওমর ফারুক ভাই বসে বর্তমান সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের নেতৃত্ব দানকারী আবু জাফর ও ওমর ফারুক শুভ’র সাথে বসার পরিকল্পনা করে। জুমার পরপর জহিরিয়া মসজিদের সামনে কিছু লোক দাঁড়িয়ে আছে, যে একজন ঈমামের অপেক্ষায়, একজন আবু সাঈদের অপেক্ষায় যে কিনা স্লোগান দিয়ে রাজপথ দ্রোহতে যাপ দিবে। এর মধ্যে কোচিং পরিচালক জামাল ভাই এবং ছাত্রশিবির ফেনী শহর শাখার সাবেক সাহিত্য সম্পাদক শরীফুল ইসলাম সাইমুমের নেতৃত্বে মিছিল শুরু হয়, মিছিলটি শহীদ মিনারে গিয়ে শেষ হয়।
একইদিন বিকাল ৩টায়,জামাল ভাই তৎকালীন ফালাহিয়া মাদ্রাসা সভাপতির মাধ্যমে (যেহেতু আগ থেকে শুভ’র সাথে যোগাযোগ আছে) শুনতে পারে বাদ আছর আন্দোলনকারীরা মিছিল করবে।এর মধ্যে পূর্বের পরিকল্পনার আলোকে জামাল ভাই ওমর ফারুক শুভ’র কে আন্দোলনের স্বার্থে নিজের নাম গোপন করে শরীফ পরিচয় দিয়ে দেখা করতে চাই। শুভ আছরের আগেই সাক্ষাৎ এর বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে।পরবর্তীতে জামাল ভাই ফেনী সরকারি কলেজের জনশক্তি মামুন ভাই ও দাউদ ভাইকে নিয়ে আছরের আগেই স্বাক্ষাৎ করে এবং আছরের পরে কর্মসূচি নিয়ে পরিকল্পনা করে। আছরের পর শিক্ষার্থীরা জহিরিয়া মসজিদ থেকে ফেনী বড় মসজিদ পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিল করে। সেদিন শিক্ষার্থীদের উপর কোন হামলা হয়নি। মিছিলে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি জেলা ছাত্রদল সভাপতি সালাউদ্দিন মামুনসহ ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা অংশগ্রহণ করে।
২০ জুলাই,সকালে আমাদের পৌরসভার ১০নং ওয়ার্ড থেকে স্থানান্তরকারী ঢাকা কলেজের জনশক্তি আব্দুল্লাহ আল সামি মিরপুরে আহত হয়েছে। তৎকালীন শহর সভাপতি শরীফ ভাই,তৎকালীন শহর প্রকাশনা সম্পাদক জাহিদ ভাই ও আমিসহ তার বাসয় দেখতে গেলাম।প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি যে, সামীর আম্মু মহিলা জামায়াতের দায়িত্বশীল ও ফালাহিয়া মাদ্রাসা শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত। আমরা যাওয়ার আগে সামীকে দেখতে যান ফালাহিয়া মাদ্রাসার সম্মানিত অধ্যক্ষ মুফতি ফারুক হজুর ও জেলা জামায়াতের তৎকালীন সেক্রেটারী মুফতি আব্দুল হান্নান হুজুর।হান্নান হুজুরের দোয়া মুনাজাত পরিচালনার মাধ্যমে সামীর সুস্থতার জন্য দোয়া করা হয়। সামীর বাসায় থাকা অবস্থায় শহর সভাপতি শরীফুল ইসলাম ভাইয়ের মোবাইলে জোবায়ের নামে একজন কল দে, আন্দোলন নিয়ে কথা বলতে ও সহযোগী নিতে। শহর সভাপতি ভাই আমাকে এবং তৎকালীন শহর ছাত্রশিবিরে প্রকাশনা সম্পাদক জাহিদ হোসেন ভাইকে সামীর বাসা থেকে পাঠান বাড়ী মসজিদের সামনে পাঠাই জোবায়ের ভাইয়ের সাথে দেখা করতে। জোবায়ের ভাইয়ের সাথে ইতিপূর্বে আমার পরিচয় ছিল না, কিন্তু উনার পড়াশোনা ফেনী কলেজে এবং গণঅধিকার পরিষদ করাতে জাহিদ ভাইয়ের সাথে পূর্বেই পরিচয় ছিল। জোবায়ের ভাই আন্দোলনের শুরু থেকে কিছু বিষয় বলল। পাশাপাশি দেখা করার মূল কারণ হলো এর আগে যারা স্মারকলিপি এবং ট্রাংক রোডে আন্দোলন করছে তাদের অধিকাংশেরই পরিবারকে বিভিন্ন হয়রানি ও বাসায় গিয়ে গিয়ে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা তলাশী করতেছে এবং টার্গেট করে করে তাদের বাসার নিচে সন্ত্রাসীরা পাহারা দিচ্ছে। তাই জোবায়ের ভাইয়ের পূর্বের আন্দোলনকারীদের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না।পাশাপাশি ইন্টারনেট বন্ধ হওয়াতে উনিও ঢাকার সাথে কোন ধরনের যোগাযোগ করতে পারছেনা। জোবায়ের ভাই আরো বললো, আমি জানি আপনাদের জনশক্তিরা আন্দোলনে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেছে কিন্তু এখন আপনাদের জনশক্তিদের পাশাপাশি পরামর্শ এবং পুরোপুরি সহযোগিতা প্রয়োজন। এবং উনি ছাত্রদলের সাথেও বসবে তাদেরও এমন সহযোগিতা চাইবে এই কথা বলে আশ্বস্ত করলেন। আলাপনের শেষ মুহূর্তে জোবায়ের ভাইয়ের সাথে মোবাইলে কথা বলে রাফি নামে আমাদের একজন কর্মী আসে। সে ইতিপূর্বেই জোবায়ের ভাইয়ের সাথে পরিচিত হয়েছে। স্মৃতিচারণের ফাঁকে রাফিকে নিয়ে ছোট্র করে একটু বলেনি, ফেনী শহর জুলাই আন্দোলনে ছোট হোক অথবা বড় হোক এমন কোন মিছিল,জানাযা এবং অন্যান্য কর্মসূচি ছিল না, যেখানে রাফি ছিল না। রাফিকে দেখে বরাবরের মতই অবাক হতাম, আলিম পড়ুয়া একটা ছেলে কিভাবে এত দুর্দান্ত সাহসী হয়।সেদিন সেখানে জোবায়ের সাথে অনলাইন (মেসেঞ্জার-টেলিগ্রাম) যুক্ত হয়ে আমি এবং জাহিদ ভাই বিদায় নিই।
এর মধ্যে যোবায়ের ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ হয়েছে নিয়মিত। ২৫ তারিখ যোবায়ের ভাই কল দিলো ইমার্জেন্সি একটু দেখা করবে। উনার বাসা ডাক্তার পাড়া সুবাধে আমি যাই দেখা করতে। সেদিন বিকাল বেলা ভাইয়েরা আবার দেয়াল লিখুন কর্মসূচি পালন করে। রাত ৯ টায় যোবায়ের ভাইয়ের সাথে ডাক্তার পাড়া ইথেরিয়াল স্কুলের সামনে মামুন ভাইয়ের দোকানে দেখা হলো। ভাই বললো, “ভাই! আগামীকাল একটু গায়েবানা পড়া প্রয়োজন। জানাযার একজন ইমাম এবং আপনাদের কিছু ছেলেপেলেদের ব্যবস্থা করে দেন, আমি নিজেও আমার যাদের সাথে যোগাযোগ আছে তাদের কল দিয়ে বলবো।”
আমি বললাম, “ঠিক আছে”।উনাকে বললাম, গায়েবানা জানাযায় সামনে একটি টেবিল ও বাংলাদেশের পতাকার ব্যবস্থা করে রাখার জন্য। চা-আড্ডা এবং আন্দোলনের সার্বিক পরিকল্পনা নিয়ে সে দিন কথা শেষ হলো।
২৬ জুলাই আমাকে একটু ইর্মাজেন্সি গ্রামে বাড়িতে যেতে হলো। সকাল থেকেই অসংখ্যজনকে কল দিলাম, গায়েবানা জানাযায় ইমামতির জন্য। এরমধ্যে ১/২ দিন অন্য একটি জেলায় এরকম গায়েবানায় জানাযা থেকে গ্রেফতারের ভিডিওটি দেখে অনেকে ভয়ে রাজি হচ্ছে না। আবার আমাদের সাবেক ভাইদের অধিকাংশ জুমার নামাজ পড়ানোর ফলে তারাও সময় দিতে পারছেনা। পড়লাম ব্যাপক বিপাকে,যোবায়ের ভাইকে কথা দিলাম,ইমামের ব্যবস্থা করবো, কিন্তু মনে তো হচ্ছে পারবো না। কিছুক্ষণ চিন্তা করার পর সিদ্ধান্ত নিলাম, না যেভাবেই হোক সংগঠনের ইমেজের জন্য হলেও কাউকে না কাউকে ব্যবস্থা করতেই হবে।
সকাল ১১:৩০, তৎকালীন ফালাহিয়া মাদ্রাসা সেক্রেটারী ফেনীর জুলাইয়ের ইমাম মুহাইমিনান উদ্দিন সাইমুম ভাইকে সংগঠনে সিদ্ধান্ত বলে যেতে বাধ্য করলাম। এবং বাদ জুমা, শত শত পুলিশের সামনে শহীদ আবু সাঈদের উত্তরসূরী ফেনী জুলাইয়ের ইমাম সাইমুম ভাই দুর্দান্ত সাহস নিয়ে জানাযায় ইমামতি করতে দাঁড়ি যায়। যেহেতু জুমা শেষ, শহর বড় মসজিদের মধ্যে একটি জহিরিয়া মসজিদে নামাজ শেষ পাশে অনেক মুসল্লি ছিল, কিন্তু ৩-৪ কাতারে ৫০-৬০ জনের বাহিরে কেউ সাহস করেনি। জানাযা আলহামদুলিল্লাহ সুন্দর ভাবে শেষ হলো, তবে খুব বেশি ভয়ে ছিলাম, না জানি সাইমুম ভাই গ্রেফতার হয়ে যায়, ইতিপূর্বে উনি অলরেডি ২ বার কারাবরণ করেছে। এর মধ্যে এবার আবার করলে পরিবারকে কি জবাব দিবো। যাক আজকের মতো যোবায়ের ভাই,ছাত্রদলের সাগর ভাই এবং ফালাহিয়া মাদ্রাসা সভাপতি নাজমুল ভাইয়ের নেতৃত্বে কর্মসূচি শেষ হলো।
সমস্যা শুরু হলো সন্ধ্যা থেকে, দুর্ভাগ্য হোক কিংবা সৌভাগ্য হোক, পুরো বাংলাদেশে সেদিন গায়েবানা জানাযা অনলাইন প্রচার হলো শুধু ফেনীর এটিই। নানাদিক থেকে খবর এলো এনএসআইসহ আওয়ামী সন্ত্রাসীদের কয়েকটি বিশেষ বাহিনী সাইমুম ভাইকে খুঁজছে দ্রুত গ্রেফতার করবে। ভাইকে সকল মোবাইল এবং বাসস্থান পরিবর্তন করতে বলি। আল্লাহর কাছ অনেক বেশি সাহায্যর ফলে এই বিপদ থেকে আল্লাহ ভাইকে হেফাজত করে।
পহেলা আগষ্ট, ৩২ জুলাই সাধারণ শিক্ষার্থীরা কেন্দ্রের কর্মসূচি মোমবাতি প্রজ্জলন করবে। জাহিদ ভাই শহরের কয়েকটি শাখায় দাওয়াতী কাজ করলো পাশাপাশি আমি পলিটেকনিক, ফালাহিয়াসহ কয়েকটি শাখাকে দাওয়াতী কাজ করি।সেদিন আওয়ামী এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী পুলিশলীগরা শিক্ষার্থীদের ভিতরের বাজার থেকে বের হতে দেয়নি। বৃষ্টির মধ্যেও আন্দোলনকারী দীর্ঘক্ষণ চেষ্টা করে কিন্তু এই সন্ত্রাসীদের এজেন্ডা বাস্তবায়নকারীরা ট্রাংক রোডে মোমবাতি নিয়ে উঠতে দেয়নি।
একই দিনে রাতে, যোবায়ের ভাই উনার পরিচিত তাজিম,সোহাগ,আশিক ও আজীজসহ সামনে সারিতে নেতৃত্ব দানকারীদের মতামত নিয়ে, জাহিদ ভাইয়ের মাধ্যমে শহর সভাপতি সাথে পরবর্তী দিনের কর্মসূচি বাস্তবায়নে বিষয়ে যোগাযোগ করে। শহর সভাপতি জরুরি অনলাইনে সেক্রেটারীয়েট বৈঠক দিয়ে সেক্রেটারীয়েট সাথে সমন্বয় করে জহিরিয়া মসজিদ থেকে খেজুর চত্ত্বর পর্যন্ত মিছিলের কর্মসূচির বিষয়ে যোবায়ের ভাইকে জানাই।কিছুক্ষণের মধ্যেই পরেরদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
২রা আগষ্ট ৩৩ জুলাই, কর্মসূচিতে ১৭ই জুলাই শিক্ষার্থীদের উপর হামলার পর এই প্রথম ফেনী এত বিশাল শিক্ষার্থীদের মিছিল হয়। এবং এই মিছিলে নারী শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন পাবলিক-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন।পুলিশ শহরের গুরুত্বপূর্ন স্থানগুলোতে অবস্থান নেয়। জহিরিয়া মসজিদ থেকে শুরু হওয়া মিছিল, ইসলাম রোডের মাথায় পৌঁছানোর পর পুলিশৈকে দেখা মাত্রই সাথে সাথে ১৯ই জুলাই পুলিশের হামলার কথা স্মরণ করে “বুয়া,বুয়া” স্লোগানে ট্রাংক রোড থেকে যাত্রা শুরু হয়। এই মিছিলে সকল শিক্ষার্থীদের এমন অংশগ্রহণ ফেনীর আন্দোলনে অন্যরকম স্পৃহা তৈরি করে। সেদিন ছিল বৃষ্টি দিন,কিন্তু সামান্য বৃষ্টির কি সাধ্য আছে এই পাহাড়সম দাবানলকে নিবানোর? আমরাও (ছাত্রশিবির শহর ও জেলা) ২ই আগষ্ট সকল থানা,ওয়ার্ড ও উপশাখা পর্যায়ে কোটা দিয়ে সর্বোচ্চ উপস্থিতির চেষ্টা করি। এবং ২ ঘন্টার সেদিনের আন্দোলন চমৎকারভাবে সমাপ্ত হয়।
৩ই আগষ্ট ৩৪ই জুলাই, দুপুরের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় কেন্দ্র ঘোষিত এক দফা দাবী নিয়ে আমরা আমাদের জেলা ও শহর শাখার সেক্রেটারীয়েট মেম্বাররা সিদ্ধান্ত নি, এটা যেভাবেই হোক আগামীকাল বাস্তবায়ন করতে হবে। আমাদের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি ফেনীর যেসকল শিক্ষার্থী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এবং নবগঠিত সমন্বয়ক টিমের সময়ে ফেনী জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সহযোগী “কোটা আন্দোলন পূর্ণ বহাল চলবেনা” গ্রুপে সকাল ১১ টায় মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে কর্মসূচি ঘোষিত হয়।
এই এক রাতে পরপর ২ বার শহর ও জেলার সেক্রেটারীয়েটদের নিয়ে জরুরি সেক্রেটারীয়েট বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এবং শহর ও জেলার সেক্রেটারীয়েটদেরকে আলাদা আলাদা বিভাগে কাজ ভাগ করে দেওয়া হয়।
আমার বিভাগ ছিল শৃঙ্খলা বিভাগ এর অধিনে যথাসাধ্য ইট,বাশঁসহ প্রয়োজনীয় প্রতিরোধের ব্যবস্থা করা, ৬টি শৃঙ্খলা গ্রুপ সাবেক-বর্তমান ও সমন্বয়ক ভাইদের নিয়ে গঠন করা, মাইকের ব্যবস্থা করা এবং কেন্দ্র থেকে পাঠানো লিপলেট প্রিন্ট ও বিতরণ করা। আমি আমার বিভাগের কাজের অংশস্বরূপ ফালাহিয়া সভাপতি ভাইসহ আগের রাতেই ফেনীর ভিতর বাজার থেকে ২টি হ্যান্ড মাইক ক্রয় করি। তেই রিক্সায় বড় মাইকের বিষয়ে মাইক দোকানে কথা বলি, পাশাপাশি সকালে এই দোকান থেকে মাইক নিয়ে আসার জন্য পৌরসভার ১৪নং থানার সাথী আব্দুল আহাদকে দায়িত্ব দি।এবং সাথে তৎকালীন শহর সভাপতি শরীফ ভাই সেক্রেটারী ফারুক ভাই ও অফিস সম্পাদক শফিক ভাইয়ের মাধ্যমে শহর সেক্রেটারীয়েট ও সদস্যদের একাংশ, জেলার সভাপতি ইমাম ভাই, সেক্রেটারী হেলাল ও অফিস সম্পাদক আরমান ভাইয়ের মাধ্যমে জেলা সেক্রেটারীয়েট ও সদস্যদের একাংশ এবং শহর ও জেলার সাবেক সেক্রেটাটীয়েট মেম্বার ও নবগঠিত জুলাই আন্দোলনের সমন্বয়কদের সহ প্রতিটিমে ৮ জন করে মোট ৬টি টিম গঠন করি। সেদিন রাতে জেলা ছাত্রদল সভাপতি সালাউদ্দিন মামুন ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করি।রাত হয়ে যাওয়াতে ভাইকে পাইনি পরবর্তীতে জেলা ছাত্রদল দপ্তর সম্পাদক আরিফুল ইসলাম সুমন ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করি। সুমন ভাই বলল, “উনারা ট্রাংক রোডে আন্দোলন করার বিষয়ে আগ্রহী,তাও যেহেতু শিক্ষার্থীরা আন্দোলন দিয়ে দিয়েছে,আমরা অংশগ্রহণ করবো। এর পাশাপাশি সমন্বয়ক মধ্যস্থতাকারী যোবায়ের ভাইয়ের সবগুলো কাজের বিষয়ে আপডেট জানায় এবং উনার দায়িত্ব ছিল, স্থানীয় ও জাতীয় সকল মিডিয়া গুলোকে দাওয়াত দেওয়া।সাথে ছাত্রদল, ছাত্র মজলিশসহ অন্যান্য ছাত্র রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর সাথে যোগাযোগ করা, সমন্বয়কদের সাথে সমন্বয় করে নারী আন্দোলনকারীদেরও কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতে বলা। পুরো রাত দেশে কি হতে যাচ্ছে, সেই চিন্তা এবং আগেরদিন কুমিল্লা শিক্ষার্থীদের উপর হামলার এমন নির্মমতা দেখে দু’চোখে ঘুম আসছিলো না, বারবারই কবি ফররুখের বিখ্যাত পাঞ্জেরী কবিতার “রাত পোহবার কত দেরি, পাঞ্জেরী” চয়নটুকু মনে আসছে।
৪ই আগষ্ট ৩৫ই জুলাই, সকাল হলো,তৎকালীন বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন,ফেনী পৌর সভাপতি জাকির রুবেল ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করলাম ইটের জন্য। ভাই ঘন্টাখানিরে মধ্যে কল দিয়ে আপডেট দিলেন ৬ গ্রুপের জন্য বস্তা ভরে ইটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কাজগুলো তালিকা ধরে ধরে বারবার চেক করছি, কোন কাজ গ্যাপ হয়ে যাচ্ছে কিনা। আমার তালিকা ভুক্ত শাখাগুলোকে কল দিচ্ছি এবং সার্বিক খোঁজখবর নিচ্ছি সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা। আন্দোলনে পুরুষ সদস্যদের পাশাপাশি নারীদেরও অংশগ্রহণের জন্য তৎকালীন শহর সভাপতি শরীফ ভাইয়ের মাধ্যমে ফালাহিয়া মাদ্রাসার মহিলা বিভাগের শিক্ষিকা শাহেনা ম্যাডামের সাথে যোগাযোগ করা হয়। উনার মাধ্যমে ফালাহিয়া মাদ্রাসার ছাত্রীদের এবং ছাত্রীসংস্থার দায়িত্বশীলাদের সাথে যোগাযোগ করে আসতে বলা হয়। সকাল ১০ টা নাগাদ আন্দোলনের সার্বিক কাজের আপডেট জানানোর জন্য আমি শহর সভাপতি শরীফ ভাইয়ের সাথে দেখা করি,ভাইকে সবগুলো কাজের আপডেট জানাই।
সকাল ১১টা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া বন্ধু নোমান ও নুর হোসেন ভাইসহ হাজারী রোড় হয়ে মহিপালের দিকে রাওয়ানা করি। সকাল ১১:০০ মহিপালের চট্টগ্রাম বাস কাউন্টার থেকে শুরু হয় স্লোগান, মুহুর্তের মধ্যে চতুরদিক থেকে হাজার হাজার মানুষের ঢল। সেদিন আমাদের কারো রাজনৈতিক,রক্তের বা ব্যক্তিগত কোন পরিচয় ছিল না, একটিই পরিচয় ছিল আমরা সবাই মাজলুম,আমাদের ভাইদের রক্ত ঝরেছে, স্বৈরাচারের পতন অবশ্যই অবশ্যই করতে হবে। আন্দোলনের শুরু’র একটু পর পূর্বের পরিকল্পনা অনুযায়ী আব্দুল আহাদ রিক্সা করে মাইক নিয়ে আসে। পাশাপাশি ভিতরের বাজারে আল আরব প্রিন্টিং ফ্রেশে লিপলেট গুলো প্রিন্ট করা হয়। লিফলেটগুলো কোচিং পরিচালক নিয়ে আসে এবং আমি ফালাহিয়ার সাবেক সাথী মাজহারের হাত দিয়ে সবগুলো লিফলেট বিতরণ করি। এরমধ্যে শৃঙ্খলা বিভাগের কাজস্বরূপ ট্রাংক রোডে ফেনী আলিয়া মাদ্রাসা সেক্রেটারী নোমানকে এবং পাঠান বাড়ি রাস্তার মাথায় ফালাহিয়া মাদ্রাসা সভাপতি নাজমুল ভাইয়ের একটি গ্রুপ ইনফরমেশনের জন্য রাখা হয় এবং কিছুক্ষণ পরপর আমি এবং আমার বিভাগ সহকারী জিলানী ভাই ও এনাম ভাইসহ খোঁজখবর নেওয়া হয়। আন্দোলন চলমান, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বক্তব্য রাখছে,জুলাই স্পিড ধারণ সংগীতগুলো সবাই মিলে একই সাথে একই সুরে গলা উজাড় করে গাইতেছে। সংগীতের মাঝেমধ্যে ফেনীর বাড়ি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বক্তব্য রেখেছে।
সেদিন শুধু শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেনি বরং সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে অংশগ্রহণ করে। মহিপাল ব্যবসায়ীরা নিজেদের দোকানের সাধ্য অনুযায়ী আন্দোলনকারীদের জন্য আপেল,বিস্কুল পানিসহ নানারকমের পানীয় খাবার নিয়ে আসে।মহিপাল ফ্লাইওভার নিচে পুলিশ বক্সের সামনে সরকারি অসংখ্য পুলিশ, বিজিবি দাঁড়িয়ে আছে। যোহরের আজানের কিছুক্ষণ পর আন্দোলনকারীদের একাংশ যোহরের নামাজে দাঁড়ালে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের পেটুয়াবাহিনী নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের উপর গুলি করে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায়।পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা নিরব ভূমিকা পালন করে চলে যায়। মূহুর্তের মধ্যে আন্দোলনকারীদের উপর অজস্র গুলিবর্ষণে আন্দোলনকারীরা চতুর্দিকে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। আমি নির্বাক,নিস্তব্ধ হয়ে পিসারী রোডের মাথায় দাঁড়িয়ে আছি,আর বারবারই চিন্তা করতেছি, কিরে ভাই! এরা এভাবে কেন গুলি করতেছে? গুলির পাশাপাশি কেন এভাবে গালিগালাজ করতেছে?
এর মধ্যে সন্ত্রাসীদের একটি গ্রুপ পিসারী রোডের দিকে গুলি করতে করতে এগিয়ে আসে। সে সময় আন্দোলনকারীদের একাংশ পিসারী রোডে ডুকে আশ্রয় নেয়। আমি প্রতিমধ্যে শৃঙ্খলা বিভাগ সহ পরিচিত সকল ভাইদের সাথে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করি,বিশেষ করে আলিয়া সেক্রেটারী নোমানের সাথে বারবারই যোগাযোগ করা হয়।হামলা চলাকালীন অধিকাংশজনই ফ্লাইওভারের ওপর,নোয়াখালী হাইওয়ে রোড ও মহিপাল র-্যাব ক্যাম্প হয়ে রামপুরে আশ্রয় নেয়। এভাবে দেড় ঘন্টারও অধিক ছাত্রলীগের নরপিশাচরা হামলা চালায়,ঝরে যায় তাৎক্ষণিক ১১টি লাশ। হামলার একপর্যায়ে তাদের অস্ত্রগুলোর গুলি শেষ পর্যায়ে আসলে তারা আস্তে আস্তে পিছাতে শুরু করে। দীর্ঘক্ষণ নিঃসংশ হামলায় আন্দোলনকারীদের কেউ থামাতে পারিনি। পাহাড়সম বুক নিয়ে মহিপাল ফ্লাইওভারের উপরের এবং নোয়াখালী রোডের আন্দোলনকারী পর্যায়ক্রমে এই সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ ও তাদের সহযোগীদের প্রতিরোধ করা শুরু করে। বিক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীরা পুলিশ-প্রসাশনের নিরব ভূমিকা কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে আগুন লাগিয়ে দেন। বিকাল ৪.০০ টা নাগাদ আন্দোলনকারীরা সন্ত্রাসীদের শহরের এসএসকে রোড পাঠান বাড়ি রোডের মাথা পর্যন্ত প্রতিরোধ করে পালাতে বাধ্য করে। এর মধ্যে আমার কাছে খবর এলো শহরের সদস্য নুর হোসেন ভাই গুলি খেয়েছে, কয়েকজন ভাই আহত হয়েছে। তাদেরকে মেডিনোভা হাসপাতালে নিয়ে যায়, সেখানে সঠিক চিকিৎসা হবে না।আল কেমি হাসপাতালে আনতে হবে, এবং চিকিৎসার জন্য তাৎক্ষণিক এম্বুলেন্স করে নিয়ে আসতে হবে, ভাড়া লাগবে। আমি যেহেতু তৎকালীন শহরের অর্থ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছি, সেহেতু আমাকে টাকা নিয়ে যেতে হবে।
বিকাল ৪:৩০, ফালাহিয়া সভাপতি নাজমুল ভাই এবং আমি পরিহিত পোশাক পরিবর্তনের জন্য বাসায় যাই। এবং টাকা নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার জন্য বের হয়। বারবারই মনে হচ্ছে সন্ত্রাসীরা কখন জানি আবার রাস্তায় আটকিয়ে হামলা। আল্লাহর উপর এস্তেকামাত হয়ে আমার সেজ ভাই জুলাই আন্দোলনের অন্যতম যোদ্ধা কামরুল ভাই থেকে বাইক নিয়ে রাওয়ানা দি। পাঠান বাড়ীর মাথায় পৌঁছে দেখি স্থানীয় মানুষজন নেমে গেছে, বিভিন্ন ট্রায়ার জালিয়ে রাস্তা বন্ধ করে রেখেছে। মনে হচ্ছিল এই শহরে ১১টি লাশের বার বইতে পারছে না। একটুপর হাসপাতালে পৌঁছে,ওইদিকে আমরা যাওয়ার আগে অফিস সম্পাদক শফিক ভাই নুর হোসেন ভাইকে নিয়ে আসে। একটু পরপর আহতরা রক্ত ভেজা জামা নিয়ে আসতেছে, আল কেমি হাসপাতালে আসার কারণ সদর হাসপাতালে এবং ফেনী ডায়াবেটিস হাসপাতালে আহতদের পুনরায় হাসপাতালে আবার হামলা করেছে। কতটুকু মস্তিষ্ক বিক্রিত এবং নিষ্ঠুর হলে এমন কাজ করতে পারে তা সত্যিই চিন্তার বিষয়। হাসপাতালে থেকে বারবার সাংবাদিকদের থেকে জানার চেষ্টা করতেছি সর্বশেষ কতজন এই দেশের সার্বভ্বৌমত্ত রক্ষার জন্য প্রাণ দিয়েছে। মাগরিবের মধ্যে দৈনিক নয়া দিগন্তের সাংবাদিক শাহাদাত স্যার জানায় এখন পর্যন্ত উনার ১১ জনের নাম জানতে পেরেছে। এর মধ্যে হাসপাতালে আরো কয়েকজনকে ভাইকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর রাত ৮:০০টায় হাসপাতাল থেকে বের হই।
সেদিনের ফেনী সেই নির্মম হত্যাকান্ড ফেনীর এক ভয়াল দিন হিসাবে ইতিহাস হয়ে থাকবে। কিন্তু মাত্র বছরখানিকের মধ্যেই খুনিরা কোর্ট থেকে বিভিন্ন ভাবে জামিন নিয়ে নিচ্ছে, যা এই ফেনীর জনপদের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক এই আন্দোলনের একজন সহযোগী হিসাবে এই নির্বিচারে, নির্মম হত্যাকান্ডের সকল সন্ত্রাসীদের বিচারের দাবী করছি।.
আমি সাথে সাথে বিভিন্ন মাধ্যমে কে কে আটকে পড়ছে বের করার চেষ্টা করছি এবং তৎকালীন শহর সভাপতি শরীফ ভাইকে জানিয়ে আমাদের অভ্যন্তরীন সাংগঠনিক গ্রুপে থেকে রিমুভ দিচ্ছি। খুব বেশি চিন্তিত হচ্ছি, কি করা যায়? কি করা যায়? কিছুক্ষণ পর জুলাই আন্দোলনে ফেনী সরকারি কলেজে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব দানকারী আবু সুফিয়ান নোমান ভাইয়ের মাধ্যমে যমুনা টিভির সাংবাদিক আরিফুর রহমান ভাইকে এবং ফেনীর জুলাই আন্দোলনের অন্যতম দুঃসাহসী সাংবাদিক ফেনীর সময়ের শহীদ ভাইকে সহ তাদেরকে উদ্ধার করানোর জন্য পাঠানোর বিষয়ে কথা বলি।
এরমধ্যে দুপুর ১২টা নাগাদ ফেনী কোটা আন্দোলনের অন্যতম নেতৃত্বদানকারী ওমর ফারুক শুভ ও আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ’র নেতৃত্বে ভিতরের বাজার থেকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি মিছিল বের হয়। মিছিলের এক পর্যায়ে দোয়েল চত্ত্বর পের হতে না হতেই ছাত্রলীগের নরপিশাচরা হকিস্টিক, স্ট্যাম, লাটি ও বাঁশ দিয়ে শিক্ষার্থীদেরকে পুলিশের সামনেই হামলা করে। এই আঘাতে সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ তাদের নির্লজ্জটা প্রমান দেয় নারীদের উপর হামলার করার মাধ্যমে।পুলিশ ছিল নিরব দর্শক। হামলার এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়,অধিকাংশ ইসলামপুর রোড়ে আশ্রয় নেয়। প্রতিমধ্যে আন্দোলনকারী জানতে পারে তাদের সহযোগিদের একাংশকে পিটিআই স্কুল মাঠে আটকে রেখেছে।
আমি বারবার ফেনী সরকারি কলেজের আশিক ভাই, (যিনি আমাকে আগের দিন আন্দোলনের বিষয়ে অবগত করে ও সহযোগিতা চাই) উনাকে কল দিয়ে জানাই, যেভাবেই হোক পিটিআই স্কুল থেকে আটকে পড়াদেরকে ছাড়িয়ে আনতে হবে। কিছুক্ষণ পর আন্দোলনকারী শুভ, তাজীম, জাফর ও আশিক ভাইসহ দুঃসাহসের পরিচয় দিয়ে পুলিশের ও সাংবাদিকদের সহায়তায় পিটিআই স্কুল থেকে আটজে পড়া শিক্ষার্থীদের ছাড়িয়ে আনে। সেদিন নারী শিক্ষার্থীদের উপর হামলায় ফেনীর প্রতিটি মানুষ ছাত্রলীগ সন্ত্রাসীদের প্রতি তীব্র ঘৃণা ছড়ায়। আছরের পর ফালাহিয়া মাদ্রাসার আমার জুনিয়র সফি উল্লাহকে কল দিয়ে হামলাকারী পরিচয় পাঠিয়ে কিছু স্টিকার তৈরি করতে বলি,সফির বানানো স্টিকারের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে স্টিকার বানানো হয় এবং রাতের মধ্যে সেগুলো ব্যাপক প্রচার হয়। সেদিনের হামলার পরবর্তীতে আন্দোলনে নেতৃত্ব দানকারীদেরকে নিরাপদে নিজ বাস্তস্থনে থাকতে দেয়নি।
১৮ জুলাই বাদ আছর আন্দোলনকারী আবু জাফর ও শুভ’র নেতৃত্বে দাউদপুল থেকে বড় মসজিদে পর্যন্ত মিছিল হয় সেদিন হয়। সেদিন শুভ ফালাহিয়া শিবিরের সাথে পূর্বে পরিচয়ের সুবিধার্ত্তে তৎকালীন ফালাহিয়া মাদ্রাসা সভাপতি নাজমুল হক থেকে কিছু জনশক্তি চাই।নাজমুল ভাই নির্দিষ্ট কয়েকজনকে পাঠাই। সেদিনের আন্দোলনে সেভাবে কোন হামলার ঘটনা ঘটেনি।
১৯ই জুলাই সকাল বেলা থেকে শুনা যাচ্ছে আজকে জুমার পর আন্দোলনকারীরা মিছিল করতে পারে। প্রতি মধ্যে তৎকালীন কোচিং পরিচালক জামাল ভাই এবং শহর সেক্রেটারী ওমর ফারুক ভাই বসে বর্তমান সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের নেতৃত্ব দানকারী আবু জাফর ও ওমর ফারুক শুভ’র সাথে বসার পরিকল্পনা করে। জুমার পরপর জহিরিয়া মসজিদের সামনে কিছু লোক দাঁড়িয়ে আছে, যে একজন ঈমামের অপেক্ষায়, একজন আবু সাঈদের অপেক্ষায় যে কিনা স্লোগান দিয়ে রাজপথ দ্রোহতে যাপ দিবে। এর মধ্যে কোচিং পরিচালক জামাল ভাই এবং ছাত্রশিবির ফেনী শহর শাখার সাবেক সাহিত্য সম্পাদক শরীফুল ইসলাম সাইমুমের নেতৃত্বে মিছিল শুরু হয়, মিছিলটি শহীদ মিনারে গিয়ে শেষ হয়।
একইদিন বিকাল ৩টায়,জামাল ভাই তৎকালীন ফালাহিয়া মাদ্রাসা সভাপতির মাধ্যমে (যেহেতু আগ থেকে শুভ’র সাথে যোগাযোগ আছে) শুনতে পারে বাদ আছর আন্দোলনকারীরা মিছিল করবে।এর মধ্যে পূর্বের পরিকল্পনার আলোকে জামাল ভাই ওমর ফারুক শুভ’র কে আন্দোলনের স্বার্থে নিজের নাম গোপন করে শরীফ পরিচয় দিয়ে দেখা করতে চাই, শুভ আছরের আগেই সাক্ষাৎ এর বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে।পরবর্তীতে জামাল ভাই ফেনী সরকারি কলেজের জনশক্তি মামুন ভাই ও দাউদ ভাইকে নিয়ে আছরের আগেই স্বাক্ষাৎ করে এবং আছরের পরে কর্মসূচি নিয়ে পরিকল্পনা করে। আছরের পর শিক্ষার্থীরা জহিরিয়া মসজিদ থেকে ফেনী বড় মসজিদ পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিল করে, মিছিলে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি জেলা ছাত্রদল সভাপতি সালাউদ্দিন মামুনসহ ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা অংশগ্রহণ করে। মিছিলটি বড় মসজিদের সামনে পৌঁছালে সেখানে তারা অবস্থান কর্মসূচি পালন করার জন্য রাস্তায় বসে পড়ে।অবস্থান কর্মসূচি মাঝপথে হঠাৎ পুলিশ শিক্ষার্থীদের উপর লাঠিচার্জ এবং টিয়ারস্যাল নিক্ষেপ করে। মূহুর্তের মধ্যে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ভঙ্গ হয়ে যায় এবং ৪ জনের মত শিক্ষার্থী আহত হয়ে,সন্ত্রাসী পুলিশ সদস্যরা ছাত্রী শিক্ষার্থীদের উপরও নির্লজ্জের মতো লাঠিচার্জ করে। বাদ মাগরিব,তৎকালীন শহর সভাপতি শরীফ ভাই, জেলা সভাপতি ইমাম ভাই, শহর সেক্রেটারী ফারুক ভাই ও জেলা সভাপতি হেলাল ভাই সহ আন্দোলন নিয়ে বসছে কি করা যায় সে বিষয়ে। আমি আছর থেকে শহর সভাপতির সাথেই ছিলাম তাই আমাকেও ভাই নিয়ে গেল। সার্বিক আলোচনার মধ্যে মাগরিব নামাজ বিরতি এবং নামাজের পর আবার সবাই বসলো। মাগরিব একটু পরই জেলা ছাত্রদল সভাপতি মামুন ভাই অন্য একটি নাম্বার থেকে সরাসরি আমার নাম্বারে কল দিলো। মামুন ভাই কল দিয়ে বললো, “আপনারা আসেন আজকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর হামলা করেছে পুলিশ,এভাবে তো আর বসে থাকা যায় না”,শহর সভাপতি পরামর্শ ক্রমে উত্তর দিলাম, ভাই কেন্দ্রের সাথে আমরা কথা বলার চেষ্টা করতেছি, কিন্তু নেট বন্ধ হওয়াতে পারতেছিনা, তাও দ্রুত কথা বলে ইনশাআল্লাহ আপনাকে আপডেট জানাবো। মামুন ভাই ঠিক আছে বলে কেটে দিলো।
এরপর ভাইয়েরা আরো কিছুক্ষণ বসলো, আমি শহর শাখার সদস্য নুর হোসেন ভাইসহ (উনি আবার আমার একই ডিপার্টমেন্টের জুনিয়র এবং বন্ধু) আমরা আমাদের ফেনী বিশ্ববিদ্যালয়ের মোমবাতি প্রজ্জলনে অংশগ্রহণ করলাম।সেখানে মোমবাতি প্রজ্জলনে ল” ডিপার্টমেন্টের সজীব ভাই সবার সাথে সমন্বয় করে। সে কর্মসূচি পালনের পর যে যার মত বাসায় ফিরে আসলাম।
২০ জুলাই,সকালে আমাদের পৌরসভার ১০নং ওয়ার্ডের স্থানান্তরকৃত জনশক্তি ঢাকা কলেজ পড়ুয়া আব্দুল্লাহ আল সামি মিরপুরে আহত হয়েছে। তৎকালীন শহর সভাপতি শরীফ ভাই,তৎকালীন শহর প্রকাশনা সম্পাদক জাহিদ ভাই ও আমিসহ দেখতে গেলাম। সামীর বাসায় থাকা অবস্থায় শহর সভাপতি শরীফুল ইসলাম ভাইয়ের মোবাইলে জোবায়ের নামে একজন কল দে আন্দোলন নিয়ে কথা বলতে ও সহযোগী নিতে। শহর সভাপতি ভাই আমাকে এবং জাহিদ ভাইকে সামীর বাসা থেকে পাঠান বাড়ী মসজিদের সামনে পাঠাই জোবায়ের ভাইয়ের সাথে দেখা করতে। জোবায়ের ভাইয়ের সাথে ইতিপূর্বে আমার পরিচয় ছিল না, কিন্তু উনার পড়াশোনা ফেনী কলেজে এবং গণঅধিকার পরিষদ করাতে জাহিদ ভাইয়ের সাথে পূর্বেই পরিচয় ছিল। জোবায়ের ভাই আন্দোলনের শুরু থেকে কিছু বিষয় বলল, পাশাপাশি দেখা করার মূল কারণ হলো এর আগে যারা স্মারকলিপি এবং ট্রাংক রোডে আন্দোলন করছে তাদের অধিকাংশরই পরিবারকে বিভিন্ন হয়রানি ও বাসায় গিয়ে গিয়ে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা তলাশী করতেছে এবং টার্গেট করে করে তাদের বাসার নিচে সন্ত্রাসীরা পাহারা দিচ্ছে। তাই পূর্বের আন্দোলনকারীদের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না।পাশাপাশি ইন্টারনেট বন্ধ হওয়াতে উনিও ঢাকার সাথে কোন ধরনের যোগাযোগ করতে পারছেনা। জোবায়ের ভাই আরো বললো, আমি জানি আপনাদের জনশক্তিরা আন্দোলনে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেছে কিন্তু এখন আপনাদের জনশক্তিদের পাশাপাশি পরামর্শ এবং পুরোপুরি সহযোগিতা প্রয়োজন। এবং উনি ছাত্রদলের সাথেও বসবে তাদেরও এমন সহযোগিতা চাইবে এই কথা আশ্বস্ত করেন। আলাপনের শেষ মুহূর্তে জোবায়ের ভাইয়ের সাথে মোবাইলে কথা বলে রাফি নামে আমাদের একজন কর্মী আসে, সে ইতিপূর্বেই জোবায়ের ভাইয়ের সাথে পরিচিত হয়েছে। স্মৃতিচারণের ফাঁকে রাফিকে নিয়ে ছোট্র করে একটু বলেনি, ফেনী শহর জুলাই আন্দোলনে ছোট হোক,বড় হোক এমন কোন মিছিল,জানাযা এবং অন্যান্য কর্মসূচি ছিল না, যেখানে রাফি ছিল না। রাফিকে দেখে বরাবরের মতই অবাক হতাম, আলিম পড়ুয়া একটা ছেলে কিভাবে এত দুর্দান্ত সাহসী হয়।সেদিন সেখানে জোবায়ের সাথে অনলাইন (মেসেঞ্জার-টেলিগ্রাম) যুক্ত হয়ে আমি এবং জাহিদ ভাই বিদায় নিই।
এর মধ্যে যোবায়ের ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ হয়েছে নিয়মিত। ২৫ তারিখ যোবায়ের ভাই কল দিলো ইমার্জেন্সি একটু দেখা করবে। উনার বাসা ডাক্তার পাড়া সুবাধে আমি যাই দেখা করতে। সেদিন বিকাল বেলা ভাইয়েরা আবার দেয়াল লিখুন কর্মসূচি পালন করে। রাত ৯ টায় যোবায়ের ভাইয়ের সাথে ডাক্তার পাড়া ইথেরিয়াল স্কুলের সামনে মামুন ভাইয়ের দোকানে দেখা হলো। ভাই বললো, “ভাই! আগামীকাল একটু গায়েবানা পড়া প্রয়োজন। জানাযার একজন ইমাম এবং আপনাদের কিছু ছেলেপেলেদের ব্যবস্থা করে দেন, আমি নিজেও আমার যাদের সাথে যোগাযোগ আছে তাদের কল দিয়ে বলবো।”
আমি বললাম, “ঠিক আছে”। পাশাপাশি গায়েবানা জানাযায় সামনে একটি টেবিল ও বাংলাদেশের পতাকার ব্যবস্থা করবে উনি। চা-আড্ডা এবং আন্দোলনের সার্বিক পরিকল্পনা নিয়ে সে দিন কথা শেষ হলো।
২৬ জুলাই আমার একটু ইর্মাজেন্সি গ্রামে বাড়িতে যেতে হলো। সকাল থেকেই অসংখ্যজনকে কল দিলাম, গায়েবানা জানাযায় ইমামতির জন্য। এরমধ্যে ১/২ দিন অন্য একটি জেলায় এরকম গায়েবানায় জানাযা থেকে গ্রেফতারের ভিডিওটি দেখে অনেকে ভয়ে রাজি হচ্ছে না, আবার আমাদের সাবেক ভাইদের অধিকাংশ জুমার নামাজ পড়ানোর ফলে তারাও সময় দিতে পারছেনা। পড়লাম ব্যাপক বিপাকে,যোবায়ের ভাইকে কথা দিলাম,ইমামের ব্যবস্থা করবো, কিন্তু মনে তো হচ্ছে পাবো না। কিছুক্ষণ চিন্তা করার পর সিদ্ধান্ত নিলাম, না যেভাবেই হোক সংগঠনের ইমেজের জন্য হলেও কাউকে না কাউকে ব্যবস্থা করতেই হবে।
একইদিন সকাল ১১:৩০, তৎকালীন ফালাহিয়া মাদ্রাসা সেক্রেটারী ফেনীর জুলাইয়ের ইমাম মুহাইমিনান উদ্দিন সাইমুম ভাইকে সংগঠনে সিদ্ধান্ত বলে যেতে বাধ্য করলাম। এবং বাদ জুমা, শত শত পুলিশের সামনে শহীদ আবু সাঈদের উত্তরসূরী ফেনী জুলাইয়ের ইমাম সাইমুম ভাই দুর্দান্ত সাহস নিয়ে জানাযায় ইমামতি করতে দাঁড়ি যায়। যেহেতু জুমা শেষ, শহর বড় মসজিদের মধ্যে একটি জহিরিয়া মসজিদে নামাজ শেষ পাশে অনেক মুসল্লি ছিল, কিন্তু ৩-৪ কাতারে ৫০-৬০ জনের বাহিরে কেউ সাহস করেনি। জানাযা আলহামদুলিল্লাহ সুন্দর ভাবে শেষ হলো, তবে খুব বেশি ভয়ে ছিলাম, না জানি সাইমুম ভাই গ্রেফতার হয়ে যায়, ইতিপূর্বে উনি অলরেডি ২ বার কারাবরণ করেছে, এর মধ্যে এবার আবার করলে পরিবারকে কি জবাব দিবো। যাক আজকের মতো কর্মসূচি যোবায়ের ভাই,ছাত্রদলের সাগর ভাই এবং ফালাহিয়া মাদ্রাসা সভাপতি নাজমুল ভাইয়ের নেতৃত্বে শেষ হলো।
সমস্যা শুরু হলো সন্ধ্যা থেকে, দুর্ভাগ্য হোক কিংবা সৌভাগ্য হোক, পুরো বাংলাদেশে সেদিন গায়েবানা জানাযা অনলাইন প্রচার হলো শুধু ফেনীর এটিই। নানাদিক থেকে খবর এলো এনএসআইসহ আওয়ামী সন্ত্রাসীদের কয়েকটি বিশেষ বাহিনী সাইমুম ভাইকে খুঁজছে দ্রুত গ্রেফতার করবে। ভাইকে সকল মোবাইল এবং বাসস্থান পরিবর্তন করতে বলি। আল্লাহর কাছ অনেক বেশি সাহায্যর ফলে এই বিপদ থেকে আল্লাহ ভাইকে হেফাজত করে।
পহেলা আগষ্ট, ৩২ জুলাই সাধারণ শিক্ষার্থীরা কেন্দ্রের কর্মসূচি মোমবাতি প্রজ্জলন করবে। জাহিদ ভাই শহরের কয়েকটি শাখায় দাওয়াতী কাজ করলো পাশাপাশি আমি পলিটেকনিক, ফালাহিয়াসহ কয়েকটি শাখাকে দাওয়াতী কাজ করি।সেদিন আওয়ামী এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী পুলিশলীগরা শিক্ষার্থীদের ভিতরের বাজার থেকে বের হতে দেয়নি। বৃষ্টির মধ্যেও আন্দোলনকারী দীর্ঘক্ষণ চেষ্টা করে কিন্তু এই সন্ত্রাসীদের এজেন্ডা বাস্তবায়নকারীরা ট্রাংক রোডে মোমবাতি নিয়ে উঠতে দেয়নি।
একই দিনে রাতে, যোবায়ের ভাই উনার পরিচিত তাজিম,সোহাগ,আশিক ও আজীজসহ সামনে সারিতে নেতৃত্ব দানকারীদের মতামত নিয়ে, জাহিদ ভাইয়ের মাধ্যমে শহর সভাপতি সাথে পরবর্তী দিনের কর্মসূচি বাস্তবায়নে বিষয়ে যোগাযোগ করে। শহর সভাপতি জরুরি অনলাইনে সেক্রেটারীয়েট বৈঠক দিয়ে সেক্রেটারীয়েট সাথে সমন্বয় করে জহিরিয়া মসজিদ থেকে খেজুর চত্ত্বর পর্যন্ত মিছিলের কর্মসূচির বিষয়ে যোবায়ের ভাইকে জানাই।পরবর্তীতে পরেরদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
২রা আগষ্ট ৩৩ জুলাই, কর্মসূচিতে ১৭ই জুলাই শিক্ষার্থীদের উপর হামলার পর এই প্রথম ফেনী এত বিশাল শিক্ষার্থীদের মিছিল হয়। এবং এই মিছিলে নারী শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন পাবলিক-প্রাইভেট শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন। জহিরিয়া মসজিদ থেকে শুরু হওয়া মিছিল ইসলাম রোডের মাথায় পৌঁছানোর সাথে সাথে ১৯ই জুলাই পুলিশের হামলার কথা স্মরণ করে “বুয়া,বুয়া” স্লোগানে ট্রাংক রোড থেকে যাত্রা শুরু হয়। এই মিছিলে সকল শিক্ষার্থীদের এমন অংশগ্রহণ ফেনীর আন্দোলনে অন্যরকম স্পৃহা তৈরি করে। সেদিন ছিল বৃষ্টি দিন,কিন্তু সামান্য বৃষ্টির কি সাধ্য আছে এই পাহাড়সম দাবানলকে নিবানোর? আমরাও (ছাত্রশিবির শহর ও জেলা) ২ই আগষ্ট সকল থানা,ওয়ার্ড ও উপশাখা পর্যায়ে কোটা দিয়ে সর্বোচ্চ উপস্থিতির চেষ্টা করি। এবং ২ ঘন্টার সেদিনের আন্দোলন চমৎকারভাবে সমাপ্ত হয়।
৩ই আগষ্ট ৩৪ই জুলাই, দুপুরের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় কেন্দ্র ঘোষিত এক দফা দাবী নিয়ে আমরা আমাদের জেলা ও শহর শাখার সেক্রেটারীয়েট মেম্বাররা সিদ্ধান্ত নি, এটা যেভাবেই হোক আগামীকাল বাস্তবায়ন করতে হবে। আমাদের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি ফেনীর যেসকল শিক্ষার্থী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এবং নবগঠিত সমন্বয়ক টিমের সময়ে ফেনী জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সহযোগী “কোটা আন্দোলন পূর্ণ বহাল চলবেনা” গ্রুপে সকাল ১১ টায় মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে কর্মসূচি ঘোষিত হয়।
এই এক রাতে পরপর ২ বার শহর ও জেলার সেক্রেটারীয়েটদের নিয়ে জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এবং শহর ও জেলার সেক্রেটারীয়েটদেরকে আলাদা আলাদা বিভাগে কাজ ভাগ করে দেওয়া হয়।
আমার বিভাগ ছিল শৃঙ্খলা বিভাগ এর অধিনে যথাসাধ্য ইট,বাশঁসহ প্রয়োজনীয় প্রতিরোধের ব্যবস্থা করা, ৬টি শৃঙ্খলা গ্রুপ সাবেক-বর্তমান ও সমন্বয়ক ভাইদের নিয়ে গঠন করা, মাইকের ব্যবস্থা করা এবং কেন্দ্র থেকে পাঠানো লিপলেট প্রিন্ট ও বিতরণ করা। আমি আমার বিভাগের কাজের অংশস্বরূপ ভিতরের বাজারে কোচিং পরিচালক জামাল ভাই, ফালাহিয়া সভাপতি নাজমুল ভাইসহ ফেনীর ভিতর বাজার থেকে ২টি হ্যান্ড মাইক ক্রয় করি, এবং রাতেই রিক্সায় বড় মাইকের বিষয়ে মাইক দোকানে কথা বলি, পাশাপাশি সকালে এই দোকান থেকে পৌরসভার ১৪নং থানার সাথী আব্দুল আহাদকে দায়িত্ব দি, রিক্সা ধরিয়ে মাইক নিয়ে আসার জন্য। এবং তৎকালীন শহর সভাপতি শরীফ ভাই সেক্রেটারী ফারুক ভাই ও অফিস সম্পাদক শফিক ভাইয়ের মাধ্যমে শহর সেক্রেটারীয়েট ও সদস্যদের একাংশ, জেলার সভাপতি ইমাম ভাই, সেক্রেটারী হেলাল ও অফিস সম্পাদক আরমান ভাইয়ের মাধ্যমে জেলা সেক্রেটারীয়েট ও সদস্যদের একাংশ এবং শহর ও জেলার সাবেক সেক্রেটাটীয়েট মেম্বার ও নবগঠিত জুলাই আন্দোলনের সমন্বয়কদের সহ প্রতিটিমে ৮ জন করে মোট ৬টি টিম গঠন করি। সেদিনে রাতে জেলা ছাত্রদল সভাপতি সালাউদ্দিন মামুন ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করি, রাত হয়ে যাওয়াতে ভাইকে পাইনি পরবর্তীতে জেলা ছাত্রদল দপ্তর সম্পাদক আরিফুল ইসলাম সুমন ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করি। সুমন ভাই বলল, “উনারা ট্রাংক রোডে আন্দোলন করার বিষয়ে আগ্রহী,তাও যেহেতু শিক্ষার্থীরা আন্দোলন দিয়ে দিয়েছে,আমরা অংশগ্রহণ করবো। এর পাশাপাশি সমন্বয়ক মধ্যস্থতাকারী যোবায়ের ভাইয়ের সবগুলো কাজের বিষয়ে আপডেট জানায় এবং উনার দায়িত্ব ছিল, স্থানীয় ও জাতীয় সকল মিডিয়া গুলোকে দাওয়াত দেওয়া, ছাত্রদল, ছাত্র মঁলিশসহ অন্যান্য ছাত্র রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর সাথে যোগাযোগ করা, সমন্বয়কদের সাথে সমন্বয় করে নারী আন্দোলনকারীদেরও কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতে বলা। পুরো রাত দেশে কি হতে যাচ্ছে, সেই চিন্তা এবং কুমিল্লা শিক্ষার্থীদের উপর হামলার এমন নির্মমতা দেখে দু’চোখে ঘুম আসছিলো না, বারবারই কবি ফররুখের বিখ্যাত পাঞ্জেরী কবিতার “রাত পোহবার কত দেরি, পাঞ্জেরী” চয়নটুকু মনে আসছে।
৪ই আগষ্ট ৩৫ই জুলাই, সকাল হলো,শহর শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি জাকির রুবেল ভাইয়ের সাথে যোগাযোগ করলাম ইটের জন্য। ভাই ঘন্টাখানিরে মধ্যে কল দিয়ে আপডেট দিলেন ৬ গ্রুপের জন্য বস্তা ভরে ইটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কাজগুলো তালিকা ধরে ধরে বারবার চেক করছি, কোন কাজ গ্যাপ হয়ে যাচ্ছে কিনা এবং আমার তালিকা ভুক্ত শাখাগুলোকে কল দিচ্ছি, সার্বিক খোঁজখবর নিচ্ছি সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা। আন্দোলনে পুরুষ সদস্যদের পাশাপাশি নারীদেরও অংশগ্রহণের জন্য তৎকালীন শহর সভাপতি শরীফ ভাইয়ের মাধ্যমে ফালাহিয়া মাদ্রাসার মহিলা বিভাগের শিক্ষিকা শাহেনা ম্যাডামের সাথে যোগাযোগ করা হয়। উনার মাধ্যমে ফালাহিয়া মাদ্রাসার ছাত্রীদের এবং ছাত্রীসংস্থার দায়িত্বশীলাদের সাথে যোগাযোগ করে আসতে বলা হয়। সকাল ১০ টা নাগাদ আন্দোলনের সার্বিক কাজের আপডেট জানানোর জন্য আমি শহর সভাপতি শরীফ ভাইয়ের সাথে দেখা করি,ভাইকে সবগুলো কাজের আপডেট জানাই।
সকাল ১১টা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া বন্ধু নোমান ও নুর হোসেন ভাইসহ হাজারী রোড় হয়ে মহিপালের দিকে রাওয়ানা করি। সকাল ১১:৩০ মহিপালের চট্টগ্রাম বাস কাউন্টার থেকে শুরু হয় স্লোগান, মুহুর্তের মধ্যে চতুরদিক থেকে হাজার হাজার মানুষের ঢল। সেদিন আমাদের কারো রাজনৈতিক,রক্তের বা ব্যক্তিগত কোন পরিচয় ছিল না, একটিই পরিচয় ছিল আমরা সবাই মাজলুম,আমাদের ভাইদের রক্ত ঝরেছে, স্বৈরাচারের পতন অবশ্যই অবশ্যই করতে হবে। আন্দোলনের শুরু’র একটু পর পূর্বের পরিকল্পনা অনুযায়ী আব্দুল আহাদ রিক্সা করে মাইক নিয়ে আসে। পাশাপাশি ভিতরের বাজারে আল আরব প্রিন্টিং ফ্রেশে লিপলেট গুলো প্রিন্ট করা হয়। লিফলেটগুলো কোচিং পরিচালক নিয়ে আসে এবং আমি ফালাহিয়ার সাবেক সাথী মাজহারের হাত দিয়ে সবগুলো লিফলেট বিতরণ করি। এরমধ্যে শৃঙ্খলা বিভাগের কাজস্বরূপ ট্রাংক রোডে ফেনী আলিয়া মাদ্রাসা সেক্রেটারী নোমানকে এবং পাঠান বাড়ি রাস্তার মাথায় ফালাহিয়া মাদ্রাসা সভাপতি নাজমুল ভাইয়ের একটি গ্রুপ ইনফরমেশনের জন্য রাখা হয় এবং কিছুক্ষণ পরপর আমি এবং আমার বিভাগ সহকারী জিলানী ভাই ও এনাম ভাইসহ খোঁজখবর নেওয়া হয়। আন্দোলন চলমান, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বক্তব্য রাখছে,জুলাই স্পিড ধারণ সংগীতগুলো সবাই মিলে একই সাথে একই সুরে গলা উজাড় করে গাইতেছে। সংগীতের মাঝেমধ্যে ফেনীর বাড়ি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বক্তব্য রেখেছে।
সেদিন শুধু শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেনি বরং সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে অংশগ্রহণ করে। মহিপাল ব্যবসায়ীরা নিজেদের দোকানের সাধ্য অনুযায়ী আন্দোলনকারীদের জন্য আপেল,বিস্কুল পানিসহ নানারকমের পানীয় খাবার নিয়ে আসে।মহিপাল ফ্লাইওভার নিচে পুলিশ বক্সের সামনে সরকারি অসংখ্য পুলিশ, বিজিবি দাঁড়িয়ে আছে। যোহরের আজানের কিছুক্ষণ পর আন্দোলনকারীদের একাংশ যোহরের নামাজে দাঁড়ালে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের পেটুয়াবাহিনী নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের উপর গুলি করে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায়।পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা নিরব ভূমিকা পালন করে চলে যায়। মূহুর্তের মধ্যে আন্দোলনকারীদের উপর অজস্র গুলিবর্ষণে আন্দোলনকারীরা চতুর্দিকে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। আমি নির্বাক,নিস্তব্ধ হয়ে পিসারী রোডের মাথায় দাঁড়িয়ে আছি,আর বারবারই চিন্তা করতেছি, কিরে ভাই! এরা এভাবে কেন গুলি করতেছে? গুলির পাশাপাশি কেন এভাবে গালিগালাজ করতেছে?
এর মধ্যে সন্ত্রাসীদের একটি গ্রুপ পিসারী রোডের দিকে গুলি করতে করতে এগিয়ে আসে। সে সময় আন্দোলনকারীদের একাংশ পিসারী রোডে ডুকে আশ্রয় নেয়। আমি প্রতিমধ্যে শৃঙ্খলা বিভাগ সহ পরিচিত সকল ভাইদের সাথে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করি,বিশেষ করে আলিয়া সেক্রেটারী নোমানের সাথে বারবারই যোগাযোগ করা হয়।হামলা চলাকালীন অধিকাংশজনই ফ্লাইওভারের ওপর,নোয়াখালী হাইওয়ে রোড ও মহিপাল র-্যাব ক্যাম্প হয়ে রামপুরে আশ্রয় নেয়। এভাবে দেড় ঘন্টারও অধিক ছাত্রলীগের নরপিশাচরা হামলা চালায়,ঝরে যায় তাৎক্ষণিক ১১টি লাশ। হামলার একপর্যায়ে তাদের অস্ত্রগুলোর গুলি শেষ পর্যায়ে আসলে তারা আস্তে আস্তে পিছাতে শুরু করে। দীর্ঘক্ষণ নিঃসংশ হামলায় আন্দোলনকারীদের কেউ থামাতে পারিনি। পাহাড়সম বুক নিয়ে মহিপাল ফ্লাইওভারের উপরের এবং নোয়াখালী রোডের আন্দোলনকারী পর্যায়ক্রমে এই সন্ত্রাসী ছাত্রলীগ ও তাদের সহযোগীদের প্রতিরোধ করা শুরু করে। বিক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীরা পুলিশ-প্রসাশনের নিরব ভূমিকা কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে আগুন লাগিয়ে দেন। বিকাল ৪.০০ টা নাগাদ আন্দোলনকারীরা সন্ত্রাসীদের শহরের এসএসকে রোড পাঠান বাড়ি রোডের মাথা পর্যন্ত প্রতিরোধ করে পালাতে বাধ্য করে। এর মধ্যে আমার কাছে খবর এলো শহরের সদস্য নুর হোসেন ভাই গুলি খেয়েছে, কয়েকজন ভাই আহত হয়েছে। তাদেরকে মেডিনোভা হাসপাতালে নিয়ে যায়, সেখানে সঠিক চিকিৎসা হবে না।আল কেমি হাসপাতালে আনতে হবে, এবং চিকিৎসার জন্য তাৎক্ষণিক এম্বুলেন্স করে নিয়ে আসতে হবে, ভাড়া লাগবে। আমি যেহেতু তৎকালীন শহরের অর্থ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছি, সেহেতু আমাকে টাকা নিয়ে যেতে হবে।
বিকাল ৪:৩০, ফালাহিয়া সভাপতি নাজমুল ভাই এবং আমি পরিহিত পোশাক পরিবর্তনের জন্য বাসায় যাই। এবং টাকা নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার জন্য বের হয়। বারবারই মনে হচ্ছে সন্ত্রাসীরা কখন জানি আবার রাস্তায় আটকিয়ে হামলা। আল্লাহর উপর এস্তেকামাত হয়ে আমার সেজ ভাই জুলাই আন্দোলনের অন্যতম যোদ্ধা কামরুল ভাই থেকে বাইক নিয়ে রাওয়ানা দি। পাঠান বাড়ীর মাথায় পৌঁছে দেখি স্থানীয় মানুষজন নেমে গেছে, বিভিন্ন ট্রায়ার জালিয়ে রাস্তা বন্ধ করে রেখেছে। মনে হচ্ছিল এই শহরে ১১টি লাশের বার বইতে পারছে না। একটুপর হাসপাতালে পৌঁছে,ওইদিকে আমরা যাওয়ার আগে অফিস সম্পাদক শফিক ভাই নুর হোসেন ভাইকে নিয়ে আসে। একটু পরপর আহতরা রক্ত ভেজা জামা নিয়ে আসতেছে, আল কেমি হাসপাতালে আসার কারণ সদর হাসপাতালে এবং ফেনী ডায়াবেটিস হাসপাতালে আহতদের পুনরায় হাসপাতালে আবার হামলা করেছে। কতটুকু মস্তিষ্ক বিক্রিত এবং নিষ্ঠুর হলে এমন কাজ করতে পারে তা সত্যিই চিন্তার বিষয়। হাসপাতালে থেকে বারবার সাংবাদিকদের থেকে জানার চেষ্টা করতেছি সর্বশেষ কতজন এই দেশের সার্বভ্বৌমত্ত রক্ষার জন্য প্রাণ দিয়েছে। মাগরিবের মধ্যে দৈনিক নয়া দিগন্তের সাংবাদিক শাহাদাত স্যার জানায় এখন পর্যন্ত উনার ১১ জনের নাম জানতে পেরেছে। এর মধ্যে হাসপাতালে আরো কয়েকজনকে ভাইকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর রাত ৮:০০টায় হাসপাতাল থেকে বের হই।
সেদিনের ফেনী সেই নির্মম হত্যাকান্ড ফেনীর এক ভয়াল দিন হিসাবে ইতিহাস হয়ে থাকবে। কিন্তু মাত্র বছরখানিকের মধ্যেই খুনিরা কোর্ট থেকে বিভিন্ন ভাবে জামিন নিয়ে নিচ্ছে, যা এই ফেনীর জনপদের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক এই আন্দোলনের একজন সহযোগী হিসাবে এই নির্বিচারে, নির্মম হত্যাকান্ডের সকল সন্ত্রাসীদের বিচারের দাবী করছি।