মজিবুর রহমান মঞ্জু
ডাকসু ও জাকসু’তে শিবির গঠিত প্যানেলের অবিস্মরণীয় জয়লাভকে যদি ৮ম আশ্চর্যের সাথে তুলনা করা হয়, তাহলে ৯ম আশ্চর্য হলো এর প্রতিক্রিয়ায় সাথে সাথে সবাই একজোট হয়ে শিবির প্রতিরোধের জন্য একাট্টা হয়ে মাঠে নেমে না পড়াটা। ৪৪ বছর আগেকার একটা স্মৃতি বন্ধুদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই; ১৯৮১ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (চাকসু) নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির পূর্ণ প্যানেলে জয়লাভ করেছিল।
সেটা ছিলো সে সময়কালের দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা। নির্বাচনে অভাবনীয় জয়লাভের পর শিবির বিজয় মিছিল না করলেও পরদিন সবদল একসাথ হয়ে মিছিল করেছিল সর্বদলীয় ছাত্রঐক্েযর ব্যানারে। তাদের মিছিলের সামনে যে ব্যানার, তাতে লেখা ছিলো “আজিজিয়া-জসিমিয়া-গাফ্ফারিয়া আলীয়া মাদ্রাসায় স্বাগতম”। অর্থাৎ এ অকল্পনীয় বিজয়ের প্রতি ব্যাঙ্গাত্মক ইংগিত করে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় তারা বুঝাতে চাইলেন; চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এখন আর মুক্তবুদ্ধির চর্চা কেন্দ্র নেই, এটা এখন আলীয়া মাদ্রাসা হয়ে গেছে! তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ছিলেন ড. আব্দুল আজিজ খান। ভিপি এবং জিএস নির্বাচিত হয়েছিলেন যথাক্রমে জসিম উদ্দিন সরকার ও আব্দুল গাফ্ফার। ডাকসু নির্বাচনে শিবির গঠিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের ভূমিধ্বস বিজয়ের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেরকম আরেকটি মিছিল বের হবে বলে আমি মনে করেছিলাম । যার সামনের ব্যানারে লেখা থাকবে; “নিয়াজিয়া-সাদিকীয়া-ফরহাদিয়া কওমী মাদ্রাসায় স্বাগতম”!
|
কিন্তু সেই ৯ম আশ্চর্যের ঘটনাটা ঘটেনি। এটা একটা শুভ লক্ষণ। ৮১ তে চাকসু বিজয়ের পর শিবিরের উপর নেমে এসেছিল ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা। সম্ভবত ১০০’র মত রুম পুড়িয়ে দেয়া হয়েছিল শিবির নেতা-কর্মীদের। দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়টি। সাধারণ ছাত্রদের রায় মেনে না নেয়া ও সন্ত্রাসের শক্তি দিয়ে কারও অগ্রযাত্রা রুখে দেয়ার চেষ্টা সাময়িকভাবে সফল মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে খুব বেশি সাফল্য আসেনি বরং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের অবস্থান আদর্শিকভাবে পাকাপোক্ত হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির বিরোধী পক্ষের কী তাহলে বোধদয় ঘটেছে? তারা কি তাদের ঐতিহাসিক ভুল বুঝতে পেরেছেন? তাদের মধ্যে কি এই উপলব্ধি জাগ্রত হয়েছে যে কাউকে শক্তির জোরে নির্মূলের রাজনীতি আলটিমেটলি তাকে স্ট্রেংদেন করে! তাকে আদর্শিকভাবে অপারহ্যান্ড দেয় এবং তাঁর পক্ষে জেনারেল সিম্প্যাথি গ্রো করে!
আমি হলফ করে ইতিহাসের পাঠ থেকে বলতে পারি ঢাবি’র- জাবি-র এই বিজয়ের ঢেউ দেশের প্রত্েযকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়বে এবং যদি নির্বাচন হয় তাহলে, বেশীরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিবির গঠিত “শিক্ষার্থী জোট” জয়লাভ করতে পারে। ৯০ এর দশকে দেশের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, মেডিক্যাল কলেজের নির্বাচনে শিবির জয় পেয়েছিল একই কারণে। একটা সময় এসে সবাই মিলে শিবিরের বিরুদ্ধে জোট এবং কোথাও কোথাও নির্বাচন বন্ধ করে দেয়ার পদক্ষেপ নিয়েছিল। তাতে কি আসলে শিবির ঠেকানো গেছে? মোটেও যায়নি। শিবির নানা কৌশলে, নাম গোপন করে, ভিন্ন নামে সামাজিক সংগঠন তৈরি করে নিজেদের সুসংগঠিত রাখার চেষ্টা করেছে।
আপনাদের অনেকের মনে থাকার কথা একটা সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে জাসদ ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের জয় জয়কার ছিল। আজকে তাদের অবস্থা খুবই শোচনীয়। কেন তাদের আজ এই বেহাল অবস্থা! ভালো করে বিশ্লেষণ করলে দেখবেন, দমন-নিপীড়নের মধ্য দিয়ে এ দলগুলো শেষ হয়নি। তারা অবাধে রাজনীতি ও ক্ষমতা চর্চার সুযোগ পেয়েই মূলত: আদর্শিকভাবে শেষ হয়ে গেছে। যারা একসময় শোষণ, বৈষম্যের বিরুদ্ধে তেজস্বী কথা বলতো। ক্ষমতা পেয়ে দেখা গেলো তারা নিজেরাই শোষণ ও বৈষম্যের দায়ে অভিযুক্ত হয়ে গেছে। দল ভেঙ্গে এসব কারণেই দশ টুকরো হয়েছে।
তাই যারা ভাবেন আদর্শবাদী রাজনীতিকে দমন, পীড়ন, অপপ্রচার আর ট্যাগিং দিয়ে নির্মুল করবেন তারা ভীষণ ভুল করেন। বরং আদর্শবাদীদের ব্যাপকহারে স্পেস ও ক্ষমতা চর্চার সুযোগ দিলে দেখবেন তারা ধীরে ধীরে বুর্জোয়া হয়ে উঠছে। যে বয়ানের উপর তাদের রাজনীতির ভিত তৈরি হয়েছিল তা তারা নিজেরাই ভেঙ্গে দিচ্ছে। নব্বইয়ের দশকে শিবির যতগুলো ছাত্র সংসদ জিতেছিল প্রায় প্রত্েযকটি ছাত্র সংসদের অভিষেক অনুষ্ঠানে নামী দামী ব্যান্ড মিউজিক গ্রুপকে সেসব অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। নারী ও বিভিন্ন ধর্মীয় ফেইথ গ্রুপকে তাদের উদারভাবে ডিল করতে হয়েছিল। জামায়াত বিএনপি’র সাথে জোটবদ্ধ হয়ে ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার পর জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাতে যাওয়া, নারী নেতৃত্বের অধীন মন্ত্রী হওয়া এবং প্রচলিত নির্বাচনী রাজনীতি করতে গিয়ে উদারপন্থা গ্রহণের কারণে দলের রক্ষণশীল অংশ এবং অপরাপর ইসলামী গ্রুপ গুলোর কাছে বহু প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে। ওয়ান ইলেভেনের সময় দলের একজন সংসদ সদস্েযর বাড়িতে ত্রাণের টিন উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁর দলীয় সদস্যপদ বাতিল করতে হয়েছে। তারও আগে আরেকজন এমপি তো দল বদল করে বিএনপি’তে যোগদান করেছিলেন। অর্থাৎ ক্ষমতা চর্চা, জনপরিসরে জনপ্রিয়তা অর্জন ও সার্বজনীন ভোটের রাজনীতি করার সুযোগ পেলে ধর্মীয় দল আর প্রথাগত রাজনৈতিক দলের মধ্েয পার্থক্য ও দুরত্ব কমে আসবে।
ঢাবি, জাবি’র মত ছাত্রসংসদ নির্বাচন গুলোতে ধর্মীয় সংগঠনগুলো যখন উদারনীতি গ্রহণ করবে তাদের মেনিফেস্টোতে ধর্মের চাইতেও ছাত্রদের দাবি দাওয়া, নারী অধিকার, সংখ্যালঘু, ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীদের সুবিধা-অসুবিধার বিষয়গুলো প্রাধান্য দেবে এবং নির্বাচনে বিজয়ের পর দোয়া মাহফিলের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানানোসহ মূলধারার সংস্কৃতির চর্চাগুলো চর্চিত হবে তখন দেখবেন শিবির বা ইসলামী ছাত্র আন্দোলনকে আপনার আর মৌলবাদী ছাত্র সংগঠন মনে হচ্ছেনা। মনেহবে আরে এরাতো ছাত্রী বোনদের দেখে চোখ ও মাথা নীচু করে দুরে সরে যাচ্ছেনা বরং সামনে এসে সহাস্যে সুন্দর ভাষায় ভদ্রভাবে কথা বলছে। বিজয়ের পর কাওয়ালী বা হামদ-নাতের সাথে সাথে , ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে না কো তুমি… টাইপের জাতীয়তাবাদী গানও গাইছে!
তাদের কে স্পেস দিলে আপনার মনে হবে আপনি যা চান তাঁদের চাওয়া তো প্রায় একই। দ্বন্দ্ব, দুরত্ব, খোঁচাখুচি, ট্যাগিং এগুলো ক্রমশ: কমে আসবে।
অতএব আসুন সবাই নিজেদের বোধ ও উপলব্ধিকে জাগ্রত করি। আপনি যদি আপনার নীতি কর্মপন্থা ও কৌশলে উপলব্ধি থেকে সংস্কার বা পরিবর্তন না আনেন তাহলে সময় আপনাকে বাধ্য করবে পরিবর্তিত হতে। আপনি নিজেও বুঝতে পারবেন না আপনি আসলে বদলে গেছেন। বদলে গেছে আপনার চারপাশ!
(পবিত্র মক্কায় সফররত এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ফেসবুক ওয়ালে ১৩ সেপ্টেম্বর শনিবার এই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।)