একেএম আবদুর রহীম
ফেনীর অবিসংবাদিত সাংবাদিক নেতা, বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব, ফেনী পৌরসভার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মরহুম মাহবুবুল হক পেয়ারা দাদার আজ ২৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি ছিলেন ফেনী প্রেসক্লাবের বারবার নির্বাচিত সভাপতি, পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি, বহু ক্রীড়া সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি, ফরহাদ নগর কেএম হাট হাই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি। এ ধরনের আরও অসংখ্য সংগঠনের তিনি প্রতিষ্ঠাতা, সভাপতি ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।
তবে সবকিছুর উপরে তিনি ছিলেন আমার পথপ্রদর্শক, অভিভাবক তূল্য বড় ভাই। তিনি ছিলেন ফেনীর সাংবাদিকতা জগতের পথিকৃৎ। তিনি খান বাহাদুর বজলুল হক সাহেবের ছোট সন্তান এবং আরেক কিংবদন্তি সাংবাদিক ওবায়দুল হক সাহেবের ছোট ভাই। তাঁর চলন, তাঁর বলন ছিল রাশভারী। ১৯৯০ইং থেকে তাঁর সাথে পেশাগত কারণে আমার উঠা বসা ছিল। বিশেষ করে তাঁর মৃত্যুর তিন চার বছর আগে থেকে তাঁর সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা খুব বেশি ছিল। সপ্তাহে সাত দিন না হলেও অন্তত ছয় দিন উনার বাসায় হাজিরা দিতে হত। কখনো একটানা দু’তিন দিন না গেলে তিনি অস্থির হয়ে পড়তেন। বাসায় যাবার জন্য দাদার আকর্ষণের চেয়েও তাঁর পুত্রবধু শাহনাজ জাহান ভাবির হাতের গরম গরম নানা পদের নাস্তার আকর্ষণও কম ছিল না। শেষ সময়ে আমি বেশ কিছুদিন যেতে পারিনি আমার ব্যক্তিগত কারনে। এরমধ্যেই একদিন খবর পেলাম দাদা আর নেই।শুনেছি মৃত্যুর সময় নাকি দাদা আমার নাম কয়েকবার উচ্চারণ করেছিলেন।
পেয়ারা দাদা এক কাপড় দুদিন পরেছেন বা তাঁর পোষাকের ভাঁজ কখনো নষ্ট হয়েছে কেউ বলতে পারবেনা। এসএসকে সড়কের দক্ষিন পাশে জনতা ব্যাংক ভবনের পর থেকে ইসলামপুর রোড পর্যন্ত দোকান গুলো ছিল তাঁর। তিনি ভাড়া আদায়কালে আমি অনেক সময় তাঁর সাথে ছিলাম। আমি দেখিনি কখনো ভাড়ার জন্য রিক্সা থেকে নামতে।দোকানের সামনে রিক্সা দাড়ালেই ভাড়াটিয়া দোকানদার হন্তদন্ত হয়ে উনার হাতে টাকা গুঁজে দিতেন।কখনো টাকা গুনে নিতে আমি দেখিনি। ৫০/১০০টাকা ভাড়া তাও সবাই দিতনা।নানা অজুহাতে কম দিত। এই হচ্ছে পেয়ারা দাদা।
রিকশা ছাড়া তিনি চলতেন না। তাঁর নিত্যদিনের অভ্যাস ছিল একবার হাসপাতাল ও থানায় ঢু মেরে আসা। কোন খবর আছে কিনা সেজন্য। সাংবাদিকতায় তাঁর নিষ্ঠা, উদ্দীপনা, দায়িত্ববোধ, ইথিক্স মেনে চলার প্রাণান্ত চেষ্টা ছিল শেষ দিন পর্যন্ত। যার ছিটেফোঁটাও আজ আমাদের মধ্যে নেই। প্রায় প্রতিদিন চা নাস্তা খেয়ে, রিক্সায় সারা শহর ঘুরে আর কেউ পয়সা দিবে তা ছিল অসম্ভব। ফেনীতে তাঁর চেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আর কেউ ছিলেন না। ফলে মাহফুজ ভাই, করিম ভাই, মিরু ভাই, তাহের ভাই, শামসুল ভাই সহ এমন অনেককে দেখেছি দাদা প্রেসক্লাবে উঠতেছেন তার আঁচ পেয়েই তাঁরা তাঁদের হাতে থাকা দামী সিগারেট পায়ের নিচে পিষে ফেলেছেন। এমন অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ভক্তি আমি আর কারো জন্য কখনো দেখিনি। আজকে পেয়ারা দাদার মতো মানুষের অনেক বেশি প্রয়োজন ছিল। তিনি যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন তাঁর কাছ থেকে আমরা অনেক কিছু শিখেছি। আরো অনেক কিছু শেখার ছিল। এই যুগের সাংবাদিকেরা বলতেও পারবেনা যে তিনি ফেনীর সাংবাদিকতা জগতের জন্য কত বড় সম্পদ ছিলেন। আল্লাহ তাঁকে বেহেস্তবাসী করুন।
লেখক : ফেনী প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও দৈনিক সংগ্রামের জেলা প্রতিনিধি।