আমজাদ হোসাইন, সোনাগাজী :
সোনাগাজীতে উপকূলীয় এলাকায় নদী ও খালে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে চলছে অবাধে চিংড়ি পোনা আহরণের মহোৎসব। পোনা মাছ ধরতে গিয়ে গত পাঁচ বছরে জোয়ারের পানিতে ডুবে ও বজ্রপাতে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এরপরও পোনা মাছ আহরণ থেমে নেই। প্রতি বছর জানুয়ারী-সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত পোনা আহরণের এ উৎসব পুরো ধমে চলে। তবে একটি চিংড়ি পোনার জন্য ধ্বংস করা হয় হাজারো প্রজাতির অন্য মাছের পোনা।
বড় ফেনী নদীর মুহুরী সেচ প্রকল্প এলাকা থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের ইছাখালী, বানচন্দ খাল, চর খোন্দকার, জেলেপাড়া এবং ছোট ফেনী নদীর সাহেবের ঘাট সেতু থেকে দক্ষিণে সন্দ্বীপ চ্যানেল পর্যন্ত বিশাল উপকুলীয় এলাকায় প্রতিদিনই লক্ষ লক্ষ চিংড়ি পোনা আহরণ করা হচ্ছে। এতে উপকুলীয় অঞ্চলের কয়েক হাজার মানুষ শুধু নদীতে চিংড়ি পোনা আহরণ করেই তাঁদের জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু চিংড়ি পোনা ধরার সময় তারা অন্য মাছ রক্ষায় উদাসিন থাকেন।
এই উপজেলার মানুষ ছাড়াও খুলনা, রংপুর, বাঘেরহাট ও সাতক্ষীরা এলাকা থেকে আসা প্রায় দুই হাজার লোক সোনাগাজীর উপকূলীয় এলাকায় অবস্থান করে নদীতে পোনা মাছ আহরণ করছেন। এরা পোনাগুলো স্থানীয় আড়ৎদারদের মাধ্যমে খুলনাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে পাচার করে থাকেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিনিয়ত দিন-রাত পালাক্রমে উপকূলীয় এলাকার বিভিন্ন বয়সী মানুষ এমনকি ৮-১০ বছর বয়সের শিশুসহ অনেক নারীও নদীতে চিংড়ি পোন আহরণ করছেন। পোনা আহরণকারী লোকজন নদী ও খালের মুখে মশারির জাল ব্যবহার করে গলদা ও বাগদা চিংড়ি পোনা আহরণ করে থাকেন। এরপর তারা পোনাগুলো স্থানীয় মহাজন বা আড়তদারদের কাছে বিক্রি করেন। তবে পোনা মাছ ধরতে গিয়ে তারা অন্য প্রজাতির হাজারো মাছ মেরে ফেলছেন। নদীর তীরে মরা মাছ বাতাসে দুর্গন্ধ ছাড়াচ্ছে।
সোনাগাজী উপজেলার চর খোন্দকার এলাকার পোনা আহরণকারী জেলে আবদুল মতিন ও হারাধন জল দাস বলেন, স্থানীয় মহাজনেরা পোনা আহরণকারীদের কাছ থেকে প্রতিটি পোনা মাছ ১ টাকা থেকে ২ টাকায় কিনে আড়তে জমা করেন। আড়ৎ থেকে পরে মাছগুলো ঢাকা, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন চিংড়ি ঘের (খামার) গুলোতে পাঠিয়ে থাকেন। উপকুলীয় অঞ্চলের প্রান্তিক পোনা সংগ্রহ কারীদের কাছ থেকে সংগৃহীত পোনা তারা প্রতিটি ৫-৮ টাকা দরে খামার (ঘের) মালিকদের কাছে বিক্রি করে দেন।
সোনাগাজী উপজেলার মুহুরী প্রকল্প এলাকায় বড় ফেনী নদীতে মাছ ধরার সময় কথা হয় খুলনার আলতাফ শেখ নামে একজনের সঙ্গে তিনি বলেন, তিনি পেশায় একজন মৎস্যজীবি। দীর্ঘ ৩৮বছর যাবত সোনাগাজীতে থেকে মুহুরী প্রকল্প এলাকায় নদীতে পোনা মাছ শিকার করে আসছেন। এ মাছ আড়ৎদারদের কাছে বিক্রি করে তিনি যে টাকা পান তা দিয়ে নিজে এবং পরিবার পরিজনের জীবিকা নির্বাহ করেন।
তিনি বলেন, পোনা মাছ ধরে প্রতিদিন তিনি প্রায় দুই হাজার টাকা আয় করেন। ওই টাকা থেকে আবার দুই-চারশত টাকা স্থানীয় সমিতির কর্তাদেরকে দিতে হয়। অন্যথায় সমিতির লোকজন তাদেরকে নদীতে নামতে দেয় না। তারা মৎস্য কর্মকর্তা, প্রশাসনসহ দলীয় নেতাদেরকে ম্যানেজ করেন।
পোনা সংগ্রহকারীরা জানায়, শুষ্ক মৌসুমে পোনা ধরতে নদীতে যাওয়ার সময় জাল ও নৌকাসহ পোনা আহরণের সরঞ্জামাদি ক্রয় করার জন্য অনেক সময় তাঁদের হাতে কোন টাকাই থাকে না। তখন তারা বাধ্য হয়ে স্থানীয় মহাজন ও আড়তদারদের কাছ থেকে চক্রবৃদ্ধি হারে দাদন (ঋণ) নিয়ে মাছ ধরা শুরু করেন।
তারা বলেন, শুধু সুদ দিলেই ঋণ পাওয়া যায় না। যার কাছ থেকে দাদনের টাকা নিবে পোনা ধরার পর আবার তার কাছেই পোনাগুলো বিক্রি করতে হবে। এ শর্ত মানলেই ঋণ পাওয়া যায়। নয়তো কেউ ঋণ দেবেন না। পোনা সংগ্রহকারীরা চান, স্বল্প সুদে সরকারী কিংবা বেসরকারী সংস্থাগুলো তাদেরকে ঋণ দিলে তারা উপকৃত হতেন। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, কিছু লোক চিংড়ি পোনা ধরতে গিয়ে অন্য প্রজাতির মাছের পোনাও ধ্বংস করে ফেলেন। একটি চিংড়ি পোনার জন্য তারা গড়ে শতাধিক অন্য মাছের পোনা ধ্বংস করে থাকেন। তারা সচেতন হলেই অন্য মাছের পোনা নষ্ট না করেও চিংড়ি পোনা আহরণ করতে পারেন।
উপজেলার চর চান্দিয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান মো. সামছুদ্দিন খোকন বলেন, এ অঞ্চলের চিংড়ি পোনার মধ্যে গলদা চিংড়ির গুণগত মান খুবই উন্নত। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষিরা অঞ্চলে এ পোনার প্রচুর চাহিদা রয়েছে। এমনকি লোনা পানি থেকে আহরিত বাগদা চিংড়ি পোনারও গুণগত মান কোন অংশেই কম নয়। এখানকার এ চিংড়ি পোনাকে অনেকেই সাদা সোনা বলে আখ্যায়িত করেন। তবে চিংড়ি পোনা ধরার সময় এক শ্রেণির অসাধু মৎস্যজীবী অন্য প্রজাতির মাছের পোনা মেরে ফেলেন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য তিনি প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ জানান।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা তাছলিমা আক্তার বলেন, এভাবে অপরিকল্পিত ভাবে চিংড়ি পোনা আহরণ করে কিছু দরিদ্র লোক উপকৃত হলেও এ পদ্ধতিতে চিংড়ি পোনা আহরণের ফলে অন্য মাছের পোনা বিলুপ্ত হচ্ছে। নদী গুলো মাছ শূন্য হয়ে পড়ছে। এ জন্য মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকেন। নদীতে অভিযান চালিয়ে চিংড়ি পোনা ধরতে গিয়ে অন্য প্রজাতির মাছ ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।