মো. মহিউদ্দিন, পরশুরাম :
পরশুরাম উপজেলার বক্সমাহমুদ ইউনিয়নে ৫নং ওয়ার্ডে দক্ষিণ গুথুমা শান্তিপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্প ও জামবিল আশ্রয়ণ প্রকল্পের বেহাল দশায় বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ফলে এখানে বসবাসরত ৩৮০ থেকে ৪শ বাসিন্দা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
সংশ্লিষ্ট বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত প্রায় ২৯ বছরেও সংস্কার না হওয়ায় প্রতিটি ঘরের চালের টিন বেশিরভাগে মরিচা ধরেছে। একদিকে মরিচা ধরা আরেকদিকে বেশিরভাগ টিন ছিদ্র হয়ে গেছে। বৃষ্টি হলে টিন ছুঁয়ে ঘরে পানি পড়ে। এখানে ৭০ পরিবারের জন্য ২টি নলকূপ স্থাপন করা হয়। সংস্কারের অভাবে নলকূপগুলোতে পানির দেখা মিলছে না। শুধু তাই নয়, শৌচাগারগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ১৯৯৭-১৯৯৮ সালে ভূমিহীন, গৃহহীন এবং হতদরিদ্র মানুষের জন্য এই আশ্রয়ণ প্রকল্প স্থাপন করে সরকার। দক্ষিণ গুথুমা শান্তি পাড়া ৭টি ব্যারাকে ৭০ টি পরিবার এবং জামবিল এলাকায় ৬টি ব্যারেকে ৬০ পরিবার মাথাগোঁজার ঠিকানা পায় এ আশ্রয়ণ প্রকল্পে। প্রতিটি ব্যারাকের জন্য পৃথকভাবে শৌচাগার ও একটি করে নলকূপ বসানো হয়েছে। কয়েক বছরের পর সঠিকভাবে তদারকি না থাকায় প্রতিটি ব্যারাকের টিনগুলো মরিচা ধরে যায়। টিউবওয়েলগুলো ব্যবহারে অনুপযোগি হয়ে বন্ধ হয়ে যায়। ফলে শৌচাগার এবং কলগুলো পরিত্যক্ত হয়েছে। জনপ্রতিনিধি ও সরকারি দপ্তরে ঘুরে ঘুরে স্থানীয় বাসিন্দারা সংস্কারের দাবি জানালেও কোন প্রতিকার মিলেনি।
মনির আহমেদ জানান, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা মাঝেমধ্যে পরিদর্শনে এসে আশ্বাস দিলেও উদ্বোধনের পর আর কোনো সংস্কার হয়নি। এই অবস্থা হইবো জানলে এন্ডে আঁই জীবনেও আঁসতাম না। শুরুতে সব কিছু ছিল। এখন নেই টয়লেট, নেই নলকূপ, নেই একটা পুকুর। ইয়ান কোন জীবন।
রহিমা আক্তার নামে পঞ্চাশোর্ধ এক বাসিন্দা জানান, থাকার সমস্যা পানির সমস্যা, টয়লেটের সমস্যা। বৃষ্টি শুরু হলে কাতা, বালুশ, জামা-কাপড় এবং ছেলে মেয়ের বইখাতা ভিজে যায়। দিনে বৃষ্টি হলে কিছু রক্ষা করতে পারলেও রাতের বেলায় বেশিরভাগ জিনিসপত্র ভিজে যায়।
সুরমা আক্তার (৬৩) জানান, ২০০১ সালে আইলাম কিন্তু বর্তমানের কষ্টের শেষ নেই। কমি যামু, কিয়া করমু, কনমুই যাইবার সুযোগ নেই, মেরামত করার মত কোন লোক আঁয়ে না।ঝর শুরু হলে দিনে কোন রকম জিনিস রক্ষা করি। কিন্তু রাতে ঝর শুরু হলে চিন্তায় ঘুমও আঁয়ে না। হোলা – মাইয়া নিয়ে জাগন থাকতে হয়। হোলা মাইয়ার বই খাতা বিজে যায়।
এখানে বসবাস করেন বারেক মিয়া নামের এক ব্যক্তি। ৬৯ বছর বয়সী এ বাসিন্দা জানান, আন্ডা জীবন শেষ। কিয়া করমু, কয়েকজন মিলে কিস্তি নিয়ে টয়লেট দিছি এবং টিউবওয়েল বসাইছি।এগিন করি দিন গুনছি। মরনের আগেও আঙ্গো আর শান্তি আইতোনো।
তিনি আরও জানান, টিউবওয়েল বসাইলাম। শীতকালে হানি উঠে না। কিন্তু অধিক খরচের কারণে চালের টিন মেরামত করা হচ্ছে। বেশির ভাগই তেরপাল দিয়ে জীবনযাপন করছে।
স্থানীয় বাসিন্দা পরশুরাম মাদ্রাসা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মো: ইলিয়াস জানান, দীর্ঘদিন নির্বাচিত সরকার না থাকায় ভোটবিহীন জনপ্রতিনিধিরা জনগণের কল্যাণে কোন কাজ করেন। দীর্ঘ প্রতিক্ষার বছর এবার নির্বাচিত সরকার এসেছে। আশা করছি এমপি রফিকুল আলম মজনু আশ্রয়ণ প্রকল্পগুলো মেরামত করার জন্য দায়িত্ব নিবেন। তাদের কষ্ট দেখলে নিজের কাছেও অনেক খারাপ লাগে। আমাদের একদিন-দুইদিন সমস্যা হলে আমরা দিশেহারা হয়ে যাই। তারা দেড় যুগ ধরে কষ্ট করতেছে।
বক্সমাহমুদ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব ইব্রাহিম খলিল মনি জানান, আশ্রয়ণ প্রকল্প মেরামত বা সংস্কার করার জন্য ইউনিয়ন পরিষদে কোন ব্যবস্থা নেই। এটা সম্পূর্ণ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার হাতে। তিনি ইচ্ছা করলে মেরামত করার জন্য প্রকল্প নিতে পারে। আমি এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাদিয়া সুলতানাকে জানিয়েছি। আশা করি তিনি বর্ষার আগে দ্রুত ব্যবস্থা নিবেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাদিয়া সুলতানা জানান, বিষয়টি নিয়ে আমি জেলা প্রশাসক স্যারের সাথে কথা বলবো। যত দ্রুত সম্ভব নতুন বরাদ্দ দিয়ে সংস্কার করার চেষ্টা করব।