* আ’লীগের গুলিবর্ষণে ঝরে ৮প্রাণ, আহত শতশত
* রণক্ষেত্র ট্রাংক রোড
* রামপুরে বিএনপির ধাওয়া খেয়ে পিছু হটে যুবলীগ-ছাত্রলীগ
* ৭টি হত্যা মামলাসহ ২২মামলা
* ৬টি হত্যাসহ ১৪মামলায় চার্জশিট
* এখন পর্যন্ত গ্রেফতার ১২শ
সময় রিপোর্ট :
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট ১দফার আন্দোলন চলাকালে ওইদিন ফেনী শহরের মহিপালে আওয়ামীলীগের অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা গুলি করে নিষ্ঠুর গণহত্যা চালায়। এসময় ৮ ছাত্র-জনতা শহীদ হন। আহত হয় অন্তত ৪ শতাধিক। একসময়ের সন্ত্রাস-সহিংসতার ভয়াল জনপদ খ্যাত ফেনীতে এর আগের সকল বর্বরতাকে ছাড়িয়ে যায় সেদিনের গণহত্যা। এখনো সেই দুপুরের কথা মনে উঠলে অনেকেই শিউরে উঠেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীগণ জানান, ওইদিন সকাল সাড়ে ১১টা থেকে ফেনী শহরের মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে জড়ো হতে থাকে ছাত্র-জনতা। এসময় ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে সেখানে তারা অবস্থান নেয়। দুপুর ১টার কিছুক্ষন পর নামাজ আদায় করে আন্দোলনকারীরা। এরমধ্যে ট্রাংক রোড থেকে মহিপালের দিকে গুলি ছুঁড়ে অগ্রসর হতে থাকে আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীরা। অন্যদিকে পিডিবির সামনে ছাত্র-জনতা প্রতিরোধের চেষ্টা করলে গুলির মুখে পিছু হটে। একপর্যায়ে হামলাকারীরা মহিপাল চৌধুরী মার্কেটের সামনে পৌঁছে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করে। মুহুর্মুহু গুলিতে কেঁপে উঠে মহিপাল। এতে একে একে গুলিবিদ্ধ হন অসংখ্য ছাত্র-জনতা। চোখের সামনে একে একে লুটিয়ে পড়ে শহীদ শ্রাবণ, মাসুদ, সিহাব ও শাহীসহ ৭জন তরুণ। পরে আরো ১জন সহ ৮জন শহীদ হন। এরা হলেন ইশতিয়াক আহমেদ শ্রাবণ, ছাইদুল ইসলাম শাহী, মো. সরওয়ার জাহান মাসুদ, ওয়াকিল আহাম্মদ শিহাব, মাহবুবুল আলম মাসুম, জাকির হোসেন শাকিল, মো. সবুজ ও আবদুল গণি বোরহান।
আহত ৪শতাধিক ছাত্র-জনতা। পরে ৩টায় আন্দোলনকারীদের প্রতিরোধের মুখে পিছু হটে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এসময় ক্ষুব্দ ছাত্র-জনতা সেখানে থাকা পুলিশ বক্সে আগুন ধরিয়ে দেয়। এর আগে দুপুর ১২টায় শহরের রামপুরে প্রবেশ করেন ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা। বিএনপি নেতাদের খোঁজে গিয়ে সেখানে গুলি ছুঁড়ে তারা। একপর্যায়ে বিএনপি নেতাদের প্রতিরোধের মুখে পিছু হটে যুবলীগ ও ছাত্রলীগ।
এছাড়া সকাল ১১টা থেকে বিএনপি নেতাকর্মীদের সাথে আওয়ামীলীগের থেমে থেমে সংঘর্ষ চললেও দুপুর ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত লাগাতার সংঘর্ষ চলে। এসময় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের শহীদ মিনার, জেল রোড ও ট্রাংক রোড থেকে গুলি ছুড়তে দেখা যায়। অন্যদিকে মহিপাল হত্যাকান্ডের পর বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত শহীদ শহীদুল্লাহ কায়সার সড়ক জুড়ে অবস্থা নেই ছাত্র-জনতা। এসময় টায়ার জ্বালিয়ে রাস্তা অবরোধ করে তারা বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।
জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয় সূত্র জানায়, মহিপাল হত্যাকান্ডের ঘটনায় ৭টি হত্যা মামলাসহ মোট ২২টি মামলা দায়ের হয়। এসব মামলায় এজাহারনামীয় আসামী ২হাজার ৫শ ৫জন। এখন পর্যন্ত এসব মামলায় গ্রেফতার হয়েছে ১হাজার ১শ ৯২জন। ২২টি মামলার মধ্যে ৬টি হত্যা মামলাসহ ১৪টি মামলায় চার্জশিট হয়েছে। এসব মামলায় পতিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, ফেনী-১ আসনের এমপি আলাউদ্দিন নাসিম, ফেনী-২ আসনের এমপি নিজাম হাজারী, ফেনী-৩ আসনের এমপি মাসুদ চৌধুরীসহ জেলা-উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন নেতা আওয়ামীলীগ ও অঙ্গসংগঠনের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী, উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেম্বারদের নাম রয়েছে।
এদিকে মহিপাল গণহত্যার মামলা নিয়ে বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে শহীদ পরিবার ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনায় জড়িত ও পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে অনেকেই এজাহার থেকে বাদ পড়েছে। গ্রেফতার আসামীদের কেউ কেউ ১৬৪ধারায় জবানবন্দিতে অনেক দাগী সন্ত্রাসীর নাম বললেও চার্জশীটে তাদেরকে বাদ দেয়া হয়। এদিকে শহীদ পরিবারের সদস্যদেরও কেউ কেউ হুমকি-ধামকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
শহীদ ইশতিয়াক আহমদ শ্রাবনের বাবা নেছার আহমদ জানান, ৪ আগষ্ট শ্রাবণ শহীদ হওয়ার পর জুলাইযোদ্ধা ও তার বন্ধুরা ফেনী শহরের জিরোপয়েন্ট দোয়েল চত্বরকে শহীদ শ্রাবণ চত্বর নামকরণের ঘোষণা দেয়। এব্যাপারে শ্রাবণের মাও জেলা প্রশাসকের নিকট আবেদন করে। কিন্তু বার বার আশ্বাস দিয়েও তা কার্যকর হয়নি। একই অভিযোগ করেন জেলা ছাত্রদল সভাপতি সালাহ উদ্দিন মামুন। তিনি বলেন ফেনী মাইজদী সড়কের তেমুহনী চৌরাস্তায় শহীদ শিহাব চত্বর হিসাবে নামকরণ করা হলেও তা অদ্যাবধি নির্মাণ করা হয়নি। একইভাবে সোনাগাজী জিরো পয়েন্টকে শহীদ চত্বর ও দাগনভূঞা জিরো পয়েন্টকে শহীদ মাসুদ চত্বর করার দাবী শহীদ পরিবার ও জুলাইযোদ্ধাদের।
জেলা বিএনপির আহবায়ক শেখ ফরিদ বাহার বলেন, ফেনীতে এর আগে যত হত্যাকান্ড হয়েছে সব বর্বরতাকে ছাড়িয়ে যায় ২০২৪ সালের ৪ আগষ্টের সংগঠিত হত্যাযজ্ঞ। তিনি বলেন, এই গণহত্যায় জড়িতরা পরদিন সরকার পতনের খবর পেয়ে অনেকেই তাৎক্ষণিক দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। তিনি তাদের প্রত্যেককে অবিলম্বে গ্রেফতার ও এই বর্বর ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করেন।