জুন ৬, ২০২৬ ০১:৫৫

ধলিয়ায় বিএনপি নেতা জসিমের রামরাজত্ব

  • মাদক, দখল, চাঁদাবাজী, মামলা-শালিস বাণিজ্য সবই চলে
  • অপরাধী যেই হোক প্রশাসনকে ব্যবস্থা নেয়ার আহবান বাহারের
  • সাংগঠনিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস আলালের

শহীদুল ইসলাম :

ফেনী সদর উপজেলার দক্ষিণ-পশ্চিমের একটি ইউনিয়ন ধলিয়া। একসময় ইউনিয়নটির নিয়ন্ত্রক ছিলেন ওই ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান ও যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার আহমেদ মুন্সি। ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আবছার সবুজের প্রভাব থাকলেও চেয়ারম্যান হওয়ায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন মুন্সি। দখল, চাঁদাবাজি, মাদক ও শালিস বাণিজ্যসহ সবকিছুই করতে মর্জিমতো। চব্বিশের ৫ আগষ্ট গণঅভ্যুত্থানের পটপরিবর্তনের পর মুন্সির হারানো সেই সম্রাজ্যে এখন বিএনপি নেতা জাকির হোসেন জসিমের রামরাজত্ব। জসিম ওই ইউনিয়নের দুইবারের সাবেক চেয়ারম্যান ছাড়াও জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও যুবদলের সদ্য সাবেক সভাপতি।


দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও ধলিয়া ইউনিয়নের সবকিছু চলছে আগেরমতো। স্থানীয় বিএনপি দুইভাগে বিভক্ত। বিশাল একটা অংশের নেতৃত্বে জসিম থাকলেও অপর অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নুর নবী। জসিমের সাথে রয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ফোরকান মাষ্টারও। ৫ আগস্টের পর শুরুর দিকে জাকির হোসেন জসিম ও নুর নবী একসাথে থাকলেও ভাগভাটোয়ারা ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে। জসিমের দাপটে নুর নবী অনেকটা নিষ্প্রভ। তবে একসাথে থাকাকালীন চাঁদাবাজি, সালিশ বাণিজ্য ও মাটি কাটার সাথে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে নবীর বিরুদ্ধেও। বর্তমানেও মাটি কাটার সাথে তার সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়। জসিম ও নবী ছাড়াও উপজেলা যুবদলের আহবায়ক মাষ্টার নিজাম উদ্দিন ছোট্ট একটি অংশের নেতৃত্ব দেন। ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ড তিনি দেখাশোনা করেন।


সূত্র আরো জানায়, জসিমের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখল, সালিশ ও মামলা বাণিজ্য থেকে শুরু করে রয়েছে অসংখ্য অভিযোগ। নিজের অনুসারীদের দিয়ে প্রতিটা ওয়ার্ড নিয়ন্ত্রণ করেন। ৫ আগস্টের পর তিনি মামলার ভয় দেখিয়ে অনেকের থেকে বিভিন্নভাবে চাঁদা নিয়েছেন। চাঁদা নেয়ার একটি তালিকা ফেনীর সময়ের হাতে এসেছে। এদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস করেনা।


নাম প্রকাশ না করার শর্তে চারজন ফেনীর সময়ের এর সাথে কথা বলেছেন। এদের কারো কাছ থেকে ৩০-৩৫ হাজার টাকা থেকে শুরু করে এক লাখ, দুই লাখ, তিন লাখ কিংবা পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা নিয়েছেন। অভিযোগ করেন, ব্রিকস ফিল্ডে বিনিয়োগ করবে বলে বড় অঙ্কের টাকা নিয়ে তা দেননি। এক পরিবার থেকে ধার নেওয়ার নামে বড় অঙ্কের টাকা নেন জসিম। ওই টাকা না দিয়ে পুনরায় ধার চান তিনি। পরবর্তীতে না দেয়ায় পরিবারের সদস্যকে মারধর করেন। সালিশ বাণিজ্যের নামেও হাতিয়ে নেন হাজার হাজার টাকা। সালিশকে কেন্দ্র করে কনেপক্ষের উপর হামলাও করা হয় তার নির্দেশনায়। জায়গাজমির সমাধানের কথা বলে কতিপয় ব্যক্তি তার নামে টাকা আদায় করেন। অবশ্য এসব নিয়ে পুনরায় হামলা ও হয়রানীর ভয়ে কথা বলতে রাজি হয়নি ভুক্তভোগী পরিবার।


এসব চাঁদাবাজির লেনদেনে মাধ্যম হিসেবে উপজেলা যুবদলের সদস্য লিটন হাজারী, ইউনিয়ন শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম প্রকাশ রাজমিস্ত্রী সিরাজ, ফখরুদ্দিন ফারুক, মুন্সী, সোহাগ ও শাহ আলমের নাম উঠে এসেছে।
দুই লাখ টাকা চাঁদা দিয়েছেন এমন একজন ব্যক্তি জানান, “এগুলা বলার কি দরকার ভাই, নাম বলে বিপদে পড়বো কেন। জসিম চেয়ারম্যানের পোলাপানে নিয়েছে। এসবের মূলে সে।”


অনুসন্ধানে জানা গেছে, ধলিয়ায় চলছে রমরমা মাটির কারবার। শতাংশ হিসেবে মাটি কাটার কিছু অংশ জাকির হোসেন জসিম ও নুর নবীর কাছে যায় বলে একাধিক সূত্র জানায়। আগে দিনেদুপুরে কাটলেও প্রশাসনের নজরদারী থাকায় এখন রাতে কাটা হয়। মাটি কাটা নিয়ে নিজেদের মধ্যে রয়েছে মতবিরোধও। মাটি কাটার পিছনে জুলাই যোদ্ধা ও যুবদল কর্মী মাহিন উদ্দিন হোনা, সদর উপজেলা যুবদলের সদস্য লিটন হাজারী, ইউনিয়ন যুবদল কর্মী আব্দুল হালিম, ছাত্রদল কর্মী বেলাল হোসেন সাগর, ফখরুদ্দিন ফারুক, শ্রমিক দল নেতা শাহ আলম, যুবদল কর্মী হারুন, মুন্সি, রাজিব, মুরাদ, রাহাত, স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা ইসমাইল, মিজান, শামীম, জসিম, রানা, দেলু ও তাতীদল নেতা জাফর জড়িত বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।


ধলিয়া বাজারের পাশে নূর আহমেদ নামে একব্যক্তির চার শতাংশ জায়গা দখল করেন জসিম। জানা গেছে, জসিম জোর করে ওই লোক চার শতাংশ জায়গা নিয়ে নেই। ফেনী থেকে বাড়ি যাওয়ার পথে তাকে অবরুদ্ধ করে ভয় দেখিয়ে তা নিয়ে নেয়। কিছুদিন পরে ওই লোক স্ট্রোক করে মারা যান। যদিও এ বিষয়ে ভয়ে কথা বলতে রাজি হননি ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা। তার ছেলের সাথে যোগাযোগ করা হলে বিষয়টি জানে না বলে এড়িয়ে যান।


পাশাপাশি রয়েছে মাদকের কারবারও। এসবে সরাসরি জাকির হোসেন জড়িত না থাকলেও নিয়ন্ত্রক হিসেবে ঘুরেফিরে তার অনুসারীদের নাম। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, ধলিয়া বাজারের আশপাশে মাদক ব্যবসা চলে। মহিউদ্দিন, ইফতেখার আহমেদ, ফখরুদ্দিন ফারুক, রাজমিস্ত্রী সিরাজ, জসিম, কামাল, রানা ও জসিমের মেয়ের জামাই মুন্না মাদক কারবার করা থাকে। এদের অনেকে পতিত সরকারের আমলেও মাদক সিন্ডিকেটে জড়িত ছিল বলে একাধিক সূত্র জানায়।


এসব প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জাকির হোসেন জসিম ফেনীর সময়কে বলেন, “লালপোলে সড়ক দূর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর আমি ঠিকমতো চলতে পারি  না। অসুস্থ অবস্থায় এসবে আমার জড়ানো কি সম্ভব। এছাড়া গত এক বছর আমি কোন পদে নেই। সাথে এসবের কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। সামনে নির্বাচন আসতেছে, এজন্য অনেকে আমাকে নিয়ে এসব তথ্য ছড়াচ্ছে।”


জসিম আরো বলেন, “আমার নামে যদি কেউ চাঁদাবাজি, দখল, সালিশ বাণিজ্য এসব করে থাকে এবং যদি প্রমাণ থাকে সে যেই হোক তাহলে আমি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবো। আর আমি তো কাউকে এসব করতে বলি নাই। এমন কোন প্রমাণ পেলে আমি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবো।”


ফেনী জেলা বিএনপির আহবায়ক শেখ ফরিদ বাহার ফেনীর সময় কে বলেন, দখলদার, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে জড়িত দলের যেই হোক, যেই পর্যায়ের নেতা হোক। তার বিরুদ্ধে প্রশাসন আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে। বিএনপি কখনো অপরাধকে প্রশ্রয় দেয়নি, দিবেও না।


ফেনীর সময় কে তিনি আরো বলেন, কেউ যদি প্রতিবাদ না করতে পারে গোপনে জেলা প্রশাসক অথবা পুলিশ সুপারকে জানাবেন। তারা ব্যবস্থা নিবেন। অথবা জেলা বিএনপিকে জানালে আমরাও প্রশাসনকে অনুরোধ জানাবো।


ফেনী জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলাল ফেনীর সময় কে বলেন, যেকোন অপরাধের দায়দায়িত্ব ব্যক্তির, দলের নয়। এসব অপকর্মের দলীয়ভাবে তদন্ত করে সাংগঠনিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিজ্ঞাপন

error: কন্টেন্ট সুরক্ষিত!!