জুন ১৮, ২০২৬ ১৬:৫৮

সোনাগাজীতে আইনশৃঙ্খলার অবনতিচুরি-ডাকাতি হলেও মামলা হয় না


নিজস্ব প্রতিনিধি :

সোনাগাজীতে পুলিশের নিষ্ক্রীয়তার কারনে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাতসহ অপরাধ প্রবনতা বেড়েছে চলেছে। প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙলে এবং ফেসবুক খুলতেই সামনে আসে চুরিসহ নানা অপরাধের তথ্য। উপজেলায় বিভিন্ন ধরনের চুরি, ডাকাতি ও ডাকাতির প্রস্তুতি, অপহরণ, হামলা,মারামারির ঘটনা ঘটলেও থানায় মামলা গ্রহণে অনীহা দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। ডাকাতির অভিযোগ নিয়ে থানায় গেলে আসামি অজ্ঞাত থাকার কারণে পুলিশ মামলা নিতে বাদীকে নিরুৎসাহিত করে। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ দায়ের করলেও তদন্তে অগ্রগতি না থাকায় ফলাফল পাওয়া যায় না। ফলে ভুক্তভোগীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেন।


গত এপ্রিল মাসে পুরো উপজেলায় অন্তত ৩০-৩৫টি চুরির ঘটনা ঘটলেও থানায় মামলা হয়েছে মাত্র একটি। আর পুরো উপজেলায় মাদকের সয়লাভ। একই সঙ্গে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাতসহ আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনিত। এনিয়ে ৩০ এপ্রিল উপজেলা আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভায় বেশ আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠে। চুরি, কিশোর গ্যাং দমনে পুলিশের ব্যর্থতাসহ আইন শৃঙ্খলার পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে খোদ ইউএনও রিগ্যান চাকমা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। চলতি বছর ফেব্রুয়ারী থেকে এপ্রিল পর্যন্ত তিনমাসে সোনাগাজী মডেল থানায় ৫০টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে চুরি ৪টি, খুন ৩টি,গরু চুরি ১টি,অপহরণ ৩টি, নারী নির্যাতন ৫টি, মাদকদ্রব্য ১টি এবং অন্যান্য আইনে ২৯টি মামলা রয়েছে। মাঠের অনুসন্ধান বলছে ভিন্ন কথা।


অনুসন্ধানে জানা গেছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সোনাগাজী উপজেলার মতিগঞ্জ ইউনিয়নে পাঁচটি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো হলো ৮ ফেব্রুয়ারি ভোয়াগ গ্রামের রবীন্দ্র কুমার করের বাড়িতে চন্দ্র কুমার করের ঘরে ডাকাতি, ২১ ফেব্রুয়ারি ভাদাদিয়া গ্রামে আমেরিকা প্রবাসী পলাশের বাড়িতে ডাকাতি, ৭ এপ্রিল ভোয়াগ গ্রামের সাবেক উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. ফিরোজ আলমের বাড়িতে এবং একই রাতে চর চান্দিয়া গ্রামের নুরুল আমিনের নতুন বাড়িতে ডাকাতি। ২১ এপ্রিল কদমতলা এলাকায় আবদুল খালেক ফোরম্যানের নতুন বাড়িতে সৌদি প্রবাসী শেখ বাহার ও ওমান প্রবাসী শেখ আব্দুল ফারুকের ঘরে ডাকাতি। শেখ আব্দুল ফারুক ও শেখ বাহারের বাড়িতে ১০-১৫ জনের ডাকাত দল হানা দেয়। তারা প্রায় ৬ ভরি স্বর্ণালংকার, ১ লাখ ২০ হাজার টাকাসহ প্রায় ১০ লাখ টাকার সমপরিমাণ মালামাল লুট করে নিয়ে যায়।


শেখ আব্দুল ফারুকের স্ত্রী বিবি মরিয়ম রুমা বলেন, পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেও অভিযোগের পাঁচ মাস পরও কোনো মালামাল উদ্ধার করতে পারেনি। তিনি বলেন, ‘বাড়িতে পুরুষ না থাকায় আমরা মহিলারা ভয়ে দরজা খুলি না।’ একইভাবে, ৭ এপ্রিল মো. ফিরোজ আলমের বাড়িতে ডাকাত দল ১ লাখ টাকা ও সাড়ে ৫ ভরি স্বর্ণালংকার লুট করে। তিনি বলেন, ‘৯৯৯-এ কল করার পর পুলিশ এলেও মামলা নেয়নি। আমরা এখনো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।’ সিসিটিভি ফুটেজ থাকলেও তদন্তে অগ্রগতি নেই।
চর চান্দিয়ার নুরুল আমিনের বাড়িতে একই রাতে ডাকাতির ঘটনায় ব্যবসায়ী আব্দুল্লাহ আল নোমান আহত হন। এঘটনায় পুলিশ অভিযোগ গ্রহণ করলেও মামলা নেয়নি। তিনি বলেন, ‘ডাকাতরা আমার হাতে আঘাত করেছে। পুলিশ এখনো কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি।’ ২১ ফেব্রুয়ারি ভাদাদিয়া গ্রামে পলাশের বাড়িতে ডাকাত দল জানালার গ্রিল কেটে প্রবেশ করে এবং বিদেশি মুদ্রাসহ মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়। পলাশের ভাই তানভীর থানায় অভিযোগ দিলেও মামলা হয়নি। ৮ ফেব্রুয়ারি ভোয়াগ গ্রামে চন্দ্র কুমার করের বাড়িতে পুলিশ পরিচয়ে ডাকাত দল প্রবেশ করে। এসময় ডাকাতেরা ২ ভরি স্বর্ণালংকার ও ৩৫-৪০ হাজার টাকা লুট করে নিয়ে যাওয়ার সময়  খড়ের গাদায় আগুন ধরিয়ে দেয়।


ভুক্তভোগী সুমন কুমার কর বলেন, পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেও কোনো অভিযোগ গ্রহণ করেনি। মতিগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডের ব্যবসায়ী আনিছুল হক প্রতিদিনের মত গত মঙ্গলবার রাতে দোকান বন্ধ করে বাড়িতে যান। পরদিন সকালে এসে দেখেন রাতের বেলায় চোরের দল তাঁর  দোকানের তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকে নগদ টাকাসহ প্রায় দেড় লাখ টাকার মালামাল চুরি করে নিয়ে গেছে। এঘটনাও তিনি থানায় অভিযোগ দিয়েছেন। কিন্তু পুলিশের কাজ ঘটনাস্থল পরিদর্শনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।


আলোচ্য ঘটনাগুলোতে সোনাগাজী মডেল থানায় কোনো ডাকাতির মামলা রেকর্ড করা হয়নি। থানার তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত মোট ১৪৪টি মামলা রেকর্ড হয়েছে। যার মধ্যে চুরির মামলা ১৪টি, খুন ৪টি, ধর্ষণ ৫টি, নারী ও শিশু নির্যাতন ১২টি, অস্ত্র আইনে ৪টি, মাদকদ্রব্য ১৮টি এবং অন্যান্য মামলা ৮৪টি।
ফেনী জজ কোর্টের আইনজীবী আবদুর রহিম বলেন, ‘ডাকাতি একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। পুলিশ বাধ্যতামূলকভাবে মামলা গ্রহণ ও তদন্ত করতে বাধ্য। অভিযোগ নিয়েও মামলা না করার কারণ হতে পারে মামলার সংখ্যা কম দেখানো বা স্থানীয় প্রভাব।’


নাম প্রকাশে অনিশ্চুক এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, উপজেলার কোথাও কোন ঘটনা ঘটলে সেখানে ওসি না গিয়ে একজন এএসআইকে পাঠানো হয়। এতে পুলিশের আরও বদনাম হয়। স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতাদের হস্তক্ষেপের কারণে বেশির ভাগ ঘটনায় থানায় মামলা এমনকি অভিযোগও নেওয়া হয় না।


সোনাগাজী মডেল থানার ওসি মো. কামরুল ইসলাম বলেন, উপজেলার কোথাও ছোটখাটো কোন ঘটনা ঘটলেও খবর পাওয়া মাত্র পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে। প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে মাঠে নামে। এমন সময় ‘অনেকে চুরির ঘটনাকে ডাকাতি বলে ভুল প্রচার করে থাকে। তদন্তে সত্যতা পেলে মামলা নেওয়া হয়। অনেকে আবার থানায় মামলাতো দুরের কথা অভিযোগও দিতে চাই না। তবে পুলিশের বিষয়ে উঠা কথাগুলো সত্য নয়।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিজ্ঞাপন

error: কন্টেন্ট সুরক্ষিত!!