জুন ২২, ২০২৬ ১৬:৪৭

আলমগীর সিদ্দিকীর ত্রাসের রাজ্য ঘোপাল-শুভপুর


শহীদুল ইসলাম :

বিএনপি নেতা আলমগীর সিদ্দিকী ছিলেন একসময় ছাগলনাইয়া উপজেলা বিএনপির যুগ্ম-সম্পাদক ও ঘোপাল ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। এক-এগারোর বৈরী সময়ে দেশ ছেড়ে পাড়ি জমান প্রবাসে।

৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আ’লীগের পতনের পর হঠাৎ ফ্রান্স থেকে এসে রাতারাতি সবকিছুর নিয়ন্ত্রক বনে যান। ঘোপাল-শুভপুর দুই ইউনিয়নকে নিয়ে গড়ে তোলেন ত্রাসের রাজ্য। বালু মহাল থেকে শুরু করে জবর দখল, মাদক, সরকারি জমি থেকে মাটি লুট, চোরাচালানসহ এমন কোনো অপরাধ নেই যা তার দ্বারা হচ্ছেনা। ফেনী নদীর তীরে গড়ে উঠা উপজেলার এই দুইটি ইউনিয়ন বরাবরে আলোচিত। বিশেষ করে দুইটি ইউনিয়নের বালু মহাল যার হাতে থাকে সেই এলাকার মা-বাপ। আর বালু মহালের নিয়ন্ত্রণ নিয়েই রাজনীতিতে ঘুরে ফিরে আলোচনায় আসে এ দু’টি ইউনিয়ন।

ঘোপাল ইউনিয়ন বিএনপি তিন ভাগে বিভক্ত। একদিকে আলমগীর সিদ্দিকীর নেতৃত্বে একটা গ্রুপ ও জেলা বিএনপির সদস্য নুরুল আমিন ভূঁইয়া বাদশার নেতৃত্বে রয়েছে আরেকটি গ্রুপ। আলমগীর সিদ্দিকীর একচ্ছত্র দাপটে ইউনিয়নটিতে বাদশা গ্রুপ অনেকটা কোনঠাসা। এছাড়া ইউনিয়ন বিএনপির আহবায়ক মোস্তফা মজুমদারের নেতৃত্বে রয়েছে আরেকটি গ্রুপ। মোস্তফা মজুমদার কিছু সময় আলমগীর সিদ্দিকীর সাথে থাকে আবার অনেক সময় একলা চলেন। তবে ইউনিয়নটিতে দখল, মাদক, বালু উত্তোলন, মামলা বাণিজ্য ও চোরাচালান এসবের সবকিছুতে আলমগীর সিদ্দিকীর রয়েছে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ। তার অনুসারীরা ইউনিয়নটিতে সকল অপকর্ম করে থাকেন। এমন কোন অপকর্ম বাদ নেই যা তাদের দ্বারা হয় না। এর বাহিরের নুরুল আমিন ভূঁইয়া বাদশার সরাসরি সংযুক্ত না থাকলেও তার পাঁচ থেকে ছয় জন অনুসারী চাঁদাবাজি, মাদকসহ বেশকিছু অপরাধে জড়িত রয়েছে বলে জানা যায়। এরমধ্যে বিশেষ করে এলাকায় তরমুজ চাষীদের থেকে চাঁদা নেওয়ার ঘটনায় তার অনুসারী মাসুদ ও রাসেল, আকন, আসিফসহ বেশ কয়েকজনের নাম উঠে আসে ।

অন্যদিকে শুভপুরে মোটাদাগে বিএনপির দুইটি গ্রুপ রয়েছে। এরমধ্যে ইউনিয়ন বিএনপির আহবায়ক এনামুল হকের নেতৃত্বে একটি গ্রুপ ও উপজেলা বিএনপির সদস্য কামাল উদ্দিনের নেতৃত্ব রয়েছে আরেকটি গ্রুপ। এ গ্রুপ দুইটির মধ্যে রয়েছে আরো বেশ কয়েকটি উপ-গ্রুপ। দুই গ্রুপের বিরুদ্ধেই অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, মাদক, চোরাচালান ও চাঁদাবাজির মত বিষয়ের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এনামুল হকের অনুসারীদের বিরুদ্ধে। এসব কিছুকে চাপিয়ে তাদের দুই গ্রুপের বেশিরভাগে আবার আলমগীর সিদ্দিকীর অনুসারী। আলমগীর সিদ্দিকীর মদদে তারা বিভিন্ন ধরনের অপকর্ম করে থাকে।


দুই ইউনিয়নে নিজের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে আলমগীর সিদ্দিকী গড়ে তুলেছেন নিজস্ব বাহিনী। এদের বেশিরভাগে আবার ছাত্রলীগ-যুবলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল। তাদের দিয়ে তিনি বিভিন্ন অপকর্ম করে থাকেন। বিশেষ করে বালু মহালের নিয়ন্ত্রণ এদের দিয়ে করে থাকেন। বালু উত্তোলনে বাধা দিলে হামলা করিয়ে থাকেন তিনি। কিছু হলে করা হয় মারধর। নিজের দলীয় প্রতিপক্ষকে পর্যন্ত ছাড়েন না সিদ্দিকী। ৫ আগস্টের পর নিজদলীয়দের উপর হামলা করেছেন বেশ কয়েকবার। হামলা করা হয়েছে বাড়িঘরেও। হুমকি-ধামকিতো আছেই। সর্বশেষ হৃদয় নামে ঢাকা মহানগর ছাত্রদলের এক নেতাকে হুমকি ও গালিগালাজ করার একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। এ ঘটনায় আলমগীর সিদ্দিকীকে উপজেলা বিএনপি থেকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়।

এছাড়া বিভিন্নজনকে হুমকি-ধামকি দেওয়ার এমন আরো ভিডিও ও অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রয়েছে।  এছাড়া মাদক, অস্ত্র, চোরাচালানেও জড়িত রয়েছে সে। মাদক বা অস্ত্রের বিষয়ে মাঈন উদ্দিন মামুন প্রকাশ ডাকাত মামুনের সাথে আলমগীর সিদ্দিকীর ৪৬ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ও অডিও রেকর্ড ফেনীর সময়ের হাতে এসেছে। ভিডিওতে মামুন ছাড়াও আরো দুইজনকে দেখা যায়। আশপাশে আরো এক বা দুইজনের কন্ঠ এ রেকর্ডে শুনা যায়। এসময় মামুনকে সিদ্দিকীর কাছে পূর্বের লেনদেনের টাকা কবে দিবে জানতে চাইতে দেখা যায়। পাশাপাশি আর কোন ‘মাল’ লাগবে কি না সিদ্দিকীর কাছে জানতে চান মামুন।

আলমগীর সিদ্দিকী অস্ত্র কারবারের সাথেও জড়িত রয়েছে বলে গোয়েন্দা সংস্থাদের একটি সূত্র জানায়। বিশেষ করে ১২ ফেব্রুয়ারী জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে ফেনীতে বেশকিছু অস্ত্র এসেছিল, সেখানে আলমগীর সিদ্দিকীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে গোয়েন্দা সূত্রটি জানায়। সূত্রটি আরো জানায়, আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের থেকে লুট হওয়া কিছু অস্ত্র তার ও তার অনুসারীদের হাতে রয়েছে। ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন সময় এসব অস্ত্র ব্যবহার হয়েছে বলে সূত্রটি জানায়।

ঘোপাল ও শুভপুর পেরিয়ে ছাগলনাইয়া উপজেলা সদরেও প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছে আলমগীর সিদ্দিকী। এ নিয়ে বিভিন্ন গ্রুপের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে সে। বিশেষ করে উপজেলা বিএনপির যুগ্ম-আহবায়ক কপিল উদ্দিন সরকারের সাথে তার দ্বন্দ্ব এখন প্রকাশ্য। সর্বশেষ গত ১২ জুন শুক্রবার রাত ১১টায় স্থানীয় সংসদ সদস্য রফিকুল আলম মজনুর সামনে তার নিজ কার্যালয়ে উভয় গ্রুপের মধ্যে হাতাহাতি, ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া ও অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনা ঘটে। এসময় আলমগীর সিদ্দিকীর পাঞ্জাবি ছিঁড়ে পেলা হয় বলেও প্রত্যক্ষ সূত্র জানায়। তবে আলমগীর সিদ্দিকীর প্রভাব বাড়ায় কপিল উদ্দিন সরকার সেখানে এখন অনেকটা কোনঠাসা। এছাড়া বালু মহাল নিয়ে সেখানকার আরেক বিএনপি নেতা রিয়াজ উদ্দিন মজুমদার টিপুর সাথেও দ্বন্দ্ব রয়েছে আলমগীর সিদ্দিকীর। এ নিয়ে বেশ কয়েকবার ঘটেছে হামলার ঘটনাও। দ্বন্দ্ব রয়েছে সাঈদুল ইসলাম চাচ্ছু নামে সেচ্ছাসেবকদলের আরেক নেতার সাথেও। বালু মহালের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তার সাথে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটেছে। বিশেষ করে উপজেলাটি সীমান্তবর্তী হওয়ায় এখানে চোরাচালান ও মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ নিতে আলমগীর সিদ্দিকী মরিয়া হয়ে উঠে।

বালু মহালের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে রিয়াজ উদ্দিন মজুমদার টিপু ফেনীর সময়কে বলেন, “বালু মহালের ওখানে আমি ইজারাদার মাধ্যমে নেয়ার চেষ্টা করেছি। আইনী প্রক্রিয়ায় এগোতে চেয়েছি। আইনী সিস্টেমের বাহিরে আমি কোন কিছু চেষ্টা করেনি।”
নুরুল আমিন ভূঁইয়া বাদশা ফেনীর সময়কে বলেন, “আমি স্থানীয় রাজনীতির সাথে জড়িত নই। আমি জেলা বিএনপিতে আছি, ঢাকায় রাজনীতি করি। আমি রফিকুল আলম মজনু ভাইয়ের নেতৃত্বে রাজনীতি করি। ফলে এলাকায় আমার নাম ভাঙ্গিয়ে কেউ কিছু করলে তার দায় আমার না। প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে বরং আইনি যে কোন ব্যবস্থা নিতে পারে।”

রাত হলেই শুভপুর ও
ঘোপালে বালু উত্তোলন

শুভপুর ব্রিজের পশ্চিম পাশ যেন জগতের ভিতর আরেক জগত। নিরাপত্তা বলয়ে বেষ্টিত বালু মহালের নির্দিষ্ট এই এরিয়া। তাদের কারো চোখ ফাঁকি দিয়ে কেউ প্রবেশ করবে এটা ভাবাও দু:সাধ্য বিষয়। এখানে রাত হলেই চলে বালু উত্তোলন। দূর থেকে কেউ বুঝার উপায় নেই যে এখানে বালু উত্তোলন হচ্ছে। ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পূর্বে এখানে পর্বতসম বালুর স্তুপ ছিলো। তখনকার উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ-সম্পাদক মেজবাউল হায়দার চৌধুরী সোহেল এটার নিয়ন্ত্রণ করতেন। এখন উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম-সম্পাদক আলমগীর সিদ্দিকী এটার নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। সেখানে তিনি গড়ে তুলেছেন আলাদা জগত।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পুরাতন ব্রিজের পশ্চিম পাশে চলছে নতুন ব্রিজের নির্মাণ কাজ। ব্রিজের উপরে উঠতেই পশ্চিম পাশে বালু মহালের সড়ক। নিচে নামতেই দেখা যায় সাদা টি শার্ট পড়া একজন বসে পাহারা দিচ্ছেন। প্রবেশের ডানপাশে রয়েছে উত্তোলন করা নতুন বালু। আরো কিছু ভিতরে প্রবেশ করলে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে হয় এই প্রতিবেদককে। নৌকায় ছবি তোলার কথা বললে কিছু না বলে যেতে দেয়। আরো কিছু দূর যাওয়ার পর বাম পাশে আরেকটি নতুন স্তুপ চোখে পড়ে। কিছুদূর সামনে গেলে ৫ জনকে পাইপ লাইনের মেরামত করতে দেখা যায়। তারা বালু উত্তোলনের জন্য পাইপ লাইন ও ড্রেজার মেশিন প্রস্তুত করছিল। আরো ভিতরে গেলে এভাবে দুইটা ছোট স্তুপ চোখে পড়ে। তাদের নজরদারি থাকার কারণে ভিতরে আর যাওয়া যায়নি। তবে সেখানে ভিতরে আলমগীর সিদ্দিকীর একটি কক্ষ রয়েছে। তার অনুসারী যারা তাদের থাকার জন্য রয়েছে কক্ষ ও দোকান। কক্ষগুলোয় মাদকের আখড়া বলে সেখানকার একাধিক লোক জানায়। বালু মহালের জায়গা পার হওয়ার পর একেবারে পশ্চিমে রয়েছে ছোট্ট একটি দ্বীপ। দ্বীপে আলমগীর সিদ্দিকীর অনুসারীরা অস্ত্র নিয়ে থাকেন বলে সেখানে একাধিক লোক জানান।

পশ্চিমের এ বালু মহাল থেকে বালু উত্তোলনের পিছনে আলমগীর সিদ্দিকীর অনুসারী জেলা ছাত্রদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন, সদস্য একরাম হোসেন, আরেক ছাত্রদল নেতা রানা মজলিশ, ইউনিয়ন যুবদলের যুগ্ম-আহবায়ক হোসেন মল্লিক ও যুবলীগ নেতাদের থেকে শুভপুর ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ-সম্পাদক আলমগীর হোসেন, যুবলীগ নেতা বাদশা, ওসমান প্রকাশ ঠোঙ্গা ওসমান, বোমা ইদ্রিস,লাল আরিফ, মাঈন উদ্দিন মামুন প্রকাশ ডাকাত মামুন,বাসিদ ও লুঙ্গি সাদ্দামের নাম উঠে এসেছে। এরমধ্যে একরাম হোসেন ও রানা মজলিস ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করে থাকেন। একজন রাতে ও আরেকজন দিনে দায়িত্ব পালন করে থাকেন বলে জানা যায়। এছাড়া পূর্বের সিলগালা বালু আলমগীর সিদ্দিকী গত শুক্রবার রাতে কিছু নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে।

এছাড়া ঘোপাল ইউনিয়নের নাঙ্গলমোড়া ও আলোকদিয়ায়ও তোলা হচ্ছে বালু। সন্ধা হলেই বালু উত্তোলন শুরু হয়। ঘোপাল ইউনিয়নের এ দুই স্থান থেকেও আলমগীর সিদ্দিকী বালু তুলে থাকেন। বিশেষ করে মধ্যম নাঙ্গলমোড়ায় রাতে হলে বেশ কয়েকটি ড্রেজার মেশিন বসিয়ে দেদারসে বালু তোলা হয়। ফেনী নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে উঠা নাঙ্গলমোড়ায় ৩ হাজার মানুষের বসবাস। জমির বিশাল অংশ ভেঙে নদীতে বিলীন হয়ে গিয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্থ সেখানকার বাসিন্দারা। ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পূর্বে সেখানে থাকা নদীর তীরে মাটি কেটে নিয়ে যায় মেজবাহুল হায়দার চৌধুরী সোহেল। পরে আসনটির সাবেক এমপি শিরিন আক্তারকে অনুরোধ করে ব্লক দিয়ে বাঁধ দেওয়া হয়েছে। এখন সেখানে উত্তোলন হচ্ছে বালু। বালু উত্তোলনে বাধা দেওয়ায় স্থানীয়দের উপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে বেশ কয়েকবার। সর্বশেষ গত ৬ জুন শনিবার রাতে সেখানে অস্ত্রের মহড়া দিয়ে ভীতি তৈরি করে আলমগীর সিদ্দিকীর অনুসারীরা।

স্থানীয় এক নারী ফেনীর সময়কে জানান, অনেকের মুখে কাপড় পড়া ছিল। বেশিরভাগের হাতে ছিল দেশীয় অস্ত্র। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নদীর এপাশে ফেনী অংশ ও ওই পাশে চট্টগ্রামের অংশ। এ পাশ ঘোপাল ইউনিয়নের নাঙ্গলমোড়া ও চট্টগ্রামে পড়েছে করেরহাট ইউনিয়নের পশ্চিম জোয়ার। ফেনী অংশে নাঙ্গলমোড়ায় নদীর তীরে হাজারো মানুষের বসবাস। এদের অনেকে আবার দরিদ্র। ফেনী অংশে ব্লক দিয়ে বাঁধ দেওয়া হয়েছে। ব্লকের কিছু ইট ইতিমধ্যে ভেঙে পড়ে যাচ্ছে। আশপাশে অনেকগুলো বাড়ী। এটাকে খোরশেদ চেয়ারম্যানের পুরাতন এলাকা বলে থাকে। বাড়ী গুলো পার হওয়ায় পর সেখানে বালু উত্তোলনের ড্রেজার মেশিন ও জমিনে বালুর স্তুপ চোখে পড়ে। তখন বেশ কয়েকজনকে পাইপের লাইন ঠিক করতে দেখা যায়। এরমধ্যে তাদের নির্দেশনা দিতে নুর উদ্দিন রানা নামে ইউনিয়ন যুবদলের এমন এক নেতাকে দেখা যায়। আমির হোসেন নামে আরো একজন এ প্রতিবেদকের চোখে পড়ে। জানা যায়, দু’জনে আলমগীর সিদ্দিকীর অনুসারী এবং তারা এটা তদারকি করে থাকেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের অন্তত আট থেকে নয়জন পুরুষ-মহিলার সাথে কথা বলে জানা যায়, মূলত সন্ধ্যা হলে তারা বালু উত্তোলন শুরু করে। বাধা দিতে গেলে তাদের উপর হামলা করা হয়। অনেককে মারধরও করা হয়। আবুল কালাম নামে এক বাসিন্দা ফেনীর সময়কে বলেন, “আলমগীর সিদ্দিকী এগুলা নিয়ে যায়। কিছু বললে অস্ত্র নিয়ে আসে আমাদের মারধর করতে। আমাদের বাড়ীঘরে হামলাও চালানো হয়েছে।”

আশির্ধ্বো এক বৃদ্ধ ফেনীর সময়কে বলেন, “এটা ইকবাল তুলে থাকে। ইকবালদের ১৫ জনের একটা সিন্ডিকেট রয়েছে। তারা নিয়ে যায়।” নাঙ্গলমোড়া বালু উত্তোলনের সাথে আলমগীর সিদ্দিকীর অনুসারী ঘোপাল ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক রাকিব,লম্বা সাইফুল,ছাত্রদল নেতা রানা মজলিস, ইকবাল, কামরুল মেম্বার স্থানীয় বাসিন্দা রফিক ও রফিকের ছেলে আজাদের নাম উঠে এসেছে।

এছাড়া আলমগীর সিদ্দিকী ঘোপাল ইউনিয়নের আলোকিয়া থেকেও বালু উত্তোলন করে থাকেন। সেখানে সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মুহুরি নদীর তীরে বেশ কিছু দীঘি রয়েছে। এসবে মাছ চাষ হয়ে থাকে। পাশে ফরহাদ নগরের লালা চর। এ মাঝামাঝি জায়গায় দুইটি জমিনে বালুর স্তুপ। পাশে রয়েছে ছোট গর্ত করা পুকুর। আশপাশে পাড় ভেঙে যাচ্ছে। বসানো রয়েছে ড্রেজার মেশিন। ৫০ মিটার দূরে দীঘি খননের কাজ চলছে। স্থানীয় একজন জানান, দীঘি খননে আরো গভীরে যাওয়ার পর সেখানে বালু পাওয়া যায়। সেখান থেকে ও আশপাশের জায়গা থেকে বালুগুলো উত্তোলন হচ্ছে। বালুগুলো যায় ঘোপালে পিএইচপি ফ্যাক্টরিতে। সেখানে আলমগীর সিদ্দিকী এগুলা দিয়ে থাকেন। এছাড়া ওই দিঘি থেকে মাটি কেটে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে আলমগীর সিদ্দিকী ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে। সেখানে বালু উত্তোলনের পিছনে মেজবাহ, নুরুল হক ও এনাম নামে তিনজনের নাম এলাকাবাসী জানান। এরমধ্যে মেজবাহর বাড়ী মিরসরাই বলে জানা যায়।

জানতে চাওয়া হলে জেলা প্রশাসক মনিরা হক ফেনীর সময়কে বলেন, “আমরা চেষ্টা করতেছি। র‌্যাবও পাঠিয়েছিলাম এগুলায়। এখানে এলাকাবাসীকে এগিয়ে আসতে হবে। থানাকে আরো সক্রিয় হতে হবে। নতুন পুলিশ সুপার আসছে, আমরা সমন্বয় করে নিবো। সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। অবৈধভাবে যারা বালু তুলছে তাদের নাম দেন। আমরা তাদের ধরার চেষ্টা করবো।”

বালু উত্তোলনে জড়িত
জামায়াত কর্মীও

ঘোপাল ইউনিয়নের আলোকদিয়া বালু উত্তোলনের সাথে জড়িত রয়েছে নুরুল হক নামে জামায়াতের এক কর্মী। নুরুল হক ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ড জামায়াতের সক্রিয়কর্মী বলে জানা যায়। সে বালু উত্তোলন ছাড়াও আলোকদিয়ায় মাটি কাটা সিন্ডিকেটের গুরুত্বপূর্ণ একজনও বলে জানা যায়। আলোকদিয়ার বালু উত্তোলনের পিছনে নুরুল হকের নাম ছাড়াও মেজবাহ ও এনামও জড়িত। এরমধ্যে মেজবাহ এটি তদারকি করে থাকেন। আলোকদিয়া বালু মহাল আলমগীর সিদ্দিকী সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। সেখানকার বালু বেসরকারি কোম্পানি পিএইচপির ফ্যাক্টরিতে যাচ্ছে। একটি সূত্র জানায়, আলোকদিয়া বালু উত্তোলন ও মাটি কাটার সিন্ডিকেট পুরোপুরি আলমগীর সিদ্দিকীর নিয়ন্ত্রণে। নুরুল হক আলমগীর সিদ্দিকীর সাথে কাজ করে থাকে। দলে থাকার বিষয়টি স্বীকার করে ওয়ার্ড জামায়াতের সেক্রেটারি আরিফুল ইসলাম বলেন, “জামায়াতে ইসলামী কোন অন্যায়কে সাপোর্ট করে না। আমরা সকল ধরনের অন্যায়ের বিপক্ষে। আমাদের দলের হলেও অন্যায় করলে ছাড় দেওয়ার কোন সুযোগ নেই। অন্যায় তো অন্যায়ে।”

বালু মহালের নিয়ন্ত্রণ
নিয়ে দ্বন্দ্ব-মারামারি


শুভপুর বালু মহালের পশ্চিম পাশ আগস্টের পর কিছুদিন মিনার চৌধুরীর হাতে ছিল। মিনার চৌধুরী এই বালু মহালের ইজারদার ছিল বলে জানা যায়। পরে তার থেকে বিএনপি নেতা রিয়াজ উদ্দিন মজুমদার টিপু একক নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেই। কিন্তু সেটাও আর বেশিদিন টিকেনি। টিপু থেকে আলমগীর সিদ্দিকী তার একক কব্জায় নিয়ে নেয়। শুধু বালু মহাল নয়, শুভপুরের মাদক, চোরাচালান ও অন্যান্য বিষয়ের নিয়ন্ত্রণও আলমগীর সিদ্দিকীর হাতে চলে যায়। টিপু অনেকটাই কোনঠাসা। এ নিয়ে তাদের মধ্যে রয়েছে দ্বন্দ্ব। নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিভিন্ন সময় টিপুর অনুসারীদের উপর হামলার অভিযোগ রয়েছে আলমগীর সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে। দ্বন্দ্ব রয়েছে স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা সাঈদুল ইসলাম চাচ্ছুর সাথে। বালু মহালের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটেছে। শুভপুর বালু মহালের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উপজেলা সেচ্ছাসেবক দলের এক নেতার উপরও হামলার ঘটনা ঘটেছে। শুধু সে নয়, যেই বালু মহাল নিয়ন্ত্রণে নিতে চেয়েছে তার উপরে হামলা করেছে আলমগীর সিদ্দিকী ও তার অনুসারীরা।

শুভপুর বালু মহালের পূর্ব পাশে ৫ আগস্টের যে যেভাবে পারছে বালু তুলে নিয়ে যায়। বিশেষ করে ব্রিজ থেকে জয়চাঁদপুর ও চানপুর পর্যন্ত নদী থেকে দেদারসে বালু উত্তোলন হয়। পরে তখনকার জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম বালু উত্তোলন বন্ধ করে টালগুলো সিলগালা করেন। এ ঘটনা উপজেলা ভুমি কর্মকর্তা একটি মামলা দায়ের করেন বলে জানা যায়।

৫ আগস্টের পর এ অংশে বালু উত্তোলনের পিছনে বিএনপি নেতা রিয়াজ উদ্দিন মজুমদার টিপু, ছাগলনাইয়া উপজেলা যুবদলের আহবায়ক কাজী জসিম, সদস্য হোসেন মল্লিক, জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম-সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন, উপজেলা ছাত্রদল নেতা মহিউদ্দিন সুজন, স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা সাইদুল ইসলাম চাচ্ছু, সাবেক ৩নং ওয়ার্ড ছাত্রদল সভাপতি শাখাওয়াত হোসেন রানা, উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম-আহবায়ক নাজিম, ইমতিয়াজ উদ্দিন ইমনের নাম উঠে এসেছে। এদের বাহিরে স্থানীয় এলাকার অনেক বাসিন্দাসহ অনেকে রয়েছে বলে জানা যায়।

শুভপুর ছাড়াও আলমগীর সিদ্দিকী নিজের একক নিয়ন্ত্রণে রেখেছে ঘোপাল ইউনিয়নের নাঙ্গলমোড়া বালু মহাল ও আলোকদিয়া। এছাড়া সমিতি বাজার বালু মহাল থেকে ৫ আগস্টের পর তার অনুসারীরা বালু নিয়ে যায়। সেখানে বালু উত্তোলনের পিছনে জেলা ছাত্রদলের সদস্য একরামুল হক, আরেক ছাত্রদল নেতা শাহাদাত, গোলাম রাব্বানী মেম্বার, আব্দুল মান্নান, যুবলীগ নেতা পারভেজ ও ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক রাকিবের নাম উঠে এসেছে। এখানে দুই-একজন ছাড়া সবাই আলমগীর সিদ্দিকীর অনুসারী। এদের ছাড়াও সমিতি বাজার বালু মহালে ইউনিয়ন বিএনপির আহবায়ক মোস্তফা মজুমদার ও উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সদস্য সচিব ইব্রাহিম মিয়াজী নয়নের নামও উঠে এসেছে। এছাড়া সমিতি বাজার বালু মহাল ইস্যূতে আলাউদ্দিন নামে এক যুবদল নেতাকে আলমগীর সিদ্দিকী তুলে নিয়ে মারধরও করছিল। এ ঘটনায় সে সময় ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করা হয়। অবশ্য সে আলাউদ্দিন এখন সিদ্দিকীর অনুসারী।

জবর দখলের মহোৎসব, বাদ
পড়েনি মসজিদের জমিও

ঘোপাল ও শুভপুরে চলছে দখলের মহোৎসব। বালু উত্তোলনের জন্য আশপাশের জমি যেমন দখল করছে, তেমনি সরকারি জায়গা, নদীর পাড় ও আশপাশের জমি থেকে যথেচ্ছভাবে কেটে নিয়ে গেছে মাটি। এসবের সব অভিযোগ আলমগীর সিদ্দিকী ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে। নামকাওয়াস্তে টাকা দেওয়ার নামে দখল করেছে মসজিদ ও মাদরাসার জায়গায়ও।

ঘোপাল ইউনিয়নের মধ্যম নাঙ্গলমোড়ার খুরশিদ চেয়ারম্যানের পুরাতন বাড়ীর পাশে ফেনী নদী থেকে বালু উত্তোলন করছে আলমগীর সিদ্দিকী। তার অনুসারীদের দিয়ে সে সেখান থেকে বালু উত্তোলন করে থাকে। বালু রাখার জন্য সে আশপাশের বেশকিছু জমি দখল করে নিয়েছে। জমির মালিকের আপত্তি সত্ত্বেও ও টাকা দিবে বলে দখল করে নেয়।

ভয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নাঙ্গলমোড়ার মিলন মেম্বারের বাড়ীর আশপাশের এলাকার একজন ফেনীর সময়কে জানান, সেখানে তার ২০ শতাংশ জমি রয়েছে। সে সেখানে চাষবাস করবে বলার পরও টাকা দিবে বলে জোর করে নিয়ে নেয়। তিনি বলেন, “আমার টাকা লাগবে না বলছি, এরপরও নিয়ে নিছে।”

আবুল হোসেন (ছদ্মনাম) নামে এক ব্যাক্তির সেখানে ১৬শতাংশ জমি রয়েছে। শুধু তার না, মোস্তফা, করিম ও হারুন নামে তিনজন ব্যাক্তিরও জায়গা রয়েছে। তাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তারা ভয়ে কথা বলতে রাজি হয়নি। আবুল হাসেম ফেনীর সময়কে বলেন, “কাকে বলবো এগুলা। জোর করে নিয়ে গেছে। কোন আলমগীর সিদ্দিকী নাকি একটা আছে তার লোকেরা নিয়ে গেছে। সেও আছে। কিছু বললে অস্ত্র নিয়ে মারধর করতে আছে।” দখলের বিষয়ে সেখানকার বাসিন্দা অন্তত ৫জন পুরুষ ও মহিলার সাথে কথা হয়। তাদের কেউ ভয়ে কথা বলতে রাজি হয়নি। এরমধ্যে এক মহিলা বলেন, “ওরা সবসময় অস্ত্র মহড়া দিয়ে থাকে। আমাদের ভয়ের উপরে রাখে।”

সেখানে শুধু কৃষক বা আশপাশের মানুষ জমি নয়, দখল করেছে মসজিদ ও মাদরাসার জমিও। বালু উত্তোলনের ওখানে নাঙ্গলমোড়া কেন্দ্রীয় ঈদগাহ জামে মসজিদ ও ফোরকানিয়া মাদরাসার ১২গন্ডা তথা ২৪ শতাংশ জায়গা রয়েছে। আ’লীগের সময়কার স্থানীয় মেম্বার আরিফ ৩ হাজার টাকার বিনিময়ে জোর করে নিয়ে নেন। ৫ আগস্টের পর সে জমি এখন আলমগীর সিদ্দিকীর অনুসারীদের হাতে। মসজিদের জায়গা তারা এদের থেকে ফেরত চায়। কিন্তু না দিয়ে সেখানে বালু ফেলা হচ্ছে। এ বিষয়ে মসজিদ কমিটির দুই সদস্যের সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। এরমধ্যে একজন ফেনীর সময়কে বলেন, “৩ হাজার টাকা তো পরে, এ বছর ১৫শ টাকা দিয়েছে। আমরা কি করবো। কেউ কথা বলতে চায় না ওদের ভয়ে। আর এটা আগের কমিটি ঠিক করছিল। এখন আমরা কেউ ভয়ে কিছু বলতেও পারছি না।”

নাঙ্গলমোড়ায় থাকা চর থেকেও মাটি কেটে নিয়ে যায়। একদিন কাটার পর এলাকাবাসীর বাঁধায় ভেকু নিয়ে চলে যায়। আলমগীর সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে রেল ও সড়কের জায়গা থেকে মাটি কেটে নেয়ার। ঘোপাল ইউনিয়নের নতুন সমিতি বাজার রেলের জায়গা থেকে মাটি কেটে নিয়ে যায় আলমগীর সিদ্দিকী।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়ক ও ঢাকা-চট্রগ্রাম রেললাইনের মাঝামাঝি জায়গা অনেকটা গর্ত হয়ে রয়েছে। কিছু জায়গায় গভীর গর্ত রয়েছে। এখন কিছুটা ঝোপঝাঁড়। সেখান থেকে মাটি লুট করে নিয়ে যায় আলমগীর সিদ্দিকী। সেখানে একটা ছোট সড়ক ছিল, সেটাও কেটে নিয়ে তার লোকদের দিয়ে। সেখানে এসব মাটি লুট করে নিয়ে যাওয়ার পিছনে আলমগীর সিদ্দিকীর সহযোগী হিসেবে মোমিন, ছোট সুমন ও আলাউদ্দিনের নাম উঠে এসেছে।

এছাড়া শুভপুর ব্রিজে উঠতে পূর্বে একটি লেক রয়েছে। সড়কের নিচে খালি জায়গা ছিল। সেখান থেকে বালু সহ মাটি লুট করে নিয়ে যায় আলমগীর সিদ্দিকী। গভীর করে খনন করা হয়েছে সেখানে। এতে ঝুঁকিতে রয়েছে ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কের পুরাতন এ সড়কটি ও নদীর পাড়। এছাড়া লেকটিও দখলের চেষ্টা ছিল তার। এখনো চেষ্টা করছে বলে একটি সূত্র জানায়।

চলছে রমরমা
মাদক ব্যবসাও

ঘোপাল ও শুভপুরে চলছে রমরমা মাদক কারবার। সীমান্তবর্তী ইউনিয়ন শুভপুর হয়ে এসব মাদক প্রবেশ করে এ দুই ইউনিয়নে। এরমধ্যে চট্টগ্রাম ও ঢাকা বা আশপাশে জেলায় মাদক যাওয়ার অন্যতম নিরাপদ রুট ঘোপাল। দুই ইউনিয়নে যেমন মাদকের ছড়াছড়ি রয়েছে তেমনি বেশ কয়েকটি রুট হয়ে এসব মাদক পুরাতন মুহুরিগঞ্জ বা ফাজিলপুর হয়ে চট্টগ্রাম বা আশপাশের জেলায় ছড়িয়ে যায়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, একদিকে দক্ষিণ মন্দিয়া, রাজারহাট হয়ে মুহুরিগঞ্জ অথবা শুভপুর হয়ে মোটবী ইউনিয়নের ভূঁইয়ারহাট, শিবপুর ও ফাজিলপুর হয়ে ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কে এসে চট্টগ্রাম বা ঢাকার দিকে অথবা আশপাশের জেলায় চলে যায়। অন্যদিকে সোনাপুর, জয়চাঁদপুর, সেবারহাট, শুভপুর বাজার ও জয়পুর হয়ে ঘোপাল ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে পুরাতন মুহুরিগঞ্জ বা আশপাশের সড়ক হয়ে ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কে পৌঁছে যায়। ঘোপালের মুহুরি পুকুরের দক্ষিণ পাশে তেমুহনী রাস্তার মাথা শিমুল মেম্বারের পার্শ¦বর্তী সড়কটি সবচেয়ে নিরাপদ রুট বলে একাধিক সূত্র জানায়। এখানে পাহারা দিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে নিয়ে যাওয়া হয়।

এসব মাদক কারবারে ঘোপালে দশ থেকে বারোজন ছাড়া সবাই আলমগীর সিদ্দিকীর অনুসারী। এরমধ্যে অন্তত ৫জন নুরুল আমিন ভূঁইয়া বাদশার অনুসারী ও বাকিরা ইউনিয়ন বিএনপির আহবায়ক মোস্তফা মজুমদারের অনুসারী বলে জানা যায়। শুভপুরে মাদক কারবারে আলমগীর সিদ্দিকীর অনুসারীরা যেমন রয়েছে তেমনি ইউনিয়ন বিএনপির আহবায়ক এনামুল হক ও উপজেলা বিএনপির সদস্য কামাল উদ্দিনের অনুসারীরাও রয়েছে। তবে এ দুই ইউনিয়নের মাদক সিন্ডিকেটের মূল হোতা হিসেবে ঘুরেফিরে উঠে আসে আলমগীর সিদ্দিকীর নাম। সীমান্ত পার হওয়া থেকে শুরু করে ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়ক পর্যন্ত নিয়ে সম্পূর্ণ তার অনুসারীরা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। চোরাচালানেও তার অনুসারীরা জড়িত বলে একাধিক সূত্র জানায়।

ঘোপালে মাদক কারবারে জড়িত এমন অন্তত ১৫জনের নাম ফেনীর সময় এর হাতে এসেছে। এরমধ্যে নাঙ্গলমোড়া কেন্দ্রিক রয়েছে ছাত্রদল নেতা রানা মজলিস, রাকিব, লম্বা রিয়াজ, জাহিদ, ৮নং ওয়ার্ডে আজিজুর রহমান প্রকাশ ছিড়া আজিজ ও সাইফুল। রয়েছে কোহিনুর মেম্বারের ছেলে রনি, রনির সাথে রয়েছে শুভ ও নওপাড়ার ইকবাল, সমিতি বাজার কেন্দ্রীক রয়েছে আলাউদ্দিন, মোমিন, পারভেজ, ইমরান নাজির, সাহেদ পাটোয়ারী, আকন ও আকনের ভাই আসিফ। এছাড়া রাসেল ও মাসুদ নামে আরো দুইজনের নামও উঠে এসেছে।

অন্যদিকে শুভপুরে মাদক কারবারে জড়িত এমন ২৫ জনের নাম আমাদের হাতে এসেছে। এদের মধ্যে রয়েছে চম্পক নগরের শাকিল, ফরহাদ, যুবলীগ নেতা মামুন প্রকাশ ডাকাত মামুন, জামাই শরীফ, শুভপুর নবী হোটেলের সত্বাধিকারী কামরুল, জামাই সুমন, মোটা মানিক, রতন, রেজাউল করিম বাহার, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, মুরাদ, সাজ্জাদুর রহমান, নিপুণ চৌধুরী রড্ডি, একরাম হোসেন রিয়াজ, করিমুল হক করিম, অপু, হোসনে আরা, মন্দিয়ার সুমন, জাহাঙ্গীর ও সাইফুলের নাম উঠে এসেছে। এদের বেশিরভাগে আবার এনামুল হকের অনুসারী। এর বাহিরে সাইদুল ইসলাম চাচ্ছুর নামও উঠে এসেছে। সাইদুল ইসলাম চাচ্ছু বিশাল এরিয়ার মাদক নিয়ন্ত্রণ করে বলে জানা যায়। তবে সীমান্ত পারাপারে তুষার নামে একজনের নাম উঠে আসে। পাশাপাশি শুভপুর ও জয়পুর হয়ে মুহুরীগঞ্জ পর্যন্ত শেল্টার দেয়ার পিছনে জেলা ছাত্রদলের সদস্য সাজ্জাদুর রহমান ও ছাগলনাইয়া সরকারি কলেজ ছাত্রদল নেতা নোমানের নাম জানা গেছে।

চোরাচালানেও ঘুরেফিরে আলমগীর সিদ্দিকীর অনুসারীরা জড়িত। বিশেষ করে চোরাচালানে ডাকাত মামুন,কামালের অনুসারী শাকিল,ঘোপালের রাসেল, মোশাররফ হোসেন ও ছাত্রদল নেতা ইমরান নাজিরের নাম উঠে এসেছে।

ছাত্রলীগ-যুবলীগ দিয়ে গড়ে
তুলেছে নিজস্ব বাহিনী

নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীদের দিয়ে আলমগীর সিদ্দিকী গড়ে তুলেছে নিজস্ব বাহিনী। এ বাহিনীতে ঘোপাল ও শুভপুরের পাশাপাশি রয়েছে মিরসরাই ও ফরহাদনগরের বেশ কয়েকজন চিহ্নিত সন্ত্রাসীও রয়েছে। এদের বেশিরভাগে চুরি, অস্ত্র, মাদক ও ডাকাতি মামলার আসামি। রয়েছে ৪ আগস্ট মহিপালের গণহত্যা মামলার আসামিও। আলমগীর সিদ্দিকী এদের দিয়ে দুই ইউনিয়নের অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন।

অনেকের সাথে কথা বলে জানা যায়, আলমগীর সিদ্দিকী ৫ আগস্ট ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানের পর ফ্রান্স থেকে ফিরে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে গড়ে তুলেন নিজস্ব বাহিনী। এ বাহিনী দিয়ে তিনি দুইটি ইউনিয়নে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। এদের বেশিরভাগের হাতে রয়েছে দেশি-বিদেশি অস্ত্র। বিশেষ করে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে আওয়ামীলীগের সময়কার মহিলা মেম্বার কোহিনুরের ছেলে মোশাররফ হোসেন রনির বিরুদ্ধে। রনি আওয়ামীলীগের সময় যেমন সকল অপকর্ম করে বেড়াতেন, তেমনি এখনো সকল অপকর্ম করে বেড়ান। যুবলীগের এই ক্যাডার সবসময় আলমগীর সিদ্দিকীর সাথে থাকেন এবং ব্যাক্তিগত নিরাপত্তার জন্য অনেক সময় থাকেন বলে অনেকে জানান। রনির সাথে রয়েছে রনির আরো দুই ভাই। এদের আরেকজন হলো আনোয়ার হোসেন। ৫ আগস্টের পর আনোয়ার হোসেন অহরহ অপকর্ম আলমগীর সিদ্দিকীর নির্দেশে করেছে বলে অনেকে জানান। এখন নতুন করে যুক্ত হয়েছেন মাঈন উদ্দিন মামুন প্রকাশ ডাকাত মামুন। মামুন এরপূর্বে টিপু সম্রাটের অনুসারী ছিল বলে জানা যায়। এছাড়া আলমগীর সিদ্দিকীর বাহিনী হিসেবে উঠে এসেছে ফরহাদ নগরের বন্দুক বাহারের নামও। বন্দুক বাহার ঘোপালে গিয়েও ত্রাস সৃষ্টি করে।

ছাত্রলীগ-যুবলীগ থেকে আসা আলমগীর সিদ্দিকীর বাহিনীতে আরো রয়েছেন শুভপুরের যুবলীগ ক্যাডার ওসমান প্রকাশ ঠোঙ্গা ওসমান, আলমগীর হোসেন, ছোট বাদশা, বাসিক, মো. ইয়াসিন, শুভপুর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক মারুফ, টিলার সুমন, ডাবল রানা, লাল আরিফ, মিরসরাইয়ের বোমা ইদ্রিস, ফরহাদনগরের শাহাদাত, ম্ন্নুা, রাহিয়া, আরজু, তুহিন, জাহাঙ্গীর, মুরাদ, শাহেদ, গরু বেপারী ভুট্টো, পারভেজ, রুমা, নিজাম, রানা, ঘোপালের আলোকদিয়ার সুমন, ফরহাদ নগরের লালাচরের সুমন ও টাইগার সাইফুল। এরা সবাই ৫আগস্টের পূর্বে আওয়ামীলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল এবং এলাকায় অপকর্ম করে বেড়িয়েছেন বলে স্থানীয়রা নিশ্চিত করেন।
এছাড়া বিএনপি, ছাত্রদল-যুবদল থেকে রয়েছে সোহাগ, ছাত্রদল নেতা রানা মজলিস, ঘোপাল ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ-সম্পাদক রাকিব, ছাগলনাইয়া সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সাধারণ-সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমান, শুভপুরের নাজিম, ছোট নাজিম, রুবেল ও ইকবাল হোসেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছাগলনাইয়া উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতা ফেনীর সময়কে বলেন, “আলমগীর সিদ্দিকী যাদের নিয়ে নিজস্ব বাহিনী তৈরি করেছেন তারা আওয়ামীলীগের সময় বিএনপি নেতাকর্মীদের নির্যাতন করেছে, মারধর করেছে। খালেদা জিয়ার গাড়ী বহরে হামলা করেছে ও ৪ আগস্ট মহিপালের ঘটনায়ও তারা ছিল।”

এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি
হয়নি উপজেলা বিএনপি

আলমগীর সিদ্দিকীসহ দুই ইউনিয়নে দলটির বিভিন্ন নেতাদের অপকর্ম নিয়ে জানতে চাওয়া হলে এ বিষয় নিয়ে কথা বলতে রাজি হয়নি উপজেলা বিএনপির আহবায়ক নুর আহম্মদ মজুমদার ও সদস্য সচিব আলমগীর বি.এ। নুর আহম্মদ মজুমদার ফেনীর সময়কে বলেন, “এ মূহুর্তে এ বিষয়ে কথা বলতে চাই না এবং বলা ঠিকও না।” বিষয়টি এড়িয়ে আলমগীর বি.এ ফেনীর সময়কে বলেন, “ছাগলনাইয়ায় আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ। মজনু ভাই যে নির্দেশ দেয় সেটা আমরা পালন করি দলের স্বার্থে। আমাদের এমপি সাহেব সবকিছু মিলিয়ে আমাদের দলকে গোছাতে চায়। এটা উনার আশা-আকাঙ্খা।”

আলমগীর সিদ্দিকীর ভাষ্য

অনেকে হিংসার বশবর্তী হয়ে আমার পিছনে লেগেছে

আলমগীর সিদ্দিকী বলেন, “আমি ঘোপাল ইউনিয়নের সন্তান। আমাদের ফেনী জেলা বালু উত্তোলনের কোন ইজারা নেই। আলোকদিয়ার যে বিষয়টা বলছেন এটা মূলত মিরসরাই এর ধুম ইউনিয়নে পড়ছে। ধুম ইউনিয়নের একটা মৌজায় তারা দীঘি থেকে বালু উত্তোলন করে। সেখানে তারা দীঘিগুলো সংস্কার করতে গিয়ে মাটি পেলে দিতে হয়, তো সেখানে মাটি নেই। সেখানে মাটি মিশ্রিত বালু রয়েছে। সেখানে ৫০শতাংশ বালু ও ৫০শতাংশ মাটি। তো ওগুলা তারা বিক্রি করে বা কোথাও দিয়ে দেয়। আর নাঙ্গলমোড়া বালু উত্তোলনের বিষয়ে আমার জানা নেই। এছাড়া শুভপুর বালু মহালের যে বিষয়টা বলছেন, এটা ছাগলনাইয়া উপজেলার কোন অংশ না। এটা মিরসরাই উপজেলার করারহাট ইউনিয়নের জয়পুরের মৌজা। আমাদের ভূল ধরণা যে এটা আমাদের ফেনীর। এটা আসলে ফেনীর না। আর যে বালুগুলো মেশিনের মাধ্যমে সাহেবের হাটের দিকে তুলছে কয়েকটা স্তরে, এগুলা জব্দ করছে। এগুলা নিলাম হবে।”

তিনি বলেন, “আর ফেনী-১ আসনের কোন ফসলি জমি থেকে মাটিকাটা নিষেধ আছে। এটা মাননীয় এমপি রফিকুল আলম মজনু মহোদয়ের নির্দেশনা। আমাদের দলীয় নেতাকর্মীদের এ নির্দেশনা দেওয়া আছে।”

তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ প্রসঙ্গে আলমগীর সিদ্দিকী আরো বলেন, “স্বাভাবিকভাবে আমি যেহেতু উপজেলার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, ২৫বছর আমি উপজেলা বিএনপির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ছিলাম, সম্মেলনের মাধ্যমে নেতাকর্মীরা যদি আমাকে চায় তাহলে আমি উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হওয়ার ইচ্ছে আছে। যদি না হই আমি দলের কর্মী হয়ে কাজ করে যাবো। এখন অনেকে হিংসার বশবর্তী হয়ে আমার পিছনে লেগেছে। সে হিসেবে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিজ্ঞাপন

error: কন্টেন্ট সুরক্ষিত!!