আলী হায়দার মানিক : ফেনীতে সীমান্ত পথে বিজিবি ও পুলিশের চোখে ফাঁকি দিয়ে বস্তায় বস্তায় গান পাউডার যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জায়গায়। গান পাউডার গুলো বিভিন্ন বিস্ফোরক তৈরির উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়মিত কঠোর নজরদারি ও বিশেষ অভিযান পরিচালনা করার জন্য স্থানীয়রা দাবী জানান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, জেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় বিভিন্ন পণ্যের সাথে গান পাউডার আসার খবর ছড়িয়ে পড়ে। মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে সীমান্তে বিজিবির চোখে ফাঁকি দিয়ে এই গান পাউডারগুলো প্রবেশ করছে। বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে গান পাউডার সীমান্ত পথে প্রবেশ করছে বলে নাম প্রকাশে অনিশ্চুক একাধিক ব্যবসায়ী জানান। বিশেষ করে ফেনী সদর উপজেলার ধর্মপুর ইউনিয়নের সীমান্ত ও শর্শদি ইউনিয়নের মোহাম্মদ আলী বাজার এলাকা সীমান্ত, ছাগলনাইয়া উপজেলার সীমান্ত, ফুলগাজী ও পরশুরাম সীমান্ত পথে দেদারছে এসব গান পাউড়ার প্রবেশ করছে।
এছাড়াও দেশের অন্যান্য সীমান্ত পথে বিভিন্ন সময়ে সীমান্ত এলাকা থেকে অবৈধ অস্ত্র, মাদকদ্রব্য ও বিস্ফোরক তৈরির উপাদান জব্দ করা হলেও, এভাবে নির্বিঘ্নে বড় পরিসরে গান পাউডার জব্দ করা হয়নি। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন সীমান্ত পথে এসব গান পাউডার আসছে বলেও তথ্য রয়েছে। গান পাউডারগুলো কেজি প্রতি সর্বোচ্চ ৪৫-৫০হাজার টাকা ও সর্বনিম্ম ৩০-৩৫হাজার টাকা বিক্রি হচ্ছে বলেও একটি সূত্র জানিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিশ্চুক এক ব্যবসায়ী জানায়, ঢাকায় সাম্প্রতিক সময়ে যে বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। ওই বোমা তৈরির উপাদান চৌদ্দগ্রাম সীমান্ত দিয়ে আসা। এই গান পাউডার মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
অপর একটি সূত্র জানায়, ফেনী থেকে বিভিন্ন কুরিয়ার সার্ভিস ও যাত্রীবাহী বাসের মাধ্যমে গান পাউডারগুলো পাঁচার করা হয়ে থাকে। বিশেষ করে বাসের গদির নিচে রাখা হয়। অনেক সময় বস্তা ভর্তি চালের গুড়ার সাথে গান পাউডার পাচার করা হয়ে থাকে। অনেক সময় বস্তার উপরে বা ভিতরে প্লাস্টিকের ব্যাগেও গান পাউডার পাঁচার করা হয়। যা সরবরাহকারী ছাড়া অন্য কেউ বুঝার কোনো সুযোগ থাকে না।
ব্যবসায়ীদের আরেকটি সূত্র জানায়, রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন থেকে গান পাউডারের ব্যবসার সাথে অনেকে জড়িত হয়েছেন বলে জানান। অনেক সময় সিন্ডিকেটের কারণে তথ্য ফাঁস হয়ে যায়। প্রশাসনের চোখে ফাঁকি দিয়ে সুকৌশলে তারা এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি আরো জানান, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামীলীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা দেশে আসার ঘোষণা দেয়ার পর থেকেই গান পাউডার অবাদে আসা শুরু হয়েছে। যা প্রশাসন এখনো টের পায়নি।
অপর একটি সূত্র জানায়, ২০২৪সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় বারবার চেষ্টা করেও সীমান্ত পথে গান পাউডার আনতে ব্যর্থ হয়। তখন কেজি ১লাখ টাকা করে দেয়ার পরও গান পাউডার পায়নি। গান পাউডারের জন্য দেয়া অনেকের টাকাও পাওয়া যায়নি। তখন ভারত সরকার গান পাউডার বাংলাদেশে আসার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল।
নাম প্রকাশে অনিশ্চূক একাধিক ব্যক্তি জানান, মালামাল পাঠাতে নিরাপত্তা বেশি হওয়ার কারণে বেশিরভাগ সময় এস.এ পরিবহনে এই গান পাউডার পাঠানো হয়। কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ফেনীর সীমান্ত দিয়ে আসা গান পাউডার যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়।
আরেকটি সূত্র জানায়, বিরিঞ্চি, সহদেবপুর, পেট্রোল বাংলা, সুইমিং পোল, রেলস্টেশন এলাকা, মাস্টার পাড়ার বিভিন্ন পরিত্যক্ত বাসা-বাড়ি থেকে ককটেল ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম সাপ্লাই দেয়ার অভিযোগও রয়েছে। এছাড়াও মাস্টার পাড়ার বিভিন্ন পরিত্যক্ত জায়গায় বোমা তৈরির সরঞ্জামগুলো রাখা হয়।
ফেনী রেলওয়ে স্টেশন এলাকার এক বাসিন্দা জানান, ফেনী রেলওয়ে স্টেশনে প্রতিদিন অপরিচিত চেহারার মানুষ ঘুরাফেরা করতে দেখা যাচ্ছে। তারা অনেকক্ষণ ধরে দিকবিদিক চলাফেরা করে। এতে তাদের গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হয়। ফেনী রেলওয়ে এলাকা আওয়ামীলীগ অধ্যুষিত হওয়ার কারণে এখানে ঝুঁকি রয়েছে। প্রশাসনের নজরদারী বাড়ানো দরকার বলেও তিনি জানান।
জানতে চাইলে ফেনী ব্যাটালিয়ন (বিজিবি-৪) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসিবুল ইসলাম বলেন, সীমান্ত পথে গান পাউডার আসার খবর পাওয়ায় নজরদারী বাড়ানো হয়েছে। তবে ফেনী সীমান্ত পথে গান পাউডার আসছে এমন তথ্য আমাদের জানা নেই। উত্তরবঙ্গে সীমান্ত পথে আসছে বলে খবর শুনেছি। যেহেতু অভিযোগ পাওয়া গেছে আমরা সতর্ক থাকবো এছাড়াও টহল বিজিবির নজরদারী বাড়ানো হবে।
ফেনীর পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার বলেন, সীমান্ত পথে গান পাউড়ার আসছে এমন কোন তথ্য আমাদের জানা নেই। তবে অভিযোগ পাওয়া গেছে, আইনগত ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।