আলী হায়দার মানিক :
দাগনভূঞা উপজেলার পূর্ব চন্দ্রপুর মডেল ইউনিয়নের প্রতাপপুর জমিদার বাড়ি যেন ভুতুড়ে বাড়িতে পরিণত হয়ে উঠেছে। প্রায় ২৭ বছর আগে জমিদাররা এখান থেকে অন্যত্র চলে যায়। সেই থেকে সংস্কার ও পরিত্যক্ত বাড়ি হওয়ায় এটি অনেকটা জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে।
এলাকাবাসী জানায়, জৌলুস হারালেও ঐতিহ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রতাপপুর জমিদার বাড়ি। জমিদার বংশধররা জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পরও ২০০২ সাল পর্যন্ত এই জমিদার বাড়িটিতে ছিল। সরকারী ও বেসরকারীভাবে কোন উদ্যোগ না থাকায় ক্রমেই ঐতিহ্য হারাচ্ছে ফেনীর প্রতাপপুর জমিদার বাড়িটি। ঐতিহাসিক এ বাড়িটি সংস্কারহীনতায় জরাজীর্ণ হয়ে আগাছায় ভুতুড়ে বাড়িতে পরিণত হচ্ছে। তবে পর্যটক বান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতের জন্য সংস্কারের দাবী জানান দর্শনার্থীরা। যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো হওয়ায় বাড়িটি এক নজর দেখার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থী আসেন প্রতিদিনই। জমিদারদের রেখে যাওয়া নিদর্শনগুলো দেখতে আশপাশের জেলা ও উপজেলার মানুষও ভিড় জমান এ বাড়িতে। তবে নিরাপত্তা, শৌচাগার ও বৈদ্যুতিক বাল্ব না থাকায় সন্ধ্যার আগেই এ বাড়ি ছাড়তে হয় দর্শনার্থীদের। এছাড়াও দীর্ঘদিন সংস্কারহীনতা ও পরিচ্ছন্নতার কাজ না হওয়ায় এ বাড়িটি ক্রমেই ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। দ্রুত বাংলার জমিদারী প্রথার নিদর্শন হিসেবে বাড়িটি সংস্কার করে পর্যটন বান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার দাবী দর্শনার্থীদের।
পর্যটকরা জানায়, ভারত উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে ঐতিহাসিক ও প্রাচীন নিদর্শন। বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে পড়ে থাকা এসব ঐতিহাসিক নিদর্শনের মধ্যে প্রতাপপুর জমিদার বাড়ি অনেক গুরুত্ববহন করে। এখানকার দালান-কোঠা দেখতে অনেকটা নারায়নগঞ্জের পানাম সিটির মতই। যার কারণে কম সময়েই স্যোশাল মিডিয়া ও ইউটিউবে বাড়ির ঐতিহ্য শুনে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এখানে দর্শনার্থীরা ছুটে আসেন।
জানা যায়, বাংলা ১২২৮ সালের ১৩ ফাল্গুন রামনাথ কৃষ্ণ সাহা ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার পূর্বচন্দ্রপুর ইউনিয়নের প্রতাপপুর গ্রামে এ জমিদারবাড়ি নির্মাণ করেন। স্থানীয়দের কাছে এটি বড়বাড়ি ও রাজবাড়ি নামেই পরিচিতি। প্রায় সাড়ে ১৩ একর জায়গায় নির্মিত রাজপ্রসাদসম এ বাড়িতে রয়েছে ৫টি অভিজাত ডিজাইনের দ্বিতল ভবন। ওই ভবনে রামনাথসহ তারা ৫ ভাই পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। ঘরগুলোর চারপাশে খনন করা ১২টি পুকুরের স্বচ্ছ পানিতে জমিদাররা মাছ চাষ করতেন। পুকুরগুলোতে ৫টি দৃষ্টি নন্দন বৈঠকখানা বেষ্টিত ঘাটলায় জমিদারদের ৫ পরিবারের বউ-ঝিরা গোসল ও গল্প করতেন। জমিদারী আমলে দেশ ও বিদেশের অন্যান্য জমিদাররা এ বাড়িতেই সফর বিরতি করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন।
স্থানীয়রা জানান, এক সময়ে মাঠের ধানে ভরে যেত জমিদার বাড়ির উঠান, গোলা আর কাচারি ঘর। ধান উঠানো শেষে শুষ্ক মৌসুমে সেই জমিতে চাষ হতো সরিষা, মটরশুটি, খেসারি, কলাই ও মুসরিসহ বিভিন্ন রবি শস্য। ঘোড়ায় চড়ে জমিদাররা যাতায়াত করতেন এবাড়ি-ওবাড়ি। সিন্দুরপুর ও রাজাপুর এলাকায় পরিষদ ভবনে বসে ১০ তালুকের খাজনা আদায় করতেন তারা। সেই খাজনা জমা দিতেন সরকারি কোষাগারে। এ জমিদার বাড়ির ইশারায় ওঠবস করত আশপাশের এলাকার মানুষ।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ওই বাড়িতে ঢুকতেই নজরকাটবে একতলা ও দোতলা ভবনের কাচারি ঘর। তার একটু সামনেই রয়েছে ছোট্ট একটি ঠাকুর ঘর। পাশেই পুকুর পাড়ে স্থাপিত ভাঙ্গাছোরা বৈঠক খানা ও ঘাটলা। সামনে তাকালে দুটি দৃষ্টি নন্দন দালান। ওই দালানের মাঝ দিয়ে সরু গলি ফেরুলেই দেখা মেলবে একটি বড় উঠান। উঠানের তিন পাশে দাঁড়িয়ে আছে ৫টি তৎকালীন সময়ের অভিজাত দালান। তার আশপাশেই রয়েছে ইট, সুরকি ও রড দিয়ে তৈরী আরো কয়েকটি দালান। এসব দালানের দেয়াল খসে গেছে অনেক জায়গায়। ইটের স্তর ভেদ করে কোথাও গজিয়ে গেছে পরজীবি গাছ। কোনো কোনো ভবনের উপরিভাগ ক্ষয়ে গেছে সেই অনেক আগেই। শেওলা জমে গেছে কোনো কোনো জায়গায়। সিলিং লোহার এইচ বীমের ওপর স্তম্ভ, খিলান দেয়াল সবই ইট আর সুরকির স্বল্প আয়ুর চিহ্ন বহন করে চলেছে। যে কোনো সময় ভেঙে পড়ে প্রাণহানীর ঘটনাও ঘটতে পারে এখানে।
পর্যটক মিন্টু চন্দ্র দেবনাথ জানান, জমিদার বাড়ি সম্পর্কে বাবা ও দাদার কাছ থেকে শুনে আগ্রহ সৃষ্টি হয় একনজর দেখার জন্য। সেই হিসেবে আমরা ৯ বন্ধু মিলে এসেছি দেখার জন্য। নির্জন এলাকা হলেও খুব ভালোই লাগছে। বিদ্যুতের ব্যবস্থা না থাকায় সন্ধ্যার আগেই পর্যটকদের ওই এলাকা ত্যাগ করতে হয়। বাড়িটি সংস্কার করে এখানে পর্যটন বান্ধন পরিবেশ গড়ে তোলা হলে এলাকা আলোকিত হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা এস এম ইউসুফ আলী জানান, প্রতিদিন এখানে পর্যটকরা ভিড় করেন। পরিত্যক্ত বিল্ডিংগুলোর ছাদে ওঠে যে আনন্দ উপভোগ করেন সেটা কিন্তু ভয়ংকর। যে কোন সময় ভেঙ্গে পড়ে বিপদ ঘটতে পারে। এজন্য পরিত্যক্ত বিল্ডিংগুলো সিঁড়ি খুলে পেলা হলে ভালো হয়। তাহলে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা ওপরে উঠতে পারবে না। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সচেতনতামূলক লিখা টাঙ্গিয়ে দেয়া যেতে পারে যে ঘুরে দেখা যাবে কিন্তু ছাদে ওঠা যাবে না। তবে এটি সংরক্ষন করা প্রয়োজন।
এ ব্যাপারে দাগনভূঞা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা স. ম. আজহারুল ইসলাম জানান, ‘আমি নিজে সেখানে একাধিকবার পরিদর্শন করেছি। মালিক পক্ষ আগ্রহ প্রকাশ করলে উপজেলা প্রশাসন উর্ধ্বতন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ করে সংস্কারের ব্যাপারে আগ্রহী রয়েছেন। জায়গাগুলো ব্যক্তি মালিকানাধীন। তবে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো আশপাশের স্কুল-মাদরাসা পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা গিয়ে উপরে ওঠে যায়। যে কোন মুহুর্তে বড় ধরনের বিপদ হতে পারে। সেই হিসেবে স্থানীয়দের দাবীর প্রেক্ষিতে সংস্কার করা জরুরী বলে তিনি মনে করেন’।
ফেনী রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি ও দৈনিক ফেনীর সময় সম্পাদক মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘দাগনভূঞা জাতীয় পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনপদের নাম। এখানে ভাষা শহীদ আবদুস সালামসহ অনেক গুণী জনের জন্মস্থান। জমিদার বাড়িটি ইতিহাসে একটি অংশ। চারিদিকে জঙ্গলে ঘেরা পরিত্যক্ত ও ভূতুড়ে বাড়ি হিসেবে পড়ে না থেকে সরকার ও জমিদারদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে উঠতে পারে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা। এলাকাবাসীর সহযোগিতায় মালিক পক্ষের সাথে জেলা প্রশাসন যোগাযোগ করে এটি সংরক্ষণ করা দরকার বলে স্থানীয়দের প্রাণের দাবী বলেও তিনি জানান’।
ফেনীর স্থানীয় সরকার উপপরিচালক গোলাম মো: বাতেন বলেন, ‘সরকারের প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর চাইলে অধিগ্রহণ করে রেট্রিটিং প্রক্রিয়া করে এটিকে আগের জায়গায় নিয়ে আসা যাবে। তাহলে ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হবে। নতুন প্রজন্মকে জমিদারী প্রথার আভিজাত্য ও অভিশাপ সম্পর্কে বাস্তব চিত্র দেখার জন্য এটি সংরক্ষণ করা যেতে পারে। তবে খবর নিয়ে জানা গেছে এটি ব্যক্তি মালিকানায় রয়েছে। সেই হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু করার সুযোগ নেই। উভয় পক্ষ মিলিত হয়ে সংরক্ষণ করার ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহন করা হবে’।
ফেনী জেলা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম জানান, ‘ইতিহাস ঐতিহ্য সংরক্ষণের মাধ্যমে এ জনপদ সমৃদ্ধ করার বিষয়ে জেলা প্রশাসন আন্তরিক। আমি নিজে সেখানে যাবো। প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর ও জমিদার বাড়িটির উত্তরসূরিদের সাথে আলাপ-আলোচনা করে দেখা যাক ওই স্থানে কিছু একটা করা যায় কিনা।যেহেতু দীর্ঘ প্রায় ২৭ বছর ধরে সেখানে জমিদার পরিবারের উত্তরসূরিরা বসবাস করছেন না, সেখানে তারা আর ফিরে আসবেন কিনা কিংবা বসবাস করবেন কিনা -সেটা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। সংস্কারের মাধ্যমে সেখানে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। জমিদার বাড়িটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে সংস্কার করতে পারলে এলাকাটি সমৃদ্ধ হবে বলেও তিনি মনে করেন’।