স্বাধীনতা সৃষ্টির প্রতি স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। পৃথিবীতে যত প্রাণী আছে সকলেই স্বাধীনভাবে চলতে চায়। পরাধীনতাকে কেউ পছন্দ করে না। সকল প্রাণী চায় নির্বিঘ্নে, নিশ্চিন্তে ও অবাধে যেথায় ইচ্ছা সেথায় স্বাধীনভাবে চলা ফেরা করতে। নির্বোধ পাখি বা পশুকে পর্যাপ্ত খাদ্য সামগ্রী দিলেও খাচায় বন্ধি থাকতে চাইবে না। সুযোগ পেলে চলে যাবে। পশুরা বন-জংগলে স্বাধীনভাবে অন্যান্য পশুদের সাথে ঘুরতে এবং পাখিরা আকাশে মুক্তভাবে উড়তে পছন্দ করে। কোন পশু-পাখিই বন্দি জীবন ও পরাধীনতা পছন্দ করে না
স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া জুলুম : স্বাধীনতা এমন সম্পদ যার কোন তুলনা হয় না, অর্থ দিয়ে কেনা যায় না, বিনিময় দিয়ে লাভ করা যায় না। বলা হয়ে থাকে “আল হুররিয়াতু গালিয়া” স্বাধীনতা অমূল্য সম্পদ। প্রত্যেক প্রাণীই জন্ম সূত্রে স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীনতা সকলের মৌলিক অধিকার। এ অধিকার কেড়ে নেয়া জুলুম এবং মহা অন্যায়। বিশেষ করে সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের জন্যে স্বাধীনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিহার্য বিষয়।
স্বাধীনতা ও দেশ প্রেম : দেশের সাথে দেশের নাগরিকদের রয়েছে গভীর সম্পর্ক। দেশের স্বাধীনতা হরণ হলে, নাগরিকদের স্বাধীনতাও বিনষ্ট হয়ে যায়। দেশ ভাল থাকলে নাগরিক ভাল থাকে। একজন নাগরিকের জন্য তার দেশ বড় নেয়ামত। সে অন্তর দিয়ে ভালবাসে তার দেশকে । কবির ভাষায়- “স্বদেশের উপকারে নেই যার মন / কে বলে মানুষ তারে, পশু সেই জন।” বলা হয়ে থাকে ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়। দেশ বাঁচলে নাগরিক বাঁচবে। দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে নাগরিক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সুতরাং একজন নাগরিকের কাছে দেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মহানবী (স) এর মধ্যে দেশ প্রেম ছিল সবচেয়ে বেশী। তাই তিনি মক্কা নগরী ছেড়ে ইয়াসরাবে (মদীনা শরীফের পূর্বের নাম) যাওয়ার সময় নয়নের বারি নির্গত করে বার বার মক্কা শরীফের দিকে ফিরে তাকিয়ে ছিলেন, আর বলছিলেন- হে মক্কা! আমি চেয়েছিলাম তোমার কাছে থাকতে, কিন্তু তোমার বাসিন্দারা আমাকে থাকতে দেয়নি।
স্বাধীনতা না থাকা অশান্তির কারণ : বর্তমানে পৃথিবীর কোথাও কথা, কাজ, চলাফেরা, রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি ইত্যাদিতে কোনো স্বাধীনতা নেই। পৃথিবীতে অশান্তির প্রধান কারণ হলো স্বাধীনতা হরণ করা। সকলকে যদি স্বাধীনভাবে সরল পথে চলতে এবং বৈধ কাজ করতে অনুমতি দেয়া হয়, তবে পৃথিবী স্বর্গে পরিণত হবে। কোথাও কোন অশান্তি ও বিশৃংখলা থাকবে না। মানুষকে ন্যায় কাজে স্বাধীনতা দিলে অন্যায়-অবিচার দূরীভূত হবে। মানুষ অন্যায় পš’া অবলম্বন করবে না, অন্যায় পথে চলবে না। পৃথিবীতে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালনের পরিবর্তে চলছে, শিষ্টের দমন ও দুষ্টের লালন।
আমাদের স্বাধীনতার সূচনা : কোন ঘটনা একদিনে ঘটেনা। বরং তার জন্য পূর্ব থেকে পরিকল্পনা থাকতে হয়। আমাদের বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা হয় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। বাংলাদেশীদের উপর উর্দু ভাষা চাপিয়ে দেয়ার ঘৃণ্য প্রচেষ্টার ফলে বাংলাদেশীরা বুঝতে সক্ষম হয় যে, পাকিস্তানীরা তাদের আপন নয়। ফলে বাংলাদেশীদের মনে বিভাজনের রেখাপাত সৃষ্টি করে। তারা পর্যায়ক্রমে ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ১১ দফা আন্দোলন ও ’৬৯ সালের গণ অভ্যুত্থানে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে জয়লাভ করার পর পাকিস্তানী শাসকচক্র বঙ্গবন্ধুর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি; বরং বাংলাদেশীদের উপর চালায় অত্যাচারের ষ্ট্রীম রোলার।
বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতা : বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে এবং জেনারেল এম আতাউল গণি ওসমানীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের ১১টি সেক্টর। প্রত্যেকটি সেক্টরের নেতৃত্ব দেন বীর বাঙ্গালীর দামাল ছেলেরা। তাদের সাহসী প্রাণের গর্জনে কেঁপে ওঠে পাক বাহিনীর হৃদয়। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর অর্জিত হয় মুক্তির লাল সূর্য, স্বপ্নের স্বাধীনতা, প্রাণ প্রিয় লাল সবুজের পতাকা। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষিত হলেও বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন ছাড়া স্বাধীনতা অসম্পূূর্ণ রয়ে যায়। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারী বঙ্গবন্ধুর দেশের মাটিতে পা রাখার পরেই দেশের স্বাধীনতা পূর্ণতা লাভ করে।
স্বাধীনতা লাভ : বাংলার মানুষ পাক হানাদারদের অত্যাচারে ভীত হয়নি। তারা দুর্বার গতিতে যুদ্ধ করতে থাকে। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে গঠিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার। ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। আমরা এখন স্বাধীন দেশের নাগরিক। যার নেতৃত্বে, যাদের প্রচেষ্টায় অর্জিত হয়েছে এ স্বাধীনতা তাদেরকে ভুলা যাবে না কখনো। তাদের ত্যাগ স্বীকার করতে হবে, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে এবং মহান প্রভূর কাছে তাদের উচ্চ মর্যাদার জন্য দোয়া করতে হবে। মহানবী (স) বলেছেন যে ব্যক্তি মানুষের শুকরিয়া আদায় করে না, সে আল্লাহ শুকরিয়াও আদায় করে না। স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে রক্ষা করা কঠিন। এখন থেকে ৪৭ বছর পূর্বে আমরা স্বাধীনতা লাভ করলেও, স্বাধীনতার সুফল লাভ করতে পারিনি। আমাদের পরে স্বাধীন হয়েও অনেক দেশ উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে গিয়েছে। কারণ আমরা দূর্নীতি, ঘুষ, অন্যায়, অনাচার, অবিচার, ইত্যাদিতে ডুবে রয়েছি। আমাদের মধ্যে সততা, ন্যায় নিষ্ঠা, দেশপ্রেম, পারস্পরিক ভালবাসা ইত্যাদির রয়েছে যথেষ্ট অভাব। স্বাধীনতার সুফল পেতে হলে দেশ থেকে দূর্নীতি, ঘুষ, অন্যায়, অনাচার, অবিচার ইত্যাদি দূর করতে হবে। আর এ কাজের জন্য দরকার সোনার মানুষ। সোনার মানুষের পক্ষেই সম্ভব সোনার বাংলা গড়ার। যাদের মধ্যে থাকবে দেশপ্রেম, সততা, ন্যায়-নীতি ও পারস্পরিক ভালোবাসা।
লেখক : প্রধান ফকীহ, আল জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদ্রাসা, ফেনী।