মার্চ ৬, ২০২৬ ১৭:৩৬

লাগামহীন, বেপরোয়া দলবাজী নেতৃত্ব নিয়ন্ত্রনের পথ কোথায়

চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর জেরে প্রকাশ্য দিবালোকে রাজনৈতিক পরিচয়ধারী কতিপয় সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসীচক্র রাজধানী ঢাকার ব্যাস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা মিটফোর্ডের রাস্তায় ব্যবসায়ীকে ভারী পাথর দিয়ে আঘাত করে হত্যার ঘটনায় জাতি হতবাক, মর্মাহত ও আতংকিত। হত্যাকান্ড সংগঠিত হবার দুইদিন পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইচবুকে প্রকাশিত নারকীয় দৃশ্য বর্বরতার এক নিকৃষ্ট উদাহরণ হয়েই ধরা দিয়েছে। বিশালাকার সিমেন্টের ব্লক দিয়ে বারকতক আঘাত করে ও মাথা থেতলে দিয়ে জঘন্য সীটগুলো ক্ষান্ত হয়নি মৃতের বুকের উপর লাপিয়ে দাপিয়ে নিশ্চলভাবে স্থান ত্যাগ করেছে।

গত শুক্রবার ১০ জুলাই ফেইচবুকে প্রকাশিত হবার পর জাতি জানলো। এরপর প্রশাসনে টনক নড়লো। রাজনীিিতবদরা সরব হলেন। রাতের আঁধার ফুটো করে ছাত্র, যুব বিভিন্ন সংগঠন প্রতিবাদী মিছিলে প্রকম্পিত করলো রাজপথ। যে রাজনৈতিক দলের পরিচয় বহন করে যে সকল দানবেরা এই বর্বরতা করেছে তাদের ছাত্র সংগঠনের ব্যানারেও ‘বিচার চাই’ প্রতিবাদী মিছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সত্যিকারের বিচার চেয়েছে নাকি শক্তিমত্তার উপস্থিতি জানান দিয়েছে, সে প্রশ্ন সচেতন মহলে।
প্রশ্ন হলো মৃত সোহাগের লাশ দুইদিন কোথায় ছিলো? পুলিশ, গোয়েন্দা দপ্তর নিশ্চুপ ছিলো কেন? কেন কোন মিডিয়া জানতে পারলোনা? নাকি সবকিছু রাজনৈতিক চাপ ও প্রভাবের জোরে দামাচাপা দেয়ার চেষ্টার ফল। সর্বস্তরের সচেতন মহলকে ভাবিয়ে তুলেছে এই হত্যাকান্ড। মির্টফোট হত্যাকান্ড আর দশটি হত্যাকান্ডের মত নয়। এই হত্যাকান্ডের বীভৎসতা বলে দেয় বাংলাদেশ নামক রাস্ট্রের শাসন ব্যবস্থা কতখানি ভংগুর এবং অকার্যকর।

গতকাল শুক্রবার আরো একটি চাঞ্চল্যকর ও লোমহর্ষক সংবাদ জাতি দেখেছে। সেটি হলো খুলনায় যুবদলের সাবেক বহিঃস্কৃত এক নেতাকে নিজ বাসার সামনে গুলি ও পায়ের রগ কেটে হত্যা করেছে দুবৃত্তরা। নিহত যুবদল নেতা গত মার্চে কুয়েট আন্দোলনের সময় বিশাল রামদা হাতে সাধারণ ছাত্রদের বীরুদ্ধে স্বসস্র নেতৃত্ব দিচ্ছিলো। ঐ ঘটনার জেরে তাকে বহিস্কার করা হয়।

জুলাই বিপ্লবের শরীক বিএনপি ও তার অংগ সংগঠন বিশেষ করে ছাত্রদল যুবদল বিপ্লব বিজয়ের অব্যাবহতি পর থেকেই চর দখলের মত হাঁট-বাজার, অফিস-আদালত, শিক্ষাঙ্গন, বাস স্ট্যান্ড, নদীবন্দর সর্বত্র নিয়ন্ত্রণহীন গতিতে আধিপত্য বিস্তারের নেশায় উন্মত্ত হয়ে উঠে। এই আধিপত্য বিস্তারের খেলায় ঘটছে হামলা, মারামারি, রক্তপাত, খুনোখুনি। তাদের অনেকেই প্রকাশ করেছে তারা ১৭ বছরের অভুক্ত। এখন তাদের সর্বগ্রাসী ক্ষুধার জ্বালার কাছে আইন-প্রশাসন কোন কিছুই যেন পাত্তা পাচ্ছেনা। চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও পটিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ইদ্রিচ মিয়ার একটি বক্তব্য তারই প্রমান বহন করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখাযায়, তিনি অধীনস্হ নেতাকর্মীদের বলছেন- ঐক্যবদ্ধ হলে প্রশাসন বাধ্য হবে বিএনপির কথা শুনতে। হয় বিএনপির কথা শুনবে, না হয় এখান থেকে ইএনওগিরি-ওসিগিরি ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে যেতে হবে। তাদের আর সুযোগ দেওয়া যাবে না, অনেক সুযোগ দিয়েছি। এখন আর সুযোগ দেওয়ার সময় নেই। এখন আমাদের দাবি আমাদের আদায় করে নিতে হবে।’কুমিল্লার মুরাদনগরের ধর্ষণকান্ড এবং বিবস্ত্র করে ভিকটিম নারীর ভিডিও প্রকাশ। এরকম অসংখ্য ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ পত্র-পত্রিকায় উঠে আসছে।

বগুড়ায় সপ্তম শ্রেণীতে পড়ুয়া নাবালিকা মেয়েকে বিয়ে দিতে রাজি না হওয়ায় রিকশাচালক বাবাকে তুলে নিয়ে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতার বিরুদ্ধে। হতভাগ্য রিকশাচালকের নাম মো. শাকিল মিয়া (৩২)। তাঁর বাড়ি শহরের শিববাট্টি এলাকায়। এ ঘটনায় অভিযুক্ত জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা জিতু ইসলাম এবং তাঁর সহযোগী মতিউর রহমানকে আটক করেছে পুলিশ।

জুলাই আন্দোলনের মূখ্য স্বমন্বয়করা সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় এনসিপি নামক দল গঠন করে জাতিকে আশা জাগানিয়া গল্প শোনাতে চায়। মব তান্ডবের উসকে দেয়া এই বিপ্লবীদের পদাঙ্ক অনুসৃত মব সন্ত্রাস দেশে চরম নৈরাজ্য তৈরি করেছে। এনসিপির অসংখ্য নেতাকর্মীর বীরুদ্ধে চাঁদাবাজি, নিয়োগ-বাণিজ্য, ভয়ভীতি প্রদর্শন, সরকারী-বেসরকারী দপ্তরে চাপ প্রয়োগ, এমনকি নারী কেলেংকারীরমত ঘটনায় মানুষকে বিস্মিত এবং হতাশ করেছে। মানুষের আশা জাগাবার, ন্যায়ের লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়ার ভরসাস্থল সেই তিমিরেই গ্রোথিত থেকে যাচ্ছে।

গত জুলাই বিপ্লবের পর থেকে দলীয় শৃঙ্খলা ভংগের কারণে বিএনপির প্রায় সাড়ে চার হাজার নেতা কর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছে মর্মে দলের পক্ষ থেকে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। রুহল কবির রিজভীসহ দলের সিনিয়র নেতাদের অনেকেই বহিষ্কারের তথ্য তুলে ধরেছেন। কিন্তু এই বহিষ্কারের সুফল কোথায়? বহিস্কৃতরা পদ হারালেও দলের কর্মকান্ডে যেমন জড়িত থাকছে একই ভাবে দলীয় পরিচয়ের লেভাসে দখলবাজি, চাঁদাবাজিসহ অপকর্ম ঠিকই চালিয়ে যাচ্ছে।

রাজনীতির ছত্রচ্ছায়ায় সেবকের মুখোশে কুৎসিৎ দানবেরা আশ্রয় গেঁড়ে ঝেঁকে বসেছে ভিত্ত বৈভবের মোহে। রাজনীতিকে অর্থভিত্তের সুদৃঢ় সিঁড়ি করে তরতর করে উপরে উঠতে তৎপর এই সকল হায়েনার দল। মোদ্দা কথা এদের কোন নীতি নেই, আদর্শ নেই। এদের নেতারাও নীতি আদর্শের বাণী কবজ যা কিছু সব মুখ বরাবর, ভিতরে ভিতরে তদবির বাণিজ্য চাঁদাবাজীর কারবারি। আর এসব চালাতে লাগে সংঘবদ্ধ পেশীবাজ চক্র। রাজনীতি এখন এমন যায়গাতেই আটকা পড়েছে।

দেশে কি কখনোই সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবেনা? সুশাসন কি কেবলই বক্তৃতা, বিবৃতি আর মলাট বদ্ধ বইয়ের পাতায় সজ্জিত হয়ে বইয়ের তাত্বিক গুরুত্ব বাড়াবে? প্রাচীন পুঁথি শ্লোকে যেমন বলা হয়েছে, যে যায় লঙ্কায় সে-ই হয় রাবণ। বাংলাদেশের মানুষের জীবনে কেবল আন্দোলন, সংগ্রামের হাতছানি। ন্যার্য্যতার আন্দোলন, সমতার আন্দোলন, ন্যায় বিচারের আন্দোলন, ভোটাধিকারের আন্দোলন, সুশাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, ক্ষমতার পালাবদলের আন্দোলন। নানান রং ও বৈচিত্র্যপূর্ণ শব্দে, ভাষায় আন্দোলনের চরিত্র তৈরি হয়।

মানুষ কেবলই সুখ, শান্তির আশায় একেক সময় স্বৈরাচারী সরকার বদলের আন্দোলন করবে আর জুলুমবাজ সরকার পতনের পর তৈরি হতে থাকবে আরেক নিয়ন্ত্রণহীন জুলুমবাজ শ্রেণি? এ-ই কি বাংলাদেশের মানুষের নিয়তি হয়ে থাকবে?

সচেতন সাধারণ মানুষ রাজনীতির প্রতি ভীতসন্ত্রস্ত। শিক্ষা, গবেষনা, পরমতসহিষ্ণুতা এবং মেধা ও বুদ্ধি ভিত্তিক রাজনৈতিক চর্চাহীন রাজনীতি মানুষকে ভরসা জাগাতে পারছেনা। এখন মাস্তানি এবং পেশীবাজিত্বের চোরাবালিতে আটকে পড়েছে রাজনীতি। এই ভংগুর পরণতি থেকে শিক্ষা, গবেষণা, মেধা ও বুদ্ধি ভিত্তিক রাজনৈতিক চর্চার পথ সুগম করতে রাজনীতিবিদদের ঐক্য ভিন্ন কোন বিকল্প নাই।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিজ্ঞাপন