মার্চ ৬, ২০২৬ ১৭:৫৬

আল কুরআনের আলোকে রাসূল সা. এর জীবন

(পর্ব- ১)

এ পৃথিবীর স্রষ্টা একমাত্র আল্লাহ তা’য়ালা। তিনি এ পৃথিবীকে সাজিয়েছেন তাঁর অসংখ্য সৃষ্টির দ্বারা। এসব সৃষ্টির সেরা সৃষ্টি হলো মানুষ। এ মানুষ থেকেই সৃষ্টি করেছেন সেরাদের সেরা অসংখ্য নবী-রাসূল। তাঁরা আল্লাহ তা’য়ালা কর্তৃক মনোনীত। তাঁদের জীবন-ব্যবস্থা ওহী দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তাঁদের শিক্ষক স্বয়ং আল্লাহ তা’য়ালা। আর তাঁরা হলেন উম্মতের শিক্ষক। তাঁদের জীবন চরিত উম্মতের জন্য হিদায়াতের আলোক বর্তিকা। এ হিসেবে সাইয়্যেদুল মুরসালিন, রাহমাতুললিল আলামিন, খাতামুন নাবিয়্যিন, বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সা.’র জীবন চরিত উম্মতের জন্য অনুকরণীয় মডেল। কেননা, পবিত্র কুরআন ও ইসলাম তাঁর জীবনের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। তাঁর জীবন চরিত জানা ব্যতীত কুরআন ও ইসলাম সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞানলাভ করা সম্ভব নয়।

জন্ম : আরবদের নিকট একটি স্মরণীয় বছর হলো আমুল ফীল তথা হস্তির বছর। তারা বলতো আমুল ফীলের দু’বছর পূর্বে অমুকের জন্ম হয়েছিল, অমুকের বিয়ে হয়েছিল, আমুল ফীলের দশ বছর পর অমুক ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। আমুল ফীল হলো ঐ বছর যে বছর বাদশাহ আবরাহা হস্তি বাহিনী নিয়ে আল্লাহর ঘর ধ্বংস করতে এসেছিল। যার বর্ণনা রয়েছে সূরা ফীলে। আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেন- আপনি কি দেখেননি যে, আপনার রব হস্তি অধিপতিদের কিরূপ (পরিণতি) করেছেন? তিনি কি তাদের চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেননি? আর তিনি তাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেছেন ঝাঁকে ঝাঁকে পক্ষীকূল। যারা তাদের উপর প্রস্তর কংকর নিক্ষেপ করেছে। অতঃপর তিনি তাদেরকে ভক্ষিত তৃণ সদৃশ করে দিয়েছেন (সূরা ফীল- ১-৫)।

এ ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হওয়ার ৪০ দিন পর ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার বিশ্বনবী সা. জন্মগ্রহণ করেন। নাম: মহানবী সা. মুহাম্মদ ও আহমদ এ দু’নামে সর্বাধিক পরিচিত। দুনিয়াবাসী রাসূল সা. কে চিনে মুহাম্মদ নামে, যে নাম রেখেছেন তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব। কুরআন মজীদে মুহাম্মদ সা. এ নামটি শুধুু চেনার জন্য চার জায়গায় উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা আলে ইমরান’র ১৪৪ নং আয়াতে, সূরা আহযাব’র ৪০ নং আয়াতে, সূরা মুহাম্মদ’র ২ নং আয়াতে এবং সূরা আল ফাতাহ্’র ২৯ নং আয়াতে। আর পূর্ববর্তী আসমানী গ্রন্থে তিনি আহমদ হিসেবে পরিচিত, যা উল্লেখ করা হয়েছে সূরা আস সফ’র ৬ নং আয়াতে।

মুহাম্মদ অর্থ প্রশংসিত, আর আহমদ অর্থ প্রশংসাকারী। আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর প্রিয় হাবীবকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ছদ্ম নামেও ডেকেছেন। যেমন- হে কম্বল আচ্ছাদিত! (সূরা মুদ্দাচ্ছির-১), হে বস্ত্রাবৃত! (সূরা মুযযাম্মিল-১) ইত্যাদি।

জাতির পিতার দু’আর ফসল : মহানবী সা. হলেন- মুসলমানদের জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম আ. ’র দু’আর ফসল। হযরত ইব্রাহিম আ. দু’আর করে ছিলেনÑ হে আমাদের রব! তাদের (বংশের) মধ্য থেকেই তাদের জন্য এমন একজন নবী প্রেরণ করুন, যিনি তাদেরকে আপনার আয়াতসমূহ পাঠ করে শুনাবেন, তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দিবেন এবং তাদেরকে পবিত্র করবেন। নিশ্চয়ই আপনি পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময় (সূরা বাকারাহ- ১২৯)।

শিশুকাল : মহানবী সা.’র জন্মের কয়েক মাস পূর্বে তাঁর পিতা আবদুল্লাহ ইন্তিকাল করেন এবং জন্মের ছয় বছর পর মাতা আমিনা ইন্তিকাল করেন। অতপর তিনি হয়ে যান পিতা-মাতা হীন একজন অসহায় শিশু। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন- হে রাসূল! আল্লাহ তা’য়ালা কি আপনাকে এতীম অবস্থায় পাননি? অতঃপর তিনি আপনাকে আশ্রয় দান করেছেন। তিনি কি আপনাকে পথ হারা পাননি? অতপর সৎপথের সন্ধান দিয়েছেন। তিনি কি আপনাকে সহায় সম্বলহীন অবস্থায় পাননি? অতপর তিনি অভাবমুক্ত করেছেন (সূরা আদ দুহা-৬-৮)।

আনুগত্যের স্বীকৃতি : আমাদের প্রিয়নবী সা. কে প্রেরণের পূর্বেই আল্লাহ তা’য়ালা সমস্ত নবী-রাসূল থেকে তাঁর আনুগত্যের স্বীকৃতি নিয়েছেন। আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেনÑ আর আল্লাহ যখন নবীগণের কাছ থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন যে, আমি তোমাদেরকে গ্রন্থ ও জ্ঞান-বিজ্ঞান দান করার পর তোমাদের সঙ্গে (ওহীর জ্ঞান) যা আছে তার সত্যতা প্রত্যায়নকারী একজন রাসূল (মুহাম্মদ সা.) আগমন করবে, তখন তোমরা অবশ্যই তার প্রতি বিশ্বাস ¯’াপন করবে এবং তার সাহায্যকারী হবে। তিনি আরো বলেন, তোমরা কি এতে স্বীকৃত হলে এবং প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করলে? তারা বলেছিল- আমরা স্বীকার করলাম। তিনি বললেন, তাহলে তোমরা সাক্ষী থেকো, আমিও তোমাদের সাথে (এ অঙ্গীকারে) সাক্ষী হয়ে রইলাম (সূরা আল-ইমরান-৮১)। এ আয়াত দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, শেষ নবীকে যারাই অমান্য করবে তারাই আল্লাহর অবাধ্য এবং আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করার দায়ে দোষী হবে (তাফসীর ফি যিলালিল কুরআন)।

পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবে তাঁর স্বীকৃতি : পূর্ববর্তী সকল আসমানী কিতাবে শেষ নবীর স্বীকৃতি রয়েছে। সকল নবী-রাসূল তাদের উম্মতকে শেষ নবীর আগমন বার্তা দিয়েছেন এবং তাঁর গুণ বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ তা’য়ালা বলেন- যারা উম্মি রাসূলের আনগত্য করছে তারা(ইহুদী ও খ্রীষ্টানগণ) তাঁর বর্ণনা নিজেদের কাছে (বিদ্যমান তাওরাত ও ইঞ্জিলে) লিখিত পাচ্ছে (সূরা আরাফ -১৫৭)। আমাদের নবীর পূর্বে প্রেরিত হয়েছেন হযরত ঈসা আ.। তিনি তাঁর উম্মতকে শেষ নবীর আগমন বার্তা দিয়েছেন। স্মরণ কর, যখন মরিয়ম তনয় ঈসা আ. বলল- হে বনী ইসরাঈল! আমি তোমাদেরকে এমন একজন রাসূলের সুসংবাদ দিচ্ছি যিনি আমার পরে আগমন করবেন। তাঁর নাম মুহাম্মদ (সূরা আসসাফ-৬)।
আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত : নবী-রাসূলগণ আল্লাহ তা’য়ালা কর্তৃক মনোনীত। কেউ নিজের প্রচেষ্টায় নবী-রাসূল হতে পারেনা। আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেন আল্লাহ ফিরিশতা ও মানবকুল থেকে রাসূল মনোনীত করে থাকেন (সূরা আল হাজ-৭৫)। আরো ইরশাদ করেন অবশ্যই তাঁরা ছিল আমার মনোনীত উত্তম বান্দাদের অন্তর্ভ্;ূক্ত (সূরা ছোয়াদ -৪৭)। অন্যত্র ইরশাদ করেনÑ আর আল্লাহ তাঁর রিসালাতের ভার কার ওপর অর্পণ করবেন তা তিনিই ভালো জানেন (সূরা আল- আনয়াম: ১২৪)। আর এমন কোনো জাতি নেই যাদের কাছে সতর্ককারী বা ভীতি প্রদর্শক প্রেরিত হয়নি (সূরা আল-ফাতির: ২৪)। আরো ইরশাদ করেন আর প্রত্যেক উম্মতের জন্যই রয়েছে রাসূল (সূরা আল ইউনুছ: ৪৭)। আরো ইরশাদ করেন আর প্রত্যেক জাতীর জন্য একজন পথ প্রদর্শক রয়েছে (সূরা রাদ-৭)।

আল্লাহর ভাষ্যকার : মহানবী সা. নিজের থেকে কিছুই বলেন না, যতক্ষণ আল্লাহ তা’য়ালা তাঁকে বলার নির্দেশ না করেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’য়ালা বলেন- আর তিনি নিজের থেকে কিছুই বলেন না, যতক্ষণ তার কাছে প্রত্যাদেশ না করা হয় (সূরা নজম-৩-৪)। আরো ইরশাদ করেন- আর যদি রাসূল আমার নামে কিছু রচনা করে চালাতে চেষ্টা করত, তবে অবশ্যই আমি তার দক্ষিণ হাত ধরে ফেলতাম এবং তার জীবন-ধমনী কেটে দিতাম। তারপরে তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যে, তাকে রক্ষা করতে পারে (সূরা আল হাক্কাহ-৪৪-৪৭)। আরো ইরশাদ করেন- আমি শুধু সে ওহীরই অনুসরণ করি, যা আমার প্রতি নাযিল করা হয় (সূরা আনআম-৫০)।

হেদায়েতের আলোক বর্তিকা : রাসূলুল্লাহ সা. হলেন মানব জাতীর জন্য হেদায়েতের আলোক বর্তিকা। আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেন- তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ হতে নূর তথা হেদায়েতের আলোক বর্তিকা হিসেবে রাসূূল ও সত্য প্রদর্শনকারী কিতাব এসেছে (সূরা আল-মায়েদা-১৫)। অন্যত্র ইরশাদ করেন আর আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর দিকে আহবানকারী ও আলোকদীপ্ত প্রদীপ হিসেবে (আপনাকে প্রেরণ করেছি) (সূরা আহযাব-৪৬)।

হেদায়েতের গাইড বুক প্রদান : তাঁর কাছে প্রেরিত কুরআন মাজীদ হেদায়েতের শ্রেষ্ঠ গাইড বুক। পূর্ববর্তী সকল আসমানী গ্রন্থ বিকৃত হয়ে গিয়েছে, কিন্তু কুরআন মাজীদ হুবহু বিদ্যমান রয়েছে। কেননা, আল্লাহ তা’য়ালা পূর্ববর্তী আসমানী কিতাব সমূহের রক্ষনাবেক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করেননি; কেবলমাত্র কুরআন মাজীদের রক্ষনাবেক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। আল্লাহর বাণী আমি স্বয়ং এ উপদেশ গ্রন্থ নাযিল করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক (সূরা হিজর-৯)। আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেন আমি আপনার প্রতি যে কিতাব নাযীল করেছি তা প্রতিটি বিষয়ের সুষ্পষ্ট ব্যাখ্যা হিসেবে এবং হেদায়েতের রহমত ও সুসংবাদ সে সব লোকদের জন্যে যারা মস্তক অবনত করেছে (সূরা আন- নাহাল: ৮৯)।

আরো ইরশাদ করেন- তাড়াতাড়ি শিখে নেয়ার জন্যে আপনি দ্রুত ওহী আবৃত্তি করবেন না। এর সংরক্ষণ ও পাঠ আমারই দায়িত্ব। অতপর আমি যখন তা পাঠ করি, তখন আপনি সেই পাঠের অনুসরণ করুন। এরপর বিশদ বর্ণনা আমারই দায়িত্ব (সূরা আল-কিয়ামাহ: ১৬-১৯)। আল্লাহ তা’য়ালা আরো ইরশাদ করেনÑ প্রত্যেক যুগের জন্য কিতাব রয়েছে (সূরা রা’দ-৩৮)। আরো ইরশাদ করেন এটাতো সমগ্র জগদ্বাসীর জন্য একটি উপদেশ, তোমাদের মধ্যে সে সব লোকদের জন্য, যে নির্ভূলভাবে চলতে চায় (সূরা আত-তাকভীর-২৭-২৮)। আরো ইরশাদ করেন এ কুরআন মানুষের জন্য একটি সুস্পষ্ট সতর্কবাণী এবং মুত্তাকীদের জন্য উপদেশ (আল ইমরান-১৩৮)। (চলবে)
লেখক : প্রধান ফকিহ্, আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদরাসা, ফেনী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিজ্ঞাপন