খন্দকার নাজমুল হক
ইসলামী ব্যাংক পিএলসির ২২ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে ১১ হাজার চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার অধিবাসী। এস আলম শিল্প গ্রুপ ২০১৭ সালে গোয়েন্দা সংস্থা এবং ফ্যাসিবাদের দোষর হিসেবে ব্যাংকটি দখল করে। ২০০৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগের তাত্ত্বিক ও ভারতের তাবেদার অধ্যাপক আবুল বারাকাত মিথ্যা তথ্য দিয়ে, মিডিয়ায় ঢোল পিটিয়েছিলো ইসলামী ব্যাংক মানবিক কাজের আড়ালে জংগী সংগঠন ও একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলেকে অর্থায়ন করে থাকে। এভাবে এস আলম দখলে নিয়ে নামে বেনামে সাধারণ গ্রাহকদের প্রায় ৯০,০০০ কোটি টাকা লুটপাট করে ব্যাংকটির মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। অভিজ্ঞতা আছে যে, এস আলম ব্যাংকটি নিয়ন্ত্রনে নিয়ে প্রায় ১১,০০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছে। যাদের অধিকাংশের বাড়ি দক্ষিণ চট্টগ্রাম এবং পটিয়া উপজেলায়। ইসলামী ব্যাংক সূত্রে জানা যায় যে, ২০১৬ সালের শেষে ব্যাংকটির জনবল ছিল ১৩ হাজার ৫৬৯ জন এবং চট্টগ্রাম জেলার কর্মকর্তা-কর্মচারী ছিল মাত্র ৭৭৬ জন। কিন্তু বর্তমানে ব্যাংকটির জনবল দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২ হাজার, এর মধ্যে প্রায় ১১ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী শুধু চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার অধিবাসী। অভিযোগ রয়েছে, এসব নিয়োগে ব্যাংকিং আইন বিধি বা নিয়োগ নিয়মনীতি ভঙ্গ করা হয়েছে। দেশের ৬৩ জেলার চাকরি প্রত্যাশীদের বঞ্চিত করে গোপনে একটি জেলার প্রার্থীদের নিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এতে ব্যাংকের শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে এবং গ্রাহকসেবার মান চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
৩৬ জুলাই ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ও পালিয়ে যাওয়ার পর ব্যাংকের ওপর থেকে এস আলম গ্রুপের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব চলে যায়। অতি সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এস আলমের সুপারিশে নিয়োগ পাপ্ত ৫ হাজার ৩৮৫ জন কর্মকর্তাকে পরীক্ষার মাধ্যমে যোগ্যতা ও দক্ষতা যাচাইয়ের উদ্যোগ নেয়। এ লক্ষ্যে গত ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের (আইবিএ) মাধ্যমে একটি মূল্যায়ন পরীক্ষা আয়োজন করা হয়। উক্ত পরীক্ষায় অংশ নেন মাত্র ৪১৪ জন, বাকিরা পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। প্রায় ২০০ জনকে শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে বরখাস্ত করা হয়েছে। পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ না করায় ৪ হাজার ৯৭১ জনকে ওএসডি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এস আলমের সময়ে নিয়োগ পেতে জাল সনদ ব্যবহার, বক্স ফরমে বায়োডাটা জমা এবং পরীক্ষা ছাড়াই লক্ষ লক্ষ টাকার বিনিময়ে সরাসরি নিয়োগে বানিজ্য চলত। নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হতো ম্যানেজমেন্ট এর সিদ্ধান্ত মোতাবেক কোনো ধরনের বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই।
২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ রাষ্ট্রীয় একটি গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় জোর পুবক ৮২% শেয়ার ক্রয় করে ইসলামী ব্যাংক পিএলসিকে দখলে নেয়। এরপর থেকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা থেকে নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। বিশেষ করে পটিয়া উপজেলার বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা নিয়োগের কারণে সে সময় ব্যাংকটিকে অনেকে “পটিয়া ব্যাংক” বলেও কটাক্ষ করতেন। ইসলামী ব্যাংকে কর্মরত ৫,৫০০জন কর্মকর্তাকে ব্যাংকের চাকুরি বিধি লংঘন করে চাকুরীচ্যুতির উদ্যোগ গ্রহণ করা সম্পুর্ন অবৈধ বলে গণ্য হবে। চাকুরী বিধিতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রদান করা বাধ্যতামূলক নহে। ব্যাংকের চাকুরী বিধিতে বলা আছে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কতৃপক্ষ প্রয়োজনীয় সংখ্যক কর্মকর্তা বা কর্মচারী নিয়োগ করতে পারেন। বেসরকারি ব্যাংকের মালিক হলো চেয়ারম্যান এবং বোড অব ডিরেক্টর। যার শেয়ারের মালিকানা বেশি তিনি চেয়ারম্যান হিসেবে সিইও বা ম্যানেজিং ডিরেক্টর, অতিরিক্ত ম্যানেজিং, ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর, অভিজ্ঞ এবং অনঅভিজ্ঞ কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ করে থাকেন। ব্যাংকে একটি এইচআরডি ডিপার্টমেন্ট আছে। এইচআরডি বিভাগ বিজ্ঞাপন দিয়ে অথবা বিজ্ঞাপন ছাড়া অথবা বায়োডাটা সংগ্রহ করে, মৌখিক পরীক্ষা অথবা লিখিত পরীক্ষা নিয়ে অথবা নোট লিখে কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ করে থাকেন। উক্ত প্রক্রিয়ার সাথে এইচআরডি প্রধান, সিইও বা ম্যানেজিং ডিরেক্টর, অতিরিক্ত ম্যানেজিং, ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর জড়িত। তাদের নোট অনুমোদন এবং নিয়োগ পত্রে স্বাক্ষর ছাড়া অভিজ্ঞ বা অনঅভিজ্ঞ কোন কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ নেই।
ইসলামী ব্যাংকের সাবেক সিইও বা ম্যানেজিং ডিরেক্টর জনাব আব্দুল মান্নান, জনাব মনিরুল মাওলা এবং জনাব মাহবুব আলমের সময় উক্ত ৫,৫০০জন কর্মকর্তা নিয়োগ পেয়েছে। তাহারা সাটিফিকেট দেখে ড্রাইভার ও পিয়ন এবং দারোয়ানকে অফিসার হিসেবে প্রমোশন দিয়েছে। হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট এর সিদ্ধান্ত মোতাবেক একজন নাগরিক ব্যাংকে চাকুরী পেয়ে থাকেন। প্রবিশনালকাল শেষে চাকুরী স্থায়ী হয়ে থাকে। রাস্ট্রের উচিত তদন্ত করে দেখা অযোগ্য কোন ব্যক্তি সাটিফিকেট জ্বালিয়াতির মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগ পেয়েছে কিনা। যদি পেয়ে থাকেন তাহলে এর দ্বায়ভার চাকুরীদাতা হিসেবে ইসলামী ব্যাংকের সাবেক সিইও বা ম্যানেজিং ডিরেক্টর জনাব আব্দুল মান্নান, মনিরুল মাওলা জনাব মাহবুব আলম এবং এইচআরডি প্রধানের উপর পড়ে। উক্ত সময় ৫,৫০০জন কর্মকর্তা কিভাবে নিয়োগ পেয়েছে, ব্যাংকের চাকুরী বিধি লংঘিত হয়ে থাকলে, অযোগ্য লোকজন নিয়োগ করা হলে তাদেরকে অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে। কোন অফিসারের শিক্ষা সাটিফিকেট জ্বাল থাকলে, চাকুরী বিধি লংঘন করে ড্রাইভার ও পিয়ন এবং দারোয়ানকে অফিসার পদে নিয়োগ দিয়ে থাকলে জড়িত কর্মকর্তা ও সিইওকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
ইসলামী ব্যাংকে অযোগ্য লোকজন নিয়োগ করা হলে বছরের শেষে মূল্যায়ন করে, প্রশিক্ষণ প্রদান করে ব্যাংকের উপযোগী অফিসার তৈরি করা সম্ভব। ইসলামী ব্যাংকের নিকট গ্রাহকদের প্রত্যাশা : ১. একজন গ্রাহক বা শেয়ার হোল্ডার দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে টাকা তুলছে, ক্যাশ কাউন্টার আচরণটা সুন্দর করা। ২. প্রতিটি অফিসারের ব্যবহার বা কথাবার্তা বন্ধুসুলভ ভদ্র আচরণ করা। ৩. প্রত্যেক কর্মচারী এবং ম্যানেজারের উচিত গ্রাহকদের স্যার সম্বোধন করে কথা বলা। ৪. গ্রাহকদের যে কোনো সমস্যার দ্রুত সমাধান করে দেওয়া এবং আইন ও বিধি মোতাবেক পরামর্শ দেওয়া । ৫. মা-বোনদের জন্য ইসলামী ব্যাংক একটি নিরাপদ ব্যাংক এবং একটি বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা। ৬. গ্রাহক দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলেও বিরক্ত না হয়ে ব্যাংকের অফিসারদের সুমধুর ব্যবহারে সন্তুষ্ট থাকা এবং হাসিমুখে ব্যাংক থেকে বের হওয়া। ৭. এস আলম ব্যাংকটি দখল করার পরে ইসলামী ব্যাংক একটি ফ্যাসিস্ট ব্যাংক হিসেবে পরিণত হয়, এ ব্যাপারে ব্যাংকের রিজার্ভ বৃদ্ধির প্রদক্ষেপ গ্রহণ করা। ৮. অনেক অভিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যাংকার কে জোরপূর্বক চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়, অনেক অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে বিভিন্ন অজুহাত দিয়ে জেলে পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে, বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দিয়েছে, চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে, তাদেরকে সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে নিয়োগ দেওয়া। ৯. এস আলম দখলের পরে ইসলামী ব্যাংক এতটাই আতঙ্কের জায়গায় পরিণত হয় যে, পটিয়ার একজন পিয়ন বা কর্মচারীর কাছে ব্যাংকের ম্যানেজার জিম্মি ও অফিসারেরা জিম্মি হয়ে থাকতো। কর্মচারীরা উশৃংখল ব্যবহার করতো, তাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা। ১০. পটিয়ার যতজন কর্মকর্তা এস আলমের দাফট দেখিয়ে ব্যাংকের রুলকে মানেন নাই, ব্যাংকের রুলকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা অব্যাহত রাখা। ১১. যাহারা বিজ্ঞাপন মোতাবেক লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে চাকুরী পেয়েছে তাদের আর কোন কোন পরীক্ষা নেওয়া যাবেনা। এতে বিশৃংখলা সৃষ্টি হবে। ১২. চাকুরী বিধি মোতাবেক ৫,৫০০ অফিসারের নিয়োগ সঠিক ছিলো। তাদেরকে চাকুরীচ্যুত করলে সামাজিকভাবে ব্যাংকের সুনাম ক্ষুন্ন হবে। সমাজে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হবে, অনেক পরিবার অথনৈতিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ১৩. হাইকোর্টের আদেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়ে চাকুরিতে বহাল করতে হবে। ১৪. ওদের নিয়োগের ক্ষেত্রে সিইও আব্দুল মান্নান, মাহবুব আলম, মনিরুল মাওলা এবং এইচআরডি প্রধান কোন নোট অব ডিসেন্ট প্রদান করে নাই, তাহলে তাদের নিয়োগ এবং চাকুরী বৈধ।
ইসলামী ব্যাংকের ৫৫০০ কর্মকর্তার মধ্যে যাহারা দক্ষতা যাচাই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে নাই তাদেরকে শরীয়া ও ব্যাংকিং কার্যক্রম বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষতা বৃদ্ধি করার প্রদক্ষেপ গ্রহণ করা। তাদের ফ্যামিলি ও ছেলে মেয়েদের ভবিষ্যৎ চিন্তা করে দুরবতী শাখায় বদলী করে চাকুরিতে বহাল করা এবং শাখা ম্যানেজারের সুপারভিশনে রাখা, প্রয়োজনে এক পদ নিচুঁতে পদায়ন করা। এস আলমের পাচারকৃত ৯০,০০০ কোটি টাকা আদায়ের জন্য দ্বায়িত্ব দেওয়া। ডিপোজিট টাগেট দেওয়া। ইসলামী ব্যাংক কোন একক গোষ্ঠীর বা শ্রেণীর ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান নয়। সুবিচার ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে ইসলামী ব্যাংককে এগিয়ে যেতে হবে। ইসলামী ব্যাংক এ দেশের ১৮ কোটি ইসলাম প্রিয় মানুষের ব্যাংক। ইসলামের নীতি অনুযায়ী, সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে, জাতীয়তা ও আঞ্চলিকতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কোন ধরনের আঞ্চলিক বা রাজনৈতিক বৈসম্য করা যাবেনা। ইসলামী ব্যাংক লুটেরাদের কারণে পথ হারাবে না, নতুন ম্যানেজমেন্ট এর পরিচালনায় ঘুরে দাঁড়াবে, ইনশাআল্লাহ।
লেখক : গবেষক ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ।