মার্চ ৬, ২০২৬ ১৭:৩৩

ফেনীতে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় মাথাচাড়া দিচ্ছে ‘কিশোর গ্যাং’

  • পিএক্স-১০, এমবিডি-১৭৮, ডিকেবি, এফসি সেভেন স্টার, বিএসকেবি ও এমএসবি সহ রয়েছে অন্তত ৩২টি গ্রুপের তথ্য গোয়েন্দাদের হাতে
  • ছাত্রদলের একাধিক নেতা এসব গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করেন
  • দেড় বছরে মামলা হয়েছে ৮টি, অভিযোগের স্তুপ

শহীদুল ইসলাম :

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে ফেনী শহরে আতংকের নাম ‘কিশোর গ্যাং’। গ্যাং কালচারে জড়িয়ে পড়া কিশোর-তরুণরা ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, নারী উত্ত্যক্ত সহ খুনোখুনি সহ এমন কোন ঘটনা বাদ পড়েনি যা ঘটায়নি। শহরে নামে-বেনামে অন্তত ৩২টি গ্যাংয়ের তথ্য নিয়ে কাজ করছেন সরকারি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর হঠাৎ ‘নাই’ হয়ে যাওয়া কিশোর গ্যাং গত কয়েকমাস ধরে তৎপর হয়ে উঠেছে। তাদের উপদ্রবে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে স্থানীয় বাসিন্দারা। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি স্থানে মারামারিও হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, ফেনী মডেল থানায় গত দেড় বছরে অন্তত ৮টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৩০-৩৫ জন গ্রেফতার হয়েছেন। দেড়শ থেকে দুইশ কিশোর-যুবক মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পেয়েছেন।


সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পাড়া-মহল্লা ভিত্তিক আধিপত্য, ছোট ভাই-বড় ভাই এমনকি মেয়ে সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা বিভাদে জড়িয়ে পড়ে। বিরোধের জের ধরে ‘রাজনৈতিক বড় ভাই’দের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে কিশোর গ্যাং গ্রুপ গড়ে তোলে। চলতি বছরের গত ৯ জানুয়ারি শহরের পাঠানবাড়ী এলাকায় একটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় ফেনী মডেল থানায় একটি মামলাও হয়।


বিভিন্ন সূত্রের তথ্যমতে, ফেনী শহরে ‘কিশোর গ্যাং’ এর ৭ থেকে ৮টি শক্তিশালী গ্রুপ রয়েছে। এদের বেশিরভাগ গ্রুপ বিভিন্নভাবে বিভক্ত। তবে সক্রিয় এমন ৩২টি গ্যাং গ্রুপের নাম ফেনীর সময়ের হাতে এসেছে। এর মধ্যে এফবিএক্স-৩০, এমডিবি-১৯৬৪, এফসিবি-৭, এসআরডিএক্স, পিএক্স-১০, এমকেবি এক্স-১১, এফএক্স-১১, থ্রী আর ডিএক্স, এমবিডি-১৭৮, ডিকেবি, টক্সিন, সাইকো এক্সটেন, এসআরএক্স-২০, এফসিবি-২.০, এমডিবি-১৭৬, বিএসকেবি, জিকেবি-২৭, এসডিবি-২৬, এসিএক্স, রেডএক্স, এফসি সেভেন স্টার, আরকেবিএক্স ১১, এমএসবি, এইচপিজি, জেএসকেবি, এসএস-১০, এমসিকেএক্স-২০, টিআরবি ১৪৪ ও ১৪৩ এবং এমডিবি-৩৬০ উল্লেখযোগ্য। এসব গ্যাং এর প্রধান হিসেবে রায়হান, বিজয়, নোমান, নাফিজ বৃত্ত, ঠিকানা বাবু, নিলয়, ফাহিম, নাফিস মুন্সি, আরিফুল ইসলাম বাবু, হামিম, তানভীর, আবির, মাসুম, তাসিন, নিলয়, রাকিব, রাজু, পিয়ান্ত, পাবেল, পিয়ম, জাওয়াদ, তাহমিদ, এলেক্স জাহিদ, সাইদুল, রনি, সাইমুন, ইশতিয়াক, আব্দুর রহমান, অভি খাঁন, সাব্বির, জুয়েল ও নিলয়ের নাম জানা গেছে।


এরমধ্যে রেলষ্ট্রেশন, রাঝাঝির দীঘি ও পাইলট কেন্দ্রীক রায়হান, মিজান রোডে জুয়েল ও নিলয়, ফেনী পাইলট ও মিজান রোডে আবির, মিজান রোড ও আলিয়া মাঠ কেন্দ্রিক মাসুম, ফেনী আলিয়া ও মিজান রোডে তানবির, শান্তি নিকেতন স্কুলের পাশের গলি ও রিক্সা গেরেজের পাশের মাঠে হামিম, মুক্তবাজার ও ডাক্তারপাড়ায় তাসিন, ওয়াপদা মাঠ ও পাঠানবাড়ি এলাকায় নিলয়, ফেনী সেন্টারের সামনে রাজু, ফেনী সেন্টারের আশপাশে সাইমুন ও ইশতিয়াক, একাডেমী এলাকার ফারুক হোটেল ও বনানী এলাকায় আরিফুল ইসলাম বাবু, মমিন জাহান মসজিদ ও আড্ডা বাড়ি নাফিস মুন্সি, মমিন জাহান মসজিদে সাব্বির, পাঠানবাড়িতে অভি খাঁন, ফালাহিয়া মাদরাসা ও আশপাশের এলাকা পিয়ান্ত, ডাক্তারপাড়া ও মুক্তবাজার এলাকায় আব্দুর রহমান, একাডেমি এলাকায় বিজয় ও এলেক্স জাহিদের সাঙ্গপাঙ্গরা নিয়মিত আড্ডা জমায়।


নির্ভরযোগ্য সূত্র আরো জানায়, একসময় কিশোর গ্যাংয়ের নিয়ন্ত্রণ নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের হাতে থাকলেও এখন সেটি পরিবর্তন হয়েছে। ছাত্রদল-যুবদল ও শ্রমিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের ৬-৭ জন নেতার নাম ঘুরেফিরে আলোচনায়। জেলা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক জাকির হোসেন রিয়াদ পাটোয়ারীর নেতৃত্বে বড় একটি গ্রুপ রয়েছে। তারা উকিলপাড়া, পেট্টোবাংলা, দাউদপুল, সহদেবপুর, নাজির রোড, মিজান রোড এলাকা নিয়ন্ত্রণ করেন। জোবায়ের হোসেন শরীফ ও শাফায়েত রহিত নামে দুইজন এসব এরিয়ার বেশিরভাগ গ্যাংয়ের দেখভাল করে। রেলগেইট থেকে শুরু করে একাডেমি, বনানীপাড়া, ফারুক হোটেল ও সদর হাসপাতাল পর্যন্ত এসব এরিয়ার গ্যাং গ্রুপগুলো জেলা ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক আরিফুল ইসলাম সুমনের নিয়ন্ত্রণে। ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত আহাদুল ইসলাম তনিক এসবের নেতৃত্ব দেন। বিজয়সিংহ দিঘি ও মহিপাল এলাকায় কিশোর গ্যাং এর বড় কোন গ্রুপ না থাকলেও ছোট দুই-একটা গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করেন শ্রমিক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ স্বপন। পৌর যুবদলের সাবেক যুগ্ম-আহবায়ক আবু তালেব ভূঁইয়া ফলেশ্বর এলাকায় একটি গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। পাঠানবাড়ী, ডাক্তারপাড়া, শান্তি কোম্পানি রোড ও ফালাহিয়া মাদরাসা এবং তার আশপাশের এলাকায় গ্রুপগুলো নিয়ন্ত্রণ করেন সাফায়াত হোসেন নাদিম নামে জেলা ছাত্রদলের আরেক নেতা।


এছাড়া রামপুর এরিয়া,পুরাতন পুলিশ কোয়ার্টার, শাহীন একাডেমি ও আশপাশের এলাকা, সদর হাসপাতাল মোড়, বারাহীপুর ও বিরিঞ্চি এলাকায় ছাত্রদল-যুবদলের একাধিক নেতার নাম উঠে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকায়। বিভিন্ন গ্রুপ-উপ গ্রুপ নিয়ন্ত্রণের তালিকায় ফেনী সরকারি কলেজ ও পৌর ছাত্রদলের শীর্ষ দুই নেতার নাম রয়েছে।


অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) নিশাত তাবাসসুম ফেনীর সময় কে বলেন, “কিশোর গ্যাং নির্মুলে পুলিশ কাজ করছি। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকলে ছবি সংগ্রহ করে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়। শহরের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে। মামলা হলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হয়। এছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহ অভিভাবক ও সচেতন মহলে তদারকী বাড়ানোর কাজ করছি।” রাজনৈতিক নেতাদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে বলেও তিনি জানান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিজ্ঞাপন