মার্চ ৬, ২০২৬ ১৭:৩৪

জনসভার মূল্যায়ণ: দুর্গখ্যাত ফেনীতে বিএনপির ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছে জামায়াত

কেফায়েত শাকিল

ফেনী দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ব্যতিক্রমী জেলা হিসেবে পরিচিত। ঐতিহাসিকভাবে এখানে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক ভিত্তি তুলনামূলকভাবে দুর্বল ছিল। পেশীশক্তি ছাড়া আওয়ামী লীগ কখনোই ফেনীতে দাঁড়াতে পারেনি। গত দেড় দশকে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব ফেনীতে টিকে ছিল মূলত প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও নির্বাচনে কারচুপির মাধ্যমে। তার বিপরীতে ঐতিহাসিকভাবে ফেনী বিএনপির শক্ত ঘাঁটি। সদ্যপ্রয়াত দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জন্মভূমি হওয়ায় অঞ্চলটি বিএনপির সঙ্গে আবেগ ও পরিচয়ের রাজনীতিতে বাঁধা। যার কারণে জনভিত্তির দিক থেকে বিএনপিই ছিল ফেনীর প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। কিন্তু স্বাধীনতার পর এই প্রথম ফেনীর রাজনৈতিক মানচিত্রে ভিন্ন এক দৃশ্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সেটা হলো ফেনীর রাজনীতিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সুসংগঠিত উত্থান।


গত ২৪ জানুয়ারি ফেনী পাইলট হাই স্কুল মাঠে জনসভা করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। জনসভাটি ছিল ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর এই তিন জেলার সম্মিলিত আয়োজন। এর ঠিক এক সপ্তাহ পর একই স্থানে  জনসভা করলো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এই জনসভায় অংশ নিয়েছে শুধুমাত্র ফেনীর তিনটি সংসদীয় আসনের নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা। দুই সমাবেশের আয়তন ও জনসমাগম তুলনা করলে দেখা যায়, এক জেলার আয়োজন হওয়া সত্ত্বেও জামায়াতের জনসভাটি জনসমাগমের দিক থেকে বিএনপির তিন জেলার সমাবেশের তুলনায় কোনো অংশে কম ছিল না। মাঠ ছাড়িয়ে শহরের প্রধান সড়ক পর্যন্ত মানুষের উপস্থিতি ফেনীর রাজনীতিতে শক্তির নতুন বিন্যাসের ইঙ্গিত দিচ্ছে।


দুই দলের শীর্ষ নেতাদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে রাজনৈতিক কৌশলের ভিন্নতাও স্পষ্ট হয়। তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে ফেনীর সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে আবেগী সংযোগ তৈরি করার চেষ্টা করেন। তিনি ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, এসব জেলায় ধানের শীষের বিজয় মানেই হবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিজয়। পাশাপাশি তিনি মেডিকেল কলেজ, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, ইপিজেড স্থাপন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশে পাঠানোর মতো উন্নয়নমূলক পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তবে তিনি ফেনীর সমাবেশে এখানকার সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও তার আলোকে পরিকল্পনা তুলে ধরার বিপরীতে রাজনৈতিক বিষদগারমূলক বক্তব্যই বেশি দিয়েছেন। তার বক্তব্যে সামগ্রিক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি থাকলেও ফেনীর নির্দিষ্ট সমস্যা ও স্থানভিত্তিক চাহিদা নিয়ে বিস্তারিত রূপরেখা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল বৃহত্তর অঞ্চল ও আবেগী সম্পর্ক, নির্দিষ্ট নাগরিক সমস্যার বিশদ বিশ্লেষণ নয়।


অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর আমীর তাঁর বক্তব্য শুরু করেন তারেক রহমানেরই মা ফেনীর মেয়ে বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণ করে। তারপর তিনি স্মরণ করেন ভারত কর্তৃক ফেনী নদীর পানি চুরি নিয়ে লেখার অপরাধে প্রাণ হারানো শহীদ আবরার ফাহাদকে। এরপর তিনি ফেনীকেন্দ্রিক বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরেন। লালপুল এলাকায় ফ্লাইওভারের প্রয়োজনীয়তা, মেডিকেল কলেজ স্থাপন, টেকসই বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, স্টেডিয়াম নির্মাণসহ কয়েকটি দীর্ঘদিনের নাগরিক দাবির কথা তিনি উল্লেখ করেন এবং সমাধানের আশ্বাস দেন। প্রবাসী অধ্যুষিত জেলা হিসেবে ফেনীর অর্থনৈতিক অবদান এবং প্রবাসীদের ভূমিকা স্বীকার করে তাঁদের সুযোগ ও মর্যাদা বাড়ানোর বিষয়টিও তাঁর বক্তব্যে স্থান পায়।


জামায়াত আমীরের বক্তব্যের একটি বিষয় আমার খুব নজর কেড়েছে। গত প্রায় দশক ধরে ফেনী শহরের দক্ষিণ অংশের মানুষ, বিশেষ করে সোনাগাজীবাসী আন্দোলন করছে লালপুলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওপর একটি ফ্লাইওভার করে দিতে। কেননা এখানে মহাসড়ক পেরিয়ে জেলা শহরে আসতে গিয়ে প্রতিনিয়ত প্রাণ ঝরছে অসংখ্য মানুষের।  সম্প্রতি ফেনী-৩ আসনের বিএনপির প্রার্থী ও দলটির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়াল মিন্টুকে কেউ একজন এই দাবির বিষয়ে বললে তিনি বলেন, লালপুলে ফ্লাইওভার প্রয়োজন এই বিষয়টি তিনি আগে জানতেন না। অথচ ফেনীর মানুষ না হয়েও জামায়াত আমির সেই সমস্যার কথা উল্লেখ করে সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। যা প্রমাণ করছে তিনি ফেনী আসার আগে এখানকার সমস্যা সম্ভাবনাগুলো নিয়ে বেশ ভালো স্টাডি করে এসেছেন।


এ ছাড়া ২০২৪ সালের ফেনীর ভয়াবহ বন্যার সময় নিজের সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জামায়াত আমির যে বক্তব্য দেন, সেটি স্থানীয় জনগণের সঙ্গে আবেগী সংযোগ তৈরির একটি কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এতে বোঝা যায়, জামায়াত ফেনীর সাম্প্রতিক সামাজিক ও প্রাকৃতিক সংকটগুলোকেও রাজনৈতিক ভাষ্যে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করছেন।


আমার হাইপোথিটিক্যাল এনালাইসিস বলছে, দুই দলের বক্তব্যের এই গভীরতাকে মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতির ভিন্নতার প্রতিফলন হিসেবে দেখতে পারেন ভোটাররা। যা তাদের মনস্তাত্বিক পরিবর্তনেরও কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।


পরিশেষে বলতে পারি, সব মিলিয়ে ফেনীর রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই জেলায় জামায়াতে ইসলামীর সংগঠিত উপস্থিতি এখন আর উপেক্ষণীয় নয়। জনসমাগম, বক্তব্যের বিষয়বস্তু ও মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতির দিক থেকে দলটি নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে। অপরদিকে কিছুটা ছন্নছাড়া দেখা যাচ্ছে বিএনপিকে। যদিও এখনো সময় আছে। আগামী কয়েকদিনের কাজই বলে দেবে নিজেদের দুর্গ উদ্ধারে কতটা সক্ষম বিএনপি নাকি শেষ পর্যন্ত বিএনপির ফেনীর দুর্গেও ভাগ বসাবে জামায়াতে ইসলামী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিজ্ঞাপন