নিজস্ব প্রতিনিধি :
বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনে মায়ের ভাষার অধিকার রক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ফেনীর ছাত্র-যুবক, রাজনৈতিক কর্মী সহ বিভিন্ন পেশার মানুষরা। এরপর একাত্তর সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ-আহতদের স্মরণ করা হলেও বায়ান্নের ভাষা সৈনিকদের স্মৃতি রক্ষায় জেলায় কোন স্থাপনা নির্মাণ করা হয়নি। শুধু তাই নয়, ভাষা শহীদ আবদুস সালামের নামে তার নিজ জেলা ফেনীর প্রবেশপথ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক কিংবা তার বাড়ি সম্মুখস্ত ফেনী-নোয়াখালী মহাসড়কে তোরণ নির্মাণ হয়নি। শুধু তাই নয়, গাজীউল হক, সামছুল হুদা, বিচারপতি কাজী এবাদুল হক, ড, শরীফা খাতুন, খাজা আহমদ, জিয়াউদ্দিন সহ ফেনী শহরের ভাষা আন্দোলনের অগ্রসৈনিকদের কেউ আর বেঁচে নেই। একুশে ফেব্রুয়ারিতে গঁৎবাধা অনুষ্ঠান হলে তাদের স্মরণ করা হয়না। ফলে দেশের সূর্য সন্তানরা। ফলে নতুন প্রজন্ম ভাষা সৈনিকদের অবদান বিষয়ে জানতে পারছে না।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের তথ্যমতে, ১৯২৫ সালের ২৭ নভেম্বর দাগনভুঞা উপজেলার মাতুভূঞা ইউনিয়নের লক্ষণপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আবদুস সালাম। তার পিতা ফজিল মিয়া পাকিস্তান সরকারের শিল্প বিভাগে পিয়ন পদে চাকরি করতেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় আবদুস সালাম ঢাকা মেডিকেল কলেজের পাশে নীলক্ষেত ব্যারাকের ৩৬বি কোয়ার্টারে বসবাস করতেন। মাতৃভাষা বাংলার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের সামনের রাস্তায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বিক্ষোভে অংশ নেন। পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে প্রায় দেড় মাস ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন থাকার পর ৭ এপ্রিল তিনি মৃত্যুবরণ করেন। পরবর্তীতে ২০০০ সালের আবদুস সালামকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় লক্ষ্মণপুর গ্রামকে তার নামেই ‘সালামনগর’ ও লক্ষণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ‘সালামনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ করা হয়। তার বাড়ির সামনে প্রায় ৬৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় ভাষা শহীদ সালাম স্মৃতি গ্রন্থাগার ও জাদুঘর। বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে ভাষা শহীদ সালামের নামে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের প্রবেশদ্বার ও তার বাড়ি সম্মুখস্ত ফেনী-নোয়াখালী সড়কের মাতুভূঞা ব্রীজ সংলগ্ন স্থানে তোরণ নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। একইসঙ্গে তার বাড়ি সংলগ্ন নদীর তীরে শিশু পার্ক তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়। সেসব সিদ্ধান্ত আর বাস্তবায়ন হয়নি।
এছাড়া উত্তাল এ আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল ভাষা সৈনিক গাজীউল হক। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন সরকার ১৪৪ ধারা জারি ভঙ্গকারীদের অন্যতম ছিলেন গাজীউল হক। গাজীউল হকের ‘ভুলব না ভুলব না ভুলব না এই একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না’ গানটি গেয়ে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত প্রভাতফেরি করা হতো। তিনি রাষ্ট্রভাষা পদক ও সম্মাননা স্মারক, শেরেবাংলা জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন। ১৯২৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া থানার নিচিন্তা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আবু নছর মোহাম্মদ গাজীউল হক। জীবদ্দশায় তিনি প্রেস ইন্সটিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআইবি) এর চেয়ারম্যান ছিলেন।
ভাষা আন্দোলনের সময় সারা দেশের মত উত্তাল হয়ে ওঠে ফেনী শহর। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ওপর গুলির খবর পৌঁছলে ফেনী কলেজের ছাত্ররা রাতেই মিছিল বের করে। ফেনী কলেজ ছাত্র মজলিস সম্পাদক জিয়াউদ্দিন, তৎসময়ের যুব নেতা খাজা আহমদ, বিচারপতি কাজী এবাদুল হক, আমীর হোসেন, ডা. তোফাজ্জল হোসেন, ফেনী কলেজ ছাত্র ফরমান উল্যাহ খান, আবুল কাশেমসহ কয়েকজন আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।
সোনাগাজী উপজেলার চর চান্দিয়া গ্রামের বাসিন্দা শামসুল হুদা ১৯৪৮ সাল থেকে শুরু করে ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারীর চরম মূহুর্ত এবং পরবর্তী পর্যায়ে ১৯৫৬ সালে বাংলা ভাষার স্বীকৃতি ও বিজয় অর্জন পর্যন্ত ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে জেল-জুলুমের শিকার হন। ১৯৪৮ সালের ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত বক্তব্যের প্রতিবাদ ও ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির মিছিলেও অংশ নিয়েছিলেন। আন্দোলনে অংশ নেয়ার জন্য কারাবরণ করতে হয় তাকে। ২০১৪ সালে ভাষা আন্দোলনে অবদানের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদক ও ২০১১ সালে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পদকে ভূষিত হন শামছুল হুদা।
ফেনী সদর উপজেলার বালিগাঁও ইউনিয়নের বালিগাঁও গ্রামের বাসিন্দা বিচারপতি কাজী এবাদুল হক ১৯৫২ সালে ফেনী কলেজের ছাত্র সংসদের সাহিত্য বিষয়ক সম্পাদক থাকাকালে ফেনী শহরে বাংলা ভাষা আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি ১৯৫৪ ও ১৯৫৫ সালে ফেনী ভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন। ২০১৬ সালে তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা একুশে পদক দেয়া হয়।
ফেনী সদর উপজেলার শর্শদী ইউনিয়নের জাহানপুর গ্রামের বাসিন্দা অধ্যাপক ড. শরিফা খাতুন ১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণার দাবীতে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৫৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি অনেক ছাত্রী গ্রেপ্তার হয়। অনেককেই সেদিন ১৪৪ ধারা ভাঙার দায়ে পুলিশ ট্রাকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। সেদিন গ্রেফতার হওয়া ছাত্রীর সংখ্যা ছিল ২০-২১ জন। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের অধ্যাপক লায়লা নূরও ছিলেন তাদের সঙ্গে। লায়লা শরীফার পরিচিতদের একজন। লায়লা নূরের সঙ্গে মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নিয়েছেন শরীফা খাতুন। ২১ পরবর্তী সময়ে দেশের প্রথম শহীদ মিনার তৈরি করে তাতে যখন শ্রদ্ধা অর্পণ করা হয়, সেটিতেও অংশ নিয়েছিলেন শরিফা খাতুন। ২০১৭ সালে একুশে পদক লাভ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক এ শিক্ষিকা।
জানা গেছে, আবদুস সালামের নামে নিজ গ্রামে জাদুঘর ও গ্রন্থাগার ছাড়াও জেলা শহরে স্টেডিয়াম, কমিউনিটি সেন্টার, দাগনভূঞা উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনের নামকরণ করা হয়েছে। এছাড়া খাজা আহমদের নামে ফেনী বড় বাজারের প্রধান সড়ক খাজা আহমদ সড়ক ও দাউদপুরে খাজা আহমদ মার্কেটের নামকরণ হয়েছে। তবে এসব স্থাপনা এখন অন্য নামেই চিনছেন স্থানীয়রা। বাকিদের নামে এখনও কোনও স্থাপনা নির্মাণ বা নামকরণ হয়নি।
বরেণ্য শিক্ষাবিদ, ফেনী সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর তায়বুল হক বলেন, ভাষা আন্দোলনের সৈনিকদের স্মরণে রাখার জন্য জেলা প্রশাসনকে উদ্যোগ নিতে হবে। প্রজন্মকে তাদের ইতিহাস জানাতে এলাকাভিত্তিক নামফলক কিংবা স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা যেতে পারে।
ভাষা শহীদ আবদুস সালাম স্মৃতি পরিষদের সভাপতি ও দৈনিক ফেনীর সময় সম্পাদক মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন জানান, ভাষা আন্দোলনের গৌরব গাথা ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। সালামদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলা ভাষা দেশের সর্বস্তরে চালু করার উদ্যোগ নিতে হবে। সালামনগরে জনসমাগম নিশ্চিত করার জন্য সেখানে একটি পার্ক অথবা বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলার দাবি দীর্ঘদিনের। এছাড়া ভাষা আন্দোলনে সম্মুখভাগে থাকা ফেনীর সূর্য সন্তানদের নামে স্থাপনার নামকরণের দাবী জানান তিনি।
জেলা প্রশাসক মনিরা হক জানান, ভাষা শহীদ ও ভাষা সৈনিকদের রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। তবে স্থানীয়ভাবে কোন উদ্যোগ নেয়া যায় কিনা এ ব্যাপারে প্রদক্ষেপ গ্রহন করা হবে।