* দখল, চাঁদাবাজি, মাটিকাটা, মামলা ও সালিশ-বাণিজ্য সবই চলে
* দখল-চাঁদাবাজির সহযোগী মিরসরাইয়ের বিএনপি নেতা
শহীদুল ইসলাম :
ফেনী শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরত্বে কালিদাস পাহালিয়া ও মুহুরি নদীর তীরে ৭বর্গ মিটারের ইউনিয়ন ফরহাদ নগর। ১১টি গ্রাম ও ৩টি হাট-বাজার নিয়ে গঠিত ইউনিয়নটি একসময় কার্যক্রম নিষিদ্ধ পলাতক আওয়ামীলীগ নেতাদের একচ্ছত্র দখল ও নিয়ন্ত্রণে ছিলো। যা এখন অনেকটাই ইউনিয়ন বিএনপির আহবায়ক বেলায়েত হোসেন বাচ্চু এবং তার ভাই সদর উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব শাহাদাত হোসেনের দখলে। এখানে বাচ্চু ও শাহাদাতের ইশারা ছাড়া নড়ে না গাছের পাতাও। গত কয়েকদিন অনুসন্ধান করে স্থানীয় বিভিন্ন পর্যায়ের বিএনপির নেতাকর্মী সহ সাধারণ মানুষ ও একাধিক ভুক্তভোগীর সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। তবে তাদের কেউই নাম প্রকাশ করে উদ্বৃত হতে রাজি হননি।
সরেজমিনে জানা গেছে, ফরহাদনগর ইউনিয়নে বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনগুলো কয়েকভাগে বিভক্ত। তবে বাচ্চু বলয়ের নেতাকর্মীরা এলাকায় শক্তিশালী ও বেপরোয়া। বাচ্চু গ্রুপের আভ্যন্তরে ছোট-বড় আরো বেশ কয়েকটি উপ-গ্রুপ রয়েছে। বাচ্চুর অনুসারী এসব গ্রুপ নিয়ন্ত্রন করেন শাহাদাত। বাচ্চু ইউনিয়ন বিএনপির আহবায়কের পাশাপাশি জেলা বিএনপির সদস্য। একসময় তিনি ইউনিয়নটির চেয়ারম্যানও ছিলেন। আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে কিছুদিন এলাকায় যাওয়া আসা থাকলেও একপর্যায়ে কোনঠাসা হয়ে পড়েন বাচ্চু পরিবার।
এখানে সদর উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম-আহবায়ক জিয়াউদ্দিন আরেকটি গ্রুপ নেতৃত্ব দেয়। গত দেড় বছরের বেশিসময় গ্রুপটির সাথে বাচ্চু গ্রুপের অন্তত ১৫ থেকে ২০বার সংঘাত হয়। এছাড়া ইউনিয়ন বিএনপি সদস্য সচিব সৈয়দ জাহাঙ্গীর ও জেলা ছাত্রদলের সদস্য সাইদুল ইসলাম আরাফাত পৃথক দুটি গ্রুপ পরিচালনা করেন। জাহাঙ্গীর অনেকটা নিষ্ক্রীয় হয়ে ইতিমধ্যে প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর চাঁদাবাজি, দখল, মামলা বাণিজ্য, সালিশ বাণিজ্য ও মাটিকাটা সবকিছুর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক বাচ্চু-শাহাদাত। শাহাদাত সরাসরি সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ করলেও ভাগ পান বাচ্চওু। দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে নিজ দলের প্রতিপক্ষের উপর হামলার অভিযোগও রয়েছে অহরহ। তাদের অনুসারীরা খাইয়ারা বাজার, ভোরবাজার ও কেএমহাট এলাকায় বেশ দাপিয়ে বেড়ান। প্রায়ই অপকর্ম করেন এমন ৩৫ থেকে ৪০ জন অনুসারীর নাম ফেনীর সময়ের কাছে রয়েছে। তারাও আবার বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের রাজনীতির সাথে জড়িত।
দখলের মহোৎসব
ভুক্তভোগীদের তথ্যমতে, ইউনিয়নের ৯৬ চরকালিদাসে দীঘি দখল করেন বাচ্চু। ৫ আগস্টের পর একটি বর্গাচাষী সমিতি থেকে দুই দফা সাড়ে ১৪ লাখ টাকা চাঁদাও নেন তিনি। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় থাকাকালে সেখানকার ইউপি চেয়ারম্যান (বর্তমানে পলাতক) ও আওয়ামীলীগ সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন টিপু খালি পড়ে থাকা জমি চট্টগ্রামের ফরিদ উদ্দিন (ছদ্মনাম) নামে একজনের নিকট ১০বছরের জন্য বৎসরে প্রতি একর ৯হাজার টাকা চুক্তির বিনিময়ে বর্গা বা ইজারা দেন। তারা ৬০লাখ টাকা খরচ করে দীঘি খনন করে মাছ চাষ করেন। চার বছর হবার আগেই ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে পর টিপু পালিয়ে গেলে বাচ্চুর অনুসারীরা সেখান থেকে রাতের আঁধারে মাছ লুট করে। একপর্যায়ে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে চাঁদা দাবি করে বাচ্চু। মাছ চাষ করতে বাধ্য হয়ে দুই দফায় সাড়ে ১৪লাখ টাকা চাঁদা দেন ওই সমিতির সদস্য নাজিম উদ্দিন। নাজিম উদ্দিন একদফা ফয়জুল্লাহ নামে একজনের মাধ্যমে সাড়ে ৪লাখ টাকা ও পাশ্ববর্তী চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ধুম ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব মেজবাউল হক মানিকের মাধ্যমে আরেক দফা ১০লাখ টাকা চাঁদা দেন। বাচ্চুর হয়ে তাদের কাছ থেকে চাঁদা নেন মানিক। এরমধ্যে ফয়জুল্লাহ থেকে লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে ভোরবাজার পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম ও ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আজহারুল ইসলাম বাবলুর সম্পৃক্ততাও রয়েছে।
জানা যায়, ফরহাদনগর থেকে বাচ্চু ও ধুম থেকে মানিক একত্র হয়ে এসব নিয়ন্ত্রণ করেন। পরে ওই সমিতি চাঁদা দেয়ার পরও ঠিকমত মাছ চাষ করতে না পারায় তারা সেখান থেকে চলে যায়। একপর্যায়ে সাকিব নামে একজনকে চুক্তির দলিল দিয়ে চাষ করাতে গিয়েও পারেনি। সাকিবের কর্মচারীদের উপর আজহারুল ইসলাম বাবলুর নেতৃত্বে হামলা করা হয়। এর আগে তার কাছ থেকেও ২০ হাজার টাকা চাঁদা নেন তারা।
সাকিব ফেনীর সময়কে বলেন, “আমি দীঘিগুলো মাছ চাষের জন্য ইজারা নিয়েছিলাম। কিন্তু ওরা আমার কর্মচারীদের মারধর করে এবং আমার অসুস্থ চাচাকেও মারধর করে। আমার চাচা এগুলো তদারকি করতো। তারা মোটর নিয়ে যায়। ২টি মেশিন ভাংচুর করে। আমি প্রথমে ২০ হাজার টাকা চাঁদা দিয়েছি। এরপরও আমাকে চাষ করতে দেয়া হয়নি।”
সেখানে আরো একাধিক দীঘির মাছ চাষি থেকে বাচ্চু চাঁদা নিয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানায়। ফেনী জেলা পুলিশের একটি গোয়েন্দা সূত্র ফেনীর সময়কে বলেন, “টিপু হয়তো সরকার থেকে লীজ নিয়েছিল জায়গাগুলো। ৫আগস্টের পর সে পালিয়ে যাওয়ার পর বাচ্ছু বিভিন্ন মাধ্যমে প্রথমে রাতের আঁধারে নিয়ে যেতো তার লোকবল দিয়ে। ওই ভুক্তভোগী চাষীরা তাকে একাধিকবার কল দিয়ে কোন সুরাহা পায়নি। পরে জানতে পারে যে ওরা তার লোক।”
ওই গোয়েন্দা সূত্র ফেনীর সময়কে আরো বলেন, “সেখানে বাচ্চু অনেকের থেকে চাঁদা নিয়েছে। কিন্তু কেউ ভয়ে কথা বলতে চায় না।” এছাড়া তাদের কাছ থেকে ২০লাখ টাকা চাঁদা চাওয়ার গোপনে ধারণ করা একটি ভিডিও ফেনীর সময়ের হাতে এসেছে। এর বাইরে বাচ্চু সেখানে আরো একাধিক মাছ চাষি থেকে চাঁদা নিয়েছে বলে একটি সূত্র জানায়। যদিও এ বিষয়ে এক ভুক্তভোগীর সাথে কথা বলতে চাইলে ভয়ে ওই চাষি মুখ খুলতে রাজি হয়নি।
স্থানীয়রা জানান, এই দীঘি গুলো থেকে জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম-সম্পাদক আলাউদ্দিন রুমন, ভোরবাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম, ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আজহারুল ইসলাম বাবলু, সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহীন ও সুজন নামে একজন মাছ নিয়ে যান।
গত ২১ এপ্রিল সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভোরবাজার থেকে ৫শ মিটার পূর্বে নদী পার হলে ৯৬ চরকালিদাসে অসংখ্য দীঘি রয়েছে। যেগুলোতে মাছ চাষ করা হয়। এরমধ্যে কিছু অংশ ফেনী ও বাকি অংশ চট্টগ্রামের মধ্যে পড়েছে। সেখানে মোশাররফ হোসেন টিপুর তিনটি দীঘি রয়েছে। এরমধ্যে একটি ছোট হলেও বাকি দুটি বড় আকৃতির। একটিতে তখন সেচ দেওয়া হচ্ছে মাছ ধরতে। সেখানে থাকা তিনজন জানান, সাইফুল, রুমন, বাবলু ও সুজন সেচ দিচ্ছে। তারা বিভিন্ন সময় এসে মাছ ধরে নিয়ে যায় বলে স্থানীয়রা জানান। তবে এখানে দীঘির মালিকানা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। সেখানে অন্তত অর্ধশতাধিক পরিবারের সম্পত্তি রয়েছে বলে দাবি স্থানীয় অনেকের। তাদের দাবি, এগুলো টিপু ক্ষমতার অপব্যবহার করে জোরপূর্বক দখল করেছিল। অথচ এগুলো তাদের বাপ-দাদাদের সম্পত্তি ছিল। তারা জানায়, ৫ আগস্টের পর যে যার জায়গায় বিলবোর্ড ও লাল পতাকা টাঙিয়ে দেয়। বাচ্চুর অনুসারী রুমন, সাইফুল, বাবলু ও সুজন এসে ফেলে দেয়। এভাবে একাধিকবার চেষ্টা করেও তারা তা দখলে নিতে পারেনি বলে ফেনীর সময়কে জানান।
ওই দীঘিতে নিজের জায়গা রয়েছে দাবি করা এমন একজন বাসিন্দার সাথে কথা হয়। তিনি ফেনীর সময়কে বলেন, “এখানে রুমন, সাইফুল, সুজন ও আজহার বাবলু মাছ নিয়ে যান। তারা আর মাছ চাষ করেন না। কিন্তু বার বার মাছ নিয়ে যান।”
তিনি আরো বলেন,“এখানে অনেকের জায়গা আছে। টিপু চেয়ারম্যান এসে এগুলো দখল করে দীঘি তৈরি করে। ওইসময় ভয়ে কেউ কিছু বলেনি। কিছুদিন আগে অনেক পরিবার সাইনবোর্ড ও লাল পতাকা টাঙ্গিয়েছিল। গত ১৭ বছর আমরা কোথায় ছিলাম হুমকি দিয়ে বাচ্চু চেয়ারম্যানের লোকেরা এগুলো ফেলে দেয়।”
তবে দীঘিগুলোর জায়গার কিছু অংশ ব্যাক্তিমালিকানাধীন ও কিছু অংশ সরকারি বলে জানান ইউনিয়নের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মো: জসিম উদ্দিন। তিনি বলেন, “এখানে কিছু অংশ ব্যাক্তিমালিকানাধীন ও কিছু অংশ সরকারি। দাগ নাম্বার ছাড়া কোন জায়গাগুলো কি তা বলা যাচ্ছে না।”
বেপরোয়া মামলা ও সালিশ বাণিজ্য
দখল ও চাঁদাবাজির পাশাপাশি চলে মামলা ও সালিশ বাণিজ্যও। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামীলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মামলার ভয় দেখিয়ে বাচ্চু-শাহাদাত হাতিয়ে নেয় লাখ লাখ টাকা। বড় অঙ্কের চাঁদা না দেওয়ায় ৪ আগস্ট হত্যা মামলার আসামিও হন কেউ কেউ। চাঁদা দেয়া থেকে বাদ পড়েননি তরমুজ চাষীরাও।
সালিশি বৈঠকে পোলাপানের খরচের কথা বলে নেয়া হয়েছে হাজার হাজার টাকা। চাঁদাবাজি ও দখলের পাশাপাশি এসব নিয়ে উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব শাহাদাত হোসেনের বিরুদ্ধে সদর উপজেলা বিএনপি ও জেলা যুবদল বরাবর ইউনিয়ন বিএনপির ৪ নেতার দেয়া একটি অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেখানে ২০২৪ সালের ১৫ আগস্ট খালেদা জিয়ার জন্মদিন ও ৫ আগস্টের পর নিজদলীয়দের উপর হামলা এবং চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠে আসে। ওই অভিযোগটি করেন ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য শহিদুল ইসলাম, সালেহ আহম্মদ, বোরহান উদ্দিন ও মো. মিন্টু। এছাড়া আজহারুল ইসলাম বাবলুর বিরুদ্ধেও জেলা ছাত্রদল বরাবর অভিযোগ দেয় ইউনিয়ন ছাত্রদলের সহ-সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন কাওসার, কর্মী জামসেদ আলম রাফি, নজরুল ইসলাম সামিদ ও মিনহাজ ইবনে আমীর। এসব চাঁদাবাজি, সালিশ ও মামলা বাণিজ্যে প্রায় ২০জনের নাম উঠে এসেছে। এদের মধ্যে খাইয়ারা বাজার ও এর আশপাশ কেন্দ্রীক নুর আলম শুক্কর, নুর কালাম সোহেল, ভোরবাজার ও এর আশপাশ কেন্দ্রীক সাইফুল ইসলাম, আলাউদ্দিন রুমন, আজহারুল ইসলাম বাবলু, সুজন ও সাদ্দাম হোসেন শাহীন, কেএমহাট ও এর আশপাশ এলাকায় মোশাররফ, বাহার ওরফে বন্দুক বাহার, বাচ্চু মিয়া প্রকাশ অটো বাচ্চু, নুর নবী, পাটোয়ারী কোনা কেন্দ্রীক বকু, স্বপন, জামতলা কেন্দ্রীক রেজাউল,বাচ্চু ও শাহাদাতের বাগিনা নোভেল, কেএমগোনা কেন্দ্রীক রায়হান এর নাম উঠে এসেছে। এদের মধ্যে খাইয়ারা বাজার এলাকায় দুই ভাই নুর আলম শুক্কুর ও নুর কালাম সোহেল ইট ও বালু বিক্রি করেন। এলাকায় ঘর তৈরি করতে তাদের কাছ থেকে ইট-বালু কিনতে বাধ্য করা হয়।
স্থানীয় এক দোকানদার জানান, ৫ আগস্টের পূর্বে শুক্কুর-সোহেল দুই ভাই বিদেশ ছিল। ৫ আগস্টের পর দেশে ফিরে তারা বেপরোয়া হয়ে উঠে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন দোকানদার বলেন, “সাইফুল কোন দোকানে ঝামেলা হলে সালিশ বসিয়ে পোলাপানের খরচের নামে বাবলুকে দিয়ে টাকা নিয়ে থাকে। অনেক সময় রুমন সমাধানের নাটক সাজিয়ে পরিকল্পনা করে এসব করে।”
মাটিকাটার দৌরাত্ম
ফরহাদনগরে চলে রমরমা মাটি ব্যবসাও। প্রতিটা ইউনিয়নের ন্যায় এখানেও দিনের পরিবর্তে রাতে মাটি কাটা হয়। বিশেষ করে পুলিশের সহায়তায় মাটি খেকোরা রাতের আঁধারে মাটি কেটে থাকে। এসব থেকে অসাধু কিছু পুলিশ কমিশনও পেয়ে থাকেন। মাটিকাটার প্রতিটি স্থান থেকে দৈনিক ২হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৫হাজার টাকা পর্যন্ত কমিশন দেয়া হয়। ইউনিয়ন পুলিশ বিট ও বোগদাদিয়া ফাঁড়ির পাশাপাশি এসব ভাগ থানা পর্যন্ত পৌঁছে দেয়া হয়।
এ ঘটনায় পৈত্রিক সম্পত্তি দখল, ফসলি জমির মাটি জোরপূর্বক কেটে নিয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে পুলিশ মহাপরিদর্শক বরাবর ইউনিয়নের নৈরাজপুর এলাকার কামরুল ইসলাম মানিক নামে এক প্রবাসী ১১জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরো চার-পাঁচজনের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ দেন। এরা হলেন বাহার উল্লাহ প্রকাশ বন্দুক বাহার, নাহিদুল ইসলাম, জামশেদ আলম নিশান, সৌরভ হোসেন, বাচ্চু মিয়া প্রকাশ অটো বাচ্চু, আবুল হোসেন সম্রাট, এনামুল হক ও নুর নবী, জসিম উদ্দিন, মাসুম সওদাগর ও হোনা মিয়া। জমিটি ছাগলনাইয়া উপজেলার দৌলতপুরে। সেখানে মানিকের ২৪শতাংশ ফসলি জমির ৩ থেকে ৪ ফুট মাটি কেটে গভীর করে ট্রাকে নিয়ে গেছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। জমিটির পাশে এমন আরো দুইটি জমি থেকেও তারা মাটি কেটে নিয়েছে। এরমধ্যে আব্দুল কুদ্দুস নামে একজনের ২০শতাংশ ও মর্তুজা হাজারী নামে আরেকজনের ১৫শতাংশ মাটি কেটে নিয়ে যায়। যদি এ বিষয়ে দুই ভুক্তভোগী পরিবার ভয়ে কথা বলতে রাজি হয়নি।
অনুসন্ধানে ইউনিয়নটির তিনটি এলাকায় অন্তত পাঁচটি সিন্ডিকেট মাটি কাটার সাথে যুক্ত থাকার তথ্য উঠে এসেছে। এরমধ্যে ইউনিয়নের খাইয়ারা বাজার এলাকা কেন্দ্রীক ওমর গণি মুন্না, সাইফুল ও ফারুকের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট এবং নুর আলম শুক্কুর ও নুর কালাম সোহেলের নেতৃত্ব আরেকটি সিন্ডিকেট মাটিকাটার সাথে জড়িত। মুন্না ছাড়া বাকিরা বেলায়েত হোসেন বাচ্চু ও শাহাদাত হোসেনের অনুসারী। কেএমহাট কেন্দ্রীক মিলন, বাহার, বাচ্চু, নবী, নুর আলী ও মানিক এদের নেতৃত্ব একটি সিন্ডিকেট এবং জেলা ছাত্রদলের সদস্য সাইদুল ইসলাম আরাফাতের নেতৃত্বে আরেকটি সিন্ডিকেট মাটি কাটার সাথে জড়িত। এছাড়া বেড়িবাঁধ ও পাটোয়ারী কোনা কেন্দ্রীক ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন শাহীন, বাদশা, রাজু, শহীদুল, হৃদয় ভূঁইয়া ও মেহেদীর নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট মাটির কাটার সাথে জড়িত।
মাদকের ছড়াছড়ি
ফরহাদ নগর ইউনিয়নের যত্রতত্র হাত বাড়ালেই মিলে বিভিন্ন প্রকারের মাদক। এই কারবারেও জড়িতরা সবাই বাচ্চু ও শাহাদাতের অনুসারী। এদের অনেকে আবার কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামীলীগের সময়েও মাদক কারবার করতেন। ক্ষমতার পালাবদলে নেতা পরিবর্তন করে দিব্যি এই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যে তাদের অনেকে এখন বোল পাল্টিয়ে বিএনপি নেতাদের সাথে গা লাগিয়ে চলছেন।
ইউনিয়নটিতে মাদক শুভপুর সীমান্ত হয়ে দারোগারহাট, পুরাতন মুহুরীগঞ্জ, সমিতি বাজার হয়ে ফরহাদ নগরে ঢুকে। নদী তীরবর্তী নৈরাজপুরের বাহার উদ্দিন ওরফে বন্দুক বাহারের বাড়ী নিরাপদ রুট। এ বাড়ী ছাড়াও আরো কয়েকটি রুট হয়ে মাদক প্রবেশ করে থাকে। এসব মাদক কারবারে খাইয়ারা বাজার কেন্দ্রীক মো. শামীম, নুর আলম শুক্কর ও নুর কালাম সোহেল, জামতলা কেন্দ্রীক রেজাউল ও মুহসিন, বৈদ্যকোনা কেন্দ্রীক জাহিন ও রায়হান, ভোরবাজার কেন্দ্রীক ছাত্রদল নেতা বাবলু, হানিফ, তপন, সুজন, পাটোয়ারী কোনা কেন্দ্রীক সাবেক ছাত্রলীগকর্মী ক্যাসিনো বাদশা, যুবলীগকর্মী বাবু,বকু ও স্বপন, সুবলপুর কেন্দ্রীক বেলাল ও সোহেল, কেএমগোনা কেন্দ্রীক মোকাররম ও কালা রায়হান, কেএমহাট ও নৈরাজপুর কেন্দ্রীক বাহার, নবী, বাচ্চু, প্রবাসী নিজাম ও মোশাররফ এবং কেএমহাট ও কেএমগোনার মাঝামাঝি কেন্দ্রীক নুর করিমের নাম উঠে এসেছে। নুর করিম ওই এরিয়ার সকল অপকর্মের নেতৃত্ব দিয়ে থাকে বলে জানা যায়।

গণঅভ্যুত্থানে হত্যা মামলার আসামী
কে এই বন্দুক বাহার
স্থানীয়দের ভাষ্য মতে, ফরহাদনগরের আরেক মূর্তিমান আতংক বাহার উল্যাহ প্রকাশ বন্দুক বাহার। চব্বিশের ৪আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান আন্দোলনে মহিপাল ছাত্র হত্যাসহ একাধিক মামলার আসামী। হয়েও বেলায়েত হোসেন বাচ্চু ও শাহাদাত হোসেনের প্রধান সহযোগী হয়ে সকল অপকর্ম করেন। এমন কোন অপকর্ম নেই যা বাহার উল্যাহ প্রকাশ বন্দুক বাহার করছেন না। বিশেষ করে ইউনিয়নের কেএমহাট কেন্দ্রীক তার ভয়ে তটস্থ এলাকার মানুষ। কেএমহাট এর পাশে তিনটি দীঘি দখল, ব্যাক্তিগত সম্পত্তি দখল, ফসলি জমি দখল করে মাটি কাটা, চাঁদাবাজি, সালিশ বাণিজ্য ও মাদকসহ সবকিছুতে জড়িত তিনি। চাঁদা না দেওয়ায় মারধর করেন বাহার নিজেই। অস্ত্র নিয়ে ভয় দেখিয়ে দাবি করেছেন চাঁদাও।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কেএমহাটের পাশে তিনটি দীঘি বাহার দখল করে নিয়েছে। তার সাথে রয়েছে বাচ্চু ওরফে অটো বাচ্চু, নবী, মানিক, আবুল হোসেন সম্রাট ও মুরালী। লীজের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামীলীগ ও বিএনপির একাধিক নেতাকর্মীদের মাধ্যমে গঠিত একটি সমিতি এই দীঘি তিনটিতে মাছ চাষ করতো। কিন্তু ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের ছাত্র হত্যা মামলায় জামিনের পর দীঘিগুলো দখলে নেয়। এর আগে ৪ আগস্ট মহিপালের ছাত্র হত্যা মামলায় গ্রেফতার হওয়ার পর ১৭ডিসেম্বর জামিনে বের হলে বাচ্চু কারাফটকে তাকে ফুল দিয়ে বরন করেন বাচ্চু ও তার অনুসারিরা।
এছাড়া বাহার এক ব্যবসায়ীর জোরপূর্বক ৩৪ শতাংশ জায়গা দখল করে নেন। এই জায়গা দখলে বাহারের সাথে এনামুল হক, নুর নবী, মাছুম ও নুর আলীও জড়িত বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই ব্যবসায়ী ফেনীর সময়কে জানান। এনামুল হক তার কাছ থেকে ২০হাজার টাকা চাঁদা নিয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। এছাড়া ৫আগস্টের বেশ কয়েকদিন পর তার বাড়ি ভাংচুর করে বাহার ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা। তিনি বলেন, “আমি পালিয়ে বেড়াচ্ছি। আমি নাকি আওয়ামীলীগের সময়ে সুবিধাভোগী। এজন্য আমাকে এলাকায় থাকতে দেওয়া হয়নি। আমার জায়গা দখল করে নেওয়া হয়েছে। দীঘিতে আমারও জায়গা আছে, সেখানে আমার অংশও দখল করা হয়েছে।”
এছাড়া এক ব্যাক্তি থেকে পিস্তল নিয়ে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে বাহার। ভুক্তভোগীর দাবি করা এমন একটি ভিডিও ফেনীর সময়ের হাতে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক মেম্বার কুদ্দুসের ছেলের আড়াই লাখ টাকার গরু চুরি করে নিয়ে যান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী জানান, বাহার এসব যুবদল নেতা শাহাদাত বলেছে বা তার কথা বলে এসব করে থাকে। এছাড়া গত ২২ এপ্রিল চাঁদা না দেওয়ায় রহিম খান নামে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবীকে মসজিদ থেকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয় বাহার। তার কাছে ২০লাখ টাকা চাঁদা চেয়েছে বলে সে দাবি করেন।
রহিম খান ফেনীর সময়কে বলেন, “আমি ২০২০সালে চাকরি থেকে অবসর নেয়ার পর হজ্ব করি, শহরে থাকি। মা-বাবার কবর জিয়ারত করতে এলাকায় যাই। কিন্তু বাহার আমাকে চাঁদা দেওয়া ছাড়া এলাকায় যেতে নিষেধ করছে। এজন্য আমি গেলে আমাকে গাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়।”
তিনি বলেন, “আমি যেহেতু সরকারি চাকরি করতাম, সুতরাং যে দল ক্ষমতায় আসুক তার কাজে করতে হয়। এখন আমি নাকি ’লীগ ছিলাম, সুবিধাভোগী ছিলাম। এগুলো বলে আমাকে এলাকায় যেতে দেয় না।”
কী বলছেন বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা
ফেনী সদর উপজেলার ফরহাদনগর ইউনিয়নে বিএনপি নেতা বেলায়েত হোসেন বাচ্চু ও তার সহোদর যুবদল নেতা শাহাদাত হোসেনের নেতিবাচক কর্মকান্ডে ক্ষুদ্ধ তৃণমূল নেতাকর্মীরা।
জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলাল বলেন, ব্যক্তির অপরাধের দায় দল নিবেনা। কেউ অন্যায়ের শিকার হলে আইনের আশ্রয় নিতে পারেন। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে দলীয়ভাবে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
জেলা ছাত্রদলের সভাপতি সালাউদ্দিন মামুন বলেন, যখন কোন ঘটনা ঘটে তখন আমরা কেন্দ্রের নির্দেশনার আলোকে সুনির্দিষ্ট অপরাধের প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। ইতিমধ্যে অনেকগুলো ঘটনার ব্যবস্থা নিয়েছি।
যা বললেন বাচ্চু
ফরহাদনগরে নানা অপকর্মের জড়িত থাকার বিষয় অস্বীকার করেছেন বেলায়েত হোসেন বাচ্চু। গতকাল রাতে বক্তব্য জানতে তার সাথে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। ফেনীর সময় কে বাচ্চু বলেন, ‘দখল, চাঁদাবাজী, মাটিকাটা, মামলা ও সালিশ বানিজ্য সহ যেসব বিষয়ে অভিযোগ এসেছে এসব বিষয়ে আপনারা সরেজমিন তদন্ত করুন। যদি কোন সত্যতা পান তাহলে পত্রিকায় লিখে দিন।’
এব্যাপারে শাহাদাত হোসেনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।