জুন ৩০, ২০২৬ ১৮:২৬

পরশুরামের মাদক সম্রাট কে এই প্রীতম

* ফার্মেসীর মালিক থেকে বনে যান কোটিপতি
* রয়েছে ভারতীয় নাগরিকত্ব
* মদ উদ্ধার করার পর থেকেই লাপাত্তা
* ফার্মেসির আড়ালেই চলে মাদক কারবার

মো. মহি উদ্দিন, পরশুরাম :

প্রীতম পাল। ফার্মেসীর মালিক থেকে মাদক সম্রাট। রাতারাতি হয়ে উঠেন আঙুল ফুলে কলা গাছ। অভিযানের আগেই পালিয়ে যায় সে। তার ইশারায় পরশুরামে প্রবেশ করে ভারতীয় মদ, গাঁজা ও ইয়াবা। প্রীতম উপজেলা হাসপাতাল মোড়ের শৈল ফার্মেসীর স্বত্বাধিকারী। বর্তমানে গীতা মেডিসিন সপ নামে পরিচিত সে ফার্মেসীর আড়ালে তার রয়েছে ইয়াবা, গাঁজা ও মদের রমরমা বানিজ্য। প্রীতম উপজেলায় পাটোয়ারী বাড়ী পশ্চিম বসন্তপুর এলাকার মৃত গৌরাঙ্গ শংকর পালের একমাত্র ছেলে।


বিভিন্ন সূত্রের সাথে কথা বলে জানা যায়, দক্ষিণ কোলাপাড়ায় প্রীতমের বাসার পশ্চিম পাশে একটি রুমে রয়েছে মদের গোডাউন। এখান থেকে চলে মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ। সেখানকার এক ব্যবসায়ী জানান, তার যে ফার্মেসী রয়েছে সেখানে রয়েছে অবৈধ ঔষধ। সেখানে তল্লাশি চালানো হলে আরো অনেক রহস্য বেরিয়ে আসবে বলে তিনি জানান।
গত ২০ জুন সকাল সাড়ে ৭টায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরশুরাম টু ফেনী সড়কের সমিতি রোডের পাশে পরশুরাম ক্লিনিকের এম্বুলেন্সে অভিযান চালিয়ে ১শ ১৭ বোতল ভারতীয় মদ সহকারে ড্রাইভারসহ দুইজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ড্রাইভার জসিম উদ্দিন জিজ্ঞাসাবাদে জব্দকৃত মদ গীতা মেডিসিন সপের মালিক প্রীতম পালের ও এসব মদ এগারো দিনের অধিক সময় ধরে ঢাকায় নেওয়া হয় বলে পুলিশকে জানান। আর ওইদিন থেকে লাপাত্তা হয়ে যান প্রীতম পাল। গতকাল পর্যন্তও তার দোকান ছিল বন্ধ।


প্রীতম পালের মাতা গীতা রাণী চন্দ ছিলেন পরশুরাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নার্সিং সুপার ভাইজার। ২০২৪ সালে যান অবসরে। গীতা রাণীও অনিয়ম করে অবৈধভাবে অর্থের বিনিময়ে সরকারি কর্মকর্তা ও দলীয় নেতাদের সহযোগিতায় একাধিক সিনিয়র নার্সদের বাদ দিয়ে পদোন্নতি নিয়ে থাকেন। চাকুরীরত অবস্থায় ডেলিভারিতে সরকারি ঔষধ ব্যবহার করে স্বামীর শৈল ফার্মেসীর নামে ভাউচার দেখিয়ে রোগীদের কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থ আদায় করার অভিযোগও ছিল তার বিরুদ্ধে। ডেলিভারি দিনে না করে রাত বারোটার পর করতেন বলে একাধিক সূত্র জানায়। এভাবে চাকরিরত অবস্থায় অনৈতিক ভাবে অর্থ উপার্জনের মধ্য দিয়ে তিনি তার নামে ও সন্তানের নামে পরশুরামে উত্তর কোলাপাড়া, দক্ষিণ কোলাপাড়া এবং ছয় ঘরিয়ায় ক্রয় করেন বিপুল পরিমাণ সম্পদ।


পরশুরাম মডেল প্রাইমারি বিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী শিক্ষক সুমেন সাহা জানান,উত্তর কোলাপাড়া ছয়ঘরিয়ায় আমার জায়গার পাশেও কিছু দিন আগে ৫০ লক্ষ টাকার জায়গা কিনেছে প্রীতম পাল ও তার মা গীতা রানী পাল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, “পরশুরাম পৌরসভার দক্ষিণে শ্মশানের পাশে জায়গা কিনেছে। একজন নার্সের চাকরি করে। সে সামান্য ফার্মেসীর মালিক হয়ে কিভাবে এতো জায়গা জমিন কিনে। এতো সুন্দর বহুতল বাড়ি নির্মান করা কীভাবে সম্ভব।”
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রীতম পালের অনিয়ম খুঁজতে গিয়ে আরো চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে। প্রীতম পালের স্ত্রী পুতুল নন্দিত বিয়ের পর সরকারিভাবে চাঁদপুর সরকারি মিডওয়াইফারি প্রতিষ্ঠানে নার্সিং ইনস্টিটিউট অব চাঁদপুরে তিন বছর মেয়াদি মিডওয়াইফারি নার্সিং কোর্সে উত্তীর্ণ হয়। বিয়ের পরে এ কোর্স নার্সিং আইনে সম্পূর্ণ বিপরীত বলে জানা যায়। পুতুল নন্দি নিজে তার শ্বাশুড়ির পারিবারিক ক্লিনিকে কাজ করেন।


অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রীতমপালের রয়েছে ভারতীয় নাগরিকত্ব। ভারতের নাগরিকত্ব নিয়ে ঐখানে তিনি নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন ও বাংলাদেশ থেকেও এইচএসসি পাশ করেন।


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তার নিকটতম ফার্মেসীর এক মালিক জানান, প্রীতম পাল নিজেও একজন মাদক সেবক ছিলেন। সে মাঝে মাঝে মাতাল অবস্থায় দোকানে বসে থাকতো। তিনি আরও জানান, তার দোকানে পেথিডিন, পেন্টানিল ও কেটামিন নেশা জাতীয় ঔষধ রয়েছে। প্রশাসন তার ফার্মেসী ও বাসায় তল্লাশি চালালে এসব নেশা জাতীয় ঔষধ পাওয়া যাবে। বিভিন্ন সময় সে নিজে তার শরীরের মধ্যে পুশিং করে থাকে। যা ঝিমুনী ও ইউফোরিয়া তৈরি করতে পারে এবং ঘুম, মাথা ঘোরা নেশা, শরীর হালকা লাগতে পারে।


জানা যায়, সীমান্তে দিয়ে মদ পার করে নিয়ে আসার পিছনে প্রীতম পালের সাথে আরো বড় রাঘববোয়াল রয়েছে। কিন্তু তারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।


পরশুরাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত ওসি আশ্রাফুল ইসলাম জানান, আটককৃত ড্রাইভার জসিম উদ্দিনের কথা ধরে প্রীতম পালের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া যায় না। রিমান্ডে নিলে যদি কারোর নাম বলে তখন মামলায় আসামি অন্তর্ভুক্ত করা যায়।


প্রীতম মামলা থেকে বাদ কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আপনারা এটা নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করতেছেন।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিজ্ঞাপন

error: কন্টেন্ট সুরক্ষিত!!