অক্টোবর ৫, ২০২৬ ০৪:১৬

ফেনীতে নার্স সংকট চরমে কোথাও জনবল ঘাটতি কোথাও সংযুক্তিতে অলস সময়


ইলিয়াছ সুমন :

ফেনীর সরকারি হাসপাতাল গুলোতে নার্স সংকট ক্রমেই প্রকট আকার ধারণ করছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ ২৫০শয্যা ফেনী জেনারেল হাসপাতালে প্রয়োজনের তুলনায় নার্সের সংখ্যা কম থাকায় রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। অন্যদিকে জেলার ধর্মপুর বক্ষব্যাধি হাসপাতাল থেকে পদায়ন করা হলেও মহিপাল ট্রমা সেন্টারে সংযুক্তিতে থাকা কিছু নার্সের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

হাসপাতাল-সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, জেলার একাধিক হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সংখ্যক নার্স না থাকায় কর্মরত নার্সদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এতে একদিকে কর্মীদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে ফেনী জেনারেল হাসপাতাল এবং পরশুরাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে নার্স সংকটের কারণে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। রোগীর চাপ সামাল দিতে গিয়ে বিদ্যমান নার্সদের অনেক সময় অতিরিক্ত শিফট ও দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, জেলার একটি সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নার্সের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও অন্য হাসপাতালে সংযুক্তির মাধ্যমে জনবল ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। ধর্মপুর বক্ষব্যাধি হাসপাতালে পদায়ন থাকা নার্সদের মধ্যে কেউকেউ মহিপাল ট্রমা সেন্টারে সংযুক্তিতে রয়েছেন। এছাড়া মহিপাল ট্রমা সেন্টারে ৮জন নার্স পদায়িত রয়েছেন। সেখানে হাসপাতাল কার্যক্রম না থাকায় তাদের পদায়ন নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে পর্যাপ্ত কর্মব্যস্ততা না থাকায় কেউকেউ কর্ম ঘণ্টার একটি বড় অংশ অলসভাবে পার করছেন।

এদিকে যেসব হাসপাতালে রোগীর চাপ বেশি এবং নার্সের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানে জনবল সংকট থেকেই যাচ্ছে। ফলে একই জেলার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনায় কোথাও জনবল সংকট, আবার কোথাও সংযুক্তির কারণে জনবল ব্যবহারে অসামঞ্জস্যতা দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, নার্স সংকট কাটাতে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নার্সদের বদলির উদ্যোগ নেয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টরা নতুন কর্মস্থলে যোগদান করছেন না বলে তাদের দাবি। এতে প্রশাসনিক আদেশ বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

তাদের দাবি, কোনো কোনো নার্সকে উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে বদলি করা হলেও তারা সেখানে যোগদান না করায় সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে কাঙ্খিত জনবল পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে সংকটাপন্ন হাসপাতাল গুলোতে রোগীদের সেবা নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষকে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসাসেবায় চাপ বাড়ার পাশাপাশি হাসপাতাল গুলোতে নার্স সংকটের প্রভাব পড়ছে রোগীদের ওপর। বিশেষ করে ভর্তি রোগীদের নিয়মিত পরিচর্যা, ওয়ার্ড ব্যবস্থাপনা, জরুরি বিভাগ, অপারেশন-পরবর্তী সেবা এবং বিভিন্ন চিকিৎসা কার্যক্রমে পর্যাপ্ত নার্স না থাকায় সেবার মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

পরশুরাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ জেলার একাধিক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রয়োজনের তুলনায় নার্স কম থাকায় বিদ্যমান জনবল দিয়েই অতিরিক্ত চাপ সামলাতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে স্বাস্থ্যকর্মীদের কর্মপরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে তারা মনে করছেন।

স্বাস্থ্যসেবা-সংশ্লিষ্টদের দাবি, জেলার কোন হাসপাতালে কতজন নার্স প্রয়োজন, কোথায় কতজন কর্মরত এবং কোথায় কতজন অতিরিক্ত বা সংযুক্তিতে রয়েছেন এসব তথ্য পর্যালোচনা করে প্রয়োজন অনুযায়ী জনবল বণ্টন করা জরুরি। একইসঙ্গে বদলির আদেশের পর সংশ্লিষ্ট কর্মস্থলে দ্রুত যোগদান নিশ্চিত করা গেলে সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব। তাদের মতে, রোগীর চাপ ও হাসপাতালের কার্যক্রম বিবেচনায় নিয়ে জনবল পুনর্বিন্যাস করা হলে একদিকে নার্সদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ কমবে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষও সরকারি হাসপাতাল থেকে আরও কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

এবিষয়ে জানতে চাইলে ফেনী সদর উপজেলার স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এএসএম সোহরাব আল হোসাইন বলেন, ‘বর্তমান সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সব সরকারি হাসপাতালে রোগীর চাপ দুই থেকে তিন গুণ বেড়েছে। এতে নার্সরা চিকিৎসা সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। এই অবস্থা সামাল দিতে নার্সদের সমন্বয় করে পদায়নের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা মানুষের দৌরগোড়ায় নিয়ে আসা সম্ভব।’

তিনি বলেন, ‘পরশুরাম উপজেলায় নার্স সংকট থাকায় গত ২৫আগস্ট ধর্মপুর বক্ষব্যাধি হাসপাতাল থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নার্স রোজি আক্তার, সেলিনা আক্তার, হিমা খাতুন ও সুশমিতা পালকে বদলি করা হয়েছে।’

এবিষয়ে পরশুরাম উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এমদাদুল হক জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চারজন নার্স পদায়ন করা হলেও তারা এখনো যোগদান করেননি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা নার্সিং সুপারভাইজার রত্না রানী দেবী বলেন, ‘বদলি ও পদায়নের বিষয়টি স্থানীয়ভাবে সিভিল সার্জন এবং জাতীয়ভাবে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর দেখভাল করেন। আমি তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করি।’

ফেনীর সিভিল সার্জন ডা. মো. আরিফুজ্জামান বলেন, ‘বিষয়টি আমি শুনেছি। বর্তমান সময়ে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমি ফেনীতে কয়েক দিন আগে যোগদান করেছি। তবে নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে নার্সদের সমন্বয় ও পদায়নের বিষয়ে সুপারিশ করব।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিজ্ঞাপন

error: কন্টেন্ট সুরক্ষিত!!