সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬ ০১:৩৪

অর্থনীতির গতি—শিল্প ও বিনিয়োগ-সাহিদ রেজা

স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে বাংলাদেশ আজ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে অর্থনীতি নিয়ে আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত উচ্চ প্রবৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, উদ্ভাবন এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার কৌশল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমরা এখনও বিনিয়োগের ধীরগতি, কর্মসংস্থানের সংকট, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং শিল্পের স্থবিরতা নিয়েই বেশি আলোচনা করছি। এটি আমাদের অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতারই প্রতিফলন।

বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। তবে শুধু রিজার্ভ বৃদ্ধি পেলেই অর্থনীতি শক্তিশালী হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। অর্থনীতির প্রকৃত প্রাণশক্তি হলো বিনিয়োগ। সরকারি ও বেসরকারি—উভয় খাতেই যদি বিনিয়োগের গতি শ্লথ হয়, তাহলে রিজার্ভ বাড়লেও উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোয় না। একটি সুস্থ অর্থনীতির জন্য এমন পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভই যথেষ্ট, যা অন্তত তিন থেকে চার মাসের আমদানি ব্যয় নির্বাহ করতে সক্ষম।

বাংলাদেশের অন্যতম বড় শক্তি হলো বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী এবং ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি। এই দুটি শক্তিকে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো গেলে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি আরও গতিশীল হতে পারত। কিন্তু সেই সম্ভাবনা এখনও পুরোপুরি বাস্তবে রূপ নিচ্ছে না। এর পেছনে দীর্ঘদিনের সুশাসনের ঘাটতি, নীতিগত ধারাবাহিকতার অভাব, বিচারিক ও প্রশাসনিক জটিলতা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের দুর্বলতা উল্লেখযোগ্য কারণ।

এ ছাড়া বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বাংলাদেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ, সরবরাহ ব্যবস্থার অনিশ্চয়তা, জ্বালানি ব্যয়ের ওঠানামা এবং ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব বিশ্ববাণিজ্যে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতে দেশীয় শিল্পকে আরও দক্ষ, প্রযুক্তিনির্ভর এবং প্রতিযোগিতামূলক করে তোলার বিকল্প নেই। এখন আর শুধু স্বল্পমূল্যের শ্রমশক্তির ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়ন সম্ভব নয়। উৎপাদনে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, স্বয়ংক্রিয়তা, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাই হবে আগামী দিনের অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রধান শর্ত।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হলো বেসরকারি খাত। বিনিয়োগ তখনই বাড়ে, যখন উদ্যোক্তারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, প্রশাসনিক জটিলতা কম থাকে এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। দীর্ঘসূত্রতা, অনিশ্চয়তা ও অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে এবং শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির গতিকে মন্থর করে। তাই শিল্পকারখানার উৎপাদন সচল রাখা এবং নতুন বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও বর্তমানে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। উচ্চ সুদের হার, জ্বালানি ও বিদ্যুতের ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবহন খরচ এবং কাঁচামাল আমদানির অনিশ্চয়তা অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে নীতিগত সমন্বয়, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি করা গেলে উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং দেশীয় শিল্প আরও শক্তিশালী হবে।

সম্প্রতি বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর লক্ষ্যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে শুধু নীতিপত্র বা সার্কুলার জারি করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল আসে না; মূল বিষয় হলো কার্যকর বাস্তবায়ন। বর্তমানে দেশের অনেক ব্যাংক তারল্য সংকট, খেলাপি ঋণের উচ্চহার এবং অন্যান্য আর্থিক চাপের মধ্যে রয়েছে। ফলে দুর্বল বা বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নতুন ঋণ দিতে তারা স্বাভাবিকভাবেই সতর্ক। কারণ ব্যাংকের অর্থ মূলত জনগণের আমানত, যা ঝুঁকিপূর্ণভাবে ব্যবহারের সুযোগ সীমিত। তাই সরকার যদি সত্যিই বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরুজ্জীবিত করতে চায়, তাহলে বাস্তবসম্মত আর্থিক সহায়তা, ঝুঁকি ভাগাভাগির ব্যবস্থা এবং কার্যকর নীতিগত প্রণোদনা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং আর্থিক খাতের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। একটি শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা ছাড়া টেকসই শিল্পায়ন সম্ভব নয়।

বর্তমানে কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ গুলোর একটি। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের জন্য পর্যাপ্ত মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। এর ফলে একদিকে বেকারত্ব বাড়ছে, অন্যদিকে দক্ষ জনশক্তির একটি অংশ বিদেশমুখী হচ্ছে। এই বাস্তবতায় শ্রমঘন শিল্পের পাশাপাশি উচ্চ মূল্যসংযোজনকারী শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিভিত্তিক শিল্প, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল এবং রপ্তানিমুখী নতুন খাতের বিকাশে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
একই সঙ্গে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে (এসএমই) আরও শক্তিশালী করা জরুরি। এই খাতই দেশের মোট কর্মসংস্থানের বড় অংশ সৃষ্টি করে এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল রাখে। সহজ শর্তে অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে এসএমই খাত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।

দেশীয় পুঁজি যাতে দেশের ভেতরেই বিনিয়োগ হয়, সে জন্য আস্থাশীল ও অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। পুঁজি সবসময় নিরাপদ, লাভজনক ও স্থিতিশীল পরিবেশের দিকে ধাবিত হয়। যদি দেশীয় উদ্যোক্তারা বিদেশে বিনিয়োগকে তুলনামূলকভাবে বেশি নিরাপদ মনে করেন, তবে তা দেশের অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক। তাই বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে আইনের শাসন, নীতিগত স্থিতিশীলতা, দ্রুত ও স্বচ্ছ প্রশাসনিক সেবা এবং চুক্তি বাস্তবায়নের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সহায়তা অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে কোনো দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তি কখনোই বৈদেশিক ঋণ নয়। টেকসই অর্থনৈতিক শক্তি গড়ে ওঠে উৎপাদন বৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, সুশাসন এবং দেশীয় বিনিয়োগের ধারাবাহিক সম্প্রসারণের মাধ্যমে। একই সঙ্গে রপ্তানি বাজারের বহুমুখীকরণ এবং বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনার দুয়ার এখনও উন্মুক্ত। আমাদের রয়েছে কর্মক্ষম জনশক্তি, উদ্যমী উদ্যোক্তা শ্রেণি এবং বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজার।

এখন প্রয়োজন দ্রুত, সাহসী ও বাস্তবমুখী অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত। শিল্পের চাকা সচল হলে বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, মানুষের আয় বৃদ্ধি পাবে এবং অর্থনীতি নতুন গতিতে এগিয়ে যাবে। অর্থনৈতিক অগ্রগতির এই যাত্রায় নীতিনির্ধারক, উদ্যোক্তা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগই হতে পারে সবচেয়ে বড় শক্তি। সময়ের দাবি একটাই—কথার চেয়ে কার্যকর বাস্তবায়নকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া।

লেখক : ড. একেএম সাহিদ রেজা, সাবেক পরিচালক, এফবিসিসিআই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিজ্ঞাপন

error: কন্টেন্ট সুরক্ষিত!!